বিশ্বের জানালা অস্ট্রেলিয়া-গল্পে এবার সংগ্রহশালা৩ পারিজাত ব্যানার্জি শীত ২০১৮

 এ সিরিজের আগের লেখা অস্ট্রেলিয়ার পেটের ভিতর,   অস্ট্রেলিয়া-এক “টরোঙ্গা” দূরে,   অস্ট্রেলিয়া-গল্পে এবার সংগ্রহশালা১,  অস্ট্রেলিয়া-গল্পে এবার সংগ্রহশালা ২ 

গল্পে এবার সংগ্রহশালা (৩)

পারিজাত ব্যানার্জি

সুসানাহ্ প্লেস মিউজিয়াম

পথিক মানুষ আমি, পথ চলাতেই খুঁজে নিই তাই আনন্দ অনেকের কাছে শুনেছি, “সংগ্রহশালার গহ্বরে কী পাও বলো তো দেখি? শুধু তো পুরোনো কিছু সরঞ্জাম, ওর বুঝি এতো মোহ?”

আমি হাসি, বলি, “আমি তো কোনো জিনিস দেখতে পাইনি! কিছু থাকার কথা ছিল বুঝি? আমি তো শুধু চার দেওয়ালের একটানা বলে চলা একনিষ্ঠ গল্প শুনে চলে এসেছিঅতীতের যে গল্পের হাত ধরে হেঁটে ফেলা যায় আসতো কয়েক যুগ সময়, নির্বিঘ্নে  বাকি তো আর কিছু টের পেলাম না, নিশ্চয়ই ঠকে গেলাম, কী বলো?”

আর এমনই নতুন পথের সন্ধানে এক ভরা দুপুরবেলায় পুরোনো সিডনির অলিগলি পেরিয়ে পৌছে গেলাম সুসানাহ্ প্লেস মিউজিয়াম

তবে এই সংগ্রহশালায় ঢোকার আগে আশপাশটার বর্ণনা বোধহয় এক্ষেত্রে দিয়ে রাখা ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক ১৭৮৮ সাল থেকে ইংরেজদের হাত ধরে অস্ট্রেলিয়ার নবজন্ম হয়, একথা তো এতক্ষণে তোমরা জেনেই গেছো এও জানা, যে প্রথম বেশ কয়েকটি পর্যায়ে বেশিরভাগ মানুষ যারা এসে বন্দরে নোঙর করেন, তারা আইনত সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি তবে ১৮০০ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত বেশ কিছু মানুষ ভাগ্যের  সন্ধানে এবং কাজের বন্দোবস্ত করতে পাড়ি জমাতে থাকে সিডনিতে তৈরি হয় প্রথম সাধারণ মানুষের বসতি এলাকা, দ্য রকস্ সমুদ্রের ধার বরাবর বন্দিদের হাতেই পাথর কেটে কেটে এগোতে থাকে নির্মাণ কাজ, তাই অঞ্চলের এমনতর নাম আবির্ভাব ঘটতে শুরু করা প্রশিক্ষিত সবল উন্নত কর্মীদের নতুন ঠিকানা জুটে যায় এই নতুন আবিষ্কৃত বিচিত্র মহাদেশে

নিজেদের পরিবার পরিজন নিয়ে একেবারে নতুন করে জীবন শুরু করতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে জড়ো হতে থাকে নানাবিধ মানুষজন আবার, বন্দীদের অনেকেও মুক্তি পাওয়ার পর এই রকস্ এই বসবাস শুরু করে দেয়, ছোটখাটো ব্যবসা বা কাজের ভরসায় কিন্তু অভাব যেই কর্মীদের নিত্যসঙ্গী, তার উপর ভর করে কিছুতেই অনেকসময়  কিনতে পারা যায়না নতুন বাসা অতএব, শুরু হয় একসার দিয়ে নির্মিত দুইতলা বাড়ির প্রচলন যেখানে একত্রে বেশ কিছু পরিবারের একসঙ্গে অথচ স্বতন্ত্রভাবে থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভবরেলের বা ব্যাঙ্কের কোয়ার্টার দেখেছো তো? খানিকটা ওরকমই আদল বলতে পারা যায় এই বাড়িগুলোরও এমনই অক্ষত বেশ কিছু বাড়ি নিয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের এখনকার এই গন্তব্যস্থল, সুসানাহ্ প্লেস মিউজিয়াম

