বিশ্বের জানালা অস্ট্রেলিয়া-এক “টরোঙ্গা” দূরে… পারিজাত ব্যানার্জি সাহা বসন্ত ২০১৮

 এ সিরিজের আগের লেখা অস্ট্রেলিয়ার পেটের ভিতর,   অস্ট্রেলিয়া-এক “টরোঙ্গা” দূরে… 

গল্পে এবার সংগ্রহশালা (১)

পারিজাত ব্যানার্জি সাহা

একটা একটা করে যুগ পেরিয়ে যায় নিজের মতো হিসাব মেনে। তাকে পাল্লা দিয়ে ধরার চেষ্টা করে চলি বটে আমরা, তবে আদৌ কি পেরে ওঠা সম্ভব সেভাবে? সময় আসে, সময় যায়, কেবলমাত্র পরে থাকে তার কিছু ছাপ শুধু পৃথিবীর অপূর্ণ বক্ষের কেন্দ্রস্থলে। তাই দিয়ে কেবল গড়ে ওঠে সংগ্রহশালা, আগামী প্রজন্মের পরিদর্শনের জন্য। চলতি ভাষায় এইসব টুকরোটাকরা যেই চার দেওয়াল এক জায়গায় জড়ো করে, আমরা তাকেই বলি মিউজিয়াম।

আমাদের কলকাতায় যেমন সুবিশাল সংগ্রহশালা রয়েছে ধর্মতলা চত্বরে(যদি না গিয়ে থাকো, তবে অবশ্যই গতানুগতিক ক্লাসঘরে পড়া পাঠ্যবই পেরিয়ে একদিন ঢুঁ মারা প্রয়োজন সেখানে, আরও ভালো করে ইতিহাসের প্রকৃত সান্নিধ্যে আসতে — খানিকটা বোধহয় নিজেরই প্রয়োজনে), তেমনই সিডনির প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া মিউজিয়াম। কী নেই সেখানে? মৃত থেকে অবলুপ্ত নানান জন্তু জানোয়ার, গাছগাছালির জীবাশ্ম থেকে শুরু করে এই মহাদেশের আদিম মানুষদের জীবনধারণ, ২০০ বছরের কলোনির ইতিহাস, শিল্পকলা,অমূল্য সব পুরোনো প্রিন্ট ছবি— সবকিছুকেই ছুঁয়ে গেছে এই বৃহৎ তিনতলা অট্টালিকাসম পুরোনো ভিক্টোরিয়ান যুগের বাড়িটি। সে গল্পও যেমন তোমাদের আজ শোনাব, তেমনই ভাগ করে নেব এক অনন্য অভিজ্ঞতাও।
প্রথম থেকেই শুনেছিলাম, ‘সিডনি লিভিং মিউজিয়াম পাস’ এর কথা। সত্যি বলতে আগ্রহ জন্মেছিল নামটা শুনেই। মিউজিয়াম মানে তো যেখানে ইতিহাস বাসা বেঁধে থাকে, এমনই জেনে এসেছি সবসময়, তাহলে কীভাবে জীবিত হয়ে উঠল এই পুরাতনেরা? এ কি কোনো জাদুকরের মায়া?

অনেকখানি আশায় বুক বেঁধে তাই শেষমেশ একমাসে বারোটি মিউজিয়াম দেখার ছাড়পত্র সংগ্রহ করা গেল ফেব্রুয়ারির এক পড়ন্ত বিকেলে। সবকটি যে শহরের মাঝেই অবস্থিত, তা কিন্তু নয়। তাই সামান্য উদাসও হলাম কারণ, একমাসে সত্যিই এতগুলো বাড়ি দেখে ওঠা সম্ভব হয়ে উঠবে না কোনোভাবেই। আসলে, এ তো আর তোমার আমার বাড়ি নয় যে চট করে একটু ঘুরে আসা যাবে, এখানে কথা বলে ইতিহাস সুবিস্তারে, তার নিজের মতো করে।

সাধারণত বইয়ে যে ইতিহাস আমরা পড়ে থাকি, তা মূলত রাজারাজড়াদের গল্প। কোন শাসনকাল শেষে কে আবার রাজা হল, কবে কোন যুদ্ধ হল, কবে প্রথম সভ্যতা এল, কীভাবে তার প্রসার ঘটল— এই আর কি। কিন্তু জীবন্ত মিউজিয়ামের দর্শন এসবের থেকে একদম আলাদা! অনন্য! প্রতিদিনকার সাধারণত্বের যে ইতিহাস, এই যেমন ধরো তোমার আমার নিয়মিত সব ঘটনা — কোনোদিন ভেবেছিলে এরাও পুরাতত্ত্ব প্রাধান্যবিস্তারকারী?

