বিশ্বের জানালা গুইলিন উমা ভট্টাচার্য শীত ২০১৬

biswerjanalaguilin06চীনদেশের উত্তর গুয়ানজি অঞ্চলের একটি শহর গুইলিন-প্রকৃতির নিপুণ হাতে তৈরি এক দৃশ্যপট,যাকে বলা যায় ‘আ প্যালেস অফ ন্যাচারাল আর্টস’। চীনা ভাষায় গুইলিন কথার অর্থ হচ্ছে,‘ফরেস্ট অফ সুইট  অস্‌মানথাস’। অস্‌মানথাস হচ্ছে একধরনের সুগন্ধী ফুল, চিনে বিশেষ করে গুইলিনে, এই ফুলের বিস্তর গাছ ছিল, এখনো আছে। এই ফুল গাছের আধিক্যের জন্যই এই জায়গার নাম হয়েছিল গুইলিন। এই গাছ নাকি সৌভাগ্য বয়ে আনে,তাই চিনা মেয়েরা অতীতে প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাবার সময় এই গাছ টবে লাগিয়ে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যেত।   

গুইলিন এক সময় ছিল শুধুই জেলেদের গ্রাম। চারদিকে শঙ্কুর মত দেখতে ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়ের সমাবেশ, যেন ছুঁচলো খাড়া খাড়া পাহাড়ের জঙ্গল, গাছপালা আর ফল-ফুলে ভরা এক গ্রাম। গ্রামের এক ধার ঘেঁষে বয়ে চলেছে ‘লী’নদী, তাতে ভাসছে অসংখ্য বাঁশের তৈরি ভেলা। জেলেরা এগুলি এখনও ব্যবহার করে। রাখাল ছেলেরা গবাদি পশু চড়াত, শ্রীকৃষ্ণের মত বাঁশি বাজাত। রিড ফ্লুট বাঁশি। লুকোচুরি খেলত পাহাড়ের আনাচেকানাচে।

biswerjanalaguilin05পাহাড়গুলি সবই ভঙ্গুর উপাদানে তৈরি। চুনাপাথর, জিপসাম আর ডলোমাইটের  মত দ্রাব্য পাথরের পাহাড়। লক্ষ লক্ষ বছর আগে এই সব পাহাড়ের দঙ্গল মাথা তুলে জেগেছিল সমুদ্রের তল থেকে। পাহাড়গুলি্র ভিতরে আছে অনেক গুহা,পাহাড়ের গা থেকে চুঁইয়ে বৃষ্টির জল চলে যায় নীচে, চুনাপাথরের দেয়াল চুঁইয়ে নেমে আসে  নীচে, জমে গুহার গহ্বরে নীচু জায়গায়। আবার বেরিয়েও আসে বাইরে নদী বা ঝর্না হয়ে। এই প্রক্রিয়া চলছে বহুযুগ থেকে। চুনাপাথর ক্ষয়ে গিয়ে গুহার ভিতরে তৈরি হয়েছে স্ট্যালেকটাইট, স্ট্যালাগমাইটের গুহাভাস্কর্য। এখনো চলছে সেই প্রক্রিয়া।

সেখানকার এক রাখাল ছেলে একদিন লুকোচুরি খেলতে খেলতে ঢুকে পড়েছিল এক গুহায়, শুনেছিল জলধারার শব্দ আর পাহাড়ের ফাটলের মধ্য দিয়ে হুহু করে বয়ে আসা বাতাসের তৈরি বাঁশীর আওয়াজ। ছেলেটি ডেকে আনল বন্ধুদের, সবাই মিলে ঢুকল মাটির নীচের সেই বিশাল অন্ধকার গুহায়, হাতে তাদের জ্বলন্ত কাঠের মশাল। তারা সন্ধান পেল মাটির নীচে এক মায়াপুরীর।

সেই গুহার ওপরের চুনাপাহাড়ের গায়ের ফাটল দিয়ে বয়ে আসা বৃষ্টির জলে গুলে যাওয়া  চুনাপাথর জমে তৈরি হয়েছে নানান অপরূপ ভাস্কর্য, দেখে যে কোন জিনিসের কল্পনা করা যায়। মানুষ, গাছ,পশু, থাম, দেবতা, শঙ্খ,যা খুশি। কিছুদিন পর গ্রাম থেকে শহরে শহরে ছড়িয়ে পড়লো এই খবর। চীন সরকারও নজর দিলেন। আবিষ্কার হল মাটির নীচের মায়াপুরী- ‘রিড ফ্লুট  কেভ’। গুহার আশেপাশেই রিড ফ্লুট নামে বাঁশি তৈরির কাঠ হয় এমন গাছ মিলত অনেক। সেই গাছের নামে নাম রাখা হল গুহাটির।

