বিশ্বের জানালা আঙ্কল স্যাম সংহিতা বসন্ত ২০১৭

                                                                                                                           আগের পর্ব  আঙ্কল স্যাম(১)

bishwerjanala02-medium

আবার স্বকীয়তা রেখে, বাকি সকলের থেকে দারুন আলাদা ইউনাইটেড স্টেটস্‌-এর আমিস জনগোষ্ঠী। এঁরা জার্মান। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে ইউরোপ থেকে এসেছিলেন আমেরিকায় কিন্তু শিল্পসমৃদ্ধ যান্ত্রিক আমেরিকার জীবনযাপণ এঁরা গ্রহণ করেন নি। ছোটো ছোটো শহর বা কসবায় এঁদের বাস। তবে পেন্সিলভ্যানিয়ার ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টিতে আর ওহায়োর হোমস্‌ কাউন্টিতে এঁদের বাস কাউন্টি জুড়ে। সেখানে তাঁরা বিশাল বিশাল খামারে চাষ করেন, পশুপালন করেন, হাতে করে আসবাব বানান।

হোমস কাউন্টিতে আমিসদের একটা ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার আছে। সেখানে তাঁরা খুব যত্ন করে জানান যে “আমিস ওয়ে অফ লাইফ” মানে ঠিক কী। আমাদের দেখে সেখানকার গাইড জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমরা তো ভারত থেকে আসছ?” আমরা “হ্যাঁ” বলতেই বলেছিলেন, “তোমাদের সাথে আমাদের অনেক মিল। আমরাও আমাদের বাড়ির বৃদ্ধ মানুষদের সাথে একসাথে বাস করি। একেক বাড়িতে বয়স্ক বাবা-মা, তাঁদের ছেলে-পুত্রবধূ আর নাতি-নাতনির সাথে বাস করেন।” কিন্তু পরে একটা তথ্যচিত্রতে দেখলাম যে এক যুবক ও যুবতী একে অপরকে বিয়ে করবে বলে মনস্থ করলে সমাজের বয়জ্যেষ্ঠদের সমষ্টির কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। অনুমতির সঙ্গে নববিবাহিতদের দেওয়া হয় খামার করার জায়গা। তারপর বিয়ে হয়ে গেলে নবদম্পতির বার্নহাউস বা শস্যগোলা বানিয়ে দেন গোষ্ঠীর সমস্ত পুরুষ মিলে। এক বেলায় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের মধ্যে কাজটা সারতে হয় তো, তাই অনেক লোক মিলে হাত লাগান বোধ হয়। আর

অতজন কাজ করবেন মানে তাঁদের সকালের জলখাবার , দুপুরের খাবার এবং সন্ধের খাবারের আয়োজন রাখতে হয়। আয়োজনের দায়ভার বহন করেন নব দম্পতি, খাবার রান্না করার আর পরিবেশন করার কাজে লাগেন গোষ্ঠীর মহিলারা। মানে পুরুষেরা যখন নবদম্পতির বার্ন তৈরির কাজে ব্যস্ত, তখন তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করেন তাঁদের মা, স্ত্রী, কন্যারা।

এসব কাজ গ্রীষ্মকালেই হয়। কারণ গ্রীষ্মের দিনে আলো ফোটে পাঁচটার আগে। আর সূর্য ডোবে প্রায় রাত নটার সময়ে। সন্ধে সাতটা থেকে এক অতি দীর্ঘ গোধূলি থাকে। ফলে দিনের আলো ব্যবহার করে বাইরের যাবতীয় কাজ সেরে ফেলতে চান ইউনাইটেড স্টেটসের সক্কলে, আমিসরা তো বটেই, নির-আমিসরাও। মানে যাঁরা আমিসদের মতো মূলতঃ কৃষি ও বনজ কাঠের কাজের মতো কাজ করেন না, তাঁরাও দিনের কাজ উপার্জনের কাজ শুরু করে দেন সকাল সাতটার মধ্যে। সে কাজটা রাস্তা সারাইয়ের মতো, নর্দমা তৈরি করার মতো বাইরের কাজ না হলেও, আপিসে বসে খাতাতে, কম্পিউটটারে হিসেব কষার কাজ হলেও। তার মানে বাইরের কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয় ভোররাত থেকে।

