বিশ্বের জানালা আঙ্কল স্যাম সংহিতা বর্ষা ২০১৭

                                                                                                                           আগের পর্ব  আঙ্কল স্যাম(২)

পর্ব ৩

নাগরিকরা বাধ্য হন কেমন কাজ করতে? বাড়ি বানালে সেখানে একটা আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করতে বাধ্য থাকেন নাগরিকরা। আবর্জনা ফেলার সেই নির্দিষ্ট জায়গা কত লম্বা হবে, কত চওড়া হবে তার মাপ বলা থাকে বাড়ি বানানোর নিয়ম নির্দেশিকায়। এই নির্দেশিকায় আরও বলা থাকে যে আবর্জনা ফেলার সেই নির্দিষ্ট জায়গাটি বাড়ির বাইরের দিকে করতে হবে। এর ফলে কোনো লোক বাড়িতে দরজা খুলে দেওয়ার জন্য উপস্থিত না থাকলেও ময়লা সংগ্রহ করার লোক এসে ময়লা যথা সময়ে নিয়ে যেতে পারে।

তবে এই নির্দেশিকা সরাসরি আইন হিসেবে বাস স্টেসনে মানে বাস স্ট্যান্ডে বা গ্যাস স্টেসনে মানে পেট্রল পাম্পে সবার জানার জন্য ঝোলানো থাকে না। কোনো একটা এলাকায় যাঁরা বাড়ি বানান বা যাঁরা বাড়ি কিনে কিংবা ভাড়া নিয়ে বাস করেন তাঁরা অঙ্গীকার পত্রে সই করে কবুল করেন যে তাঁরা যে এলাকায় বাড়ি বানাতে চলেছেন বা বাস করতে চলেছেন সেই এলাকাতে বাড়ি বানানোর বা বসবাসের সমস্ত নিয়ম মানতে তাঁরা রাজি আছেন। যাঁরা বাড়ি বানান তাঁরা কবুল করেন নিজেদের নির্মাণ সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সময়ে। বসবাস করেন যাঁরা তাঁরা কবুল করেন যে সংস্থার থেকে বাড়ি কিনছেন বা ভাড়া নিচ্ছেন তাঁরা, তাঁদের কাছে। এরপরে তাঁরা সেই অঙ্গীকার পত্রের সঙ্গে পেয়ে যান কাগজে ছাপানো অবশ্য পালনীয় নিয়মাবলী।

যাঁরা বাড়ি বিক্রি করেন বা ভাড়া দেন তাঁরা তাঁদের খদ্দেরকে অঙ্গীকার করানোর কাজটা করেন কারণ এটা করানোর জন্য তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ। কার কাছে? এলাকার জনপ্রতিনিধিরা যে পরিষদ চালান, সেই পরিষদ রাষ্ট্র এবং রাজ্যের আইন মেনে সরকার তৈরি করেন এবং সেই সরকারের মধ্যে দিয়ে নানান নাগরিক পরিষেবা দেন ও রাজস্ব সংগ্রহ করেন। সেই সরকারের দেওয়া পরিষেবাগুলোর একটা ব্যবসায়িক সংস্থার প্রতিষ্ঠাকে স্বীকৃতি দেওয়া। যাকে বিজনেস রেজিস্ট্রেসন বললে চটপট বোঝা যায়। যে সংস্থা বাড়ি বিক্রি বা ভাড়া দেওয়ার কাজ করেন তাঁরা নিজেদেরকে বিজনেস হিসেবে রেজিস্টার করানোর সময় যে এলাকায় কাজ করবেন, সেই এলাকার নাগরিকদের বানানো নিয়ম মানতে অঙ্গীকারবদ্ধ হন।

