বিদেশী গল্প -অন্ধকারের চিতাবাঘ- উইলিয়াম স্যামব্রট- অনুবাদ রাজর্ষি গুপ্ত শরৎ ২০২০

অন্ধকারের চিতাবাঘ

(উইলিয়াম স্যামব্রট-এর নাইট অফ দ্য লেপার্ড অবলম্বনে- অনুবাদ রাজর্ষি গুপ্ত)

কোলুমা গ্রামে পা রেখেছি কি রাখিনি, গোলমাল শুরু হয়ে গেল।

সদ্যোজাত আফ্রিকান দেশ সিয়েরা লিওনে পাঠানো শান্তি বাহিনীর সদস্য আমরা। দলে আমরা আছি চারজন। নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তারির ছাত্র দাড়িওয়ালা জেকব টানেনবাউম—দুর্দান্ত ওবো-বাজিয়ে, জ্যাজ মিউজিকের বেদম ভক্ত, থিলোনিয়াস মঙ্ক কবে কী করেছে সেসব ওর নখদর্পণে। ওরিগন রাজ্যের মাইকেল ফ্যালন বি.এ. পড়েছে বনবিদ্যা নিয়ে। একমাথা লাল চুল আর মুখে মেচেতার মতো দাগ, ঝকঝকে সুন্দর চেহারা। আছে ইউনিস গ্যান্টলি। এই সুন্দরী কৃষ্ণাঙ্গিনীর জন্ম ক্যালিফর্নিয়ার ওকল্যান্ডে, ক্যালিফর্নিয়া ইউনিভার্সিটির বার্কলি ক্যাম্পাস থেকে সমাজতত্ত্বে বি.এ. পাস করেছে। আর আছে এই অধম, গণিতশাস্ত্রে মাস্টার্স পাস করা বব মেৎজগার, যে জানে গিনি আর লাইবেরিয়ার সীমান্তবর্তী নিরক্ষীয় ঘনবৃষ্টির চিরহরিৎ অরণ্যের গভীরে অবস্থিত ও সভ্যজগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই কোলুমা গ্রামে তার শেখা অঙ্কশাস্ত্রের কণামাত্রও কোনও কাজে আসবে না।

রেলপথ যেখানে শেষ হয়েছে, তার থেকে অনেক দূরে ‘কোনো’ উপজাতি অধ্যুষিত এই গ্রাম। আপাদমস্তক ঘন জঙ্গুলে জায়গা, যাকে বলে ‘বুশ’। আদিম আফ্রিকা আজও এখানে সগৌরবে রাজত্ব চালাচ্ছে।

ছ’সপ্তাহের প্রস্তুতিপর্বে আমরা মোটামুটি ভালোমতোই বুঝে গিয়েছিলাম কী জায়গায় পদার্পণ করতে চলেছি। জেনেছিলাম এঁদো জলাভূমি, এবড়োখেবড়ো অধিত্যকা আর গভীর আফ্রিকান জঙ্গলের ছিট-ছাটে আকীর্ণ এক অঞ্চলের ঠিক মধ্যিখানে অবস্থিত এই কোলুমা গ্রাম। সেখানে বৃষ্টি হলে জল উঠে যায় দশ ফুটের উপর। হিসেব বলে, প্রতি চারটি শিশুর মধ্যে একটি মাত্র বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত বাঁচে সেখানে। সেখানে মেয়েরা বুড়ো হতে শুরু করে চোদ্দ বছরে আর ক্রমাগত সন্তানের জন্ম দিতে দিতে মারা যায় চল্লিশ পেরোতে না পেরোতেই। ট্রাকোমার মতো চক্ষুরোগ, ফ্র্যামবেসিয়ার মতো ঘা-পাঁচড়া, গোদ আর ৎসেৎসি মাছি সেখানকার স্বাভাবিক জীবনের অংশ। আর সেখানকার উপজাতীয় সর্দাররা মধ্যযুগীয় সামন্তপ্রভুদের মতো হাতে মাথা কাটার ক্ষমতা রাখে। অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর এক দেশ, যেখানে হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা কুসংস্কার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেশের মানুষদের ঘাড়ে ধরে নিজের দাস বানিয়ে রেখেছে। রাতের বেলা মেরে ফেললেও তারা জঙ্গলের মাটিতে পা রাখবে না, কারণ তাদের দেবতা হলেন চিতাবাঘ—তিনি তাদের শরীর আঁচড়ে-কামড়ে ছিঁড়েখুঁড়ে রেখে যান, তাদের আত্মা তাঁর ভোগে লাগে। আর এই দেবতার সাক্ষাৎ প্রতিনিধি হল তাদের ওঝা। একমাত্র সে-ই রাতবিরেতে জঙ্গলে চরে বেড়ায় বিভিন্ন রূপ ধরে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝাঁ-চকচকে বার্কলি ক্যাম্পাসে প্রস্তুতিপর্ব চলার সময়ে এই ওঝার ব্যাপারে আমাদের তেমন কিছু জানানো হয়নি। কিন্তু অযাচিতভাবে কোলুমায় উপস্থিত হওয়ামাত্রই তার সঙ্গে এবং তার ক্ষমতার সঙ্গে আমাদের মোলাকাত হয়ে গেল। সে মোলাকাত খুব বন্ধুত্বপূর্ণ মেজাজে হল না।

বুশ অঞ্চলে প্রবেশ করার আগে শেষ গঞ্জমতো জায়গা হল সোফাদুয়ে। সেখানেই আমাদের দেখা হল ফাদার এভারেটের সঙ্গে। মেরিনোল সম্প্রদায়ের এই আমেরিকান পাদরিটি কোলুমার অদূরেই একটি ছোটো মিশন চালান। ত্রিশ বছর বুশের গহিনে বাস করে ধস্তাধস্তি চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে আফ্রিকার জঙ্গলের আদিম অন্ধকারে একটু আলোকরেখা দেখা দেয়। একহারা চেহারা আর শান্ত দুটি চোখের মালিক ভদ্রলোকটি স্বেচ্ছায় আমাদের সাহায্য করতে বুশ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তাঁর পাকা চুলওয়ালা বৃদ্ধ কৃষ্ণাঙ্গ সহচর জোবকে সঙ্গে নিয়ে। আমাদের সবাইকার সঙ্গে হাসি মুখে করমর্দন সেরে তিনি ইউনিসের হাতদুটো অনেকক্ষণ নিজের হাতে ধরে রেখে গভীর চোখে তাকে জরিপ করলেন। তারপর বললেন, “বেশ শক্তি আছে তো তোমার! মনে হচ্ছে নীলনদ অঞ্চলের হামিটিক কোনও বংশধারায় তোমার জন্ম। ঠিক যেন… হ্যাঁ, মাসাই।”

দুই মেধাবী চোখে ফুলকি ছুটিয়ে ভরাট গলায় তার স্বাভাবিক হাসি হেসে উঠল ইউনিস। জবাব দিল, “না, মিসিসিপির ধারায় ফাদার। তাও আজ দুশো বছরের ওপর হয়ে গেল।”

“না না, আমি তারও আগেকার কথা বলছিলাম।” শান্ত গলায় ফাদার বললেন, “আফ্রিকার সিংহ মাসাইদের নাম এখানকার লোকও জানে।” কোটরে বসা দুই চোখ দিয়ে খুব ভালো করে আমাদের দেখলেন তিনি। বললেন, “তোমরা বড়ো সুন্দর মানুষ। স্বাস্থ্যবান যৌবনের ছবি যে কী সুন্দর হয় তা আমি এত বছর ভুলে ছিলাম। তোমরা তোমাদের ওষুধ-ইঞ্জেকশন ঠিকঠাক নিয়েছ আশা করি? এখানকার ম্যালেরিয়ার কথা তো নিশ্চয় জানো।”

আমাদের সমস্বরে গুঙিয়ে ওঠা দেখে ফাদার এভারেট একটু বিষণ্ণ ম্লান হাসি হাসলেন মাত্র। জোব আমাদের মালপত্র তুলতে হাত লাগাল। আমাদের বাহন বলতে দুটি পুরনো কিন্তু কাজ চলে যাওয়ার মতো জিপ। তাতে ডাঁই করে রাখা আমাদের যাবতীয় জিনিসপত্র, দু’বছর চলে যাওয়ার মতো সরঞ্জাম। জোব সার্থকনামা ব্যক্তি। যাবতীয় যা ধকল-ঝক্কি-জ্বালা-যন্ত্রণা কল্পনা করা যায় সেসব সামলেও ভূতের মতো খাটতে পারে লোকটা, আর তার সঙ্গে চলতে থাকে এদেশি দেহাতি টানে ভাঙা ইংরেজিতে অনর্গল বকবক। সিয়েরা লিওন বহুকাল ব্রিটিশ প্রোটেক্টরেট অঞ্চল থাকার কারণে অনেক এদেশিয়ই অন্তত ‘ইংরেজি’ বলে চালানোর মতো একটা ভাষা বলতে পারে। অন্যেরা মিশ্র ভাষা বা পিজিনে কথা বলে। আর বুশ অঞ্চলে এদের নিজস্ব ভাষা ছাড়া অন্য কোনও ভাষাই চলে না।