মোট চারটি অক্ষত দোতলা বাড়ি ঘিরে গড়ে উঠেছে এই সংগ্রহশালাটি এখানে বলে রাখি, এই অঞ্চলের কিন্তু বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য আজও দিব্যি নজরে পরে যাবে তোমাদের পাহাড়ি রাস্তার মতো ঢালু সরু পাকদণ্ডী বেয়ে বেয়ে উঠে চলে এখানের বেশ কিছু গলি যেমন নার্সেস ওয়াক, হারবার ওয়াক, ইত্যাদি মোটা মোটা বড় বড় কয়েদিদের তৈরি ইঁটের মজবুত ভিতের নমুনা আজও ছড়িয়ে যত্রতত্র শহরের ঝাঁ চকচকে একুশ শতকের প্রাণকেন্দ্রের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে বেড়ে ওঠার জন্যই হয়তো হঠাৎ করে বড় বেশি করে চোখে পরে এই অঞ্চলের পুরোনো দিনের ফেলে আসা জীবনসংগ্রামের চাকচিক্যহীন বৈচিত্র্য

১৮৪৪ সালে নির্মিত এই বাড়িগুলিতে শেষ ভাড়াটে ছিলেন মেরি অ্যাণ্ডার্সন তাঁর পরিবার ১৯৭৪ সাল অবধি তাঁদের আস্তানা ছিল ৫৮ নং গ্লোউকেস্টার স্ট্রিটের এই বাড়িটি পুরোনোদিনের লণ্ডনেরওয়ার্কিং ক্লাস’-দের আস্তানার ছিমছাম ধাঁচই এই বাড়িগুলির বৈশিষ্ট ইংরেজদের কলোনিয়াল ছাঁচে বাইরে যে মোটা ইঁটের দেওয়াল উঠেছে, তা সত্যিই লক্ষণীয় ভিত্তি প্রস্তরটি স্যাণ্ডস্টোনের তৈরিতাতেই হয়তো এমন মজবুত শক্তপোক্ত এর গাঁথুনি এখনও পর্যন্ত ছোটখাট মেরামতির কাজ ছাড়া বাড়িগুলিতে তেমন হাতই জানো, লাগাতে হয়নি!

প্রতিটি বাড়ির অন্দরমহলের সরঞ্জাম ব্যবস্থা মোটামুটি একইরকম একতলায় সাজানো গোছানো বাইরের ঘর বা ড্রয়িং রুম মধ্যবিত্তদের সামর্থ্যে যেটুকু কুলোতো, তার বেশিরভাগটাই খরচ হত এই ঘরের জন্য কিছু দামি আসবাবপত্র কেনায় বাইরের ঘরে বাড়ির কর্তার অনুমতি ছাড়া বাড়ির অন্য কারও প্রবেশ করাও ছিল নিষিদ্ধ রবিবার করে চার্চের পাদ্রী আসতেন সকলকে আশীর্বাদ করতে, মূলতঃ এছাড়া ওই ঘর আর ব্যবহৃত হত না বললেই চলে আমাদের মতো হুটহাট কারও বাড়িতে যাতায়াত সাহেবসুবোরা বোধ করি তখনও প্রশ্রয় দিত না, আজও দেয় না

বাইরের ঘর পেরোলেই কিন্তু আনাচেকানাচের ছবিটা বেশ ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে দু তিনটে রঙের প্রলেপ চোখে পরে পাশাপাশি, একজন যেমন বাস ডিপোয় কাজ করায় সেখানকার সবুজ রঙ এনেই দেওয়ালে কোনোক্রমে রঙ করেছিলেন, তেমনই আবার কোথাও কোথাও কোনোদিনই হয়তো রঙের তেমন কোনো প্রলেপও পড়েনি, সেই রূপও সুস্পষ্ট