সাধারণত এইসব নিয়ম স্থির করেন এলাকার বাসিন্দারা, তাঁদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে, জনপ্রতিনিধিদের দরবারে। সেই দরবারে থাকেন এলাকার বণিক সভার প্রতিনিধিরাও। এলাকায় ব্যবসা করেন এবং করেন না এই দু ধরনের মানুষের মত বিনিময় আর বিতর্কের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় এইসব নিয়মনীতি। এলাকাভিত্তিক জনপ্রতিনিধিদের এই দরবারকে বলা হয় সিটি কাউন্সিল। ভারতে আমরা এই সংস্থাগুলোকে মিউনিসিপ্যালিটি বা কর্পোরেসন বলি। তা বাদে ট্রাইবাল কাউন্সিলও হয় উপজাতি অধ্যুষিত এলাকাতে। তবে সাধারণভাবে একেকটা এলাকার জনপ্রতিনিধিদের দরবারেই ঠিক করা হয় সেই এলাকার এইসব আবর্জনা ফেলার ব্যবস্থা কেমন হবে এবং সেই সংক্রান্ত নানান মাপজোপ। আসলে বাজারে নানান মাপের নানা ডিজাইনের নানান স্ট্যান্ডার্ডের যন্ত্র এবং জিনিস পাওয়া যায়। তাদের সবার সাথে সবটা খাপ খায় না। ডামস্টারের মাপ, আর তার সাথে ময়লা সংগ্রহ ট্রাকের যন্ত্রপাতি মানানসই হতে লাগে। বেখাপ্পা যন্ত্র ও জিনিসের ব্যবহার এড়াতে আবর্জনা ফেলার ব্যবস্থাতেও মাপজোপের কিছু কড়াকড়ি থাকে।

অনেক কথা ভেবে, অনেক হিসেব করে বাড়িগুলোতে রাখা হয় ময়লা ফেলার জায়গা, যাকে কিনা ডাম্পস্টার বলে, সেটা। এখানে বাড়ি বলে বোঝাতে চেয়েছি বসতবাড়ি, ইস্কুলবাড়ি, দোকান-বাজার, হোটেল, হাসপাতাল, মল – সব ধরণের ইমারৎ। ফিরে যাই হিসেবের কথায়। কিসের হিসেব? হিসেব হলো ডাম্পস্টার অবধি যাতে ময়লা সংগ্রহ করার ট্রাক পৌঁছোতে পারে, তার। এই জন্য সব অ্যাপার্টমেন্টের পার্কিং স্পেসে থাকে ডাম্পস্টার রাখার কুঠুরি। সাধারণত এসব কুঠুরির তিনদিকে ইঁটের তৈরি দেওয়াল থাকে। কখনও কখনও দেওয়াল তৈরি করা হয় কাঠের পাটাতন দিয়েও। আর রাস্তার দিকে থাকে সেই কুঠুরির দরজা। হোটেলেও তাই, তবে হোটেলে ঢোকার দরজা থেকে সেসব দেখা যায় না সাধারণত।

ডাম্পস্টার পার্কিং-এ থাকার সুবিধে অনেক। ময়লা ফেলার কাজটা বাইরের কাজে বেরোনোর সময়েই বেশ করে ফেলা যায়। হোটেলে থাকলে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে বা অ্যাপার্টমেন্টে থাকলে নিজের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে, কাজে যাওয়ার জন্য গাড়িতে চড়ার আগে, হাতে করে আনা ময়লা ভর্তি ট্র্যাশব্যাগ ঝপ করে ফেলে দেওয়া যায় ডাম্পস্টারে। আবার ময়লা সংগ্রাহক সংস্থার ট্রাক এসে ঘোরার ফেরার যথেষ্ট জায়গা পায়।