আমরা প্রথমে জন্তুজানোয়ারে ভরা উন্মুক্ত সাভানার প্রান্তরের ওপর দিয়ে উত্তর-পূর্ব অভিমুখে চললাম। তারপর ঝলসানো ঘাসজমি আর বেঁটে বেঁটে ঝোপঝাড়-গাছপালায় আকীর্ণ ভূপ্রকৃতির মাঝ দিয়ে আরও উত্তরে আর তারপর আরও পূর্বে ছুটে চলতে চলতে অবশেষে এসে পড়লাম ঘন চিরহরিৎ বনানীর রাজত্বে। আফ্রিকার মার্কামারা এই জঙ্গল পূর্বদিকে শত শত মাইল বিস্তৃত হয়ে প্রবেশ করেছে গিনি আর লাইবেরিয়া দেশে। এবারে পথ বলতে জঙ্গলের সরু সুঁড়িপথ। তার উপর দিয়েই লাফাতে লাফাতে আর আমাদের নাচাতে নাচাতে চলল আমাদের জিপ। ইত্যবসরে ফাদার এভারেট বলে যেতে থাকলেন কোলুমায় আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করে রয়েছে।

“প্রথম যার সঙ্গে তোমাদের দেখা হবে সে হল ওতুরু—সে গাঁয়ের মোড়লও বটে, বদ্যিও বটে।”

“স্থানীয় ওঝা তার মানে?” আমি হেসে জিজ্ঞাসা করলাম।

তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন ফাদার। তারপর গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন, “ও-ই হচ্ছে আমার আজ তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসার মূল কারণ। আমি এসেছি তোমাদের ওর জন্য প্রস্তুত করে দিতে। ওকে হেলাফেলা করে নীচু নজরে দেখার মতো ভুল কোরো না। ওতুরু মেন্দি উপজাতির লোক, ছেলেবেলায় ফ্রি-টাউনের স্কুলে পড়েছিল, খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারে। কিন্তু ওর আসল কারবার হল জুজু—মানে জাদু-মন্ত্র-তন্ত্র নিয়ে। ওর ক্ষমতাকে গাঁয়ের লোকেরা যমের মতো ভয় করে, আর ও সেই ভয়কে নিষ্ঠুরভাবে কাজে লাগিয়ে নিজের প্রতিপত্তি বজায় রাখে। লোকটা পয়লা নম্বরের স্বৈরাচারী একনায়ক।”

আমরা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাঁর দিকে চাইছি দেখে তিনি বললেন, “তোমরা যে ওখানে যাচ্ছ, এই ব্যাপারটা সে মোটেই ভালো চোখে দেখছে না। বুঝতেই পারছ কেন। তোমরা আরেক ধরনের জাদুর দূত হয়ে আসছ, যে জাদু ওকে তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাই তোমাদের কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ এই যে, এমন কোনও কাজ তোমরা করবে না যা ওকে তোমাদের বা তোমাদের কাজের চরম কোনও ক্ষতি করার সুযোগ করে দেয়।”

“এ-ই হচ্ছে আফ্রিকার মূল সমস্যা।” ঝাঁঝালো গলায় ইউনিস বলে উঠল, “এ লোকটা শিক্ষিত, এ জানে এ যা করছে তাতে এর নিজের দেশের লোকের উন্নতি কয়েকশো বছর পিছিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু জেনেও দু’নম্বরি চালিয়ে যাচ্ছে। ধাপ্পাবাজ বদমাইশ বুজরুক কোথাকার! লোকেদের কুসংস্কার আর ভয়ের উপর পরজীবীর মতো ভর করে নিজের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে; তাদের অশিক্ষা আর দুঃখ-দুর্দশাকে জিইয়ে রাখছে শুধুমাত্র নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য!” তার কালো চোখে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। বলল, “একে ধ্বংস করার জন্য যা যা করার দরকার হয় আমি করব, এই আমি বলে দিলাম।”

ইউনিসের এহেন তেড়েফুঁড়ে ওঠায় ফাদার এভারেট কেমন একটু নিভে গেলেন। বললেন, “তুমি ঠিক বুঝতে পারছ না। ওর ক্ষমতা সত্যিই আছে, সত্যিকারের জাদুশক্তি। শোনা যায়,” ফাদার এভারেট একবার উঁকি মেরে পিছনের জিপে বসে থাকা জোবকে দেখে নিলেন। “শোনা যায় ও নাকি টোঙ্গো বলে এক নিষিদ্ধ দলের বেশ বড়ো গোছের পাণ্ডা। চিতামানুষের দল। নেটিভরা তাদের নামও মুখে আনে না। রাত্রে তাদের কারোর মুখোমুখি পড়ে যাওয়ার অর্থ হল সাক্ষাৎ মৃত্যু। অনেকে সেভাবে মরেছেও, ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে।”

ইউনিস চোরা চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনিও এইসব বুজরুকিতে বেশ বিশ্বাস করেন ফাদার।”

ফাদার দৃশ্যতই একটু থতমত খেয়ে ইতস্তত করে বললেন, “আমি কী বিশ্বাস করি সেটা বড়ো কথা নয়। আমি সম্পূর্ণ অন্য জগত থেকে আসা সাদা চামড়ার মানুষ। বড়ো কথা হল, এরা বিশ্বাস করে আর আদি-অনন্তকাল ধরে সে বিশ্বাস এদের মনে শিকড় গেড়ে বসে আছে। তাই এদের সঙ্গে যাই ঘটুক না কেন, ব্যাখ্যাতীত হয়েই থেকে যায়।”

জিপ নেচে নেচে এগোতে থাকল। ছায়া দীর্ঘ হতে শুরু করল। ফাদার বলে যেতে থাকলেন কেমন করে এদেশের মানুষের জীবন থেকে মৃত্যু নির্ধারণ করে ওঝা-বদ্যির দল। ওঝার জাদুশক্তিতে এদের অপরিসীম বিশ্বাস। এরা বিশ্বাস করে, কেউ ওঝার বিরক্তির কারণ ঘটালে ওঝা তার হাত অবশ করে দিতে পারে, চোখ অন্ধ করে দিতে পারে। এমনকি তার বুকের ধুকপুকুনিও এক লহমায় থামিয়ে দিতে পারে। আর যেটা বললেন তিনি সেটা হল এখানকার লোকেদের কালোজাদু আর তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাসের কথা। মন্ত্রবলে ঘুমন্ত অবস্থায় কারোর কারোর আত্মা নাকি বিচরণ করে বেড়াতে পারে দূর-দূরান্তরে। আবার মন্ত্রের জোরে ভয়ানক অসাধু কিছু লোক নাকি বেবুন বা কুমির কিংবা সবচেয়ে ভয়ংকর চিতাবাঘেরও রূপ ধারণ করতে পারে। রাত নামলে সেই রূপ ধরে অন্ধকারের মাঝে তারা ঘুরে বেড়ায় খাবারের সন্ধানে। খাবার মানে, মানুষের রক্তমাংস।

সূর্যের আলো যখন তেরছা হয়ে সবচেয়ে উঁচু গাছগুলোর মগডাল বেয়ে মাটিতে নেমে আসছে, সেই সময় আমরা কোলুমায় পৌঁছালাম। ফুলে ফুলে ছাওয়া বিশালকায় বনস্পতির দলের নিচে ছড়ানো ছেটানো কয়েকটা কুঁড়েঘর দাঁড়িয়ে আছে, যেন স্বর্গের নন্দনকাননের ঠিক মাঝখানে একটা খোলা নর্দমার মুখ। গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে এল। ছয় সপ্তাহ আগে হালকা মেজাজে এই কাজে যোগ দিয়েছিলাম; আর আজ এই প্রথম বুঝতে পারলাম আমাদের কাজটা ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ আর কঠিন। কুটিরগুলোর চারপাশের প্রতি ইঞ্চি জমিতে থিকথিক করছে নোংরা—তাতে পোকা ধরে গেছে, ভনভন করে উড়ছে মাছির দল। আবর্জনার মধ্যে চরছে কাদামাখা রুগ্ন শুয়োরের পাল। পোকাধরা পালকওয়ালা মুরগির ঝাঁক পায়ে পায়ে ঘুরছে। ঘেয়ো কুকুরগুলো খেঁকিয়ে একে অপরকে খাবারের টুকরোর পাশ থেকে সরাতে ব্যস্ত। তার মধ্যেই টলমল পায়ে এদিক ওদিক চলে বেড়াচ্ছে বাচ্চার দল; মাটি থেকে ধুলোমাখা খাবারের টুকরো তুলে আয়েশ করে মুখে পুরছে। বাচ্চাগুলোর পেট ফুলে ঢোল, পা লিকলিকে, গায়ের খোলা ঘা থেকে পুঁজরস গড়াচ্ছে, পিঁচুটি পড়া চোখ থেকে অনবরত জল ঝরছে। প্রত্যেকটা হাড্ডিসার চেহারার পাঁজরা গোনা যায় আর দাঁত-ফোকলা। তাদের মায়েদের বয়স বোধ করি কৈশোর এখনও পেরোয়নি, কিন্তু এর মধ্যেই তাদের চামড়া ঝুলে পড়ে বীভৎস দেখাচ্ছে। পুরুষের দল হাঁটুর খাঁজে এক পা তুলে এক পায়ে ভর দিয়ে হাঁ করে ভ্যাবাগঙ্গারামের মতো চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দেখে মনে হবে যেন বকের দল ধ্যান করছে। তাদের ফাটা গোড়ালি দিয়ে ‘ইয়’ রোগের বিষাক্ত পুঁজরক্ত ঝরছে।

আমরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখতে থাকলাম। ইউনিসের চোখের কোনা দিয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

জিপগুলো দাঁড়িয়ে ছিল একটা প্রকাণ্ড ইয়াইরি গাছের সামনে। গাছতলায় চোখে পড়ল একটা কাঠে কিংবা পাথরে খোদাই করা পেট মোটা কিম্ভূতকিমাকার মূর্তি। তার মুখটা কোনও জানোয়ারের, কিন্তু হাত-পাগুলো মানুষের মতো। সে হাত-পায়ের আঙুলের ডগা থেকে জান্তব বড়ো বড়ো নখ বেরিয়ে এসেছে, আর পিছন থেকে ঝুলছে একটা লম্বা ল্যাজ। মূর্তিটা ঘিরেও মাছির মেঘ ভনভন করছে। কারণ তার সামনে পচা মাংসের টুকরো, ছেঁড়া সবজিপাতি, মাছের কাঁটা-পোঁটা-মুড়ো আর দুর্গন্ধ ফলের ঢিবি হয়ে উঠেছে। গাছ থেকে দড়িতে বাঁধা কাচ আর ধাতুখণ্ড ঝুলছে, গ্রামদেবতার কাছে গ্রামবাসীদের পুজো চড়ানোর নিদর্শন আর কী!

“ঠাকুরের কী ছিরি!” ইউনিস তেতো গলায় বলে উঠল।

“এই এদের সেই চিতাবাঘ-দেবতা।” ফাদার এভারেট বললেন, “আর ওই যে পাশের কুঁড়েটা দেখছ, ওইটা এদের ওঝা ওতুরুর।”

জিপ থেকে বেরিয়ে এসে আমরা ওতুরুর ঘরের দিকে চললাম। চলতে চলতে খেয়াল করলাম, গ্রামবাসীরা আমাদের কাছে এসে ঘিরে ধরার বদলে, যেমনটা এরা সাধারণত করে থাকে বলে আমি এখানেও আশা করেছিলাম, দূরেই দাঁড়িয়ে রইল। ফাদার এভারেটের দিকে চেয়ে বললাম, “আমাদের দেখে এরা খুব যে খুশি হয়েছে তা তো মনে হচ্ছে না ফাদার।”

তিনি শুধু ছোটো করে মাথা নেড়ে বললেন, “হয়নিই তো।”

এইবার একটা লোক কুঁড়েঘরটা থেকে বেরিয়ে এল। ফাদার বিড়বিড় করে বললেন, “ওতুরু।”

লোকটা ঢ্যাঙা, পাকানো শক্তপোক্ত চেহারা, কিন্তু ওজনে বেজায় হালকা, বোঝা যায়। কাছে এগিয়ে আসতে বুঝতে পারলাম সে ঠিক কতটা লম্বা। আমি লম্বায় ছ’ফুট দু’ইঞ্চি। এর মাথা আমার থেকেও ফুট খানেক উঁচুতে। কাছে এগিয়ে আসতে আসতে লোকটা রুক্ষস্বরে কী একটা বলল। কয়েকজন গ্রামবাসী উৎসুক হয়ে আমাদের কাছে ঘেঁষে এসেছিল, তার মুখ থেকে কথা খসা মাত্রই জড়সড় হয়ে ফিরে গেল নিজেদের দলের মাঝে। লোকটার পোশাক-আশাক খুব সাধারণ। রঙজ্বলা খাকি শর্ট প্যান্ট আর সুতির শার্ট। হাতার ফুটো দিয়ে চোখে পড়ার মতো পেশীবহুল দুটো লম্বা হাত বেরিয়ে এসেছে। গলায় একটা সুতোয় ঝুলছে দুটো বাঁকা হলদে দাঁত, কোনও বড়ো বেড়াল জাতীয় জানোয়ারের শ্বদন্ত। লোকটার সারা চেহারা থেকে ফেটে পড়ছে একটাই ভাব, তার অসীম শক্তি। আর সেই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও তার আছে। জ্বলজ্বলে চোখের তীক্ষ্ণদৃষ্টি মেলে সে আমাদের মাপতে লাগল, আর তার চোখ সবচেয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়াল ইউনিসের ওপর।

আমরা বিস্ময়-বিমুগ্ধ চোখে দাঁড়িয়ে রইলাম। ইউনিসের মুখে বিতৃষ্ণার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু তার চোখেও একটা ভয়ের ঝিলিক দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। ত্বরিতে সে নিজেকে সামলে নিয়েছে। ফাদার এভারেট নীচু গলায় ভদ্রতাসূচক কী একটা কথা বলতে শুরু করতেই ওতুরু তাঁর দিকে চাপা ঘৃণা মিশ্রিত একটা চাউনি ছুড়ে দিয়ে কর্কশ ভাষায় কী যেন বলে উঠল। তার দানাদার ভারী কণ্ঠস্বরেও ক্ষমতার দম্ভ ঠিকরে পড়ল।

“কী বলছে এ?” জিজ্ঞাসা করল ইউনিস।

ইউনিসের দিকে ভাঁটার মতো চোখ ফিরিয়ে বেখাপ্পা ব্রিটিশ উচ্চারণের ইংরেজিতে ওতুরু চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “হাড় চেলে দেখেছি, তা-ই বলছিলাম সাদা ফাদারকে।”

“এই ভবিষ্যৎ বাতলানোর পদ্ধতি নাকি বলেছে তোমরা এখানে অবাঞ্ছিত অতিথি।” ফাদার বললেন।

“হাড় বলেছে এই আমেরিকানরা এখানকার লোকেদের দুঃখের কারণ হবে।” গম্ভীর গলায় ওতুরু বলল।

ইউনিস হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল। আকাশ ফাটানো অবজ্ঞার অট্টহাসি। গ্রামের লোকেরা এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, এবার গুঞ্জন তুলে আমাদের কাছে ঘনিয়ে এল। সরু কিন্তু সবল হাতদুটো কোমরে রেখে সটান দাঁড়িয়ে ইউনিস বলল, “হ্যাঁ, আমাদের উপস্থিতি যে তোমার পক্ষে কতখানি কড়া আর বাজে ওষুধ সে তো বুঝতেই পারছি। তবে সেই ওষুধে এদের উপকারই হবে। শোনো, আমরা ফ্রি-টাউনের সরকারের অনুরোধে এখানে এসেছি। সরকারি আমন্ত্রণপত্র আছে আমাদের সঙ্গে যাতে পরিষ্কার লেখা আছে আমরা এখানে থাকতে পারি, এদের সঙ্গে বসবাস করতে পারি আর এদের যা যা সাহায্য দরকার স-ব দিতে পারি।” তার চোখ জ্বলতে লাগল। বলল, “সাত হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এই বিদেশ-বিভুঁইতে এসেছি আমরা, সে তোমার হাড়ের মুখ থেকে ‘আমাদের থেকে খারাপ হবে’ শুনে ফিরে যাওয়ার জন্য নয়।”

ওতুরুর মোটা ভুরুতে মেঘ ঘনিয়ে এল। গলাতেও মেঘের চাপা গুড়গুড়ুনি তুলে ঠাণ্ডাভাবে সে বলল, “আমার আর কিছুই বলার নেই তাহলে। হাড় কখনও মিথ্যে বলে না। তোমরা যদি থাকো তবে আমাদের পরমপিতা চিতাবাঘের আক্রোশের আর অন্ত থাকবে না।”

