বিশ্বের জানালা আঙ্কল স্যাম সংহিতা শীত ২০১৭

আঙ্কল স্যাম(১)  আঙ্কল স্যাম (২) , আঙ্কল স্যাম(৩), আঙ্কল স্যাম(৪)

সংহিতা

শুধু সবুজ বা গাছ নয়। প্রকৃতি এখানে জেগে থাকে নানান অভাবনীয় চেহারায়। যেমন লা ব্রি পিট বা আলকাতরার পুকুর। এটার কথা প্রথম জেনেছিলাম সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যালের লেখা পড়ে। তারপর ভূতত্ত্ব পড়ার সময়, ফসিলের বিতর্ক পড়ার সময়। এলাকাটা লস এঞ্জেলস কাউন্টি মিউজিয়াম অফ আর্টের ঠিক পাশেই লস এঞ্জেলস শহরের প্রাণকেন্দ্রে, মিরাকল মাইলস এলাকাতে। এখনও সেখানে গেলেই পোড়া পিচ আর আলকাতরার গন্ধে ম-ম করে।

পিটের অধিকাংশটাই ফসিল সংগ্রহের কাজের জন্য আর সংরক্ষণের জন্য সাধারণের নজরের আড়ালে রাখা হয়েছে। তবে সাধারণের নজরেও রাখা হয়েছে একফালি পিট। সেখানে গেলেই দেখা যায় ফুটবলের মাপের বুদবুদ বানিয়ে, ভুড়ুক ভুড়ুক শব্দ করে আলকাতরা ফুটে বের হচ্ছে। পুরো পুকুরে যেন তেলে-জলে মিশে আছে। পিটের পাশের পায়ে চলা রাস্তা ফুঁড়েও কোথাও কোথাও বেরিয়ে এসেছে আলকাতারা। সেই রাস্তার পাশে লোহার বেড়া, লোহার বেড়ার অন্যপারে শহরের গাড়িচলা রাস্তা। তবে গাড়িচলা রাস্তা আর লোহার বেড়ার মধ্যে রয়েছে সাইড-ওয়াক বা ফুটপাথ। সেই ফুটপাথও যেখানে সেখানে ফেটে গিয়ে বেরিয়েছে ব্রি।

লা ব্রি পিট ফসিলের খনি। পিটে জল খেতে আসা জন্তু পাড় বেয়ে পিটে নামলেই তার পা এঁটে যেত আলকাতরায়, তারপর নিজের শরীরের ভারে ক্রমে সেই জন্তু তলিয়ে যেত পিটে। তাই পিটে হাতি, শেয়াল, চিল এমনকি আধুনিক মানুষেরও অবশেষ পাওয়া গেছে। এই মানুষের অবশেষ কিন্তু জীবাশ্ম বা ফসিল নয়। কারণ, এই অবশেষ আধুনিক মানুষের, যার বয়স দশ হাজার বছরের কম। জীবাশ্ম হতে হলে মাটির নিচে পাথরের স্তরে চাপা পড়া জীবাবশেষের বয়স কম করে দশ হাজার বছর হতে হয়। অর্থাৎ, মাটির নিচে পাথরের স্তরে চাপা পড়া যে জীবাবশেষ আধুনিক মানুষের উৎপত্তির থেকে প্রাচীনতর তাকে জীবাশ্ম বলা যায়। আধুনিক মানুষের উৎপত্তি হয়েছিল এখন থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে কিনা।