যে সব জায়গা বেশ গ্রামীণ যেমন পেন্সিলভ্যানিয়ার মুন টাউনশিপ কিংবা অ্যারক্যানসয়ের বেন্টনভিল কিংবা ক্যান্সাসের সনি, সেসব জায়গায় ময়লা সংগ্রাহক সংস্থার ট্রাক এসে থামে ডাম্পস্টার কুঠুরির সামনে। তারপর ট্রাকের ড্রাইভার ট্রাক থেকে নেমে এসে ডাম্পস্টার রাখা কুঠুরির বন্ধ দরজা খুলে নেন হাট করে। সরিয়ে দেন ডাম্পস্টারের ঢাকনা। তারপর ফের ট্রাকে চড়ে ড্রাইভারের কেবিনের মাথার ওপর থেকে কাঠের নাগরদোলার দোলনা দোলাবার কায়দায় নামিয়ে আনেন একজোড়া লিভার। লিভারগুলো এমন করে নামানো হয় ট্রাকের সামনে যে ট্রাকটা সামনে এগোলেই ডাম্পস্টারের কানার নিচ দিয়ে চলে যায় দুটো লিভার। এই দুটো লিভারকে দেখে মনে হয় যেন মানুষের হাতের কনুই থেকে আঙুলের ডগা অবধি অংশ, হাতের পাতা অনুভূমিক করা রাখা অবস্থায় কিংবা দু হাতের পাতা পরস্পরের মুখোমুখি করে, ভূমির সাথে উল্লম্ব করে রাখা অবস্থায়।

আর বোধ হয় বলতে লাগবে না যে বাচ্চাদের কোলে নেওয়ার মতো করে ডাম্পস্টারটাকে ট্রাকের ড্রাইভার্‌স কেবিনে উপুড় করে নেন ড্রাইভার তাঁর চালকের আসনে বসেই, কিছু যন্ত্রপাতি নেড়ে। তারপর আবার নাগরদোলার দোলনার কায়দায় নামিয়ে দেন ডাম্পস্টার যথাস্থানে। তারপর আবার ড্রাইভার নেমে এসে বন্ধ করে দেন ড্রাম্পস্টারের ঢাকা আর ড্রাম্পস্টার রাখার কুঠুরির দরজা। ফিরে যান নিজের ট্রাকে।

 যেসব জায়গা ঘনবসতি পূর্ণ শহর বা শহরতলি, যেমন লস এঞ্জেলস, সেসব জায়গায় দেখেছি যে ময়লা সংগ্রাহক ট্রাকের ড্রাইভার ডাম্পস্টার কুঠুরির দরজা খোলার পর ট্রাকে ওঠার আগে হিড়হিড় করে ডাম্পস্টারগুলোকে টেনে বার করে আনেন ট্রাকের সামনে। তারপর ট্রাকে চড়ে ময়লা সংগ্রহের বাকি কাজগুলো করে, ট্রাক থেকে নেমে আসেন আর ডাম্পস্টার ঠেলে ঢুকিয়ে দেন কুঠুরিতে। একাধিক ডাম্পস্টার একটা কুঠুরিতে থাকলে এক এক করে টেনে আনেন ডাম্পস্টার আর এক এক করে ঢুকিয়ে দেন কুঠুরিতে। যথেষ্ট জায়গার অভাবেই কাজটা করতে একটু বেশ সময় আর বেশি শ্রম দিতে হয়। এসব ঘন বসতি এলাকায় ট্রাক সরসরি ডাম্পস্টার রাখা কুঠুরিতে ঢুকতে পারে না। ট্রাক ঘোরানোর জায়গার অভাবে।

একেক এলাকায় ময়লা তোলা হয় সপ্তাহের একেক দিনে, একটা এলাকার জন্য দিনটা নির্দিষ্ট। এলাকায় যে সমস্ত বাড়ি থাকে মানে যেগুলো অ্যাপার্টমেন্ট নয়, আলাদা আলাদা বাড়ি, সেগুলোর চাকা লাগানো লম্বাটে প্লাস্টিকের ট্র্যাশ ক্যান সাইডওয়াকে নামানো থাকে ময়লা সংগ্রহের দিনে। সেদিন বিকেলেই বা পরে কোনো দিন দেখা যায় যে বাড়ির বাসিন্দারা কেউ বিকেল বেলায়

