বিশ্বের জানালা অস্ট্রেলিয়া-গল্পে এবার সংগ্রহশালা২ পারিজাত ব্যানার্জি সাহা শরৎ ২০১৮

 এ সিরিজের আগের লেখা অস্ট্রেলিয়ার পেটের ভিতর,   অস্ট্রেলিয়া-এক “টরোঙ্গা” দূরে,   অস্ট্রেলিয়া-গল্পে এবার সংগ্রহশালা১

গল্পে এবার সংগ্রহশালা (২)

হাইড পার্ক ব্যারাকস্ মিউজিয়াম

১)

১৭৭০ সালে দেশ অধিগ্রহণের পর ১৭৮৮ সাল থেকে একে একে বিভিন্ন জাহাজ এসে নোঙর করতে থাকে সিডনি হারবারে। এদের মধ্যে আসা বেশিরভাগ যাত্রীই ছিল আসলে তৎকালীন ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি। ইউরোপের মাটি থেকে অপরাধির সংখ্যা কমাতে দ্বীপান্তরই সে সময় শ্রেষ্ঠ সাজা হিসাবে পরিগণিত হত। সাধারণ চোর ডাকাত থেকে শুরু করে খুনের আসামী, রাজনৈতিক বন্দী, ক্রীতদাস, ব্যাঙ্কলুটকারী, ঠগ — সব ধরণের অপরাধীর জন্যই মূলতঃ ব্যবহৃত হত দুটিই মাত্র পন্থা—  মৃত্যুদণ্ড বা তারই ‘লঘুরূপী দণ্ড’ – দ্বীপান্তর। ভাবতে পারো, সামান্য পাঁচ টাকা চুরির অপরাধেও কিন্তু ছেড়ে যেতে হয়েছিল কাউকে এইসময় তাদের পরিবার পরিজন— চিরদিনের জন্য!

প্রথম ক’ বছর আলাদা করে তাদের থাকার ব্যবস্থা করার কথা মাথায় আসেনি কারও। সাজাপ্রাপ্তদের যে পালানোর কোনো উপায়ই ছিল না— চারদিকে এমন অতল প্রশান্ত মহাসাগর! কিন্তু ক্রমে অন্য নাগরিকরা সেখানে ভিড় জমাতে শুরু করায় তাদের প্রতিবাদে এবং প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজন হয়ে পরে এক আলাদা সংরক্ষিত জায়গার। আর তাই ১৮১৭ সাল থেকে শুরু হয় হাইড পার্ক ব্যারাকের নির্মাণ কাজ, যা টানা চলে আনুমানিক দু’বছর মতন।

কারা তৈরি করেছিল তিনতলা উঁচু এই বিশাল আস্তানা? আবার কারা, সেখানেই আগামী কয়েক বছর হবে যাদের বসতি, এমনই সব কয়েদিদের বানানো ইঁটকাঠেই গড়ে ওঠে তাদের প্রথম পাকাপাকীভাবে নির্মিত মাথা গোঁজার ঠাঁই! মোট ছশো জনের থাকার মতো জায়গা তৈরি হলেও একসময় সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় চোদ্দশো জনে!

কেমন ছিল সেইসব মানুষগুলোর দিনপঞ্জিকা? প্রতিদিন সকালে তাদের বিভিন্ন নির্মাণ কাজে বা মাঠে দল বেঁধে নিয়ে যাওয়া হত। সারাদিনব্যাপী হাড়ভাঙা খাটুনির পর আবার নিয়ম করে ফিরিয়েও আনা হত ব্যারাকে।পালানোর চেষ্টা করে লাভ হতনা বিশেষ। ধরা পড়লে প্রাণদণ্ড ছাড়া আর কিছুই সাজা হতো না। আর তাছাড়া, বাইরের জীবনটা যে আরও টালমাটাল, ওখানে জেলপালানো আসামীর কোনো ঠাঁই জোটে না সচরাচর।তার চেয়ে দুদিকে দড়ি বেঁধে মাঝখানে কাপড় ঝুলিয়ে সার দিয়ে সৃষ্ট হ্যামকে রাত্রিবাস অনেক বেশি নিরুপদ্রব। পরদিন আবার একই রুটিন চলত গড়িয়ে গড়িয়ে —একইভাবে চিরন্তন!