পিটে আটকে পড়ে ক্রমে পিটের নিচে তলিয়ে যাওয়া জন্তুদের শরীর এবং শরীরের অংশ সংরক্ষিত হয়েছে আলকাতরায়। পিটের এইসব জীবাশ্ম থেকেই জানা গেছে সেবার টুথ টাইগারের কথা। সেবার টুথ টাইগারের ক্যানাইন হত সেবার অর্থাৎ বাঁকা তলোয়ারের মতো। মাংসাশী এই প্রাণীর বাস ছিল এই পিট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ। পিটে আটকে পড়া মাংসল হাতি আর অন্যান্য জন্তুর মাংসের লোভে এরা পিটে ঝাঁপ মেরে পড়ত জন্তুর ঘাড়ে। আর ডুবন্ত জন্তুর মাংস খেতে মশগুল হয়ে খেয়াল করত না যে মাংসল জন্তু তলিয়ে যাচ্ছে। টের পেতে পেতে এত দেরি হয়ে যেত যে তখন আর ঝাঁপ দিয়ে পাড়ে ফেরার উপায় থাকত না। কিন্তু সে জন্য মরিয়া চেষ্টা করে যে লম্ফঝম্প জুড়ত তাতে আরও তাড়াতাড়ি ডুবে যেত পিটে! সেবার টুথ টাইগার বিলুপ্ত প্রাণী। কিন্তু তার কথা জানা গেছে পিটের অন্দরে তার জীবাশ্ম রয়ে গেছে বলে।

তাছাড়াও আগ্নেয় পর্বতের ছড়াছড়ি দেখা যায় নিউ মেক্সিকোতে। ফ্রি ওয়ের দু’পাশে বসে থাকা শঙ্কু আকৃতির পাহাড়গুলো আসলে যে মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ তা আর বলে দিতে হয় না। আগ্নেয়গিরির উদ্‌গিরণের সময়ে প্রচুর ছাই আর নানান মাপের পাথরের টুকরো বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে। তারপর বহু সহস্র বছর ধরে জমাট বেঁধে পাহাড় তৈরি করে। তার মধ্যে ফাটল থাকলে জল ঢোকে। না হলে তার দানাগুলোর ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে ঢোকে জল। সেই জল পাহাড়ের দানার ছোটোবড়ো ফাঁকফোকর দিয়ে গড়িয়ে যায় উঁচুর থেকে নিচের দিকে। তাতে কিছু ছাই ও পাথর গুলে যায়, খয়ে যায়, পাথরের গায়ে তৈরি হয় কন্দর। সেই সবই দেখা যায় নিউ মেক্সিকোর এখানে সেখানে।

আবার ডেথ ভ্যালিতে বড়ো বড়ো পাথর রাতারাতি হড়কে আসে শতেক মাইল। মাটি জমে রয়ে যায় তার আসার পথের দাগ। কোথাও হ্রদ জমে পুরোটাই নুনের সমতল হয়ে গেছে, কোথাও মাটির গভীর থেকে মাঝে মাঝেই উগরে উঠছে গরম জল। কোথাও আদিগন্ত ঘাসবনে চরে বেড়ায় বাফেলো বা তাতাঙ্কা।

তাতাঙ্কা শব্দটা নেটিভ ইন্ডিয়ান শব্দ। নেটিভ ইন্ডিয়ানরা আজও ইউনাইটেড স্টেটসের সর্বত্র রয়েছেন। কিন্তু নেটিভ ইন্ডিয়ান রিজার্ভের ভেতরেও তাঁদেরকে আজকের গড়পড়তা যেকোনও মানুষের থেকে কিছুমাত্র আলাদা লাগে না। অর্থাৎ, তাঁরাও সমকালের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছেন। তাঁরা সাবেক পোশাক পরেন না। সাবেকি ঢঙে সাজেনও না। বাস করেন না উইগ্বাম কিংবা টিপিতে। তবে নিউ মেক্সিকোতে এখনও বসবাস চলে অ্যাডোবি হাউসে। টিপি যেমন পুরো শঙ্কু আকৃতির তাঁবু, উইগ্বাম তেমন নয়। উইগ্বাম হলো বার্চ গাছের বাকলে বানানো আবাস যার ছাদ সাধারণত গম্বুজের মতো। অ্যাডোবি হাউস বা পুয়েবলো বানাতে লাগে খড় দিয়ে মাখা কাদাকে ঝলসে বানানো ইট। কিন্তু নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে উৎসব অনুষ্ঠানে নেটিভ ইন্ডিয়ানরা এখনও সাবেকি সাজে সাজেন, সাবেকি গান করেন, বাজনা বাজান এবং পোশাক পরেন। ক্যালিফোর্নিয়াতে হলিউডের খুব কাছেই আরউইনডেল নামের এক ছোট্টো শহরের পাবলিক লাইব্রেরিতে একবার নেটিভ ইন্ডিয়ান নাচ দেখার আর নেটিভ ইন্ডিয়ানদের মুখে তাঁদের সংস্কৃতির কথা শোনার সুযোগ হয়েছিল। গোটা অনুষ্ঠানটার ১৫টা ভিডিও খণ্ডের লিংক দেয়া রইল এই লিংকে—