বিদ্যুৎ অনেক পরে এসেছিল এই এলাকায়গ্যাস বাতির উপরেই অনেকদিন পর্যন্ত নির্ভরশীল ছিল এই সব পরিবার জেনারেটর বক্সে এক শিলিং ফেললে কমপক্ষে তিনঘণ্টা আলো জ্বলার ব্যবস্থা ছিল সেসময় যা রাতের খাবারের সময়েই খরচা করার চল ছিল প্রধানত বিদ্যুৎ আসলেও ভিতরের ঘরগুলির দীনতা অবশ্য তাতে দূর হয়নি তেমন টিমটিম করেই কেটে গেছে বছরের পর বছর

মাটির তলায় থাকত রান্নাঘর সেসময় ইংল্যাণ্ডের অনুসরণেই করা হয়েছিল এই আয়োজনও তবে অস্ট্রেলিয়া গ্রীষ্মপ্রধান দেশ তার উপর সমুদ্রের প্রবল হাওয়ায় প্রায়ই এখানে পুঞ্জীভূত হয় আগুন লাগার সম্ভাবনা সেইসব বিপজ্জনক পরিস্থিতি উপলব্ধি করেই পরে বাইরের উঠোনে গরম কয়লায় আর অনেক পরে বার্নারে রান্নাবান্নার প্রথা শুরু হয়

স্নানঘর এবং শৌচাগারও নির্মাণ হয়েছিল উঠোনেরই অন্য প্রান্তে জলের সমস্যার কারণে বেশিরভাগ পরিবারই কেবলমাত্র রবিবার করে স্নান করত তারও ছিল নির্দিষ্ট সময় এবং ক্রমবিধি প্রথমে বাড়ির কর্তা স্নান করে এলে বাড়ির গৃহিনী হাতে চালিত ওয়াশিং মেশিনে জামাকাপড় কেচে তবে ঢুকতেন সেখানে তারপর পালা পড়ত এক এক করে বড় থেকে ছোট এই অনুযায়ী সব বাচ্চাদের ভাবো তো শেষ বাচ্চাটি যখন ঢুকত, তখন কীরকম কাদাটে অবস্থা থাকত সেখানের! তুমি তোমার পরিবারের আবার ছোট্টটি নও তো! তবে কিন্তু এই বাড়ি একেবারেই তোমার উপযুক্ত নয়!

রান্নাঘরের মাঝ দিয়েই খাড়াই পেঁচানো সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায় রাত্রে কারও শৌচকর্মের প্রয়োজন পরলে সে অবশ্য ওই সরু সিঁড়ি বেয়ে দোতলা থেকে নামতনা সাপখোপের উপদ্রব বরাবরই দেশে বেশি, তার উপর অন্যান্য দুষ্কৃতি জনিত বিপদ আপদও তো রয়েছে তাই শোওয়ার ঘরেই সবসময় ব্যবস্থা  থাকত বড়সড় এক ফুলদানী বা পাত্রের! ভাবছো, ‘এমা!’ – কিন্তু উপায় আর কী বা রয়েছে বলো, যে প্রকৃতির ডাক!

একতলায় সিঁড়ির  নিচেই ভাঁড়ার ঘর ওখানেই বসে খাওয়াদাওয়াও করত পুরো পরিবার

দোতলায় সর্বসাকূল্যে থাকত দুটো ঘর এক ঘরে বাস কর্তাগিন্নীর, অন্যটিতে ছোট সদস্যদের অন্তত পাঁচ ছজন সন্তান নিয়ে অবস্থায় বেশ হিমশিমই খেতে হত নিশ্চয়ই, তবু রীতির অন্যথা তখন কেউই তেমন করত না সন্তানাদি বড় হয়ে গেলে অবশ্য অনেক সময় ভাঁড়ার ঘরেও সোফা পেতে সেখানেও শোওয়ার আয়োজন করা হত, তবু বাইরের ঘর কিছুতেই ব্যবহৃত হত না

এই বাড়ির প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাসে এখানে থেকে গেছে একশোরও বেশি পরিবার ৬২ নং বাড়িতে সর্বপ্রথম বাস করতেন এই বাড়ির নির্মাণকারী এবং মালিক আইরিশ পরিবারএডওয়ার্ড রেলি এবং তাঁর স্ত্রী মেরি তাঁদের বড় মেয়ের নামেই এখানকার নাম, সুসানাহ্ বেশ দাম দিয়েই কিনতে হয়েছিল তাঁদের এই জায়গা চারশো পঞ্চাশ পাউণ্ডের মূল্য খুব কম ছিলনা সেসময় পরে ১৯৬২ থেকে ৯০ সাল অবধি অর্থাৎ মিউজিয়াম হিসাবে স্বীকৃতি মেলা অবধি এইসব বাড়ির দেখাশোনা করতেন যাঁরা, সেই এলেন এবং ডেনিস মারশ্যালের থাকার ব্যবস্থাও হয় এখানেই