হিড়হিড় করে ট্র্যাশ ক্যান সাইডওয়াক থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়ির দিকে। গ্যারাজের দরজার পাশে বা গ্যারেজের মধ্যে রাখা থাকে এই ক্যানগুলো। এই ক্যানগুলো থেকে ময়লা নেওয়ার জন্য ময়লা সংগ্রাহক ট্রাকে আরেক ধরণের রোবোটিক আর্ম থাকে। এই রোবোটিক আর্মগুলো ময়লা সংগ্রাহক ট্রাকের ড্রাইভার সিটে বসে এমন করে নাড়াতে পারেন যে আর্মগুলো দুপাশ থেকে ক্যাঁক করে ধরে একেকটা ট্র্যাশ বিন আর ঝপ করে উল্টে নেয় বড় লোহার টাবে। তারপর আবার বিন ঠক করে রেখে দেয় সাইডওয়াকে মানে ফুটপাথে। রোবোটিক আর্মগুলোর ট্র্যাশবিন ধরার কায়দা অনেকটা বাচ্চাদের দুহাতে গ্লাস বা বোতল ধরে জল বা দুধ খাওয়ার মতো দেখায়। কোনো কোনো ট্রাকে যে লোহার টাবে এইভাবে ময়লা সংগ্রহ করা হয় সেই টাবটা রাখা থাকে ড্রাইভার্‌স কেবিনের মাথায়, নামানো আর ওঠানো যায় দরকার মতো, নাগরদোলার কায়দায়।

নানান জায়গা থেকে লোহার টাবে নেওয়া ময়লাটা আবার উল্টে নেওয়া হয় তৎক্ষণাৎ ট্রাকের পেছনে আঁটা বড় লম্বাটে একটা ধাতব পাত্রে। সেই পাত্রেই সংগৃহীত ময়লা কাটাই, কুঁচোনো, পেষাই এবং পোড়ানো হয়, ট্রাক চলতে চলতেই, একটা বাড়ির থেকে ময়লা নিয়ে পরের বাড়ির দিকে যাওয়ার সময়েই। তাই ময়লা সংগ্রাহক ট্রাকের থেকে ধোঁয়া বেরোতেও দেখা যায় কখনও কখনও। ট্রাকের যে অংশে এইসব আবর্জনা প্রক্রিয়াকরণ মানে সংগৃহীত ময়লার কাটাই, কুঁচোনো, পেষাই এবং পোড়ানো হয় সেই অংশটা ট্রাকের ড্রাইভার্‌স কেবিন আর ইঞ্জিন অংশের সঙ্গে জোড়া থাকে। সেই অংশগুলোকে মলের, প্লাজার, কর্পোরেট অনক্লেভের আর হাসপাতালের পার্কিং বা ব্যাক ইয়ার্ডে রাখা থাকতে দেখা যায়। এই সব সংস্থায় যাঁরা কাজ করেন তাঁদেরকে প্রত্যেকবার ময়লা ট্র্যাশব্যাগে বা বিনে করে নিয়ে গিয়ে আবর্জনা প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রে ফেলতে হয় আর যন্ত্রের গায়ে লাগানো নির্দেশিকা পড়ে যন্ত্রকে চালু বা বন্ধ করতে হয় প্রয়োজন মতো। এই যন্ত্রের ব্যবহারের সময় সতর্ক থাকতে হয় ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার ব্যাপারে। যেমন এই যন্ত্র চালু অবস্থায় যন্ত্রটি খুলে তাতে ময়লা ফেলতে বারণ করা থাকে। এই যন্ত্রে প্রক্রিয়াকরণের পর সংগৃহীত আবর্জনার আয়তন কমে যায়। একেই কম্প্যাক্টর বলে।