আবার দিনের বেলা বাইরের কাজ মিটিয়ে ফেলতে চাওয়ার মধ্যে আমিসদের একটা বিশেষ কারণ আছে। সেটা হলো এঁরা ইলেকট্রিসিটি ব্যবহার করেন না। মোমবাতি বা কেরোসিন ল্যাম্প ব্যবহার করেন। সেলফোন তো দূর, টেলিফোনও ব্যবহার করেন না। ফলে হোমস কাউন্টির গভীরে ইলেকট্রিক কিংবা টেলিফোনের খুঁটি নেই কোনো। চাষ করেন ঘোড়ায় টানা লাঙল দিয়ে। কাপড় কেচে দড়িতে ঝুলিয়ে শোকান। নালা, নদী, ঝোরা পেরোনোর সেতুগুলো কাঠের। যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করেন ঘোড়ার গাড়ি, সেগুলোকে ডাকা হয় বাগি বলে। তবে বার্নের সামনে পার্ক করে রাখা অটোমোবাইল দেখেছি। দেখেছি রিস্টওয়াচ পরা আমিস মহিলাও।

আমিস নারী-পুরুষের জামা-প্যান্ট তৈরি করা হয় নীল রঙের কাপড় থেকে। সারা কাউন্টির সব্বাই নীল জামা পরেন কাউন্টিতে। বয়স্ক পুরুষেরা লম্বা দাড়ি রাখেন। টুপি পরেন কালো। পরেন কালো প্যান্ট আর কোট। আর সাদা শার্ট। প্যান্ট নীল হোক বা কালো তাতে সাসপেন্ডর থাকে। বয়স্ক মেয়েরা খোঁপা করে মাথার চুল বেধে রাখেন, মাথা ঢেকে রাখেন কাপড়ে, কাপড়টা দড়ি দিয়ে বাধা থাকে থুতনির নিচে। মাথার কাপড়ের এই ব্যবস্থাকে বলে বেবুস্কা। চোদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত আমিস ছেলেমেয়েরা চার্চের ইস্কুলে যায়। সেখানে তাঁরা খ্রিষ্ট ধর্ম এবং আমিস কায়দা কানুন সম্পর্কে শিক্ষা পায়। তারপর ষোলো বছর বয়স অবধি চলে খামারের কাজের আর হাতের হাজের শিক্ষানবিশী বাড়ির বয়স্কদের কাছে। ষোলো বছর বয়স হলে আমিস ছেলেমেয়েদের এক বছরের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয় আমিস সমাজের বাইরের পৃথিবী দেখার জন্য, জানার জন্য, বোঝার জন্য।

এই সময়ে তাদের বাইরের পৃথিবীর মতো অটোমোবাইল চালানোর, খাবার খাওয়ার, সিনেমা, টিভি দেখার সুযোগ হয়। এইভাবে আমিস জগতের বাইরের জগতে যাওয়ার পর্বকে বলে “রামস্প্রিঙা’ মানে রানিং অ্যারাউন্ড বা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করা। খুব কম সংখ্যক আমিস ছেলেমেয়েরা ফিরতে নারাজ থাকে আমিস জীবনে। অধিকাংশই ফিরে আসে নিজের পরিবারের কাছে। তারপর তাদের আমিস চার্চে দীক্ষিত করা হয়।