৬০ নং বাড়িটির ইতিহাস আবার অন্যরকম এখানেই বাস এবাড়ির প্রথম এবং একমাত্র সমৃদ্ধ  ভাড়াটেএলেন এবং তাঁর স্বামী ফ্রান্সিস কানিংহেম এর গ্লাসগো শহরের এই বাসিন্দারাই পরে এখানকার প্রথম খবরের কাগজদ্য পিপল অ্যাডভোকেটএর প্রতিষ্ঠাতা ১৮৪৪ থেকে ৪৫ সাল অবধি তাঁরা এখানেই থাকতেন এইসময় তাঁদের প্রথম দুই সন্তানের জন্মও দেন এলেন পরে শোনা যায় নিজেদের বাড়ি করে উঠে যান তাঁরা সমৃদ্ধশালী পাড়ায়

১৮৬৫ সালে উইলিয়াম মার্চেণ্ট ভাড়া নেন এই ৬০ নম্বর বাড়ি সেই সময় থেকে প্রচুর ডক এবং জাহাজকর্মী এই বাড়িতে আশ্রয় নেন মূলতঃ বন্দরের এত কাছে এই বসতি থাকায় অবশেষে ১৯৩৪ সালে ডরোথিয়া নামে এক বৃদ্ধার শেষ জীবনের আশ্রয় হয় এই বাড়িটি তাঁর নাতিনাতনির বর্ণনার উপর নির্ভর করেই সাজানো হয়েছে এবাড়ির নিচের তলা উপরের তলা কিন্তু আজও সাজিয়ে রাখা রয়েছে বিত্ত এবং প্রাচুর্যে মুড়ে এলেনের মনের মতো করে

তবে সবচেয়ে উল্লেখপূর্ণ বাড়িটি রয়েছে কোনাকুনিভাবে দুটি রাস্তার মধ্যবর্তী সীমান্তে ১৮৪৫ সাল থেকেই এর বাইরের ঘরটির ভোল বদলে নির্মাণ করা হয় এক মুদিখানার পরে ১৮৮৯ সালে জর্জ হিল নামে এক ভদ্রলোক সেই দোকানের ভার নেন দেনায় ডুবে সমস্ত আসবাব পত্র বেচে অবশেষে তিনি ছেড়ে দেন দোকান ঘরটি এবং তাকে এক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের আকার দেন এখানকার পরবর্তী  ভাড়াটে এলিজা এবং রবার্ট স্নেডন কি থাকতনা সেখানে! মাছ মাংস থেকে শুরু করে জার ভর্তি লজেণ্স, আরও কত কি টুকিটাকি যে পাওয়া যেত, কি বলব তোমায়!এই বাড়ির প্রাণকেন্দ্রেও কিন্তু আসলে ছিল এই দোকান সকাল হলেই বাইরের লোকেদের আনাগোনার সাথে সাথেই বসে যেত আড্ডাও রেফ্রিজারেটরের আদিম সংস্করণআইস বক্স কেনা হয়েছিল দোকানের জিনিসপত্র রক্ষণাবেক্ষণের তাগিদে আজও চালু রয়েছে সেই আইস বক্সবাইরে রমরমিয়ে চলছে ১৯১৫ সালের আদলে নির্মিত দোকান , তবে একান্তই ভিন্ন এক প্রয়োজনে এই দোকানঘরটিই আসলে মিউজিয়ামের মূল প্রবেশপথ!

বেরিয়ে বাড়ির পথ ধরব, এমন সময়ে নজরে এলো এক নবদম্পতি সাদা গাউন আর কালো স্যুট পরে বাইরের ক্ষয়ে যাওয়া দেওয়ালে ভর দিয়ে ছবি তোলানোয় ব্যস্ত তাহলে সত্যিই আগামীর সূচনাও তো হয় আদিমতার হাত ধরেকী বলো!