১৯০০ সালের পাড়ার মুদির দোকান, ঘরের অভ্যন্তরের সরঞ্জাম, ধনী দরিদ্রের নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী বিলাসিতার স্বপ্ন বুনন, শহর জুড়ে গড়ে ওঠা অপরাধচক্র এবং আইনের প্রতিফলন — আপাতদৃষ্টিতে আমরা যেমন ঠিকভুল মিলিয়ে সাধারণ, এই ছোট ছোট বাড়িগুলো জোট বেঁধে জানাল,  ইতিহাসও তার ব্যতিক্রমী নয়।

তাহলে চলো, এগোনো যাক এদেশের আভ্যন্তরীণ কিছু ইতিবৃত্তের সন্ধানে!

অস্ট্রেলিয়া মিউজিয়াম

(১)
৪২০০০ বছর ধরে সাইবেরিয়ার বরফচাপা শিশু ম্যামথ, ‘লিউবা’র শরীরে প্রাণ থাকবে না জানা কথা। তাই সুদূর

রাশিয়া থেকে কয়েকমাসের জন্য আগত এই ‘অবলা’ প্রাণীকে দেখার আগ্রহ হলেও ওর প্রাণহীনতার যন্ত্রণা ভাগ করে নেব না ভেবেই এসময় মিউজিয়াম যাব না ভেবেছিলাম। কিন্তু কোথাও একটা সেই বরফের আস্তরণ পেরিয়ে কেমন ছিল ‘আইস-এজ’ তা জানার অদম্যতার কাছে হার মেনে নিল অকপটে শেষমেশ বোকা এই মনটা। তাই মোড়ক উন্মোচনের দিনই হিমযুগের টানেই পাড়ি দিলাম অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত সংগ্রহশালায়।

শুধু ‘লিউবা’ নয়, আলাপ হল সে সময়ের আরও বেশ কিছু প্রাণী আর তাদের অবশিষ্ট হাড়গোড়ের সাথেও। তবে এই ছোট্ট ম্যামথ দেহটির বৈশিষ্ট হল, এটি এখনো পর্যন্ত প্রকৃতির কোল থেকে পাওয়া সবচেয়ে নিপুণ সংরক্ষিত জীবাশ্ম।যেন ছোটখাট হাতির বাচ্চা। আবার কাছ থেকে দেখলে হাতির সাথে এদের অমিলগুলোও চোখে পরে বইকী! আসলে হাতি কিন্তু এদের সমগোত্রীয়, তবে সমকক্ষ নয়। 

সংগ্রহশালাটির সুব্যবস্থিত পরিসরে দাঁতাল শ্লথগতির এই জীবেরা নিজেরাই বলে চলে তাদের জীবনকাহিনীও নিস্তরঙ্গ বহমানতায়। তাদের ছুঁয়ে দেখা যায়, হাত বোলানো যায়  কল্পিত লোমশ শরীরেও। এমনকি,তাদের দুইদলের যুদ্ধে সামিল পর্যন্ত হওয়া যায়! পরিচিত হওয়া যায় আদিমতার অত্যাশ্চর্য সব নিদর্শনগুলির সাথেও।
কেমনভাবে পথ চলতে চলতে হঠাৎ একসময় হারিয়ে গেল তারা বিবর্তনের হাত ধরে— তার আধো ফোটা চিত্রের মধ্যে দিয়ে কোথাও গিয়ে উঠে আসে লিউবার অসহায় কান্না। ভাবায়। বড্ড বেশি ভাবায় ওই বিশালত্বের অভিশাপে জর্জরিত সরল প্রাণীর দল যারা পারেনি একসময় মানিয়ে নিতে এই চিরপরিবর্তনশীল প্রকৃতির  সাথে। এখনও তো পথ শেষ হয়নি— আমরা সব জেনেও পরম নিশ্চিন্তে তাও কেমন বসে আছি মগডালে উঠে। হাওয়ার  গতি কিন্তু ভাল নয়! তাতে কী! যতক্ষণ অন্য ডালগুলো আমার খাদ্য সংস্থান করে চলেছে ততক্ষণ তো বেঁচে নিতে হবে নাকি! সময় কখন পাব এরপরেও কোনো কিছু ভাবনাচিন্তা করার? তুফান কিন্তু বলে কয়ে আসেনা। সেই স্বভাবই যে তার নেই!