কোনো কোনো সিটি কাউন্সিল নির্দেশ দেন অধিবাসীদের যে রিসাইক্লিং-এর জন্য কোনো কোনো বিশেষ আবর্জনা অধিবাসীদেরই নিজেদের আলাদা করে আলাদা বাক্সে ফেলতে হবে। ক্যান্স্যাসের সনি শহরে এমন কোনো নির্দেশ ২০১৩-১৪ সালেও ছিল না অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের জন্য। কিন্তু ক্যান্স্যাসেরই ওভারল্যান্ড পার্কের মলে যত দোকান ছিল তাদেরকে কাগজের বাক্স আলাদা করে একটা কম্প্যাক্টরে ফেলতে হতো, প্লাস্টিক একটাতে আর কাঁচ আরেকটাতে। পেনসিলভ্যানিয়ার মুন টাউনশিপে সিটি অথোরিটির নির্দেশ ছিল বলে অ্যাপার্টমেন্ট দেখাশোনা করতেন যে সংস্থা তাঁরা জানিয়েছিলেন যে বাসিন্দারা যেন তাঁদের 1 PETE ও 2 PETE প্লাস্টিক ডাম্পস্টারে রাখা আলাদা সবুজ বিনে জমা করেন। ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলস কাউন্টির কোথাও এমন কোনো নির্দেশ আছে বলে টের পাই নি। তবে লস এঞ্জেলস কাউন্টিতেই দেখেছি যে কুঁচোনো, বা পোড়ানোর পর আবর্জনার অবশেষ দিয়ে ভরে ফেলা হয় মাটির গহ্বর। হতে পারে এই সব গহ্বর পরিত্যক্ত সোনা বা রুপোর খনির। কারণ যেখানে এই গহ্বরগুলো আছে সেখানে নতুন গহ্বর খুঁড়তে দেখি নি, কিন্তু সেখানে কয়েকটা পরিত্যক্ত সোনা, রুপো, তামার খনি আছে। অবশ্য চালু খনিও আছে কয়েকটা।

ইউনাইটেড স্টেট্‌স-এর আবর্জনা মুক্ত আবহাওয়ার কথার শুরুতে পশ্চিমের আবর্জনা মুক্ত অভ্যাসের কথা কেন বললাম? বললাম এই জন্য যে পশ্চিমের ছবি, যত পুরোনো সময়েরই কথাই তাতে দেখানো হোক না কেন, তাতে দেখা যায় যে দারুণ রোবোট বানিয়ে ফেলার আগেই পশ্চিমী মানুষ বাড়িতে আবর্জনা রাখার ঘরটা সদরের পাশে রাখতেন শহরের বাড়িগুলোতে, যাতে শহরের আবর্জনা সংগ্রাহকরা সহজে আবর্জনা নিয়ে যাতে পারেন। আর সেই আবর্জনা রাখার ঘরের মাথা ছাওয়া থাকত, দরজা বন্ধ থাকত, যাতে সারা বাড়িতে দূর্গন্ধ না ছড়ায় বা বাড়িতে পা-রাখা মাত্রই আবর্জনার স্তূপ নজরে না পড়ে।

আবর্জনার কথায় আবর্জনা সংগ্রাহক গাড়ি আর তার ড্রাইভারের কথা অনেক হলো। তাহলে একটু ড্রাইভিং-এর কথা হোক। ইউনাইটেড স্টেটসের বড়ো শহর ছাড়া কোথাও খুব সুবিধেজনক পাব্লিক ট্র্যানজিট নেই। পাব্লিক ট্র্যানজিট মানে পাবলিক ট্র্যান্সপোর্ট হলো বাস, মেট্রো, লোকাল ট্রেন, ট্র্যাম এসব দিয়ে তাড়াতাড়ি যখন তখন শহরের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াতের ব্যবস্থা। বিশেষত গ্রামে আর মফস্বলে বাস প্রায় নেই বললেই চলে। যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হলো নিজের গাড়ি।

সব্বাইকে নিয়ম মেনে গাড়ি চালাতে হয়। লেনের নিয়ম, লেন চেঞ্জের নিয়ম, সিগন্যালের নিয়ম, মোড় ঘোরার নিয়ম, গতিসীমার নিয়ম ইত্যাদি নানান নিয়ম মনে রেখে গাড়ি চালাতে হয়। এমনকি গাড়ি পার্ক করে রাখারও অনেক নিয়ম আছে। আবার নিয়ম লঙ্ঘন করলে জরিমানা দিতে হয়। তবে জরিমানা দিয়ে নিস্তার পাওয়ার উপায় সীমিত। বারবার জরিমানা হলেও আদালতের দেওয়া শাস্তি পেতে হয়। তাই পথের নিয়ম মানাটাই দস্তুর, নিয়ম ভাঙাটা নয়। গাড়িগুলো হর্নও বাজায় না চট করে। তাই অনেক গাড়ির ভিড়েও শব্দদূষণে গাড়ির হর্নের বিশেষ অবদান নেই।