এলিজাবেথ বে হাউজ

ইংল্যাণ্ড ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় ভাগ্যের ফেরে কেবলমাত্র কয়েদি বা শ্রমিক শ্রেণীর মানুষই আসেননি, এসেছিলেন সামরিক বাহিনীরও বেশ কিছু বিত্তশালী পুরুষ অ্যালেক্জাণ্ডার ম্যাক্লে নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অন্যতম ইংরেজদের এই সমগ্র কলোনির সেক্রেটারী রূপে তাঁর আবির্ভাব ঘটে অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর প্রাচুর্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই বন্দরের একদম ধারেই ৫৪ একর জমির উপর ১৮২৬ সালে নির্মাণকার্য শুরু হয়ে যায় এলিজাবেথ বে হাউসের

সাদা সুবিশাল এই বাড়িটি বাইরে থেকে দেখলেই বেশ খানিকটা সম্ভ্রম জাগতে বাধ্য অনেকটা আমাদের কলকাতার মার্বেল প্যালেস ঘেঁষা এর স্থাপত্যকলা বাড়িটির অভ্যন্তরে যদিও গ্রিক শৈলীর আভাস বেশ প্রকট সেসময়ের প্রসিদ্ধ আর্কিটেক্ট জন ভার্জ এই মহলের স্রষ্টা তাঁর কাজের বেশ কিছু নৈপুণ্য আজও সমানভাবে সুস্পষ্ট

ঢোকার মুখেই চোখে পড়বে এক বিশাল হলঘর যেখানে আমন্ত্রিতদের সাদর অভ্যর্থনার জন্য হাজির থাকতে হত বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীকে এর ঠিক ডানপাশেই সাজানো থাকত বিলাসবহুল বসার ঘর যেখানে স্বয়ং গৃহকর্তা সকলকে অভিবাদন জানাতেন বাড়ির ঠিক মধ্যিখানে ডিম্বাকৃতি সেলুন চত্বরটিও নামীদামী পেণ্টিং এবং ঝারবাতিতে নিশ্চিন্তে আলোকিত

হলঘরের বাঁদিকেই সুবিশাল খাবারঘর এমাথা থেকে ওমাথা বিশাল বড় ডাইনিং টেবিলই প্রধানত এই ঘরের একান্ত আসবাব তার সাথে অবশ্যই নানান রূচিশীল সামগ্রীও এই ঘরের অবশ্য প্রধান কিছু আকর্ষণ

এইঘরে যদিও পরিবারের লোকজন সচরাচর খাওয়াদাওয়া করতেন না ভিতরে অপেক্ষাকৃত ছোটব্রেকফাস্টঘরেই খানসামা  তাঁদের নিত্যনৈমিত্তিক ভোজনের আয়োজন করে থাকতেন তার ঠিক বিপরীতেই গৃহকর্তার পড়ার ঘর এবং লাইব্রেরি অধিকাংশ সময়ই দেখা গেছে যদিও, এই ঘরই হয়ে উঠেছে তাঁদের অফিসও

দোতলাই মূলত বাড়ির অন্দরমহল রমণীরা সাধারণত এখানেই নিজেদের ব্যস্ত রাখতেন সারাদিন ছখানা বড় বড় শোওয়ার ঘরের পাশাপাশি প্রধান পরিচারিকার ঘরও এই তলায় সেই পরিচারিকা ব্যতিরেকে অন্য ভৃত্যদের থাকার ব্যবস্থা ছিল মাটির তলার সেলার এবং গুদামঘরে আগুনের ভয়ে এখানেও কিন্তু রান্নাঘর বাড়ি পেরিয়ে বাগানের আর এক দিকে (তার যদিও এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই) মহিলাদের আমোদপ্রমোদের জন্য সেলাইমেশিন, পিয়ানো, খেলনাপাতি ঘর সাজানোর জিনিস রাখা থাকত তুলনামূলক ছোট বসার জায়গা, ‘মর্নিংরুমে

 *****

বাড়ির চারপাশটা বাগানে ঘেরা বটলব্রাশ থেকে শুরু করে ব্যাঙ্কসিয়া, ক্রিসান্থিমাম, নানান ফুলের সম্ভার সজীবতা আজও ফুটিয়ে তোলে তার মর্মে মর্মে তবে ম্যাক্লে সাহেবের এসবে হুঁশ ছিলনা তাঁর ছিল এণ্টোমোলজি বা পোকামাকড় এবং ছোট ছোট জীবজন্তু সংগ্রহের নেশা প্রজাপতি, গুবরেপোকা, বিছে, শুঁয়োপোকা, জোনাকিকি যে নেই তাঁর সংগ্রহশালায়! এর বেশিরভাগই কিন্তু এই বাগান চত্বর থেকেই সংগৃহীত!

