বিদেশী গল্প-চীনা শাস্তি প্রতিম দাস বসন্ত ২০১৮

 প্রতিম দাসের আগের লেখাঃ প্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতার কিছু কথা

[আজকের গল্প চীন দেশের। নেওয়া হয়েছে উইলহেল্ম এর “চাইনিজ ফেয়ারি বুক” থেকে। গল্পের নাম “প্যান্থার”। এ গল্প আপনাদের ঊপেন্দ্রকিশোর রায়ের একটি বহুপঠিত গল্পকে মনে করিয়ে দেবে বলেই আমার ধারনা। – লেখক]

bideshichinese

প্রতিম দাস

কোনো এক সময়ে এক বিধবা মার দুই কন্যা আর এক ছেলে ছিল। একদিন মা তার দুই মেয়েকে বললেন, ‘আমি তোদের দিদিমার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। ভাইকে নিয়ে যাচ্ছি। তোরা একটু সাবধানে থাকিস।’ মেয়েরা বলল, ‘কোনও চিন্তা কোরো না মা।’

রাস্তায় যাওয়ার পথে মা দেখা পেলেন এক বাঘের। বাঘটি জানতে চাইল, ওরা কোথায় যাচ্ছে।

‘আমার মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। উনি নাতিকে দেখতে চেয়েছেন।‘

বাঘটি বলল, ‘সেতো অনেক দুরের পথ। একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও ।’

‘না, সে উপায় নেই। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।’

কিন্তু নাছোড়বান্দা বাঘটি ঘ্যান ঘ্যান করে একই কথা বলতে থাকল পাশে যেতে যেতে। অগত্যা মা তার ছেলেকে নিয়ে বসলেন রাস্তার ধারে।

বাঘটি বলল, ‘মা আসুন আমি আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিই। এতে আপনার ক্লান্তি একটু কমবে।’ কথা না শুনলে কী করবে কে জানে এই ভেবে মা সেটা করতে দিলেন। বার কয়েক আলতো করে থাবা বুলানোর পর বাঘটি নখ বার করে এক চিলতে চামড়া ছিঁড়ে নিয়ে মুখে ঢোকাল।

মহিলাটি যন্ত্রনায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আরে একী   করছ! তুমি তো আমার মাংস কেটে ফেলছ! না না আর হাত বুলাতে হবে না, থামো বাপু!’

এ কথায় কান না দিয়ে বাঘটা এবার ঝাঁপিয়ে পড়ল মহিলার ঘাড়ে এবং মেরে খেয়ে ফেলল। এবার ছোট্ট ছেলেটার ও একই হাল করল। এবার বাঘটা পরে নিল মা যে পোশাকটা পরে ছিল সেটা। আর সাথের ঝুড়িতে নিয়ে নিল বাকি হাড়গোড় আর মাংস। 

অতঃপর গেল মহিলাটির বাড়ি এবং ডাক দিল , ‘দরজা খোল রে উমনো ঝুমনো ! আমরা ফিরে এসেছি।’

মেয়ে দুটো দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি কে গো? আমাদের মায়ের চোখ তো এতো বড়ো বড়ো নয়।’

‘আরে তোদের দিদিমার বাড়ির মোরগগুলো এতো বড়ো বড়ো ডিম দিয়েছে যে সেগুলো দেখে আমার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেছে। এখনো ফুলে আছে বুঝি?’

‘আমাদের মায়ের মুখে তো কোন দাগ ছিল না? তুমি কে ?’

‘ও রে, তোরা তো জানিস তোদের দিদিমার বাড়িটা ছোটো। শোয়ার জায়গা কম। আমায় শুতে হয়েছিল রান্নাঘরে। কয়লার দাগ লেগে গেছে বোধ হয়।’

‘বেশ তা না হয় হল, কিন্তু আমাদের মায়ের পা তো এত বড়ো বড়ো ছিল না!’

‘কী বোকারে তোরা? এতোটা রাস্তা হেঁটে আসা যাওয়া করলাম। পা ফুলেছে সেটাও বুঝতে পারছিস না।’

মেয়েদুটি এবার খুলেই দিল দরজা। আর তারপরেই ওরা বুঝতে পারল এটা ওদের মা নয় মোটেই। যদিও সেটা ওরা বলল না মুখ ফুটে।

দিন গড়াল। মা সেজে থাকা বাঘ এবার ঝুড়িতে থাকা বাকি মাংস খেতে শুরু করল।

মেয়ে দুটোর ও খিদে পেয়েছিল। বলল, ‘মা তুমি কী খাচ্ছ লাল লাল?’

‘আমি বিট খাচ্ছি।’

‘আমাদেরও খিদে পেয়েছে মা। দাও না একটা করে বিট। আমরাও খাই।’

‘না, এসব তোমাদের খেতে হবে না। আর আজ রান্নাবান্নাও করতে পারছি না। একদিন না খেয়েই থাকো তোমরা ।’

মেয়েদুটি কিন্তু সে কথায় কান না দিয়ে চাইতেই থাকল। অবশেষে বাঘটা একটুকরো মাংস ছুঁড়ে দিল ওদের দিকে। যেটা ছিল ওদের ছোট ভাইয়ের একটা আঙুল। সেটা দেখে দুই বোন শিউরে উঠল। ফিসফিস করে আলোচনা করে ঠিক করল যেভাবেই হোক এখান থেকে পালাতে হবে। তা না হলে এ আমাদেরকে খেয়ে নেবে।

রাত হল অনেকটা। খাওয়ার পর নাক ডাকিয়ে ঘুমাতে থাকা বাঘের পেছন দিয়ে ওরা চুপিচুপি বেরিয়ে এল বাইরে। চড়ে বসল কাছের একটা উঁচু গাছের মগডালে। তারপর চিৎকার করে ডাকল, ‘মা ও মা শিগগিরি বাইরে এসো। দ্যাখো কী সুন্দর  একটা বিয়ের শোভাযাত্রা যাচ্ছে!’