পথচারীর চলার অধিকারকে মর্যাদা দেওয়া হয় সবচেয়ে বেশি। গাড়িকে সবসময়েই পথ ছেড়ে দিতে হয় পথচারীর জন্য, সাইকেল আরোহীকেও। সাইকেল আরোহীদের জন্য রাস্তায় আলাদা লেন করা থাকে। লেন না থাকলে সাইকেল চালাতে হয় সাইডওয়াক দিয়ে।

ড্রাইভিং-এর কথা বলতে বলতেই এসে পড়েছে রাস্তার কথা। রাস্তার কথা বলে শেষ করা যাবে না। শহরের মধ্যে সিগন্যাল দেওয়া রাস্তা একরকম। আবার শহরকে ঘিরে বা শহর চিড়ে চলে যাওয়া হাইওয়ের ধরন সম্পূর্ণ আরেকরকম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই জার্মানিতে তৈরি হয়েছিল অটোব্‌হান। সে রাস্তায় থাকত না সিগন্যালের বাধা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেনার সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন ডোয়াইট আইসেনহাওয়ার। ষাটের দশকে ইউনাইটেড স্টেট্‌সের রাষ্ট্রপতি হয়ে আইসেনহাওয়ার নির্মাণ শুরু করেছিলেন ইউনাইটেড স্টেট্‌সের হাইওয়ে সিস্টেমের। ক্যান্সাসের আবেলিনে আইসেনহাওয়ারের জন্মভিটার কাছে আই সেভেনটির একটা অংশকে চিহ্ণিত করা আছে হাইওয়ের প্রাচীনতম অংশ হিসেবে।

হাইওয়েগুলোর নানান রকমফের আছে। কয়েকটা হলো ইন্টারস্টেট হাইওয়ে। কয়েকটা ফেডেরাল হাইওয়ে। তা বাদে আছে স্টেট হাইওয়ে আর কাউন্টি রোড। ইন্টারস্টেট হাইওয়ের যেগুলো পুব থেকে পশ্চিমে গেছে সেগুলোকে সব জোড় সংখ্যা দিয়ে চিহ্ণিত করা হয়। সংখ্যা বাড়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরে। আবার উত্তর-দক্ষিণের ইন্টারস্টেট হাইওয়েগুলোকে চিহ্ণিত করা হয়েছে বিজোড় সংখ্যা দিয়ে। সেগুলো পশ্চিম থেকে পুবে ক্রমশ বাড়ে। তাছাড়া একটা শহরকে ঘিরে থাকা ইন্টারস্টেট হাইওয়ে যদি সম্পূর্ণ বৃত্ত হয় তো তবে তা তিন অঙ্কের সংখ্যা হয়, যার শতক স্থানে জোড় সংখ্যা থাকে। যদি বৃত্ত সম্পূর্ণ না হয় তবে তিন অঙ্কের সংখ্যার শতক স্থানে থাকে বিজোড় সংখ্যা।

কাজের কথা অনেক হল, আবার চাট্টি বাজে কথা বলি। ইউনাইটেড স্টেটস ফেরত বন্ধুর সাথে মস্করা করতে হলে কথা প্রায়ই বলি, “কী পাওয়া যায় আমেরিকায়, ঐ তো আদিদাসের ব্যাগ আর হাগেনদাসের আইসক্রিম! না পাওয়া যায় বোঁদে না বালুসাই।” এই সবটাই কিন্তু বন্ধুর সাথে নেহাৎ ঠাট্টা, ইউনাইটেড স্টেটস্‌ দেশটাকে অশ্রদ্ধা করে বলা নয়।