ভাবছো তো, কী ভাগ্য নিয়ে জন্মেছিলেন এই বাড়িতে থাকা মানুষগুলো! কিন্তু জানো তো, জীবনের পরীক্ষায় সব মানুষকেই বসতে হয় এক না একদিন ছয় মেয়ে এবং স্ত্রী এলিজাকে সঙ্গী করে অ্যালেকজাণ্ডার ম্যাক্লে চলে তো আসেন এই দেশে কিন্তু নিজের দেশে ফেলে আসা সুখ বিত্ত বৈভবের স্মৃতি কোনোভাবেই যেন তাঁর মন থেকে যেতে পারে না সম্পূর্ণভাবে সিডনি পৌঁছনোর পর সবচেয়ে আদরের মেয়েকেও তিনি হঠাৎই হারিয়ে বসেন কালের অমোঘ খেয়ালে তার উপর আবার নেমে আসে নতুন ঘনঘটামাত্র বছরের মাথায়ই তাঁদের ছেড়ে চলে যেতে হয় বড় সাধের এই এলিজাবেথ বে হাউজ

১৮২৬ বাড়ি তৈরির কাজ শুরু হলেও টানা এগারো বছর ধরে নানান দেনার দায়ে আবদ্ধ হয়ে চলে নির্মাণের কাজ ১৮৪০ এর বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক ডিপ্রেশনে বাকি অর্থের ভাঁড়ারেও টান পরে ম্যাক্লে সাহেবের ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ছেলে উইলিয়ামের শঠতায় তাকেই বাড়ি বিক্রি করে ধারমুক্ত হন অ্যালেকজাণ্ডার অবশেষে তারপর অবশ্য বেশিদিন আর বাঁচেননি তিনি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি অবশেষে

উইলিয়াম প্রচুর আসবাবপত্র এবং বাবার সংগৃহীত পোকামাকড়ের সেই জীবাশ্মদের বিনিময়ে যাহোক করে ধ্বংসের মুখ থেকে রক্ষা করেন বে হাউজ ১৯০৩ সাল অবধি তা ছিল ম্যাক্লেদের পরিবারের দখলেই তারপর নানান ঝড়ঝাপটা পেরিয়েছে কখনও এই বাড়িতে বা করেছে অন্য পরিবার, কখনও অভ্যন্তরের সামান্য পরিবর্তনে তা হয়েছে অফিস, আঁকার কলেজ, বিয়ে বাড়ি শেষমেশ সরকার এই বিল্ডিং হস্তগত করে কিছুটা হলেও রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে অতীতের সেই ফিকে হয়ে আসা জৌলুস আজ তাই এই বাড়িই সিডনির জীবন্ত কিছু মিউজিয়ামের মধ্যে অন্যতম হিসাবে হয়ে উঠেছে পরিচিত

ভৌক্লজ্ হাউস

হারবারের ঠিক ধারেই তবে শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে অবস্থিত আর এক ইতিহাস প্রসিদ্ধ বাড়িভৌক্লজ্ হাউস ফ্রান্সের বিখ্যাত কবি পেত্রার্কের প্রিয় ভৌক্লজ্ ঝর্ণার নামেই বাড়ির পরিচয় ১৮০২ সাল নাগাদ হেনরি ব্রাউন হায়েস নামে এক ব্যক্তি ৫১ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠা করেন এই কটেজ, বাগান এবং চাষবাসের জায়গা

বাড়ির সাজসজ্জা  অন্য সেসময়ের আর পাঁচটা বিলাসবহূল বাড়িড় থেকে আলাদা না হলেও এর ইতিহাস অবশ্যই ব্যতিক্রমী কীভাবে? বলব, বলব!খানিক সবুর করতে হবে তো নাকি তার জন্য, কি বলো!