এঁদের নাচ দেখে বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল ইম্ফলে প্রজাতন্ত্র দিবসে দেখা নাগা ডান্সের কথা। হয়তো সাজপোশাকের সাযুজ্যের জন্য। আবার কোনও কোনও নাচ মনে করিয়ে দিচ্ছিল অরুণাচলের টাইগার ডান্স।

ইউনাইটেড স্টেটসের রাস্তা আর ড্রাইভিংয়ের নিয়মকানুনের কথা বলেছি আগে। এখন মনে পড়ল পশুর ক্যারাভ্যানের কথা। মানে পশুতে টানা গাড়ির ক্যারাভ্যান নয়। পশুকে দূরদূরান্তে নিয়ে যাওয়া গাড়ির ক্যারাভ্যান। ঘোড়া বওয়ার গাড়ি একরকম হয়। আবার গরু বওয়ার গাড়ি হয় আরেকরকম। ঘোড়াকে কেন নিয়ে যাওয়া হয় গাড়ি চাপিয়ে এখনও জানি না। তবে গরুকে গাড়ি চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া খাওয়ানোর জন্য। এক চারণভূমি থেকে আরেক চারণভূমিতে। আবার বরফ পড়ার সময়ে চারণভূমি থেকে নিয়ে যাওয়া ঢাকা গোয়ালে।

এখনও মিডওয়েস্টে ক্যাটল শো ভীষণ জনপ্রিয়। ডালাসের উপকন্ঠে নিয়মিত প্রদর্শনী চলে গরু, ঘোড়া, শূকর ইত্যাদি গবাদি পশুকে দড়ির ফাঁসে মানে ল্যাসো দিয়ে ধরার খেলার। এসবের আবার ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ হয়।

গরু-ঘোড়া এসব প্রসঙ্গে মনে পড়ল ‘বাগি’র কথা। আমিস দুনিয়ায় ঘোড়ায় টানাকে গাড়িকে বাগি বলে যেমন, তেমনই ইউনাইটেড স্টেটসের দক্ষিণতম প্রান্তের রাজ্যগুলোর অন্যতম জর্জিয়ায় শপিং কার্টকে বাগি বলা হয়! ইউনাইটেড স্টেটসের অন্যত্র যেকোনও দোকানে খদ্দেররা মালপত্র বওয়ার জন্য যে ঠেলাগাড়ি ব্যবহার করেন সেগুলো সাধারণত শপিং কার্ট বলেই ডাকা হয়। আবার যেকোনও হাতে ঠেলা মাল বওয়া গাড়িকে কার্ট বা ডলি বলা হয়। ইনক্লাইন নামে আরেকধরনের যানের কথা বলেছি আগে পিটসবার্গের কয়লাখনি প্রসঙ্গে। সেই প্রসঙ্গে মনে পড়ল যে ঐ কয়লাখনিতে ছিল শিশুশ্রমিক নিয়োগের রমরমা। চিত্র সাংবাদিক লিউইস হাইন-এর লাগাতার প্রতিবেদনে আর ব্যক্তিগত প্রয়াসে ১৯১০ সালে আইন তৈরি হয় খনির মতো বিপজ্জনক ক্ষেত্রে শিশুশ্রমিক নিয়োগের চল বন্ধ করার জন্য। তবে যেকোনও চা-দোকানে বা খাবারের দোকানে এখনও চোদ্দ বছর বয়সের বেশি বয়সী ছেলেমেয়েরা মা-বাবার অনুমতি থাকলে কাজ করতে পারে। অনেকে এভাবে উপার্জন করে নেয় কলেজে পড়ার খরচ।