আমিস সমাজে খ্রিষ্টধর্ম বেশ আদ্যিকালের মত মেনে চলে। আমিসরা যুদ্ধ করেন না। নেন না রাজানুগ্রহ। তাঁরা শুধু বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত পরিশ্রম করে, বাকি সময় ঈশ্বরচিন্তায়, পড়শীর কল্যাণে কাটানোর মত মানেন আর পালন করেন। প্রায় চারশো বছর আগে স্যুইস প্রশাসকদের বিষনজরে পড়ে আমিসরা ক্রমশ দুর্গম থেকে দুর্গমতর এলাকায় সরে যেতে থাকেন, উত্তরে জার্মানীতে আর পশ্চিমে ফ্রান্সে। তারপর ক্রমে তাঁরা পৌঁছে যান অ্যামস্টারডামের আশেপাশে, হল্যান্ডে। প্রায় দেড়শ বছর ধরে চলে এই পরিযান। বলাবাহুল্য আরও পশ্চিমে যাওয়ার প্রয়োজনে তাঁরা আটলান্টিক পেরিয়ে হাজির হয়েছিলেন আমেরিকা মহাদেশে। এখন থেকে আড়াইশো বছর আগে ইউরোপ জুড়ে নানান ধর্মীয় গোষ্ঠীর হত্যাকাণ্ড শুরু হতেই আমিসরা ইউরোপ ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান, তাঁদের ধর্মানুশাসনের কারণেই। তাঁরা কখনও অস্ত্র ধরেন না। ফলে যুদ্ধে কিংবা বাছাই করা ধর্মীয় গোষ্ঠীর হত্যাকাণ্ড চললে, প্রাণ বাঁচাতে তাঁদের দেশত্যাগী হওয়া ছাড়া আর অন্য কোনও উপায় থাকে না। তাঁদের ভাষা আজও জার্মান। ঘরোয়া আমিস জীবন আর আমিস মানুষের ধর্মানুবর্তীতা খুব সহজ সরল ও মনোগ্রাহী করে দেখানো হয়েছে হ্যারিসন ফোর্ড অভিনীত ১৯৮৫ সালের উইটনেস ছবিতে। যদিও এটা বড়োদের ছবি, কিন্তু এই ছবির মুখ্য চরিত্রে আছে একজন শিশু। তাই বাবা-মায়ের সাথে বসে এই ছবিটা দেখে আমিস জীবন কেমন তা জানার চেষ্টা করা যেতে পারে।

ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টারের গাইড খুব সুন্দর বুঝিয়েছিলেন, “পেন্সিলভ্যানিয়াতে যে আমিসরা প্রথম এসে পৌঁছেছিলেন তাঁদের জার্মান উচ্চারণের জন্য তাদের পেন্সিল্ভ্যানিয়া ডাচ বলে ডাকা হত। তার থেকে অনেকে মনে করেন যে আমিস নামটা বোধ হয় অ্যামস্টারডাম থেকে এসেছে। কিন্তু তা নয়। আমিস চার্চের আদি ধর্মপ্রচারক জেকব আম্মানের নাম থেকে এসেছে আমিস গোষ্ঠির নাম।” আমিসদের প্রসঙ্গে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে মেনোনাইটস্‌দের কথা। মেনোনাইটস্‌দের ধর্মভাবনা আমিসদের মতো হলেও তাদের জীবনযাপন খানিক আলাদা। যদিও ভৌগোলিকভাবে এই দুই গোষ্ঠী প্রায় একত্রে বাস করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন ইউনাইটেড স্টেটস সরকার ঘরে ঘরে চিঠি পাঠিয়ে ডেকে নিয়ে যেতেন নবীন পুরুষদের যোদ্ধা হওয়ার জন্য, মাতৃভূমির সেবা করার জন্য, তখনও আমিসরা কেউ রাজি হন নি যুদ্ধে যোগ দিতে। কেবলমাত্র একজন মেনোনাইট যুবক সমগ্র গোষ্ঠীর হয়ে এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে গিয়েছিলেন ধর্মপ্রচারক হয়ে। তার মানে কী আমিসরা দেশদ্রোহী? দেশের আইন মানেন না? এই বিতর্কে আমিসরা বলেন, “আমার ধর্ম আমাকে শান্তির পথ নিতে নির্দেশ দিয়েছে। যুদ্ধ করলে আমি ধর্মচ্যুত হব। রাষ্ট্র থেকে আমি কোনো দান গ্রহণ করি না। যেমন বৃদ্ধ হলে কিংবা অন্য সময়ে খেটে খাওয়ার মতো গায়ের জোর না থাকলে সরকারী কোনো সাহায্য আমি গ্রহণ