হেনরি অর্থাৎ বাড়ির যিনি প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর ছিল আয়ার্ল্যাণ্ডে বিশাল নামডাক এবং প্রতিপত্তি এমনকি তাঁর খ্যাতির জোরেই জুটে গিয়েছিল নাইটহুড উপাধিও কিন্তু কি আর বলব, ভাগ্যের ফেরে তাঁর মতিভ্রম হল স্ত্রী মারা যাওয়ার পর হঠাৎই তিনি দ্বিতীয়বার সংসার করার আশায় অপহরণ করে বসেন সেখানকারই এক কোটিপতি ব্যাঙ্কারের মেয়েকে এমনকি, তাকে জোর করে বিয়ের চেষ্টা করা হয় বলেও রটে যায় গুজব দুবছর পালিয়ে বেড়ানোর পর অবশেষে যখন তিনি নিজেই ধরা দেন পুলিশকে, বিচারে তাঁর তখন শাস্তি হয় অস্ট্রেলিয়ায় আজীবনের দ্বীপান্তর

ভীষণ রগচটা মানুষ ছিলেন এই হেনরি তার উপর অঢেল থাকায় তাঁর পয়সাপত্রের উপার্জনের তেমন প্রয়োজন পড়ত না তাই অচিরেই মাথা গরম করে বেশ বদনাম কিনে ফেলেন ভদ্রলোক সিডনিতে এসেঘটে যায় বেশ কিছু হাতাহাতির ঘটনাও শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে তাই তাঁকে দূরে রাখতেই অবশেষে শহরের বাইরে ১৮০২ সাল নাগাদ সরকার তাঁকে জমিজমা মঞ্জুর করে তৈরি হয় ভৌক্লজ্ হাউস আজ অবশ্য সেই সময়ের খোলনোলচের কণামাত্রও আর অবশিষ্ট নেই এখানে

১৮১২ সাল নাগাদ হঠাৎই অবশ্য শাস্তি মকুব হয়ে যায় হেনরির এবং তিনি ফিরে যান তাঁর দেশে

পরে থাকে কেবল জমিজমা কটেজ শূণ্য মালিকানায় ১৮২২ সালে অবশেষে স্বল্প সময়ের জন্য বাড়ি কিনে নেন ক্যাপটেন জয়েন পাইপার আর তাঁর থেকেই তা হস্তান্তরিত করে ফেলেন উইলিয়াম চার্লস ওয়োন্টওয়ার্থ, যাঁর সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই সেজে উঠেছে আজকের এই সংগ্রহশালা

এই নতুন মালিকের জন্ম বৃত্তান্ত নিয়েও কিন্তু আছে বেশ জম্পেশ এক গল্প উইলিয়ামের বাবা ছিলেন ইউরোপের কুখ্যাত ঠগী হাইওয়ের উপর দিয়ে যাতায়াত করা গাড়ি ঘোড়া কৌশলে থামিয়ে লুটপাট করাই ছিল তাঁর প্রধান ব্যাবসা ধরা পরার পর কোর্টের আদেশে অস্ট্রেলিয়ায় দ্বীপান্তরিত হওয়ার পথে বন্দীদের জাহাজেই আলাপ হয় তাঁর ভাবী স্ত্রীর সঙ্গে যাঁর ঠিক নাম জানা যায় না কোথাও হ্যাঁ, তবে এটুকু খবর মেলে, তিনিও ছিলেন সেসময় সাজাপ্রাপ্তধরা পড়েছিলেন বিলেতে চুরির দায়ে

উইলিয়ামের ছোটবেলাটা যে এতসবের মাঝে খুব ভালোভাবে কাটেনি, বলাই বাহুল্য মায়ের সাথে জেলেই শুরু হয়েছিল ওঁর জীবন তবে তীব্র  মেধা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফলে সমস্ত বাধা অতিক্রম করে তিনি সমাজে নিজের কিছুটা হলেও সম্মান ফেরত এনেছিলেন বৈকি!