টর্টিলার ব্যাপারে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম যে টর্টিলা আটা আর ময়দা দিয়েও বানানো হয়। আর দেখছি যে মাইকেল কহরস ব্যাগ এখন দেশেও পাওয়া যায়। কলকাতার কোয়েস্ট মলেই একটা আউটলেট আছে আসল মাইকেল কহরস ব্যাগের। আর নকলগুলো পাওয়া যাবে নিউ মার্কেটের সামনের রাস্তা জুড়ে সাজানো ব্যাগের পসরায়।

দেশে এখন অনেক জিনিস এবং পরিষেবা ব্যবহার করলে স্বচ্ছ ভারত কর দিতে হয়। চতুর্দিকে হৈ হৈ করে চলে পায়খানা ব্যবহারের নানারকম বিজ্ঞাপন। কিন্তু এই ব্যপারেও ইউনাইটেড স্টেটস এমন একটা ব্যবস্থা বানিয়েছে যে মাঠে-ময়দানে প্রাকৃতিক কৃত্য সারার প্রয়োজন হয় না। দূরদূরান্তের শহর আর কসবাকে জোড়ে যে হাইওয়েগুলো সেখানে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর আছে পাব্লিক রেস্ট এরিয়া। সেখানে গাড়ির থেকে নেমে যেমন আড়মোড়া ভাঙা যায় তেমনই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বাথরুম ব্যবহার করা যায়, ফ্রিতে। না হলে যেকোনও কসবায় গ্যাস স্টেশনের বাথরুম ব্যবহার করা যায়। তবে গ্যাস স্টেশনে বাথরুম ব্যবহার করলে কিছু কেনাটা ভদ্রতা রক্ষার উপায়। মানে যে গ্যাস স্টেশনের বাথরুম ব্যবহার করা হয়, সেখান থেকে গাড়িতে গ্যাসোলিন না ভরলেও চলে, কিন্তু কফি বা চকোলেট কিনে সৌজন্য রাখাটা চল।

মুদির দোকান বা শপিং মলে কমোডের সিটে বিছোনোর জন্য কাগজ দেওয়া থাকে উপযুক্ত কাটিংয়ে। বাথরুম ব্যবহারের পর জল দেওয়াটা অধিকাংশ জায়গাতেই স্বয়ংক্রিয়। মানে নানান সংস্কৃতির মানুষের বাথরুমের ব্যবহারের রীতির ওপর ভরসা না রেখে ব্যবস্থাটা স্বয়ংক্রিয় করে নেওয়া হয়েছে। শিকাগো ওহায়ার এয়ারপোর্টে কমোড সিটের কভার বদলানোর কাজটাও স্বয়ংক্রিয়। হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জল সাবান আর হাত মোছার পেপার টাওয়েলের সাথে অধিকাংশ পাবলিক টয়লেটেই দেখা মেলে হাত শুকানোর যন্ত্রের। কেবলমাত্র নায়াগ্রাতেই ভারতীয় মানুষের দ্বারা চালিত কনভেনিয়েন্স স্টোরে দেখেছি যে বাথরুম যে শুধু খদ্দেরদের ব্যবহারের জন্য তা স্পষ্ট করে লেখা আছে। ভারতীয় মানুষ বলতে ভারত উপমহাদেশে বসবাস যে মনুষ্যগোষ্ঠীর সেই গোষ্ঠীয় বা বংশীয় মানুষ বোঝাতে চেয়েছি।

 বিশ্বের জানালা       সব পর্ব একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s