কিন্তু এই বাজে কথার মধ্যেই কেউ কেউ নিশ্চয় চিনে ফেলেছে অ্যাডিডাস ব্র্যান্ড আর Häagen-Dazs (এইজেন ড্যাস বা হাগেন ডাস) ব্র্যান্ড দুটোকে। এরকম সব ব্র্যান্ডেড জিনিসের জন্য মানুষজন বেশ উতলা এবং মুগ্ধ সে দেশে। কোনো আঠের বছর বয়সীর নজর এড়ায় না অশীতিপরের গায়ে লেপ্টে থাকা সানেল ঝোলাটি। তেমনই একটা কোচ ব্যাগ কাঁধে নিলে যেন গাম্ভীর্য বাড়ে মেয়েদের, সব বয়সী মেয়েদের। মজার কথা হলো এই যে যে কোচ কোম্পানির বিশেষ কাপড়ের ব্যাগের জন্য ইউনাইটেড স্টেট্‌সের নানান বয়সী মহিলাদের মনে এত কদর সেই কাপড় দিয়ে কেস্টোপুরের রিকশাওয়ালা রিকশার হুড বানিয়েছে! রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই কাপড় পেলেন কোথায়?” তিনি বললেন, “কারখানায়। কাপড়টা বড়ো ভালো না?”

তাছাড়া আজকাল সব্বাই মাইকেল কহ্‌রস্‌ ব্যাগের জন্য মরিয়া। কোচ আর মাইকেল কহ্‌রস্‌ ব্র্যান্ডের জুতোও বেশ প্রসিদ্ধ। তা বাদে রয়েছে গুচি, গেস, গ্যাপ। এগুলো জনসাধারণের ব্র্যান্ড, তা বাদে আছে হলিউডের রোডিও ড্রাইভ জুড়ে সারবদ্ধ ডিজাইনারদের আস্তানা। সেসব আস্তানায়  যেতে গেলে ডিজাইনারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে। সেখানে যেমন শাহরুখ খানের ব্যবহৃত দোলচে-গাবানা আছে, তেমনই আছে বারাক ওবামার ডিজাইনার বিজন-এর দোকান। সানেল, গুচি, গেস তো আছেই। আছে ডায়র। আবার ডায়রে ডিজাইনারের চাকরি ছেড়ে নিজের ব্র্যান্ড বানিয়েছিলেন যে সেন্ট আইভস্‌ তাঁর শোরুমও। সেন্ট আইভস্‌কে ফ্যাশন দুনিয়ার আভাঁ-গার্দ বলা হয়।

তার মানে কী ইউনাইটেড স্টেটসের পথে ঘাটে সব্বাই ব্র্যান্ডেড জিনিস ব্যবহার করে? হ্যাঁ বটে, না-ও বটে। কিছুতেই কিছু যায় আসে না। সেখানে ধোপদুরস্ত স্যুট পরা মানুষ আর দেওয়ালে লাগানোর রঙের ছোপ লাগা ওভার-অল পরা মানুষ এক টেবিলে মুখোমুখি বসে চা খেতে পারে। প্রেসিডেন্টও কোকাকোলা খায়, সাবওয়েতে রাত কাটানো পথবাসীও তাই। কলের জল এত শুদ্ধ যে সব্বাই খেতে পারে, সব্বাই খায়।

শুদ্ধ বলতে মনে পড়ল। পেন্সিলভ্যানিয়ার পিটস্‌বার্গ শহরটা দুটো নদীর মিলনস্থলের দ্বীপগুলো জুড়ে জুড়ে তৈরি হয়েছে। একটা নদীর নাম অ্যালেঘেনি, আরেকটার নাম মনোগাহেলা। অ্যালেঘেনি শুধু নদীর নাম নয়, পাহাড়ের নাম, জঙ্গলের নাম, এমনকি পিটস্‌বার্গ শহরটা যে কাউন্টিতে তারও নাম। সে যা হোক অ্যালেঘেনি আর মনোগাহেলা মিশে গিয়ে বয়ে গেছে ওহায়ো নদী হয়ে, যেটা আবার মিসিসিপি নদীতে মিশেছে। যেখানে ওহায়ো নদীর শুরু তার কাছেই এক পাহাড়ের মাথায় চড়া যায় ইনক্লাইন নামের রেলগাড়ি চেপে। ইনক্লাইন হলো পাহাড়ের ঢাল বরাবর পাতা রেললাইন। তার গা বেয়ে গুড়গুড় করে ওঠে আর নামে বাক্সের মতো গাড়ি, এক খাড়া ঢাল বেয়ে।