সেসময়ের প্রখ্যাত উকিল হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন, ব্যবসায়ী এবং ঘোড়সওয়ার ঘোড়াদের প্রতি অসম্ভব টান ছিল সিডনির বিখ্যাত হাইড পার্কের ঘোড়দৌড়ের প্রথম বিজয়ীও হন উইলিয়াম এছাড়াও তিনি ছিলেন ভূপর্যটকসিডনি শহরের একমাত্র পাহাড় ব্লু মাউণ্টেন্স রেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাত্রা করে তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন বাকি দেশের সঙ্গে সিডনির যোগসূত্র

তাঁর বিশাল প্রতিপত্তির নমুনা ছড়িয়ে রয়েছে ভৌক্লজ হাউসের চারিদিকে এই বাড়িতেই স্ত্রী সারাহ্কে নিয়ে শুরু হয় তাঁর একান্ত সংসার আশপাশের সমস্ত জমিও কিনে নিয়ে ৫১৫ একর জমির উপর গড়ে তোলেন এই ওয়েন্টওয়ার্থ সাহেব ওনাদের বাড়ি এবং ফার্ম মুর্গী, ছাগল, ভেড়া, গরুর প্রতিপালন তো চলতই, পাশাপাশি এক বিশাল আস্তাবলে বাঁধা থাকত পুরো পরিবারের আদরের সব ঘোড়ারা বাকি বাড়ির মতোই রান্নাঘর ভাঁড়ারঘর এখানেও তৈরি হয়েছিল বাড়ির বাইরে যাতে সেখানকার কোনো দুর্ঘটনায় মূল ভবনের কোনো ক্ষতি না হয় ১৮০০ শতকের মতো করেই সাজানো এই আলোআঁধারি ঘরগুলোয় ঢুকলে সত্যি বলছি, দিনেরবেলাতেও চোখে পড়বে  ইতিহাস ফিসফিস করে কেমনভাবে কথা বলে চলে নিরন্তর!

বাড়ির অন্দরের আবার ভিন্ন রূপপ্রতিটি জিনিসে যেন লেগে রয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়া ভিক্টোরিয়ান আমলের তৈরি নানান শিল্পকলায়ও যথেষ্ট সমৃদ্ধ এর প্রতিটি ঘর মোট তিনতলায় বিভক্ত বাড়ির আপাত সাজানোর ধরণ এলিজাবেথ বে হাউসের মতোই টিরুম, ড্রয়িং রুম সব একতলায়মাঝের তলা উপরের তলা মিলে বিভিন্ন আকারের শোওয়ার ঘর  এছাড়াও দোতলায় রয়েছে মেয়েদের পড়াশোনা(সেসময় দস্তুর ছিলও আমোদপ্রমোদের ব্যবস্থা সমেত বসার জায়গায়ও, যেখানেও সুস্পষ্ট রুচিশীলতা

সাত মেয়ে এবং তিন ছেলের জনক জননী হয়ে নির্বিঘ্নেই হয়তো কাটানোর কথা ছিল ওয়েন্টওয়ার্থ পরিবারের, কিন্তু তাঁদের দুজনেরই বংশপরিচয় জেলখানায় শুরু হওয়ায়, সম্ভ্রান্ত সমাজ বরাবরই হেয় করে এসেছে তাদের বিশেষ করে সারাহ্কে কোনোরকম বড় পার্টির আমন্ত্রণ পাঠানো হতনা তার পারিবারিক পরিচয়হীনতার সূত্রে তার উপর, উইলিয়াম ছিলেন সারাহ্ দ্বিতীয় পক্ষের স্বামী তাঁর তত্ত্বাবধানের বিবাহবিচ্ছেদ হয় সারাহ্ যাকেও সেসময় খুবই হীনচোখে দেখত সমাজ

পরে অবশ্য পাল্টাতে থাকে দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ করে এখন আর নারীপুরুষের কোনো ভেদাভেদ তো করেই না মানুষজন, এমনকি তাদের অতীত নিয়েও আর কেউ ভাবিত নয় এমনই মুক্ত চিন্তা যদি সবসময় সব দেশে থাকে, তাহলে সত্যিই কিন্তু আমরা সব্বাই ভালো থাকতে পারব, তাই না?

দেখলে তো,একটা সংগ্রহশালা ঠিক কেমনভাবে জীবনদর্শনেরও পাঠ দিয়ে যায়!

   বিশ্বের জানালা       সব পর্ব একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s