“তোমাদের চিতাবাঘকে থোড়াই ভয় করি আমি!” গলা চড়াল ইউনিস যাতে তার কথা গ্রামবাসীদের মধ্যে যারা অন্তত ইংরেজি জানে তাদের কানে পৌঁছায়। তারপর সাঁ করে ঘুরে পকেট থেকে লিপস্টিক বের করে দুই চকিত টানে একটা টকটকে লাল ক্রস এঁকে দিল চিতাবাঘ-ঠাকুরের বেঢপ মূর্তির উঁচু হয়ে থাকা ভুঁড়ির উপরে। আমাদের ঘাড়ের উপর এসে পড়া কৌতূহলী জনতা ভয়ে আঁতকে উঠে লাফিয়ে পিছিয়ে গেল। ইউনিস ফিরে দাঁড়াল তাদের দিকে। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার স্পর্ধা ভাষা খুঁজে পেয়েছে তার অভিজাত শরীর জুড়ে। “সিংহের মেয়ে আবার কবে চিতাবাঘকে ভয় পায়?” এই বলে মূর্তির দিকে ফিরে সে বীরের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে কী দৃপ্ত সৌন্দর্য! দেখলাম ফাদার এভারেট মাথা নোয়ালেন। গ্রামবাসীদের মধ্যে একটা উত্তেজনার কলরব ছড়িয়ে পড়ল।

ওতুরুকে দেখে মনে হল পারলে সে ইউনিসকে ভস্মই করে ফেলে! হঠাৎ করে তার চোখদুটো কেমন ঘোলাটে লাগল। ইউনিসও যেন একটু কুঁকড়ে গেল সেই অগ্নিদৃষ্টির সামনে, কিন্তু তার চোখ থেকে চোখ সরাল না।

“এইবার অনেক আত্মা দেবতার ভোগে লেগে যাবে রে!” ওতুরু গ্রামবাসীদের দিকে আঙুল তুলল, “ওদেরও,” তার আঙুল আমাদের দিকে ঘুরল, “তোদেরও।” এই বলে ধীর পায়ে সে নিজের ঘরের ভিতর ঢুকে গেল।

দু’সেকেন্ডের মধ্যে সব লোকজনও সব উধাও হয়ে গিয়ে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু কয়েকটা নোংরা শুয়োর ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে বেড়াচ্ছে। খেঁকি কুকুরগুলো পর্যন্ত যেন কোন আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে হঠাৎ করেই গা ঢাকা দিল।

সন্ধেবেলা। আমরা আগুনের ধারে গোল হয়ে বসে আছি। গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে শনশনিয়ে হাওয়া বইছে, দেবমূর্তির সামনে কাচ-ধাতুর ঝুলন্ত টুকরোগুলো দুলতে দুলতে টুংটাং শব্দ তুলে বাজছে। হঠাৎই ওতুরুর বিরাট প্রাগৈতিহাসিক অবয়বখানা দেবতার থানের আলো-আঁধারির মাঝে ফুটে উঠল। আবছা আলোয় দেখা গেল তার হাতে রয়েছে আগাগোড়া লোমশ আচ্ছাদনে মোড়ানো একটা মোটা লাঠি বা মুগুরজাতীয় কিছু আর একটা থলে যার মধ্যে থেকে খড়মড় আওয়াজ উঠছে নাড়লে-চাড়লে। ইউনিস একা একটা ঘরে থাকছিল। লাঠিখানা সেই ঘরের দিকে তুলে ধরে সে মন্দ্রগম্ভীর স্বরে দুর্বোধ্য ভাষায় কী সব আওড়াতে লাগল, আমরা ঠিক ভালো করে শুনতে পেলাম না। তারপর সে দেবস্থানের মাটিতে লুটিয়ে পড়ে দেবতাকে প্রণাম জানাল। তারপর পা দিয়ে মাটিতে দাপাতে থাকল, চিৎকার করে বিকট সব অঙ্গভঙ্গী করতে লাগল তার সঙ্গের থলেটা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে। সবশেষে শান্ত হয়ে চলে গেল। আর ঠিক তখনই অন্ধকার জঙ্গলের গভীর থেকে আমাদের কানে ভেসে এল একটা আওয়াজ। কাশির মতো অদ্ভুত খকখকে আওয়াজ করে ভারী গলায় কী যেন একটা জন্তু ডাকতে শুরু করেছে হঠাৎই।

“চিতাবাঘ।” ফিসফিস করে বলল জোব।

ফাদার এভারেট নিঃশব্দে উঠে দ্রুতপায়ে মূর্তিটার কাছে গেলেন। দেখলাম বেদি থেকে কী একটা জিনিস তুলেও নিলেন। যখন আমাদের কাছে ফিরে এলেন তখন আগুনের আলোয় তাঁর মুখ দেখাচ্ছিল পাথরের মতো শক্ত। আড়ষ্ট গলায় টানেনবাউম জিজ্ঞাসা করল, “এসব কী হল, ফাদার?”

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ফাদার বললেন, “শয়তানির চূড়ান্ত।” একটা ছোট্ট বস্তু তুলে ধরে তিনি বললেন, “এ হল একটা জুজু। চিতাবাঘ-ঠাকুরকে তুষ্ট করার জন্য কেউ এটা নিবেদন করে গেছে।”

আমরা খুব মন দিয়ে জিনিসটা দেখলাম। একটা অগোছালোভাবে বানানো পুতুল, তার চোখে, বুকে আর পেটে বেঁধানো রয়েছে বাঁকা নখের মতো কতগুলো কাঁটা। অগোছালো হলেও পুতুলটার মুখ স্পষ্ট বোঝা যায়।

“ইউনিস!” আমার গলা দিয়ে কোনোরকমে বেরোল।

“হুঁ।” বলেই ফাদার এভারেট পুতুলটা ছুড়ে আগুনে ফেলে দিয়েই হাঁটা লাগালেন ইউনিসের কুটিরের দিকে। দরজায় একবার টোকা দিয়েই তার ঘরের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।

পরেরদিন ফাদার এভারেট আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে আমাদের প্রত্যেককে উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরলেন একবার করে। তিনি চলে যাওয়ার পর লক্ষ করলাম, ইউনিসের গলায় উজ্জ্বল হয়ে অবস্থান করছে একটা ধবধবে রুপোর ক্রস। চোখের তলায় কালি পড়ে গেছে তার। সেদিন গ্রামবাসীরা সকলেই আমাদের এড়িয়ে চলল। যদিও তাতে আমাদের প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করে দেওয়ায় কোনও বাধা পড়ল না। বেশ কাজ চালানো গোছের একটা শৌচাগার তৈরি করে তার ব্যবহার দিয়েই স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থার পদার্পণ ঘটল গ্রামে।

পরের দু’দিন বেশ গভীর রাত পর্যন্ত আমরা খুব মন দিয়ে নজর রেখেও ইয়াইরি গাছের নিচে কাউকে আবির্ভূত হতে দেখলাম না। কিন্তু রোজই পরের দিন সকালে গাছতলায় একটা করে কাঁটা-বেঁধা ইউনিসের পুতুল পাওয়া যেতে থাকল। আর প্রতিদিনই ইউনিস কেমন শুকিয়ে যাওয়া চেহারা নিয়েও প্রবল উৎসাহে গ্রামের মেয়েদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাদের কাজকর্ম দেখতে থাকল। গ্রামবাসীরা, আমরা বুঝতে পারলাম, চাপা আগ্রহে অপেক্ষা করছে কখন ইউনিসের মনের জোরের সঙ্গে ওতুরুর জাদুর টক্কর লাগে তা দেখতে পাওয়ার জন্য। বারবার তাদের ভিতু চোখ গিয়ে পড়ছিল চুম্বকের মতো ইউনিসের গলার সাদা ক্রসটার উপর।

বরফ প্রথম ভাঙল টানেনবাউম। বা বলা ভালো থিলোনিয়াস মঙ্ক আর তার সঙ্গী লেস্টার ইয়ং আর চার্লি ‘বার্ড’ পার্কার। তৃতীয় দিনেও যখন কেউ ‘ভোগে লাগল না’, গ্রামবাসীদের মধ্যে ভয়ের টানটান ভাবটা একটু কমে গিয়ে একটা শৈথিল্য দেখা দিল। টানেনবাউমের জ্যাজ মিউজিকের জলসায় সেদিন দেখলাম বেশ সমঝদার ক’জন শ্রোতা জুটেছে। এক বুড়ো তো লাফিয়ে উঠে হাততালি দিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচতেই লেগে গেল। তার ছিনে-পড়া পায়ের এক জায়গা দিয়ে অনর্গল পুঁজ-রস গড়াচ্ছে। দুর্গন্ধ ক্ষতস্থানটায় হাড়ের গুঁড়ো, কাদামাটি, থুতু আর আরও না জানি কীসব অকথ্য জিনিসপত্রের পুলটিস দেওয়া, তাতে মাছি ভনভন করছে। দুটো রেকর্ড বদলের ফাঁকে টানেনবাউম লোকটাকে হাত নেড়ে কাছে ডাকল। ভয়ে ভয়ে সে এগিয়ে আসতেই তার পায়ের ক্ষতস্থানটা দেখবে বলে টানেনবাউম তাকে একটা গাছের গুঁড়ির উপর লম্বা করে শুইয়ে দিল। বুড়ো ভিতু চোখে একবার ওতুরুর কুঁড়ের দিকে চাইল বটে, কিন্তু টানেনবাউম যখন ঘাটা পরিষ্কার করতে শুরু করল সে বাধা দিল না। একটা সময় দেখি সে টানেনবাউমের ঘাড়ের ওপর দিয়ে পিছনে চেয়ে আছে। কী দেখছে রে বাবা! ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি গলায় ক্রস আর মুখে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউনিস।