দুটি নদী, চারটি লেক আর চারদিকে ক্ষয়িষ্ণু খাড়া পাহাড়ে ঘেরা গুইলিন আর গুয়াংজি অঞ্চলে হান বংশীয় চীনা মানুষরা ছাড়াও ১২ টি বিভিন্ন আদিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন। লী নদীর দুই পাড়ে অনেক গ্রাম, সবই জেলেদের বসতি। নদীর ধারেই বিশেষ বিশেষ জায়গায়, গ্রামগুলিতে ঢোকার মুখে আছে মাছের পাইকারী বিক্রির অস্থায়ী কেন্দ্র। ক্রেতারা বড়ো বড়ো আইস বক্স নিয়ে হাজির থাকে জেলেদের ধরে আনা মাছ কেনার জন্য।

জাল দিয়ে মাছ ধরা ছাড়াও এরা আর এক উপায়েও মাছ ধরে। সেটি প্রাচীন পদ্ধতি। করমোরেন্ট বার্ড নামে হাঁস জাতীয় একরকম পাখি আছে, এদের গলার অংশটা খুব স্থিতিস্থাপক। দরকারে অনেকটা ফোলাতে পারে, আর অনেক মাছও রাখতে পারে গলার এই ফোলানো থলেতে। আর এই সুযোগটাই নেয় জেলেরা। তারা এই পাখিদের  ধরে রাখে, এদের গলার নিচের অংশে একটা শেকল বেঁধে রাখে,যাতে ধরে আনা মাছ সবগুলি গলার মধ্যে দিয়ে পেটের মধ্যে চলে যেতে পারে না। জেলেরা সেই মাছগুলি সংগ্রহ করে, বিক্রি করে। এই পাখিরা  জলের অনেক গভীরে গিয়ে মাছ তুলে আনতে পারে। লী নদীতে ক্রুজে গেলে দেখা যায় অনেক জেলেই টুকরিতে মাছ আর বাঁকে বসানো দুটি মাছশিকারী পাখি বসিয়ে মাছ নিয়ে চলেছে মাছ বিক্রি করতে। কখনও এই পাখি দেখিয়ে রোজগারও করে।

biswerjanalaguilin04সবুজের আভাযুক্ত নীল জলের লী নদী উৎপত্তি চিনের জিনগান অঞ্চলে ক্যাট মাউন্টেন পাহাড়ে, দক্ষিণে এসে মিলেছে গুই নদীর সঙ্গে, মিলিত স্রোতের দৈর্ঘ্য ৪৩৭ কিলোমিটার,বয়ে চলেছে দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে । এই জলপথই অতি প্রাচীন কাল থেকে ছিল বাণিজ্যতরী চলাচলের প্রধান পথ। এর মধ্যে গুইলিন শহর থেকে শুরু করে ইয়ানশু দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা ৮৩ কিলোমিটার দীর্ঘ জলপথের দৃশ্যই সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক।এই নদীকে গুইলিনের প্রাণভোমরা বলা চলে ।  

লী নদীর ধার ধরে রয়েছে যে’সব পাহাড়, সেগুলি প্রত্যেকটির একটির থেকে আরেকটির গড়ন আলাদা। তবে সবারই মাথা শঙ্কুর মত। জলযানের স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে এদেরও আকার পালটে যায়। অন্যরকম লাগে। পাশে উঁকি মারে অন্য আরও  পাহাড়ের চূড়া। তাদের সংখ্যা গোনা যায় না।

এই পাহাড়ের আকারের মধ্যেই দেখেছি ধ্যানরত বুদ্ধ, শিশু কোলে মা, তিনমুর্তি পাহাড়। সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে সাত ঘোড়ার পাহাড়-‘সেভেন পেইন্টেড হর্সে’স হিল’। ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়ের দেওয়ালের ফাটলের ফাঁকে ফাঁকে গজিয়ে ওঠা ঘাস যেন পাথরের খাড়াই চট্টানের গায়ে এঁকেছে সাতটি ঘোড়া। কোনটি ছুটন্ত,কোনটি যেন ঘাস খাচ্ছে, কোনটি যেন জল খেতে নামছে লী নদীতে।

পর্যটনের তালিকায় গুইলিনকে তুলে আনতে  চীনা মানুষদের প্রয়াস প্রশংসাযোগ্য। গাইডের জীবিকায় যারা আছে তারাই বারবার পাহাড়গুলিকে দেখে এগুলির মধ্যে থেকে নানা অবয়ব ভেবে নিচ্ছে, সেগুলির ছবি তুলে পর্যটকদের দেখতে সাহায্য করছে। এ প্রসঙ্গে বলি আমি আমাদের ভারতবর্ষের দক্ষিণ ভাগ,আর গুজরাট অঞ্চলকে দেখতে পেয়েছি এই সব পাহাড়ের মাঝখানে।