মাঝে কিছু কিছু অন্যরকম দিনযাপনও যে হত না, তা বলা ভুল! বিশেষ করে যেদিন নতুন কোনো জাহাজ এসে ভিড়ত মোহনায়, সে দিনগুলোর কর্মব্যস্ততা থাকত অস্বাভাবিক। পুলিশের সাথে হাতে হাতে পুরোনো কয়েদিরা নতুন বন্দিদের গোনাগুন্তি শেষে কে কী কাজ করবে সে-সবও দেখাশোনা করত। তারই মাঝে হয়ত কখনওসখনও গড়ে উঠত নতুন বন্ধুত্ব বা চোখে পড়ে যেত পুরোনো ফেলে আসা সঙ্গীর সেই অমলিন হাসি!

তবে বেশিরভাগেরই এমন সুযোগ ঘটত না। পাথরের গায়ে বা ব্যারাকের দেওয়ালে উঠে আসত অদেখা প্রিয়জনের নাম যাদের ভালমন্দ কোনো খবরটুকুও পৌঁছতে লেগে যেত অন্ততপক্ষে এক বছর! সে সময়ে ‘লভ কয়েনস্’ বলে একটি শব্দজুটির খুব প্রচলন ছিল। মুদ্রা বানানোর সময়ে তার পিছনে অনেকেই খোদাই করে দিত তার জীবনসঙ্গীর নাম, কেউ কেউ লিখে রাখত ছোট্ট ভালোবাসার চিরকুটও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই কয়েন আর পাঠানো যেত না, তবু সামান্য ওই স্মৃতিটুকুও বেঁচে থাকার সাহস জোগাত নিশ্চয়ই ভেঙে পড়া ওইসব হৃদয়ে।

১৮৪০ সাল নাগাদ বন্দি ভর্তি জাহাজ পাঠানো আইন করে বন্ধ করে দেয় ব্রিটিশ সরকার। কিছুটা অস্ট্রেলিয়াবাসীদের প্রতিরোধেই নেওয়া হয় এই সিদ্ধান্ত, কারণ একটা দেশের ভিতই নয়তো অনগ্রসর হয়ে বাঁধা পড়ে থাকছে অপরাধীদের খপ্পরে বলে চিন্তিত হয়ে পড়েছিল তৎকালীন সরকার। তবে প্রকৃত কারণ বোধহয় ছিল অন্য। এক দেশ থেকে অপরাধীদের সম্পূর্ণ অন্য গোলার্ধের আর এক দেশে পাঠানো রীতিমত ব্যয়সাধ্য প্রমাণিত হয়েছিল ততদিনে। সে খরচ বহন করতে রীতিমত নারাজ হয়ে পরে ব্রিটেন।

এর ফলে অচিরেই নতুন মুখেদের ‘আমদানি’ বন্ধ হয়ে যায় বন্দরে। ইতিমধ্যে অনেকে সাজাপ্রাপ্তই আবার শাস্তির মেয়াদ শেষে নতুন করে আলাদা ভাবে জীবনধারণ শুরু করেছে তাদের। তাই হাইড পার্কে নেমে এলো ভাঁটার টান। যে সমস্ত কয়েদিরা তখনও সেখানে ছিল, তাদের হানাহানি ও দুষ্কর্মে আতঙ্কিত থাকতে শুরু করল এলাকার সবাই। পাশেই রকস্ বলে এক বিশাল এলাকা জুড়ে কর্মী সম্প্রদায়ের অনেকের ছিল বাস। সেই এলাকাতেও চুরি ডাকাতি লেগেই থাকত প্রায়ই। এমনকি শোনা যায় ব্যারাকের আসামীদের মধ্যেই কেউ দিনদুপুরেও খুন করে দিব্যি গা ঢাকা দিতে পারত শহরের ঠিক মাঝখানে গজিয়ে ওঠা এই বিপদসংকুল বাড়িতে। তাই ১৮৪৮ সাল নাগাদ সমস্ত কয়েদিদের পাঠিয়ে দেওয়া হল বন্দর থেকে বেশ কিছুটা দূরে এক দ্বীপে — কোকাটু আইল্যাণ্ড। শেষ হল হাইড পার্কের প্রথম অধ্যায়।

