বিশ্বের জানালা ইজরায়েলের ডায়েরি পঞ্চম পর্ব অভীক দত্ত শীত ২০১৮

আগের পর্বগুলো  ইজরায়েল-১, ইজরায়েল-২ইজরায়েল-৩, ইজরায়েল-৪

Untitled3

অভীক দত্ত

পঞ্চম পর্ব

আক্কোর ওল্ড সিটি এক্কেবারে চিড়িয়াখানা বিশেষ। চোখকান খোলা রাখলে হরেক কিসিমের বান্দা মিলে যায় সেখানে। পুরোনো বাজার শহরের একদম মধ্যিখানে-আর তারই চারপাশ ঘিরে যা কিছু দেখার সব। একদিকে নাইট টেম্পলার্স গার্ডেন। বারো শতকের ক্রুসেডারদের তৈরি সেই বাগিচায় ঢুকতে না ঢুকতেই পাকড়াও করলো ফ্রাঁসোয়া। উস্কোখুস্কো চুল , গায়ে চড়ানো ছেঁড়াখোঁড়া এক সুতলীর জামা আর গালের খোঁচা খোঁচা সোনালী দাড়ি তে দেখে তাকে পাগলই মনে হয়। কোত্থেকে আসছি জানতে চায়। ইন্ডিয়া বলায় বিশেষ কিছু বুঝলো না।  অদ্ভুত টানে ভাঙা ভাঙা ইংরেজী বলে।  বেশী খোঁচাতে হলোনা, গড়গড় করে দেখি নিজের কথা বলতে শুরু করে দিল। ফরাসীদেশের ভিউল্স নদীর ধারে ভিউল্স লে রোজেস গাঁয়ে তার বাড়ি। সামান্য জমিজমা বাবা আর সে মিলে চাষ করতো। বাবা ফৌত হলে ধারবাকি দেখিয়ে জমিদার অর্ধেক জমি দখল করে নিল। তার উপর মড়ক আর দুর্ভিক্ষ। পেট যখন আর চলে না, ভাইকে লাগিয়ে দিল এক পুরুতের ফাইফরমাশ খাটতে, আর মাকে ধরাধরি করে ঢুকিয়ে দিল পাশের গাঁয়ের মঠে। তারপর বাকি জমি জমা বেচে এক ন্যাংলা ঘোড়া আর মরচে ধরা এক তলোয়ার কিনে সে গেল ফৌজে নাম লেখাতে।  ফৌজের সাথেই শেষ পর্যন্ত এই হোলি ল্যান্ড। তের্র সাঁৎ।  হিদেনদের জায়গায় গর্মিতে একেই প্রাণ ওষ্ঠাগত, তারপর নিত্য স্যারাসেনদের উপদ্রব। লম্বা প্রাকার দেখিয়ে ফ্রাঁসোয়া  বলে-দেখো হে, এই পুরো দেওয়াল দুই লিউ কম্মুন লম্বায় । এই পুরো পাঁচিলে টহল দিতে হয় সেন্ট্রিদের। হিসেব করে দেখলুম পাঁচিল লম্বায় কমসেকম আট মাইল তো হবেই। অবিশ্যি হিদেনদের সবই যে খারাপ ফ্রাঁসোয়ার এমন মত নয়, চোখ কুঁচকে বলল – রাতে বাজারের দিকে এসো।  রাবেয়ার নাচ হয়।  স্যারাসেন হলে কি হবে-খাস মাল, আর গান গায় কি মিষ্টি। বলতে বলতে দেখি তার চোখের নীল তারায় কিসের ছায়া। ভাঙা গলায় তারপর বললো- অদ্ভূত সেই জ্বরটা না হলে হয়ত রাবেয়াকেই বিয়ে করতাম। ওকে নিয়ে যেতাম গ্রামে। নতুন বৌদের ভিউল্সের জলে পা ধোয়ানো হয়-গ্রামের সবাই আসে-বলতে বলতে আমার দিকে তাকিয়ে বলে চললে?  আমি ততক্ষনে মূল সিটাডেল ছেড়ে পিছনের গেটের দিকে হাঁটা দিয়েছি।

পিছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে খানিক দূরে বাঁহাতি এক পরিখা। তার উপর ছোট এক ব্রিজ। আক্কো প্রিজন। টিকিট কেটে ঢুকেই সান্ত্রীদের ঘর। জানালার পাশ থেকে দেখি সাঁৎ  করে কোঁকড়া চুলের এক মাথা সরে গেল। উঁকি মেরে দেখি বছর বারোর এক ছোকরা। গালভর্তি ব্রণ আর মুখভর্তি হাসি। যাই জিগগেস করি, খালি বেদম জোরে ডাইনে বাঁয়ে মুন্ডু নাড়ে।  অতয়েব পয়সা কবুল করতে হলো। তাপ্পর দেখি কথার ফুলঝুরি বেরোচ্ছে।

“এফেন্দি তুমি ইন্ডিয়ার লোক? জেলের নতুন সায়েব ইন্ডিয়া থেকে বদলি হয়ে এসেছে। তোমাদের কে এক গান্ধী আছে, তাকে বেদম গালি দেয়। মা ওর অফিস ধোয়াপাকলা করে কিনা? মা সব শুনতে পায়।  খানিক থেমে  বলে মাকে সায়েব খুব মারে বোধয়। মা অনেক রাতে ফেরে আর আমায় জড়িয়ে ধরে কাঁদে। আমি মাকে নিয়ে চলে যাবো আরেকটু বড়ো হলে। খানিকক্ষণ চুপ থেকে আবার খোলা গলায় বলে, “জানো এফেন্দি, এই লাল টুপিগুলো যাদের মেরে ফেলার সাজা, তাদের। একবার নীল টুপি ফুরিয়ে গেলে  বারো নম্বর সেলের হাশিমকে লাল টুপি দিয়েছিল, সে তো পাজামাতেই পেচ্ছাপ করে দেয় আরকি।  মা বলে ইহুদিরা খারাপ, কিপ্টে, বদমেজাজি। ঠিকই বলে, এই বাজারের জ্যাকব বুড়োর দোকান থেকে সেদিন কটা খেজুর সরাচ্ছিলাম- বুড়ো দেখতে পেয়ে যা নয় তাই বলল। মাকে কত বাজে বাজে কথা বলল। তবে জানো এফেন্দি, সব ইহুদিরা না খারাপ নয়। আটত্রিশ নম্বর সেলে যে ইহুদিটা থাকত, সে ভারী ভালো। ও না, এটজেল দলের লোক।  মা বলে ওরা ইহুদিদের দেশ চায়। আমাদের আরবদের থাকতে দেবে না সেখানে। কিন্তু লোকটা আমায় কত গল্প বলে, বলে এই জেলবাড়িটা নাকি আসলে ফ্রাঙ্কদের দুর্গ, তারপর সেখান থেকে তুর্কিরা নিয়ে নেয়। তারপর সবশেষে এই ইংরেজরা। আমার হাতে অল্প চাপ দিয়ে বলল, ‘তোমাদেরও তো ইংরেজরা জায়গা জমি কেড়ে নিয়েছে বলো?’ ”

জেল প্রাঙ্গন অনেকটা বিস্তৃত। হাঁটতে হাঁটতে মুস্তাফা দেখায়, “ওই যে নিচের পাথর খিলান দেখছ, ওগুলো হাজার বছর আগের। সেবার যখন জেলে আরব-ইহুদি দাঙ্গা হল, তিনজন ওই পাথরের উপর পড়ে মরে গেছিল।” তারপর এদিক ওদিক দেখে ফিসফিস করে বলে, “হাসান চাচা মসজিদে বলে ইহুদিরা খারাপ। কিন্তু শোলমো  আর আমি একসাথেই খেলি তো, জানো? আল্লাহ তো রাগ করেন না!  আমরা দুজনে রাতের বেলা ইংরেজ কোয়ার্টারে ঢিল ছুঁড়ে পালিয়ে যাই। আমরা একবার ওই নীচে রাতেরবেলা ফ্রাঙ্কদের গুপ্তধন খুঁজতেও গেছিলাম। সেই একবারই।”

কথা বলতে বলতে মুস্তাফা থেমে  যায়, অদ্ভুত তার মুখের ভাব। ধরা গলায় বলে তুমি খুব ভালো এফেন্দি, তুমি শহরের দিকে যাবেতো, এবার? তুমি যাও। আমার ওদিকে যাওয়া বারণ।  আমি অলসমন্থরপদে হাঁটা দি শহরের দিকে। মুস্তাফার হাসি দীর্ঘ কাঠের কপাটের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।

 বিশ্বের জানালা       সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s