এক নজরে কিছু তথ্য— 

  • চীনদেশের উত্তর গুয়ানজি অঞ্চলে অবস্থিত গুইলিনের মোট আয়তন প্রায় ২৭.৮০৯ বর্গ কিলোমিটার।
  • গুইলিনে আছে ৭টি অঞ্চল,তাতে আছে ৬টি জেলা,৯টি কাউণ্টি,আর দুটি স্বশাসিত কাউন্টি।
  • লোকসংখ্যা-প্রায় ৪৭৪৭৯৬৩ জন। বর্তমানে যার মধ্য ৯৭৫৬৩৮ জন শহরবাসী। আদিম জনজাতির মধ্যে আছে জুয়াং,ইয়াও,হুই,মিয়াও,হান আর ডং জাতির মানুষেরা।
  • জলবায়ু-মৌসুমী জলবায়ু প্রভাবিত আর্দ্র সাবট্রপিকাল জলবায়ু প্রভাবিত গুইলিনে শীতকাল স্বল্পায়ু, আর হাল্কা শীত পড়ে। চরম উষ্ণ, আর্দ্রতাবহুল দীর্ঘ গ্রীষ্মকাল। বসন্তে আকাশ মেঘমুক্ত থাকে না,মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হয়।
  • biswerjanalaguilin03দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে আছে এলিফ্যান্ট ট্রাঙ্ক হিল। প্রাকৃতিক কারণে পাহাড়ের শেষ প্রান্তের একটু আগে খানিকটা অংশ ক্ষয়ে গিয়ে নদীর জলের দিকের অংশে মনে হচ্ছে একটি হাতী যেন শুঁড় দিয়ে জল খাচ্ছে। এছাড়াও নানা আকারের পাহাড়, লাইম কেভ, যেগুলির কথা আগেই লিখেছি। আছে ‘সান এন্ড মুন টেম্পল’ নামে দুটি প্যাগোডা যেগুলি ‘ফির’ লেকের মাঝখানে অবস্থিত। এরা বিশ্বের প্রথম দুটি প্যাগোডা যেগুলি জলের ওপর নির্মিত। আছে সান টেম্পল। বিশ্বের সর্বোচ্চ এই ব্রোঞ্জনির্মিত  ৯তলা প্যাগোডাতে এলিভেটর আছে। এর উপরের ছাদ থেকে সারা গুইলিনকে দেখা যায়। রাতের বেলায় সান প্যাগোডায় জ্বলে সোনালী আলো আর মুন প্যাগোডায় জ্বলে সাদা আলো। আর হ্রদের  জলে এদের প্রতিচ্ছবির সৌন্দর্য দর্শককে স্থানু করে রাখতে পারে।
  • গুইলিনের মানুষদের মাথাপিছু মোট আয় ২০০৯ সালের হিসাব মত ছিল ১৯৪৩৫ চীনা ইউন=ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৯৪৩৫০০ টাকা। চীনের ৬৫৯ টি বিত্তবান শহরের মধ্যে ১২৫ নম্বরে ছিল গুইলিন।
  • ব্যবসা বাণিজ্য- পর্যটন ব্যবসা থেকে আয় প্রচুর হলেও স্থানীয় শিল্পের মধ্যে আছে ফার্মাসিউটিক্যাল দ্রব্য, টায়ার শিল্প, মেশিনারি,সার শিল্প, সিল্ক, পারফিউম,চা, ভেষজ শিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প।তবে সবার আগে রয়েছে পর্যটন শিল্প ও সেই সূত্রে নানা  ব্যাবসা।
  • উৎপন্ন দ্রব্য- স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্যের মধ্যে আছে সামার অরেঞ্জ,ওয়াটার চেস্টনাট,দানাশষ্য,মাছ চাষ। প্রধান খাদ্য রাইস ন্যুড্‌লস,গুলিন পিক্‌ল টফুও বিখ্যাত।
  • শিক্ষা ব্যবস্থা- এখানে মাধ্যমিক স্তরের স্কুল অনেক। প্রাথমিক শিক্ষার মানও ভাল। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৫টি। ১টি মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি, টেকনোলোজি ও ইলেকট্রনিক টেকনোলজির বিশ্ববিদ্যালয় আছে দুটি,একটি অ্যারোস্পেস টেকনোলোজির  ইউনিভারসিটি আছে ১টি আর সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় আছে একটি। 
  • গুইলিনের সবার সেরা হচ্ছে রিড ফ্লুট কেভ আর লী নদীতে ভাসতে ভাসতে প্রকৃতির শ্রেষ্ট সৃষ্টিকর্ম দেখা।
  • সঙ্গে গুইলিনের কিছু ছবি রইল।

 বিশ্বের জানালা        সব পর্ব একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s