(২)
আচ্ছা একটা দেশের নিজস্ব সংগ্রহশালায় ঠিক কী কী থাকে? তাদের দেশজ ইতিহাস,সম্পদের ইতিকথা, তাই তো! কিন্তু এই দেশটাই যে আনকোরা নতুন! এদের আবার ইতিহাস কী! ওই তো, ২০০ বছর আগে ইংরেজদের কলোনি হয়েছিল হঠাৎ এই বিপুল প্রান্তর।  তারপরই তো গঠন হল নব্য সভ্যতা! এর আবার ইতিহাস কী?
এমন আবছা ধারণা পোষণ করেই রেখে দিতাম অবচেতনে যদি না চোখের সামনে হঠাৎ খুলে যেত অ্যাবরিজিনাল বা এই প্রদেশের আদিবাসীদের ইতিহাস।

এই আদিম মানুষেরা ঠিক কবে থেকে বাস করছে অস্ট্রেলিয়ায়, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়নি আজও। কারও মত ৪০হাজার বছর ধরে বাস এদের তো কারও বিচার আরও কমপক্ষে ২০ হাজার বছর আগেই ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল এই উপজাতিরা। নিতান্ত জঙ্গলেই বাস ছিল এই মানুষগুলির। সাধারণ সব হাতে বানানো অস্ত্র দিয়ে শিকার করেই দিনযাপন করত তারা। গোটা পৃথিবী তাদের খবর রাখেনি— তারাও এই ভূখণ্ডকেই মানত আস্ত বিশ্ব। একদিক দিয়ে ভালই ছিল। নিজেদের নিজেদের মতো দিব্যি ছিল তারা। তাদের সকল গোষ্ঠীর আলাদা আলাদা ভাষা, বেশভূষা। কিন্তু একটা জিনিস সকলের মধ্যেই কোথাও যেন জোট বেঁধে দিয়েছিল। তা হল নিপাট সরলতা। ঘোরপ্যাঁচ কাকে বলে, কীভাবে করতে হয় রাজনীতি তাই যে তারা জানে না! আর এই না জানার মধ্যেই যে রয়েছে সুখের চাবিকাঠি। কে জানে সে নিয়েও তারা কখনও ভেবেছিল কিনা!

বাধ সাধল তথাকথিত সভ্য সমাজের দলবল। ষোলোশো শতাব্দীতে প্রথমে ডাচ, এবং পরে ১৭৭০ সালে ইংরেজদের আকস্মিক হানায় প্রথমে কিন্তু আমল দেয়নি এরা। বরং বেশিরভাগই সোৎসাহে যোগ দিয়েছিল এই নতুন কর্মযজ্ঞে। সাদা চামড়া, ভিক্টোরিয়ান সাজসজ্জা, অস্ত্রশস্ত্র তাদের কাছে ছিল একদম নতুন। চমকিত হয়েছিল তারা। ভিনদেশে সাহেবদের আতিথেয়তারও তাই কোনো কসুর করেনি।

বদলে সাহেবরা  এদের ‘অসভ্য’ আখ্যা দিল, কেড়ে নিয়ে দখল করল তাদের জমি। তাও সই, কিন্তু এরপর যা ঘটল তা আরও ভয়াবহ। প্রতিটি অ্যাবরিজিনাল সন্তানসন্ততিকে সভ্য করতে কেড়ে আনা হল তাদের পরিবারের কোল থেকে। ভর্তি করা হল ‘সভ্য’ স্কুলে। মুছে ফেলা হল তাদের সব ইতিহাস— চিরতরে। সেই শোকে কত পরিবার নিঃশেষিত হল এক নিমেষে, বাকিরা ‘বিদেশী’ সাহেবসুবোদের বয়ে আনা অসুখে প্রাণ হারাল।