১৮৪৮ সাল থেকে এই বাড়ি জুড়ে থাকতে এলো ভিনদেশী সব রমণীরা। গোটা বাড়িটাই ব্যবহৃত হতে শুরু করল অভিবাসককারী বা ইমিগ্রেশন অফিস হিসাবে। ততদিনে নানান দেশ থেকে অনেকেই কর্মসংস্থানের আশায় পাড়ি জমাতে শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়ায়। বিশেষ করে মহিলারা বাড়ির বাইরে পা রেখে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। কয়েদিদের অভাবে বেশ কিছু কায়িক পরিশ্রমের কাজ থেকে শুরু করে হাতের কাজ, দরজির কাজ,  গৃহসেবিকা বা নার্সের পেশায় খুলে গেছে নতুন দিগন্ত।যতদিন না তাঁদের ঠিকঠাক করে কোনো বাসস্থান জোগাড় হত, ততদিন তাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল এখানে। তাই বলে সবাই যারা আসতেন, তাদের ভাগ্য যে একরকমের ভালো, তা কিন্তু নয়। কেউ ছ’মাস যাত্রা করে এসে জানতে পারতেন, তার পরিবারের আর কেউ এসে পৌঁছতে পারেনি। কেউ বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও কাজের সুযোগ পেয়ে উঠত না মনের মতন। এমনই সব চাকরিজীবি মেয়েদের থাকার ব্যবস্থা করা হয় বাড়ির দোতলায়।

একতলাটায় ইমিগ্রেশন অফিসের পাশাপাশি চাকরির খবরাখবর দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রতিদিন মেয়েরা সেখানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসত নতুন কাজের প্রত্যাশায়। তারপর সারাদিন যে যার কাজ সেরে সন্ধ্যায় সার দিয়ে রাখা লোহার বিছানার নিজেরটি ঠাহর করে শুয়ে পড়ত ঘুমের ঠিকানায়।

১৮৮৬ সালে ইমিগ্রেশন সেন্টার উঠে যাওয়া অবধি প্রায় চল্লিশহাজার মেয়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের ছেলেমেয়েরও বাসস্থান হয়ে ওঠে ব্যারাকস্। যাক, এভাবেই অন্তত অন্ধকার জগত থেকে আলোয় কিছুটা হলেও তো ফিরতে পারল এই ঐতিহাসিক মাইলফলক!

১৮৬২ সাল থেকে আরও একটি কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু হয় হাইড পার্ক ব্যারাকসের তৃতীয় তলাটি। সম্ভবত সেটিই ছিল এদেশের প্রথম বৃদ্ধাশ্রম। দুঃস্থ, কপর্দকশূন্য বৃদ্ধাদের মাথার উপর ছাদের ব্যবস্থা করতে তৎপর হয়ে ওঠে সে-সময়ের সরকার। তাদের মধ্যে যারা সামান্য শারীরিক দিক দিয়ে ক্ষমতাশালী, তাদের জন্য কাজের অল্পস্বল্প ব্যবস্থা করা, থাকা খাওয়া, পথ্যাদি দেওয়া— এসবই চলতে থাকে নিখরচায়।

তবে সত্যি বলতে, খুবই নিম্নমানের সংস্থান হয়ে উঠেছিল ব্যারাকস। ইঁদুরের উপদ্রবে প্লেগ বা ওই জাতীয় সংক্রমণের ভয় তো সবসময় ছিলই, তার উপর অন্ধকূপের অপরিচ্ছন্ন  চৌখুপীতে সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকাটাই ধীরেধীরে যেন হয়ে পড়ছিল দুষ্কর। অবশেষে, যখন নিচের দোতলা খালি হয়ে গেল, সেই ১৮৮৬ সালেই বন্ধ করে দেওয়া হল আশ্রমও।