সে রাত্রে আবার প্রবল ঝড় উঠল। আকাশের গোল চাঁদ যেন এ-গাছ থেকে ও-গাছের মাথায় মাতালের মতো লাফালাফি করে বেড়াতে থাকল। আর আমি বেশ রাত অবধি টানটান হয়ে বসে থেকেও গাছতলার দেবস্থানে ওতুরু বা অন্য কাউকে উদয় হতে দেখলাম না। কিন্তু পরে, রাত যখন গভীর হয়েছে, তখন গ্রামের পিছনের বনের ভিতর থেকে একটা রক্ত জল করা চিৎকার ভেসে এল। আর পরের দিন সকালে বনের ধারে মিলল সেই বুড়োর ছেঁড়া-খোঁড়া আধ-খাওয়া মৃতদেহ। দেখে মনে হয় চিতাবাঘের শিকার হয়েছে সে। টানেনবাউমের সযত্নে ব্যান্ডেজ করে দেওয়া ঘেয়ো পাটা নির্মম আক্রোশে একেবারে মুচড়ে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। সেদিন সারাদিন গাঁয়ের লোকেরা ঘরের বাইরে বেরোল না। বুড়োর মৃতদেহ খড়ে ঢেকে দেবতার মূর্তির সামনে রেখে দেওয়া হল। ওতুরুকেও সারাদিন দেখা গেল না। আমরা রাইফেল বাগিয়ে গ্রামের সীমানায় বনের ধারে ধারে পাহারা দিলাম, কিন্তু আমাদের অনভ্যস্ত চোখে কিছুই ধরা পড়ল না।

সেই রাত্রেই, যেমন চুপিচুপি তিনি ফিরে গিয়েছিলেন, তেমনই নিঃশব্দে গ্রামে ফিরে এলেন ফাদার এভারেট—সঙ্গে তাঁর চিরবিশ্বস্ত সহকারী জোব। আর গ্রামে ঢুকেই সর্বপ্রথম তিনি গেলেন ওতুরুর ঘরে। আমরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন তিনি বেরোন। কিন্তু তিনি বেরিয়েই হাত তুলে আমাদের অপেক্ষা করতে বলে সোজা ঢুকে গেলেন ইউনিসের ঘরে। অনেকক্ষণ পরে যখন তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন তখন তাঁর মুখ শুধু গম্ভীর নয়, রক্তহীনও বটে।

“ওতুরু বলল বুড়োর আত্মা নাকি চিতাবাঘ-বাবার ভোগে লেগেছে।” ক্লান্তভাবে হাত দিয়ে মুখের ঘাম মুছে ফাদার বললেন, “কপাল আরও পুড়বে যদি ইউনিস আর তোমরা এক্ষুনি এই জায়গা ছেড়ে চলে না যাও। এসবই নাকি তাকে বলেছে তার সেই মহামহিম হাড়।”

“কিন্তু এরকম বললেই এই লোকগুলোকে এভাবে ফেলে রেখে এককথায় চলে যাওয়া যায় নাকি?” আমি প্রতিবাদ করলাম, “এসব থামানোর একটা কোনও রাস্তা তো নিশ্চয়ই থাকবে! আমাদের খুঁজে বের করতে হবে সেই রাস্তা।”

ফাদার গম্ভীর মুখে তাঁর গলায় ঝোলানো কালো ক্রুশবিদ্ধ যীশুর লকেটে নিবিষ্ট মনে হাত বোলালেন কিছুক্ষণ। তারপর নীচু গলায় বললেন, “জোব বলল, মৃতদেহের ধারে একটা বিশাল চিতাবাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছে। সে পায়ের ছাপ অকুস্থল থেকে গ্রামের ভিতর পর্যন্ত এসেছেও, কিন্তু তারপর যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, আর কোনও হদিশ নেই তার। বেচারা গ্রামের লোকেরা একথা জানে। তারা ভয়েই মরছে, কারণ তাদের বিশ্বাস, এ কোনও সত্যিকারের চিতাবাঘ নয়—এ মায়া-চিতাবাঘ।”

আমরা হতভম্ব হয়ে একে অপরের মুখের দিকে চাইলাম।

“শুনুন,” আমি একটু অধৈর্য গলাতেই বললাম, “বন্দুকে আমার মতো অভ্রান্ত নিশানা খুব কম লোকেরই আছে, সেনাবাহিনীর স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কঠোর প্রশিক্ষণের ফল। চিতাবাঘের ব্যাপারে আমি তেমন কিছু জানি না অবশ্য, কিন্তু চিতাবাঘ ফেলে যাওয়া মড়ির কাছে আবার ফিরে আসে বলে শোনা যায় না? তাই যদি হয়ে তবে এখানকার কারোর থেকে একটা শুয়োর কি ছাগল কিনে সেটাকে মেরে ওই মড়ির জায়গায় ঝুলিয়ে রাখলেই তো হয়। আর আমি কাছাকাছি একটা গাছে বন্দুক আর টর্চ নিয়ে উঠে বসে থাকব।”

ফাদার এভারেট মাথা নেড়ে আমায় থামিয়ে দিলেন। “এ চিতাবাঘকে ওসব কিছু করে মারাই যাবে না।” এই বলে তিনি মুখ তুলে আমাদের পিছনের দিকে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকিয়ে দেখি কখন ইউনিস এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের পিছনে তার কুটিরের দরজায়। এই প্রথম খেয়াল করলাম ঠিক কতটা কালি-মাড়া চোখমুখ হয়েছে তার; লম্বা চেহারাটা যেন অসীম ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে নুয়ে পড়বে এবার। আর তার গলায় রুপোর ক্রসটা আর নেই। ক্রসটা ছাড়া তার গলাটা শুধু খালি খালি লাগছে না, কেমন যেন অসংরক্ষিত লাগছে। ফাদারের দিকে চেয়ে সে শুধু ধীরে ধীরে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল।

বড়ো করে একটা দম নিয়ে (যেমন মানুষ একটা লম্বা দৌড় কিংবা সাঁতার শুরু করার আগে নেয়) ফাদার আমার দিকে চেয়ে বললেন, “তোমার বন্দুকের একটা গুলি আমার লাগবে। আর, তোমার কাছে জোরালো টর্চ আছে তো?”

আমি ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিলাম যে আছে। তখন ফ্যালন আর টানেনবাউমের দিকে ফিরে তিনি বললেন, “আজ রাত্রে যদি কিছু শুনতেও পাও, ইউনিসের কুটিরে কিংবা অন্য যেকোনও জায়গাতেই হোক না কেন, ভুলেও নিজেদের ঘরের বাইরে পা বাড়াবে না। একাজ শুধু আমাদের দু’জনের।” তারপর একটু থেমে খুব ভারী, দুঃখী গলায় যোগ করলেন, “এমন কিছু করা চলবে না যাতে ওই চিতাবাঘ আজ রাতে পালিয়ে যায়।”

আমি আমার .৩৭৫ ম্যাগনাম বুলেটের একখানা ফাদারকে এনে দিলাম। ৩০০ গ্রেনের মৃত্যুবাণের দিকে একটিবার ফিরেও না তাকিয়ে সেটাকে মুঠোয় ভরে নিয়ে ফাদার আমায় বললেন, “ইউনিসের ঘরের দিকে যাবে না এখন। তৈরি থেকো, আমি পিছনদিক দিয়ে আসব রাইফেল সমেত তোমায় নিয়ে যেতে। ততক্ষণ পর্যন্ত ঈশ্বর তোমাদের সহায় হোন।”

ফাদার পিছন ফিরে ইউনিসের ঘরে ঢুকে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। খানিকক্ষণ পরে তার ঘর থেকে চাপা ঠুকঠাক ধুপধাপ শব্দ শোনা যেতে লাগল। ব্যস, আর সব চুপচাপ।