এই ইনক্লাইনটা এখন পেন্সিলভ্যানিয়ার পিটস্‌বার্গ শহরের পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণগুলোর একটা। কিন্তু এই রেললাইনটা আসলে ছিল পাহাড়ের কয়লা খনির আনাচ-কানাচ থেকে তুলে আনা কয়লার খন্ড আর তাল এক তলা থেকে আরেকতলায় বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য! কয়লাখনি বন্ধ হয়ে যেতে, পরিত্যক্ত খনির মাটির স্তুপে গাছ পোঁতা হয়েছে। এখন আর ইনক্লাইনের গ্রীষ্মকালের সবুজঘেরা ছবি দেখে কিছুতেই বোঝা যায় না যে অর্ধশতক আগেও জায়গাটা ভয়ানক বিশ্রী, খাবলানো খোঁদলওয়ালা পোড়ো কয়লাখনি ছিল।

চোখ জুড়োনো সবুজ দেখা যায় হাইওয়ের দুমুখো ট্রাফিকের বিভাজিকাতেও। প্রায় এক হাইওয়ে পরিমাণ এলাকা নিয়ে বিভাজিকাগুলো তৈরি করা হয় কোথাও কোথাও, যেমনটা লেখা থাকে আর্বান ফরেস্ট্রি ম্যানুয়ালে, ঠিক তেমনটিই অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় অ্যাভেনিউ প্ল্যান্টেশনের ব্যবস্থা! পেন্সিলভ্যানিয়ার উত্তর-পশ্চিমাংশে এই বিশাল বিভাজিকাগুলি ভর্তি গাছে। গ্রীষ্মকালে এগুলো দেখায় ঘনবনের মতো। শুধু এই বনগুলো নয়, পাড়ায় পাড়ায় যতটুকু বন থাকে, সেখানেই হোয়াইট টেল হরিণেরা দল বেধে বাস করে। গ্রীষ্মের সন্ধেবেলা প্যাটিওতে পা-ছড়িয়ে বসে থাকলেই দেখা যায় হরিণ বা হরিণ পরিবার খসখস করে ঘাস খাচ্ছে কয়েক হাত দূরে। আবার শীতকালে জঙ্গলে গাছের সব পাতা ঝরে যায়, ঘাস বরফে ঢেকে যায় বলে, হরিণেরা হানা দেয় পাড়ার সেই সব বাড়িতে যেগুলোর লন থেকে বরফ সাফ করে রাখা থাকে। ভারি মজা লাগে ক্রিসমাসের সময় এই দেখে যে আলো-আঁটা লোহার ফ্রেমের হরিণের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সত্যিকারের হোয়াইট টেইল!

ক্যান্সাস আর টেক্সাসে হরিণ ছাড়াও দেখা মেলে খরগোশের। কাঠবেড়ালিরা বেশ বড়োসড়ো মাপের হয়। তারা মুখের সামনে দু’পা জড়ো করে নমস্কার করার ভঙ্গিতে কুপকুপ করে খেতে থাকে। সে ইউনাইটেড স্টেট্‌সের প্রেসিডেন্টের আপিস আর বাড়ি হোয়াইট হাউস হলেও তাই, আবার ইস্কুলের উঠোন হলেও তাই। এক দুপুরে দেখি, একটা কুপারস্‌ হক সোঁ করে মাটিতে নেমে এসে উড়ে গেল ছাদের ওপর। নখে তার গাঁথা একটা কাঠবেড়ালি। হয়ত আরও দু-চারটে কাঠবেড়ালির সাথে নখে আঁটা কাঠবেড়ালিও, একটু আগেও, ঐ মেপল গাছের নিচে মেপলের বীজ খাচ্ছিল কুপকুপিয়ে…

  বিশ্বের জানালা সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s