ততদিনে একশো বছর পার হয়ে গেছে আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার বয়স। মোটামুটি স্থিতিশীল হয়ে উঠেছে গোটা সিডনি। রমরম করে চলতে থাকা নতুন জীবনে হাইড পার্ক ব্যারাকস যেন কলঙ্কের একচিলতে দাগ। অনেকেই গোপন করে তাদের পূর্বজদের জেলের ঘানি টানার পরিচয়। কিন্তু এই স্থাপত্যই যেন কিছুতে ভুলতে দেয় না তাদের হারিয়ে যাওয়া বেশ কিছু অতীত।

অবশেষে, সরকারী সিদ্ধান্তে ভর করে হাইড পার্কের সম্পূর্ণ চত্বরকে বদলে ফেলা হয় আদালতসমূহ এবং অফিস কাছারিতে। বিশাল বিশাল ঘরগুলিকে কেটে কেটে প্রয়োজন মতো ঘরের আকার দেওয়া হয়। প্রায় একশো বছর ধরে এরপর এমনভাবেই মানুষের মনে ছাপ ফেলে চলে হাইড পার্ক। মুছে যায় তার পূর্বতন পরিচয় অচিরেই। দেশের স্বার্থে এখানকার কোর্টরুমেই নেওয়া হয় দুটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। ১৯২৭ সালে সকলের কাজের ন্যূনতম পারিশ্রমিক ধার্য করার কথা বিবেচিত হয় এই চত্বরেই, আবার নারীদের পুরুষদের ন্যায় সমান আয়ের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় 

এখানেই ১৯৭৩ সালে। ১৯৭৯ সালে যদিও কোনোপ্রকার কাজকর্মের জন্যই বন্ধ করে দেওয়া হয় এই অঞ্চল।


প্রায় দু’দশক পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়াবাসীরা নিজেদের পরিবারের পূর্বস্মৃতি রোমন্থনে উৎসাহী হয়ে পরে অবশেষে। তাদের পূর্বপুরুষের অপরাধজনিত গ্লানি মুছে নতুন এক দেশের জনক রূপে স্বীকৃতি দিতে ব্যস্ত হয়ে পরে আপামর সিডনিবাসি। শুরু হয় খননকার্য হাইড পার্ককে তার পুরোনো রূপে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায়। বিভিন্ন ছোট ছোট দৈনন্দিন সামগ্রী যেমন চুরুট, আয়না, চিরুনি থেকে শুরু করে মহিলাদের  সাজ সরঞ্জাম এমনকি ইঁদুরের ফসিলও প্রাপ্ত হয় এই অবসরে। আর পাওয়া যায় বাাড়ির পুরোনো সব খোলনোলচে যা আজও সাক্ষ্য বহন করে বিভিন্ন সময়ের।

১৯৮৪ সালে উন্মোচিত হওয়া এই হাইড পার্ক মিউজিয়াম তাই ২০১০ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়ে আজ পৃথিবীর অন্যতম এক স্থাপত্যে অকপট দলিল হিসাবে বিশ্বজন সমাদৃত।

মিউজিয়াম অফ সিডনি

সারকুলার কোয়ের চত্বরটা ঠিক আমাদের ক্রিসমাসের পার্ক স্ট্রিটের মতো। সবসময় প্রাণবন্ত। বলা চলে, এটিই শহরের প্রাণকেন্দ্রও! এখানেই যেমন রয়েছে অপেরা হাউস, সিডনি হারবার ব্রিজের মতো জগত বিখ্যাত ফলক, ঠিক তেমনই ঐতিহাসিক গুরুত্বও খুব কম নয় এই অঞ্চলের। কিন্তু ১৭৭০ সালের আগে কেমন ছিল এই অঞ্চল? কারা বাস করত এখানে? কি ছিল তাদের জীবন পুরাণ?