দেবমূর্তির পিছনে সুঁড়িপথটা যেখানে এঁকেবেঁকে জঙ্গলের গভীরে ঢুকেছে, যেখানে বুড়োর নিষ্ঠুর মরণ হয়েছিল, তার কাছেই ওৎ পেতে বসে ছিলাম আমি আর ফাদার এভারেট। একটা প্রাচীন ইয়াইরি গাছের মসৃণ গুঁড়িতে গা মিশিয়ে নিঃশব্দে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা। চাঁদের আলো ঘন ডালপালা-পাতার মধ্যে দিয়ে চুঁইয়ে পড়ে বনের মাটিতে রহস্যময় দাবার ছক এঁকে দিয়েছে, চারপাশের জঙ্গলের আবছায়া চালচিত্র দেখে মনে হচ্ছে যেন জলের নিচের দৃশ্য দেখছি। আমরা অপেক্ষা করছি। না, জঙ্গলের দিকে চেয়ে নয়, গ্রামের দিকে মুখ করে।

কিছুক্ষণ আগেই ফাদার এভারেট আমাদের কুঁড়ের পিছন দিকে টোকা মেরে আমায় ফিসফিস করে ডেকে বেরিয়ে আসতে বলেছিলেন। অতি কষ্ট করে পিছনদিকের ছোট্ট জানালা গলে আমি রাইফেল আর টর্চ নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। আমার থেকে বন্দুকটা নিয়ে ফাদার তার ভিতরে একটা গুলি পুরে দিয়ে বন্দুক আমায় ফেরত দিয়েছিলেন। তারপর গোটা গ্রামের সীমানার বাইরে দিয়ে চক্কর মেরে আমরা এখানে এই বনের ধারে এসে হাজির হয়েছি। অপেক্ষা করছি।

অপেক্ষা আর অপেক্ষা। জঙ্গলের মধ্যে এতরকমের আওয়াজ হয় জানা ছিল না—কত গর্জন, কত প্রাণীর ডাক, কত সাঁই-সাঁই-ফট-ফট শব্দ! আচমকা সব চুপচাপ। হঠাৎ গ্রামের ভিতর থেকে কী যেন একটা মড়মড় করে ভেঙে পড়ার আওয়াজ এল। আওয়াজটা হওয়ামাত্র ফাদার শক্ত করে আমার কাঁধের নিচে চেপে ধরলেন। বুঝতে পারলাম তিনি টর্চটা তুলে ধরছেন, মুহূর্তের মধ্যেই যাতে জ্বালতে পারেন তাই তৈরি থাকছেন।

শরীরের সমস্ত স্নায়ু টানটান করে আমি সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। রগের শিরা দপদপ করছে আমার, যেন ছিঁড়ে পড়বে। এবার কানে এল একটা ঘড়ঘড়ে গলা ঝাড়ার মতো শব্দ—কোনও জানোয়ারের গলা থেকে আসছে সেটা। তার সঙ্গে যোগ হল পাতার ওপর ঝটাপটির শব্দ। যেন একাধিক বৃহৎ জন্তু শুকনো পাতার উপর লুটোপুটি খাচ্ছে। শব্দগুলো বাড়তে থাকল, আর তার পরেই আমি চোখগুলো দেখতে পেলাম। ঘোলাটে সবুজ, উজ্জ্বল চোখ—দু’জোড়া।

তৎক্ষণাৎ ফাদার এভারেটের হাতের টর্চের তীব্র আলোয় চতুর্দিক দিনের মতো আলোয় ভরে গেল, আর আমার কান ফেটে গেল তাঁর পরিত্রাহি চিৎকারে, “ওই বড়োটা! মারো, মারো! প্রভু যীশুর দিব্যি, এক্ষুনি গুলি করে মারো বড়োটাকে!”

জোরালো আলোয় বজ্রাহতের মতো স্থাণু হয়ে আমাদের সামনে দুটো পেল্লায় চিতাবাঘ! তাদের সোনালি চামড়া যেন আভা ছড়াচ্ছে, কালো বুটিগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। নিষ্পলকে আমাদের দিকে চেয়ে আছে ভাঁটার মতো জ্বলজ্বলে দু’জোড়া কপিশ চোখ। ঘোরতম দুঃস্বপ্নেও এইরকম ভয়াল দৃশ্য আমার কল্পনার অতীত। বিশাল চেহারার মদ্দাটার মুখ বিকট হাঁ হয়ে রয়েছে নিষ্ঠুর ঘৃণা আর হিংসায়, তার মধ্যে থেকে ঝিলিক মারছে লালায় ভেজা ছোরার মতো শ্বদন্তগুলো আর বেরিয়ে এসেছে লকলকে লাল তার জিভটা।

একটা ক্রুদ্ধ খ্যাঁকরানি দিয়ে সেটা গুঁড়ি মেরে বসল, এইবার ঝাঁপাবে। মুহূর্তের মধ্যে বন্দুকটা কাঁধে তুলে লক্ষ্যস্থির না করেই কোনোক্রমে গুলি চালালাম। সঙ্গে সঙ্গে কাঁধে বন্দুকের উলটো ধাক্কা আমায় সপাটে মাটিতে ফেলে দিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে চিতাবাঘটা ঠিক মানুষের মতো গলায় রক্ত জল করা একটা চিৎকার করে শূন্যে লাফিয়ে উঠেই সশব্দে মাটিতে পড়ল। তারপর শুরু হল মরণান্তিক যন্ত্রণায় মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে তার গর্জন-খ্যাঁকরানি আর প্রবল আক্রোশে ল্যাজ আছড়ানো। তার সঙ্গী ছোটো চিতাবাঘটা সটান পিছন ফিরে এক লাফে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আর ঠিক এই সময়ে আমাদের আলো গেল নিভে।

নিঝুম অন্ধকারে আমরা দু’জন দাঁড়িয়ে রইলাম স্তব্ধ হয়ে। এতক্ষণের এই জোরালো আলো আর বিদ্যুতের মতো ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে। অন্ধকারের মধ্যে শুধু শুনতে পাচ্ছিলাম বিরাট জানোয়ারটার মৃত্যুযন্ত্রণার কাতরানি-গোঙানির আওয়াজ, প্রবল হুঙ্কার আর প্রচণ্ড আছাড়িপিছাড়ির শব্দ। অত বড়ো দেহের শেষ জীবনীশক্তিটুকু সম্বল করে জন্তুটা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। অবশেষে একটা গম্ভীর হুঙ্কার আর লম্বা দম নেওয়ার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে শেষবারের মতো একটা ল্যাজ আছড়ানি শুনলাম। ধপ করে ভারী কিছু পড়ার শব্দ পেলাম একবার, তারপর নিখাদ নৈঃশব্দ।

তখন গ্রামের দিক থেকে ভেসে এল তীক্ষ্ণ কণ্ঠে একটা প্রাণ ফাটানো চিৎকার। অনন্ত দৈর্ঘ্যের কয়েক সেকেণ্ডে চিৎকারটা তীক্ষ্ণতর হতে হতে বাতাসে মিলিয়ে গেল।

ফাদার এভারেটের হাতে আলো জ্বলে উঠল আবার। দুদ্দাড়িয়ে সুঁড়িপথ ভেঙে তিনি গ্রামের দিকে ছুটলেন; পিছনে পিছনে বন্দুক বাগিয়ে আমিও দৌড় লাগালাম। দেবস্থানের কাছে এসে দেখি গাছতলায় ফাদার হাঁটু গেড়ে বসে আছেন, সামনে পড়ে আছে ইউনিস। অচেতন, চামড়া ফ্যাকাশে রক্তশূন্য, চোখ কপালে উঠে গেছে তার।

“ওর কুঁড়েতে নিয়ে গিয়ে ভালো করে হাত-পা ঘষে জ্ঞান ফিরিয়ে আনো ওর।” এই বলে ফাদার তড়িৎগতিতে উঠে দাঁড়িয়ে ইউনিসের শরীরের উপর ক্রস আঁকার ভঙ্গি করে আবার আমার টর্চটা নিয়ে ছুটে গেলেন সুঁড়িপথ লক্ষ করে বনের দিকে।

ইউনিসকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে এলাম ওর ঘরে। ফাদারের কথামতো শুশ্রূষা করতে আসতে আসতে জ্ঞান ফিরে এল মিনিট কয়েক পরে। ঘোর যে তখনও কাটেনি তা বোঝাই যাচ্ছিল। ঘোরের মধ্যেই সে বিড়বিড় করে বলতে আরম্ভ করল, “আগের তিনবারও স্বপ্নে ঠিক এমনিই হয়েছিল ফাদার!”