তার পরেও পড়ে থাকা হাজার হাজার মানুষ শোষিত, নিপীড়িত হতে হতে আজ অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যার মাত্র তিন শতাংশে এসে ঠেকেছে। নিজের দেশেই এই আদি অধিবাসী সম্প্রদায় হয়ে উঠেছে আজ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।

সময় পালটেছে। আজ অনেক সাদা চামড়ার  মানুষই অ্যাবরিজিনালদের রক্ষার উদ্দেশ্যে এসছে এগিয়ে।সবরকম ভাবে তাদের সমৃদ্ধ করতে হয়েছে তৎপর। স্বয়ং ব্রিটেনের রানিমার ‘অ্যাপোলজি লেটার’ও হারিয়ে  যাওয়া সভ্যতার মাঝে শোভা পাচ্ছে এই মিউজিয়ামেরই এক ঘরে। তবু সব অপরাধ কি আর ক্ষমার যোগ্য হয়? কে জানে!
আর ওই যে আগের দিন বলছিলাম না, ম্যামথদের হারিয়ে  যাওয়ার গল্প— মানুষও তাহলে দেখছি দিব্যি হারায় সব। চামড়ার  রঙের কাছে,বৈষম্যের কাছে—প্রকারন্তরে মানুষের কাছেই।

(৩)
এই বেশ ভালো। বেঁচে থাকা না থাকার মধ্যে দিয়েই বয়ে চলে ইতিহাস।তাকে ধরে রাখার এক অদম্য প্রয়াসও চোখে পরে সংগ্রহশালায়।  কোথাও যেমন পরে আছে ঠিকই তাদের হারিয়ে যাওয়া হাড়গোড়, কোথাও আবার ধরাও তো হয়েছে তাদের নতুন আঙ্গিকে, নবচেতনার ডানায় ভর দিয়ে! তাদের সেখানে ছোঁয়া যায়, অনুভব করা যায়—চোখের পাতায় আঁকা জীবনীর পাতা উল্টেপাল্টে বেশ পড়াও যায় একান্তে। স্টাফড্ অথবা ছবি— সে যেমনই রূপ হোক—সবই যে সরল সে জীবনধারারই বাহক ও রূপকার। এই অসীমতার দেহে তাই প্রাণ না থাকলেও গেয়ে চলে তারা ‘বেঁচে থাকার গান’ই।

হয়তো কোয়ালার নরম পশমী বুকে হাত বুলিয়ে বা রঙের আকর উপচে দেওয়া পাখিদের চোখে চোখ রেখে শেষমেশ তাই বলে উঠবেই আগামীর সন্তান   — চিন্তা নেই, আমি পারলে তুমিও পারবে। কিছুতেই আর মিলিয়ে যেতে দেবোনা তোমাদের কালের গহ্বরে। কোনোভাবেই।

(৪)
একসময় তারা দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত এই পৃথিবীর বুকেই। আজ তারা নেই। কাল আমরাও থাকব না। এ সত্য চিরন্তন। তবু হিংসা দ্বেষ ক্লেশে কেন জর্জরিত আমরা? তুমি আমার মতো নও, তুমি স্বাতন্ত্র্য — এই নিপাট সত্যকে মেনে নিতে এত কিসের ভয় আমাদের, এত কিসের দ্বিধা? আলাদা আলাদা ভাবেই খুব যত্ন নিয়ে গড়েছেন আমাদের বিবিধ ঈশ্বরতত্ত্বের পারিষদ্বর্গ , এমনকী তাদের প্রতি বিমুখতাও কারও কারও নিজস্বতা বই তো কিছু নয়! তাকে অস্বীকার করে সাময়িক নিশ্চলতা আসে বটে, তবে তা আর কতক্ষণের, বলতে পারা যায় কি?

ওই, ওই যে দেখো, পাথর থেকে কেমন ধীরে ধীরে তুলে আনা হচ্ছে গুঁড়ো,হাড়,মিনারল, ফসিল, চলছে তার উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা — আজ থেকে কয়েকহাজার বছর পর ওই কাটাছেঁড়ার টেবিলে শুতে তো হবেই আমাদের প্রজাতিরও কোনো জীবাশ্মকে, তাই না! সবই যে ঘূর্ণায়মান এই পৃথিবীতে, এমনকি ‘যুগ’ এবং তার অনন্ত প্রহরী, ‘কাল’ও!