আনুমানিক চল্লিশ হাজার বছর ধরে এই অঞ্চল আদিবাসী গ্যাডিগল গোষ্ঠীর দ্বারা ছিল পরিচালিত। প্রকৃতির মধ্যেই ছিল তাদের বাস, তাদের সমস্ত জীবনীও ছিল এই সমুদ্র জঙ্গল আর উঁচু নিচু পাহাড়িয়া পথে ঘেরা। তাদের অস্ত্রশস্ত্রও তৈরি হত যেমন গাছের ডাল কেটে, আবার নতুন গাছপালা লাগানোয়ও ছিল তাদের জুড়ি মেলা ভার। তাদের চলার স্রোতের ছিল একটাই মন্ত্র— “যতটুকু লাগবে, ঠিক ততটুকুই নিয়ে নেব শুধু শস্যশ্যামলা ধরিত্রীর বুক থেকে। তার বদলে বাকি সবকিছু প্রতিপালনের দায়িত্বও কিন্তু বর্তাবে আমাদেরই কাঁধে।”

১৭৭০ সালে যখন ক্যাপটেন কুক এই দেশ অধিগ্রহণ করলেন, আশ্চর্যজনকভাবে তিনি এড়িয়ে গেলেন এই অঞ্চলের উপর তার আদিম বাসিন্দাদের অধিকার। আজও যার ফলে নিজের দেশেই এই মানুষগুলো দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। সময় যদিও পাল্টেছে, অনেক সাদা চামড়ার  মানুষও বোঝে তাদের পূর্বপুরুষদের গায়ের রঙ দেখে অপরকে ভিন্ন করার প্রবণতা। সেই ত্রুটি বিচ্যুতি শোধরানোর চেষ্টায়ও সদা ব্রতী আজ এখানকার শিক্ষিত সমাজ। তবে, দুশো বছর আগে এরকম ছিল না দুই দলের মধ্যে সদ্ভাব।

১৭৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম গভর্নর, ক্যাপটেন আর্থার ফিলিপ হাজির হন সিডনির দোরগোড়ায় তাঁর দলবল সমেত। আট মাসের নিরন্তর যাত্রার পর বিশাল নৌবহর এসে দাঁড়ায় সিডনির বন্দরে। দুটি নৌবাহিনীর, সাতটি সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের এবং তিনটি মাল বোঝাই জাহাজ একসাথে দেখে চমকে উঠেছিলেন কি সেসময়ের আদিবাসীবৃন্দ? তার আগে অবধি সেই নিরীহ মানুষগুলো সত্যিই বুঝতে পারেনি নতুন করে লেখা হতে চলেছে তাদের অধ্যুষিত এলাকার একান্ত ইতিহাস।

গভর্ণর ফিলিপ আজকের মিউজিয়াম অফ সিডনি যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানেই প্রথম গভর্ণর হাউজের ভিত্তি স্থাপন করেন। মাত্র একবছরের মধ্যেই নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে দেয় তাঁর সঙ্গে আসা বন্দিদের দল। পরে যদিও বিভিন্ন সময়ে নানান এদিক ওদিক কাজকর্ম চলতেই থাকে অন্যান্য গভর্ণরের আমলে। এটিই কলোনির প্রথম উল্লেখবহুল দোতলা স্থাপত্য হিসাবে পরিচিত।

ফিলিপই প্রথম উপলব্ধি করেন, আাদিম এই প্রজাতিদের দূরে সরিয়ে রাখলে আদতে তাঁদেরই ক্ষতি। ভাষা, আচার,আচরণগত সমস্যার কারণে ওদের সঙ্গে ভবিষ্যতে যোগসূত্র স্থাপনে অসুবিধা দেখা দিতে পারে বুঝে তিনি নানান ভাবে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন গ্যাডিগলদের। সভ্য জগতের সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটানোর বারবার প্রচেষ্টা ঘটলেও সমস্ত পথই যখন বৃথা হয়ে যায়, তখন তাদের মধ্যের বেশ কয়েকজনকে চুপিসারে তুলে এনে আটক করে রাখেন এই গভর্ণর হাউজেই। তবু অসৎ উপায়ে তাদের ধরে আনায় তাঁর সৎ ইচ্ছাগুলো কিছুতেই সম্প্রসারিত হয় না।