বাঘটা বাইরে এল। ওদের গাছে ওপরে দেখে বলল, ‘কইরে কোথায় কী? আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না!’

মেয়েরা বলল, ‘গাছে উঠে এস, তাহলেই দেখতে পাবে।’

বাঘ উত্তর দিল, ‘বয়স হয়েছে, আর অত উঁচুতে কি আমি উঠতে পারি?’

উমনো বলল, ‘তুমি ওই ঝুড়িটায় যা আছে সব নামিয়ে রেখে চেপে বসো। আর ওটায় একটা দড়ি বেঁধে আমাদের ছুঁড়ে দাও। আমরা তোমায় টেনে তুলে নেব এখানে।’

বাঘটা সেটাই করল। মেয়ে দুটো অর্ধেকটা ওঠানোর পর শুরু করল ঝুড়িটাকে দোলানো। এক সময় ওটা ধাক্কা খেল কাছের এক দেওয়ালে। আর তার ফলে নিচে পড়ল বাঘটা । পোশাক খুলে গিয়ে বেরিয়ে এল আসল রূপ। আর সেটা বুঝতে পেরে বাঘটা পালাল ওখান থেকে।

সকাল হল। উমনো ঝুমনো নেমে এল নিচে। ঘরের কাছে গিয়ে মা আর ভাইয়ের জন্য শুরু করল কান্না। পাশের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে এক ছুঁচ বিক্রেতা ওদের কান্না শুনে এগিয়ে এসে জানতে চাইল কী ব্যাপার।

‘একটা বাঘ আমাদের মা আর ভাইকে মেরে খেয়ে নিয়েছে। তারপর পালিয়েছে। কিন্তু রাতে তো আবার ফিরে আসবে। আমাদেরকে খেয়ে নেবে।’

ছুঁচ বিক্রেতা ওদেরকে এক জোড়া বড়ো বড়ো ছুঁচ দিয়ে বলল, ‘এ দুটোকে চেয়ারের গদিতে ওপরদিকে মুখ করে গুঁজে রেখে দাও।’

ওরা ছুঁচ বিক্রেতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সেটা করল। তারপর আবার কাঁদতে থাকল।

এবার এল এক কাঁকড়াবিছে ধরতে জানে এমন মানুষ। জানতে চাইল কেন কাঁদছে ওরা। মেয়েরা জানাল কারণ। মানুষটা একটা কাঁকড়া বিছে ঢুকিয়ে দিল দেশলাই এর বাক্সে।

তারপর চলে গেল।

এবারে এক ডিমওয়ালা এল ওদের কান্না শুনে। কারণ জেনে ওদেরকে দিল দুটো ডিম। বলল, ‘এদুটোকে   উনুনের  মধ্যে ঢুকিয়ে রাখো । আর কিছু কাঠকুটো দিয়ে ঢেকে দাও।‘

উমনো ঝুমনো ডিমওয়ালাকে ধন্যবাদ জানিয়ে পুনরায় শুরু করল কাঁদতে। রাস্তায় এবার এল এক কচ্ছপ বিক্রেতা।  যথারীতি সব কথা শুনে মানুষটা ওদের একটা কচ্ছপ দিল আর বলল, ‘এটাকে বাইরে হাত মুখ ধোয়ার জলের পাত্রে রেখে দাও।’

সব শেষে এল এক মুগুর বিক্রেতা। সব কথা শুনে সে ওদের দিল একটা মুগুর। ‘এটাকে বাইরে যাওয়ার দরজার ওপরে টাঙিয়ে রেখে দাও।’

রাত ঘনাল, ফিরে এল বাঘটা । সমানে চেয়ারটা দেখে যেই বসতে গেল আর ছুঁচ দুটো ঢুকে গেল ওর শরীরে। আর্ত চিৎকার করে ছুটে গেল রান্না ঘরে, আলো জ্বেলে দেখার জন্য ব্যাপারটা কী হল। দেশলাই বাক্স খুলে যেই কাঠি নিতে গেছে কাঁকড়াবিছেটা দিল এক কামড়। আর একটা কাতর আর্তনাদ বেরিয়ে এল বাঘটার গলা থেকে।

যাইহোক উনুনে রাখা কাঠকুটোয় আগুন জ্বালানোর পর তার আলোয় মাথা ঘুরিয়ে দেখতে চেষ্টা করল কী ফুটেছে। ওদিকে আগুনের তাপে গরম হয়ে ফেটে গেল ডিম দুটো। আর সেই গরম তরল এসে পড়ল বাঘটার চোখে। প্রায় অন্ধ হওয়ার দশা । ছুটল বাইরের দিকে জলের পাত্রের জন্য। গোটা মুখটাই ডুবিয়ে দিল ভেতরে। আর ওটার মধ্যে রাখা কচ্ছপটা এক কামড়ে উপড়ে নিল বাঘের নাকটা। ঘ্র্যাঊঊঊঊ করে একটা শব্দ ছেড়ে বাঘ বাবাজি লাফাতে লাফাতে দৌড়ালেন বাইরের দরজার দিকে। ঝুলানো মুগুরে গিয়ে সজোরে ঠুকে গেল মাথা। ব্যাস অক্কা পেল দুষ্টু বাঘ।

আমার গল্প ফুরাল, নটে গাছটি মুড়াল।

জয়ঢাকের  সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s