জাস্টিস এ্যাণ্ড পুলিস মিউজিয়াম

কি, নাম শুনে খানিক সন্দিহান হয়ে পড়লে তো?পুলিশ মানে তো নিরন্তর খেটে চলা সেই মানুষগুলো, প্রকৃত অর্থে যারাই আমাদের রক্ষক, সে তো বুঝলাম! তবে ন্যায়ের প্রশ্ন কীভাবে জুড়ছে এখানে? আর আদ্যোপান্ত একটা সংগ্রহশালা কীভাবে গড়ে উঠতে পারে এই আপাত রোজকার এক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে?

ফিরে যেতে হবে আমাদের আধুনিক সিডনি শহরের গড়ে ওঠার প্রাক্কালে। ১৭৭০ সালে ক্যাপটেন কুক এসে এই বিপুল এক স্থলজ অংশে ব্রিটেনের ঝণ্ডা উড়িয়ে চলে তো গেলেন নিজের দেশে, কিন্তু, কারা সেখানে বসবাস করতে আসবে এরপর – সেরকম কোনো সিদ্ধান্ত তখনই হলনা। তবে এটুকু বুঝতে বাকি রইল না, কেউ যদি অধিগ্রহণ না করে এই অঞ্চল, তবে রাজত্ব হাতছাড়া হতেও আর  বেশিদিন লাগবেনা। মূলতঃ ব্রিটিশদের আসার অনেক আগেই ১৬০০ খৃষ্টাব্দে ডাচেরা অধিগ্রহণ করেছিল অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম প্রান্তর যেখানে আজকের পার্থ্ শহর অবস্থিত। কিন্তু জনবসতিহীন অবস্থায় ফেলে রাখার ফলে অচিরেই তা আবার হস্তগত করে নেয় আদিবাসীবৃন্দ।
এমন ভুল ব্রিটিশ সরকার একেবারেই করতে নারাজ। তাই  নতুন দেশ গড়ে তুলতে প্রথমেই পাঠানো হল ইউরোপের জেলে সাজাপ্রাপ্ত সব বন্দিদের। অতএব ১৭৮৮ সাল নাগাদ প্রথম বন্দিদের জাহাজ এসে ভিরল সিডনি হারবারে।
যথারীতি সময়ের স্রোত দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর স্বমহিমায় বয়ে চলেছে বছরের পর বছর। ধীরে ধীরে সাধারণ নাগরিকরাও একে একে ভিড় জমিয়েছে এই দূর দেশে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দেশের তকমা পাওয়া ব্রিটেনবাসী পরিস্থিতির শিকার হয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাধ্য হয়ে এই চরম আদিম আশ্রয় স্থলে এসে জড়ো হয়েছে। শহরের মধ্যেই ব্যারাকে অভিযুক্তরা এসে জড়ো হওয়ায় বেড়েছে খুন, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানির সংখ্যাও। পরিস্থিতি সামাল দিতেই তাই অবশেউ মজবুত করা হল আইনি ব্যবস্থা। শহরের মূল কক্ষপথে ১৮৫৬ সালে খোলা হল পুলিস স্টেশন, আর তারই অনতিদূরে একই চৌহদ্দির ভিতরে গড়ে উঠল নতুন আদালত। এর আগে অবধি যেকোনো বিচার ব্যবস্থার জন্য আবার অভিযুক্তকে পাড়ি দিতে হত ইংল্যাণ্ড।সত্যি, সব ছেড়ে বারবার যাতায়াতই সবচাইতে বড় সাজা ছিল বুঝি সে সময়! পরিবার পরিজন ছেড়ে বারবার বাসাবদলের চেয়ে নির্মম আর কিই বা হতে পারে বলো তো! যাক,অন্তত, এবার তার ব্যতিক্রম ঘটল শেষমেশ।