করি না। আমার পরিবার, পরিজন, প্রতিবেশীদের আনুকুল্যেই আমার চলে যায়। তাহলে আমি সরকারী নির্দেশে অধর্ম করব কেন?” আবার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টারের গাইড বলেছিলেন, “তবে যদি পুলিশ এসে আমাদের কাউকে ধরে তাতে তো আমরা বাধা দিই না। কোর্টের সাবপিনাতে সাড়া দিয়ে বিচারকের দরবারেও হাজির হই। রাষ্ট্রের আইনের সাথে সহায়তা করি সবসময়। তবে আমরা যেহেতু কোনো নেশা করি না, কোথাও কারুর সাথে মারপিট করি না আমাদের দরজাতে কখনও পুলিশ হাজির হয় না। আসে না আদালতের সমনও।”

হোমস কাউন্টির মিল্‌সবার্গ এলাকাকে লিটল স্যুইজারল্যান্ড বলা হয়। জায়গাটা ছবির মতো সুন্দর দেখতে। আমি দেখেছি গ্রীষ্মে। পাহাড়ের সবুজ ঢেউয়ের মধ্যে সাদা কাঠের বাড়ি আর তার রঙীন ছাদ। ঝিল আর তার ওপরের কাঠের রঙীন পুল। শীতে বরফের মধ্যে জায়গাটাকে স্যুইজারল্যান্ডের মতোই লাগে নাকি। আসলে এখন এখানে যাঁরা বাস করেন তাঁদের পূর্বপুরুষের আদিবাস তো স্যুইজারল্যান্ডেই। তাই আদিভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা মনে পড়লে আমেরিকার আমিস গোষ্ঠীর আদি অভিবাসীরাও আবেগাচ্ছন্ন হয়ে পড়তেন। তাঁদের আদিপুরুষ আদিভূমি থেকে বাস উঠিয়ে প্রাণের তাগিদে বেছে নিয়েছিলেন ইউরোপের দূর্গম থেকে দুর্গমতর এলাকা। তারপর প্রাণের তাগিদে আমেরিকা পৌঁছে তাঁরা নিজেদের বাসভূমিকেই সাজিয়ে তুলেছেন আদিভূমির মতো, পূর্বপুরুষের থেকে বংশানুক্রমে লালন করে রাখা আদিভূমির স্মৃতিকে উজিয়ে রেখে মিল্‌সবার্গকেই করে তুলেছেন স্যুইজারল্যান্ড।

আমিস এলাকা ছাড়াও ইউনাইটেড স্টেটস্‌-এর অন্যান্য শহর আর গ্রামও খুব ঝকঝকে পরিষ্কার। তার কারণ বোধ হয় পশ্চিমের দেশগুলির ময়লা জড়ো করা আর তা ফেলে দেওয়ার জন্য সচেতনতা। দেশগুলোর সচেতনতা মানে সেই দেশের মানুষগুলোর সচেতনতা। সেই সচেতনতা দিয়ে তাঁরা গড়ে তুলেছেন একটা ব্যবস্থা যা তাঁদের ঘর, উঠোন, পাড়া, মহল্লা, বাজার, শহর, গ্রাম সব পরিপাটি পরিচ্ছন্ন রাখতে পারে। ব্যবস্থা মানে কী? মানে কিছু নিয়ম, যা সব বাসিন্দাকেই মানতে হবে, না মানলে প্রথমে জরিমানা পরে শাস্তি পেতে হবে। যেমন সিঙ্গাপুরে চ্যুইং গাম খাওয়া নিষেধ। এটা যদিও পুবের দেশ, তবুও। যেমন লন্ডনের দেওয়ালে স্প্রে পেইন্ট দিয়ে গ্রাফিত্তি করা নিষেধ। কিন্তু ব্যবস্থা মানে কয়েকটা কাজ যা করলে জীবন নোংরা হয় তা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করাই শুধু নয়, কিছু কাজ যা করলে জীবন পরিচ্ছন্ন হয় তা করতে নাগরিকদের বাধ্য করা।

ক্রমশ

  বিশ্বের জানালা সব পর্ব

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s