ব্যতিক্রম শুধু বেনালং। সাহেবের সাথে ধীরেধীরে তারই একমাত্র গড়ে ওঠে নিবিড় সম্পর্ক। বেনালং এতটাই ভালোবেসে ফেলে ফিলিপকে, শোনা যায় সে তাকে বাবা বলে সম্বোধন করত, আর ফিলিপ তাকে ‘পুত্র’ বলে। একই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে বেনালংয়ের জন্য আলাদা কুটিরও বানিয়ে দেওয়া হয়। চলতে থাকে তাঁদের মধ্যে ভাষার আদানপ্রদান এবং তাদের দুপক্ষের সভ্যতা, শিক্ষা, বোধ, রুচি, ধর্মের এক অনন্য মূল্যায়ন। এ বাড়ির প্রতিটি ইঁট সে হিসাবে ভাগ্যবান, তারাই একমাত্র উপলব্ধি করেছিল এই অসম দুই মানুষের অপার বন্ধুত্ব। ১৭৯২ সালে যখন ফিলিপ ফিরে যান তাঁর দেশে, তাঁর সাথে লণ্ডন অবধি যায় বেনালং সাহেবসুবোদের মতো বেশভূষা ধারণ করে।

বেনালং আর ফিলিপের এই আত্মীয়তা ভালো চোখে দেখেনি সে-সময়ের সমাজ। অন্য লালমুখো সাহেবরা তার নিকষ কালো রূপ দেখে যেমন হাসাহাসি, তাচ্ছিল্য করেছে, তেমনই সে সমাদৃত হয়নি তার নিজকূলেও। তার স্ত্রী বারাঙ্গারু এর প্রতিবাদে তাকে একলা ছেড়ে চলে যায় বলেও রয়েছে রটনা। চারবছর পর যখন বেনালং নিজের দেশে ফেরে, ততদিনে অবশ্য তার কুটির ভেঙে ফেলেছে নতুন গভর্ণর।

সম্পর্কের সেই থেকে তিক্ততা শুরু। আজও কোথাও কোথাও লেগে রয়েছে তার রেশ। তবু সময় বদলায় তার আপন খেয়ালেই, পিছনে পরে থাকে তার ফেলে আসা রেশ! আবার কিছু সূত্র তো মেলেও না সে-রকম করে, তাই না? ১৮৪৬ সালে তাই মাটিতে মিশিয়ে ফেলা হয় আস্ত এই গভর্ণর হাউজকেই অবলীলায়। একরাশ স্মৃতি কেবল ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে থাকে এদিক-ওদিক, অজানায়।

১৯১২ সালে ওই একই জায়গায় নির্মিত হয় কিছু সরকারী বিল্ডিং, যা আবার ধূলিসাৎ হয়ে যায় ১৯৬০ সাল নাগাদ। নগর ভাঙাগড়ার এই নির্মম খেলায়, ইতিহাস হারিয়ে যেতে থাকে বেশ কয়েকবার। এমনকি এলাকাটিকে কার পার্কিং হিসাবে ব্যবহার করা হয় প্রায় দুই শতক! অবশেষে কিছু খননকার্যে উঠে আসে সেই প্রথম জমানার গভার্মেণ্ট হাউজের কিছু চিহ্ন। খোঁজ মেলে প্রথম সেই প্রস্তরের যা স্বয়ং স্থাপিত করেছিলেন আর্থার ফিলিপ!

ঠিক দুশো বছরের মাথায় ১৯৮৮ সালে গ্যাডিগাল সমাজকে সম্মাননা প্রদানের মধ্যে দিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে সেই একই আদলে বানানো নতুন স্থাপত্যটি। ‘মিউজিয়াম অফ সিডনি’ নামধারণ করে। বাইরে আদিবাসীদের এক অসামান্য বাঁশের তৈরি শিল্পকলার মধ্যে দিয়ে হেঁটে সংগ্রহশালার অন্দরে প্রবেশ করার সময় সত্যিই মনে হবে, এভাবে হাতে হাত ধরেই ঠিক কোনোদিন হয়ে উঠবে “পৃথিবী একটাই দেশ!”

   বিশ্বের জানালা       সব পর্ব একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s