কিন্তু এত সহজে কি আর অপরাধ অবদমিত হয় এসবে? বিশেষ করে সেই দেশে যার প্রথম প্রস্তর গেঁথেছে অন্ধকার জগতে ঘোরাফেরা করা সব মানুষজন? না, অপরাধ তো কমলই না, উল্টে যেন আরও সংগঠিত হয়ে উঠল সব চক্রান্তকারীরা। শুরু হল সঙ্গোবদ্ধ জুয়াখেলা, ঘোড়দৌড়ের বাজি লাগানো, আর গ্রাস করল অস্ট্রেলিয়ার বাজার  কোকেন থেকে শুরু করে সবধরণের খতরনাক ড্রাগস আর নেশার সামগ্রীর প্রকোপ।
এমনই সব ছোটখাট থেকে বড়সড় গল্প উঁকিঝুঁকি মারছে আজও পুরোনো এই বিল্ডিংয়ের প্রতিটি নিশ্বাসে প্রশ্বাসে। প্রতিটি অভিযুক্তকে পুলিশ স্টেশনে আনার পর নিয়ম ছিল তার ছবি এঁকে বা তুলে সংরক্ষিত করার। যবে থেকে ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে, রক্ষিত হয়েছে সেই সমস্ত প্রিন্টেবল নেগেটিভও। সেইসব জমে থাকা নেগেটিভের প্রিণ্ট দিয়েই ঢোকার মুখের প্রথম ঘরে চলছে সুবিশাল প্রদর্শনী।

ঘরের আলো সামান্য কমানো। শুধু ছবিগুলোর উপরে ফেলা হয়েছে ফোকাস।সেই মৃদু আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কারও চোখে ঝরে পড়ছে ক্রুঢ়তা, কারও মণিতে তাচ্ছিল্যসূচক হাসি। কেউ আবার ভীত, লজ্জিত,তো কেউ মুখ ঘুরিয়ে বসেছে সবার নজর এড়াতে অন্যদিকে।বিশ্বাস করবেনা, ওই ছবিগুলির মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হল প্রথমবার,সত্যিই, মানুষের চোখের ভাষাই কেমন অকপটে বলে দেয় তাদের ভিতরের আসল পরিচয়! সবক্ষেত্রে আলাদা করে সাক্ষিসবুদ সবসময় লাগে না।

আরও একটা জিনিস খেয়াল পড়ল, এসময়ে অপরাধে মেয়েরাও কিন্তু পিছিয়ে ছিল না। ছোটখাট চুরি ছিনতাই তো ছিলই, এমনকি মাদকপাচারকারী কিছু মক্ষিরাণীদের রূপেও এসময় বেশ মজেছিল কিন্তু গোটা এলাকা! সেখানে কোথাও মা মেয়েকে অসৎ পথে করা ব্যবসায় হাতেখড়ি দিচ্ছে, কোথাও আবার সাজের সামান্যতম সামগ্রীর জন্য কেউ স্বেচ্ছায় নাম লেখাচ্ছে অন্ধকূপের অন্দরে। কেউ উচ্চবৃত্তদের ফাঁসিয়ে সর্বশান্ত করার আগে একবারও ভাবছে না, কেউ আবার লোভের বশবর্তী হয়ে খাবারে বিষ মেশাতেও কোনো কসুর করছে না।
পাশাপাশি আরও একটি জেলের সেলের মধ্যেই আবার রাখা রয়েছে নানা ধরণের মার্ডার ওয়েপন বা হত্যা করা হয়েছে যা দিয়ে, এমন সব অস্ত্র। দোনলা বন্দুক থেকে অটোমেটিক রিভলভার, লাঠির মধ্যে রাখা গুপ্ত ছোরা থেকে পিন —  এতসব সরঞ্জাম একসাথে দেখলে ভ্রম হতেই পারে হলিউডের পুরোনো কোনো সিনেমার ক্রাইম সিনে পৌছে গেছি যেন হঠাৎ করে। তফাৎ একটাই, এই এখানে যা দেখছি যা শুনছি, তার কোনোকিছুই বানানো বা রেপ্লিকা নয় আদৌ, সবই অন্য কোনো সময়ের বৃত্তে ঘটে চলা অতীতের নির্মম সাক্ষ্য!