অপ্রকৃতিস্থ ঘোলাটে চোখ দেখে বুঝলাম আমাকে ভুল করে ফাদার এভারেট ভেবেই ইউনিস যা বলার বলে চলেছে, “সেই আকুলতা, সেই অদম্য টান! আমায় যেতে হবে, যেতেই হবে। কিন্তু আগে গলায় ক্রসটা ঝোলানো ছিল, সামলাতে পেরেছিলাম। কিন্তু এবার… এবার…” চোখ বুজে এল ইউনিসের, কণ্ঠস্বর মৃদু আর গাঢ় হয়ে এল। তবে থামল না। ও বলে চলল, আমি শুনে চললাম। আর এই ঘোর গুমোট গরমের মধ্যেও সে গল্পের আতঙ্ক আমার গা-হাত-পা জমিয়ে দিল।

ও হঠাৎ করেই যেন জেগে উঠেছিল। সটান, সজাগ, চারপাশ সম্পর্কে একদম সচেতন। জানালা দিয়ে ঢলঢলে জ্যোৎস্না এসে পড়েছে ওর ঘরের মধ্যে। আফ্রিকার ঘনগম্ভীর রাত্রি আর তার বর্ণ-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দের সমস্ত উষ্ণতা ইউনিস স্পষ্ট অনুভব করছিল নিজের সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে। শরীরে ঢেউ খেলিয়ে আড়মোড়া ভেঙে মসৃণ বেগে খাট থেকে ও চলে গেল জানালার ধারে। ওই তো, ওই তো সে দাঁড়িয়ে আছে বাইরে জঙ্গলের ধারে। ওকে ডাকছে যে। ওর বন্ধু।

আগুপিছু না ভেবেই জানালা লক্ষ্য করে ও লাফ মারল। তাতেই মড়মড় শব্দ তুলে পচা কাঠের দুর্বল কাঠামো সবসুদ্ধু ভেঙে পড়ল, আর ও দেখল ও বাইরে চলে এসেছে। ও মুক্ত! পিছনে ভাঙা ঘরটা শীতল জ্যোৎস্নায় স্নান করছে। ওদিকে জঙ্গলের মখমলি অন্ধকারের ভিতর থেকে কাশির মতো আওয়াজ করে কী একটা জন্তু ডাকল। ওর চিনতে কোনোই কষ্ট হল না সে ডাক। ওর বন্ধুর ডাক। ওকেই ডাকছে।

গাছের অন্ধকারের মধ্যে জ্বলে উঠল একজোড়া সবজেটে চোখ। ও বুঝতে পারল একটা লম্বা ল্যাজ বারবার দুলে উঠছে উত্তেজনায়। তারপর নিঃশব্দে আত্মবিশ্বাসী পায়ে ওর দিকে এগিয়ে এল এক বিরাটকায় পেশীবহুল চিতাবাঘ।

আশ্চর্য! যতক্ষণ চিতাবাঘটা ধীরপায়ে এগিয়ে আসতে লাগল, ও কিন্তু নড়ল না। একটুও ভয় হল না ওর প্রাণীটাকে ওরই দিকে এগিয়ে আসতে দেখে। একটু অবাকও হল না ও এই দেখেও যে, ও দাঁড়িয়ে আছে চার পায়ে, ওর গা ভরে গেছে কালো বুটিদার সোনালি লোমে আর আঙুল থেকে বেরিয়ে এসেছে বাঁকা নখের সারি। বিরাট পুরুষ চিতাবাঘটার মুখের দিকে তাকাতেই তাকে ও চিনতে পারল। সেটা ওর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর আরও ঘনিয়ে এসে দাঁড়াতে চাইতেই হঠাৎ ওর খুব রাগ হয়ে গেল, নখওয়ালা হাত তুলে বিদ্যুতের মতো ও চালিয়ে দিল পুরুষ চিতাবাঘের মুখ লক্ষ্য করে। চকিতে তার কান থেকে কাঁধ পর্যন্ত একটা গভীর ক্ষতস্থান তৈরি হয়ে গিয়ে ঝরঝরিয়ে রক্ত গড়াতে লাগল, আর অস্ফুটে একটা ভয়ার্ত ডাক ছেড়ে লাফিয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল সে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। আবার সে এগিয়ে এসে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চাইল, তার সোনালি গালে আগুনের মতো জ্বলছে তাজা রক্তের ধারা। এবার আর ও খুব একটা বাধা দিল না। একসঙ্গে খেলতে লাগল দু’জনে। খুব খেলা। ওর মেনে নিতে কোনও অসুবিধেই হচ্ছিল না যে ওরা দু’জনেই গভীর রাত্রির সন্তান। আর তার থেকেও বড়ো কথা, ছোটো ছোটো নরম শরীর ওদের দু’জনের থাবার নিচে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে, গরম রক্তের স্রোত বইবে, নোনতা সেই রক্ত ওরা পরম আহ্লাদে চেটে নেবে—সেটাই যেন সবথেকে স্বাভাবিক বোধ হচ্ছিল ওর। মনের আনন্দে আঁধার বনের মাঝে লুটোপুটি খেতে লাগল দুটিতে।

“তারপর… তারপর…” ইউনিসের চোখ ঝট করে খুলে গেল। প্রবল আতঙ্কে কুঁকড়ে গিয়ে আমায় আঁকড়ে ধরল। তারপর এলিয়ে পড়ে হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে থাকল, “তারপর হঠাৎ করে দিনের মতো আলো হয়ে গেল চারদিকে। আর একটা আওয়াজ হল, প্রচণ্ড আওয়াজ! সে কী গর্জন, ওহ্‌, মা গো! আমি এক ছুটে পালালাম! ছুটছি, ছুটছি… এমন সময় খুব জোরে আঘাত লাগল, ভীষণ জোরে।” বুক চেপে ধরে যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল ইউনিস। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “তারপর আমি জেগে উঠলাম। আবার বোধ হয় সেই দুঃস্বপ্নই দেখছিলাম। কিন্তু এত জ্যান্ত, আর এত বিশ্রী আগের কোনও বার দেখিনি। আর, দেখলাম আমি বাইরে পড়ে আছি ফাদার!”

কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে উঠে বসল ইউনিস। ঘোর কাটছে আস্তে আস্তে। এইবার আমার দিকে চোখ পড়ল ওর। ধন্ধ লাগা চোখে বলল, “বব, তুমি? আমি ভাবলাম ফাদার এভারেট!”

ধড়মড়িয়ে ইউনিস উঠে বসতেই দরজা দিয়ে টর্চের আলোর তীব্র ঝলকানি এসে পড়ল ঘরের মধ্যে। সেদিকে ভয়ার্ত চোখে একবার তাকিয়ে ইউনিস গলায় হাত বোলাতে লাগল, খুঁজে দেখতে চাইল ফাদারের দেওয়া ক্রসটা।

ঘরে ঢুকে আলো নিভিয়ে শান্ত গলায় ফাদার বললেন, “কোনও ভয় নেই ইউনিস। তুমি একটা খুব বাজে স্বপ্ন দেখেছিলে। কিন্তু এখন আর কোনও চিন্তা কোরো না, সব সমস্যা মিটে গেছে।”

“আপনাকে যে দুঃস্বপ্নটার কথা বলেছিলাম… আবার সেটাই দেখেছি।” ঘুম ঘুম গলায় বলল ইউনিস, “আমি ভাবছিলাম বুঝি…” আর ওর কথা শোনা গেল না। বেচারি মেয়েটা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

“আরেকবার একটু কষ্ট করে তোমায় আমার সঙ্গে আসতে হবে বব।” ফাদার আমার হাত ধরে বললেন।

বন্দুকটা তুলে নিতে যাচ্ছি, তিনি বাধা দিয়ে বললেন, “ওটা আর লাগবে না।”

আবার সেই সুঁড়িপথ, আবার জঙ্গলের অন্ধকার আর আমাদের টর্চের তীব্র আলো। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছালাম সেই জায়গায় যেখানে প্রাণীটাকে গুলি করেছিলাম। যদিও জানতাম, তাও জিজ্ঞাসা করলাম, “মরে গেছে তো?”

“হ্যাঁ,” ফাদার বললেন, “জন্তুটা মরেছে।”

টর্চের জোরালো আলোকবৃত্তের কেন্দ্রে একটা বিরাট গাছের গুঁড়ির সামনে পড়ে আছে চিতাবাঘের প্রকাণ্ড মৃতদেহটা। সেটার দিকে এক পলক তাকাতেই আমার ঘাড়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। শীতল শিরশিরানিতে সারা দেহ কেঁপে উঠল আর হৃৎপিণ্ডটা তীব্রবেগে লাফিয়ে যেন জিভের পিছনে ধাক্কা মারল। আমার ৩০০ গ্রেনের প্রাণঘাতী বুলেট অব্যর্থ লক্ষ্যে শিকারের বুকে বিঁধেছে, ক্ষতস্থান থেকে এখনও চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত। কিন্তু রক্তের পুকুরের মধ্যে কোনও বিপুলবপু মদ্দা চিতাবাঘের মৃতদেহ শুয়ে নেই। পড়ে আছে ওতুরু! তার মুখ মৃত্যুযন্ত্রণায় বেঁকে বীভৎসভাবে দাঁত খিঁচিয়ে রয়েছে। একটা অসাধারণ চিতাবাঘের ছালে তার সর্বাঙ্গ আবৃত। বিশাল মুখব্যাদান করে ধারালো দাঁত আর লকলকে আড়ষ্ট জিভ বের করে যেন পৃথিবীকে গিলতে আসছে সেটা। বাঘছালটার পাগুলো ওতুরুর হাত আর পায়ের সঙ্গে বাঁধা। এতটাই জ্যান্ত গোটা জিনিসটা যে লম্বা ল্যাজটা দেখে মনে হচ্ছে এখনই নড়ে উঠবে।