আরও একটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল এরপর। এই প্রথম কোনো আদালতের অভ্যন্তরে উঁকিঝুঁকি মারার সুযোগ ঘটল। নিস্তব্ধতার মধ্যে একমনে বিষণ্ণ বড় ঘড়ি সময়ের হিসাব রেখে চলেছে যেখানে এখনও অনিঃশেষ। ওই তো সামনে ধর্মাবতারের বসার প্রশস্ত জায়গা, ওই তো সাক্ষিদের দাঁড়ানোর বক্স। আরে, আমার সামনের ঘেরা জায়গাটাই তো অভিযুক্তদের শুনানির সময়ে ব্যবহৃত বেঞ্চ, যাতে আজও সুস্পষ্ট, উদ্বেগে কেটে চলা একের পর এক আঁচড়ের দাগ!
একটা ছোট্ট চৌকাঠ পেরিয়ে একপ্রস্থ উঠোন।উঠোন পেরোলেই পুলিশের বড়বাবুর সেইসময়কার অফিস। ঘরের এককোণে উষ্ণ  ফায়ারপ্লেস বাদ দিয়ে বাকি আদল বলতে পারো, মোটামুটি আমাদের এখানকার মতোই। দেওয়াল জোড়া অভিযুক্তদের কিছু ছবি, টেবিলে জমে ওঠা অপরাধীদের ফাইল, একটা ছোট্ট  ঘেরা জেরা করার ঘর, ব্যস এইসব। ও হ্যাঁ, প্রথম ইলেক্ট্রিক কনেকশনও এসে পৌঁছোয় কিন্তু এ-ঘরেই। বাকি জায়গা সন্ধ্যাকালেই নিমজ্জিত হত মোমের আলো মাখা অন্ধকারের গোপনে।

পরপর দুপাশে সাজানো ঘুপচি মতো কিছু সেল আজও অক্ষত। সেলুলার জেলের আদলেই সেই ঘরের দরজায় বড় বড় সব গরাদ আর তালা, হাওয়া চলাচলের সুবিধার্থেই যা হোক রয়েছে উঁচুতে এক পলকা ভেণ্টিলেটর ও।ভাবতে অবাক লাগে কিকরে দিন কাটত এখানে তুলে আনা সব বন্দিদের? শোনা যায় কেউ কেউ নিজের মতো থাকলেও বেশিরভাগই এই দমবন্ধ-করা পরিবেশে একলা হতে চাইত না। তাই যেমন অনেক পুরোনো জুটি ভেঙে গেছে এসে এখানে, আবার নতুন সম্পর্কও গড়েছে অপরাধের নিতান্ত নিজস্ব এক্তিয়ারে।

ঘর যেমন শেষ হয় না, অপরাধও না। আর তাদের ঘিরে-থাকা রোমহর্ষক গল্পেরাও নয়। কোথায় খুনের দশ বছর পর কেসের বনিবনা হয়েছিল মৃতদেহে করা দ্বিতীয় দফার ময়নাতদন্তে , কোথায় রবিন হুডের ঢঙে জঙ্গল থেকে অতর্কিতে ধেয়ে বেরোত ডাকাতরা, কোথায় দাঁতের ডাক্তার পেশেণ্টের প্ররোচনায় শেষ করে দিয়েছে তার স্বামীকে, কোথায় দিদা হাসিমুখে বিষমাখানো মিষ্টি তুলে দিচ্ছেন তাঁর নাতি নাতনির মুখে – সব স্মৃতিই যেন আজও অমলিন রয়েছে এখানে! উফ, সত্যিই বড় ভয়ঙ্কর এ এক অভিজ্ঞতা। আর বলার অপেক্ষা রাখেনা, অপরাধের এই স্পর্শগুলোও যেন এখনও যথেষ্ট স্পষ্ট!

বাড়িটা থেকে বেরোনোর মুখে অনেক কাট আউট লাগানো। ফিল্মের নেগেটিভ থেকে অনেক চেহারার শনাক্তকরণ হওয়া সম্ভব হলেও বেশিরভাগেরই হয়নি। তাদেরই মধ্যে কারো কারো ছবি তাকিয়ে রয়েছে যেন স্থির দৃষ্টে আজও তোমার দিকে— প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে, “আমার অপরাধটুকু কি ছিল, বলতে পারো?” বা দেখেছো, কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি জানতে চাইছে কেমন, “খোঁজ নিওতো, আমার পরিবার পরিজন সব কোথায় গেল? জানো, এই অন্ধকূপেই আটকে রয়েছে আমার প্রেতাত্মা — বেরোনোর অনুমতি দেখোনা, আমাকে আজও কেউ দেয় না!”

ক্রমশ

       ছবিঃসুমিতাভ সাহা

 বিশ্বের জানালা       সব পর্ব একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s