“এ অসম্ভব! হে ভগবান!” আমি আর্তনাদ করে উঠলাম, “এমন ভুল আমার হতেই পারে না। আমি, আমি তো একটা চিতাবাঘকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলাম ফাদার, বাঘছাল পরা কোনও মানুষের দিকে নয়! না, না, না! গুলি করার সময় আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম চিতাবাঘটাকে, বাঘ দুটোকে! দুটো চিতাবাঘ ছিল, আপনিও তো দেখেছিলেন, একটা বড়ো, আরেকটা…” আমি থমকে থেমে গেলাম। একটা অদ্ভুত আর ভয়াল সম্ভাবনা আমার মাথায় জাগতে আরম্ভ করেছে। “তবে কি… ইউনিস আমায় সব বলেছে, ওর দুঃস্বপ্নের কথা। কিন্তু… ওটা কোনও স্বপ্ন ছিল না, না ফাদার? ওই সব ঘটনা সত্যি, বলুন ফাদার? ওই ছোটো চিতাবাঘটা, ওটা ইউনিসই ছিল, তাই না?”

টর্চের আলোয় ফাদারের কঠিন মুখটা কেমন যেন ভূতুড়ে দেখাচ্ছিল হঠাৎ। ওঁর নিজের হাতে কী একটা জিনিস ধরা ছিল, চেপ্টে যাওয়া, থ্যাঁতলানো একটা কিছু যেটা টর্চের আলোয় ঝিকিয়ে উঠছিল। সেটার দিকে তাকিয়ে উনি বললেন, “বব, দুটো সিদ্ধান্তের যেকোনও একটা তোমায় বিশ্বাস করতে হবে। এক, এই জঙ্গলের আঁধার রাজত্বে শুভ-অশুভের চিরকালীন দ্বন্দ্বের এক নতুন বাজি শুরু হয়েছিল। আমরা অনেকেই ভাগ নিয়েছিলাম সেই খেলায়। সে খেলা শেষ হয়েছে আজ, আর খেলা শেষ করার অন্যতম প্রধান কারিগর হলে তুমি। তুমি কেবল একটি নিষ্পাপ মেয়ের জীবন নয়, তার আত্মাকেও আজ রক্ষা করেছ। আর সাবাশ বটে মেয়েটার সাহস, এই অশুভের বিনাশ করতে সে নিজের আত্মাকে পর্যন্ত বাজি রেখেছিল।”

ফাদার থেমে আবার তাঁর হাতের বস্তুটার দিকে চাইলেন। তারপর একটু গলা খাঁকরে নিয়ে বলতে থাকলেন, “অথবা তুমি এও বিশ্বাস করতে পারো যে, আজ এখানে মারাত্মক একটা ভুলের কারণে ভয়ংকর রকমের অবাঞ্ছিত একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। গতরাত্রে গাঁয়ের এক বুড়োকে সত্যিই তো চিতাবাঘে মেরেছে ঠিক এইখানে। তাই আমরা জন্তুটাকে শিকারের জন্যই এখানে থানা গেড়েছিলাম। এই অন্ধকারে ঠিক আমাদের সামনেই চিতাবাঘের ছাল গায়ে চড়িয়ে ওতুরু ঘোরাফেরা করছিল, এটা নিতান্তই তার দুর্ভাগ্য।”

“কিন্তু… কিন্তু দুটো চিতাবাঘ ছিল, আমি যে স্পষ্ট দেখেছি! অন্যটা তাহলে…”

“আহ্! সেটার সঙ্গে তো আমাদের কোনও সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে! চুলোয় যাক সেটা।” অধৈর্য গলায় ফাদার বললেন, “তুমি যে মতটাই বিশ্বাস করো না কেন, একটা কথা জেনে তুমি মনে শান্তি পেয়ো বব, আজ এই গ্রাম থেকে অশুভ শক্তি বিদায় নিয়েছে। এবার এই গ্রামের উন্নতি ঠেকায় কে?”

“আমি জানি না ফাদার, কোনটা বিশ্বাস করব আর কোনটা করব না। চাক্ষুষ প্রমাণ বলতে আমি শুধু দেখতে পাচ্ছি ওতুরুর এই দেহটা। এ মরে গেছে আমারই গুলিতে!” দাঁত খিঁচিয়ে পড়ে থাকা ওতুরুর দিকে চেয়ে আমি বললাম, “কিন্তু ফাদার, গ্রামের লোকেরা যে বলত ওতুরুকে কেউ জয় করতে পারে না, ও অজেয়, তাহলে?”

“ওতুরুর জাদুর চেয়ে শক্তিশালী জাদু কি আর কিছু নেই?” ফাদার বলে উঠলেন, “গ্রামবাসীরা এও জানে যে যখন তাদের ওঝাঠাকুরের আত্মা অন্য কোনও প্রাণীর রূপ ধারণ করে রাতের আঁধারে জঙ্গলে চরতে যায় তখন আরও শক্তিশালী কোনও জাদুকর চাইলেই তার বিনাশ করতে পারে। সেটা সম্ভব বিশেষ কোনও মন্ত্রপূত জাদুবস্তুর সাহায্যে, এই যেমন ধরো না কেন, একটা রুপোর বুলেট।”

ফাদার আমার চোখের সামনে তাঁর হাতে ধরা জিনিসটা তুলে ধরতেই আমি চমকে উঠলাম। থ্যাঁতলানো জিনিসটা আর কিছুই নয়, একটা ব্যবহৃত .৩৭৫ ম্যাগনাম বুলেটের অবশিষ্ট। কিন্তু সাধারণ কার্তুজের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল, সাদাটে রঙের।

“এটা রুপোর তৈরি, তাই না?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

ফাদার ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়লেন। আমার মনে পড়ল আজ সন্ধেবেলা ইউনিসের ঘর থেকে ঠুকঠাক শব্দ শুনছিলাম। তখন ইউনিস ছাড়া শুধু ফাদারই ছিলেন সেই বন্ধ ঘরে। আর মনে পড়ামাত্রই পুরো ছবিটা আমার চোখের সামনে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠল।

“এটা তো আসলে সেই রুপোর ক্রসটা, সেই যেটা আপনি প্রথম রাত্রে ইউনিসের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন!” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।

“ঠিকই ধরেছ।” মৃদুস্বরে বললেন ফাদার, “মায়া-চিতাবাঘের জাদুমন্ত্র থেকে ইউনিসের বাঁচার এই ছিল একমাত্র রক্ষাকবচ। ও নিজে থেকে আমায় সেই রক্ষাকবচ খুলে দিয়েছিল, যাতে ওতুরুর অশুভ শক্তি আর কোনোদিন কারোর ক্ষতি করতে না পারে, যাতে সেই অপশক্তি চিরকালের মতো ধ্বংস হয়। নিজেকে টোপ হিসেবে বাজি ধরেছিল! ধন্যি মেয়ের সাহস!”

বুলেটের অবশিষ্টাংশ পকেটে চালান করে তিনি বললেন, “ওতুরুর দেহটা ভোর হওয়ার আগেই ওর ঘরে রেখে দিয়ে আসতে হবে, নইলে অনেক রকমের ঝামেলা শুরু হয়ে যাবে। চলো তাড়াতাড়ি।”

ঘাড় নেড়ে ওতুরুর দেহটা তুলে নেওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়তেই আমার নজরে পড়ল একটা জিনিস। মৃতদেহের মুখের একপাশ বরাবর জ্বলজ্বল করছে আধ-শুকনো রক্তের রেখা। তার কানের নিচ থেকে কাঁধ আর ঘাড়ের সংযোগস্থল পর্যন্ত নেমে এসেছে কতগুলো লম্বা সমান্তরাল ক্ষত। ঠিক যেমনটা হওয়া সম্ভব কোনও হিংস্র মার্জারগোত্রীয় জন্তুর থাবার আঁচড়ে। আবার বুনো কাঁটাঝোপের খোঁচাতেও এইরকম ক্ষতচিহ্ন হতে পারে। সেটাই বিশ্বাস করা সহজ আর যুক্তিযুক্ত।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

2 Responses to বিদেশী গল্প -অন্ধকারের চিতাবাঘ- উইলিয়াম স্যামব্রট- অনুবাদ রাজর্ষি গুপ্ত শরৎ ২০২০

  1. রঞ্জন দাশগুপ্ত says:

    চমৎকার।

    Like

  2. রঞ্জন দাশগুপ্ত says:

    চমৎকার লাগলো।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s