বিশ্বের জানালা নদীর গল্প-দুরন্ত মেয়ে সুরমা মীম নোশিন নাওয়াল খান শরৎ ২০১৭

আগের পর্বগুলো– পদ্মানদীর গল্প      পাহাড়ের কান্না-মেঘনা নদী

ভারতের আসামে রয়েছে নাগা-মণিপুর পাহাড়। অনেক অনেকদিন আগে থেকে এই পাহাড় একা একা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই নিয়ে তার খুব মন খারাপ। তার মাথার উপর দিয়ে কত পাখি উড়ে যায়, কত মেঘ ভেসে যায়- তারা সবাই কত জায়গায় ঘুরতে যায়। পাখিরা আর মেঘেরা এসে তাকে নানান দেশের গল্প শোনায়। তারা রাজকন্যার গল্প বলে, কৃষকের পাকা ধান কাটার গল্প বলে, আরো কত গল্প বলে!

অথচ নাগা-মণিপুর পাহাড় তাদের মতো করে ঘুরে বেড়াতে পারে না। এত সুন্দর সুন্দর দৃশ্যের কিছুই সে দেখতে পারে না। তাই সে প্রতিদিন অপেক্ষা করে থাকে কখন পাখিরা আর মেঘেরা এসে গল্প শোনাবে। কিন্তু পাখি আর মেঘগুলোর খুব ব্যস্ততা। তারা গল্প শোনানোর সময়ই পায় না। পাহাড়েরও আর সময় কাটে না। সে একা একা দাঁড়িয়ে থাকে।

এমন চলতে চলতে একদিন পাহাড়টা একটা বুদ্ধি বের করল। সে ঠিক করল, তার কোল থেকে যেই জলরাশি নেমে গেছে, তাকে সে পাঠিয়ে দেবে বিশ্ব দেখতে। সে জলরাশি নদী হয়ে কুলকুল করে বয়ে যাবে। নানা জায়গায় যাবে, অনেককিছু দেখবে আর সন্ধ্যাবেলায় তাকে সেসব গল্প শোনাবে।

যেই ভাবা, সেই কাজ। নাগা-মণিপুর পাহাড় তার দক্ষিণ অংশের জলরাশিকে পাঠিয়ে দিল বিশ্ব দেখতে। সেই জলরাশি নদী হয়ে সমতল ভূমিতে নেমে এল। লোকে তার নাম দিল বরাক নদী।

বরাক নদী পৃথিবী দেখতে বেরিয়ে পড়ল। চলতে চলতে সে পৌঁছে গেল বাংলাদেশের সিলেট জেলার সীমান্তে। নদীর কি আর সীমান্তের বাধা মানলে চলে? সে সোজা সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়ল সিলেটে। সিলেটে ঢোকার সময় সে কোনদিকে যাবে- তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেল। তাই সে বুদ্ধি করে দুই ভাগ হয়ে দুটো নদীকে বাংলাদেশে পাঠাল। তার একটার নাম সুরমা, অন্যটা কুশিয়ারা।

বরাক নদী যখন বাংলাদেশে আসে, সেই সময় এক রাজা ছিল। তার নাম ছিল ক্ষেত্রপাল। তার রানির নাম ছিল সুরম্যা। রাজা তার রানিকে খুব ভালোবাসতেন। তাই অনেকেই বলে, রানির নামেই নদীটার নাম দিয়েছিলেন রাজা ক্ষেত্রপাল।

সুরমা নদী তো বাংলাদেশে ঢুকে পড়ল। এবার সে উত্তর দিকে সীমান্ত ধরে চলতে শুরু করল। তারপর সে চলল পশ্চিম দিকে। কিন্তু সুরমা ছিল খুব অস্থির আর চঞ্চল। তাই সে এক দিকে চলতে পারল না। আবার পথ পাল্টে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে বেঁকে গেল। এভাবে সে সিলেট শহরের দিকে প্রবাহিত হতে লাগল। তারপর আবার সে সিলেট পেরিয়ে উত্তর-পশ্চিমে চলতে শুরু করল। এবার সে চলতে লাগল সুনামগঞ্জ শহরের দিকে। সুনামগঞ্জ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে পাইন্দা নামক একটা জায়গায় এসে সুরমা নদী দুই ভাগ হয়ে গেল। এর প্রথম শাখাটা চলতে চলতে দক্ষিণ মদনা নামক একটা জায়গায় চলে এল। এখানে এসে তার সঙ্গে আবার দেখা হয়ে গেল কুশিয়ারা নদীর।

তখন দুই নদীর সে কী আনন্দ! তারা একসাথে কত গল্প করল, কত হাসল, কত আনন্দ করল!

এই প্রথম শাখাটা এক সময় সুরমা নদীর মূল প্রবাহ হলেও এখন নদীটা শুকিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে গেছে। তাই একে সবাই মরা সুরমা বলে ডাকে।

আর সুরমার দ্বিতীয় শাখাটা পাইন্দা থেকে ৮ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে আবার ৯ কিলোমিটার এগিয়ে আবার দক্ষিণ-পশ্চিমে বেঁকে গিয়ে লালপুরে বাইলাই নদীতে গিয়ে পড়ল। এই শাখাটা চলতে চলতে এক সময় মেঘনা নদীর সঙ্গে গিয়ে মিশল। বরাক নদী থেকে ভাগ হওয়ার পর মেঘনা নদীতে মিশে যাওয়া পর্যন্ত সুরমার দৈর্ঘ্য হল ৩৫৫ কিলোমিটার।

সুরমা অস্থির আর চঞ্চল মেয়ে হলেও তাকে বাংলার মানুষেরা খুব ভালোবেসে ফেলেছিল প্রথম থেকেই। তাই তো তার তীরে নগর-বন্দর ও লোকালয় গড়ে তুলেছিল মানুষ। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও সিলেটের মানুষের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়াল সুরমা নদী। সুরমা নদীর পাড়ে বোনা হত চমৎকার শীতলপাটি। এই শীতলপাটির খ্যাতি ছড়িয়ে গেল সারা বাংলায়। এছাড়া বেতের তৈরি আসবাবপত্রের জন্যও সুরমাতীরের মানুষের ছিল দারুণ সুখ্যাতি।

দিনে দিনে যদিও সুরমাপাড়ের মানুষগুলো অন্য জীবিকা খুঁজে নিয়েছে, তবুও এখনও সারা বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে সুরমাপাড়ের শীতলপাটির গল্প।

সুরমা নদীকে বাংলার মানুষেরা খুব ভালবাসলে কী হবে, বর্ষাকালে কিন্তু সুরমা নদী খুব রেগে যায়। এ সময় সুরমা নদীতে বন্যা হয়। মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবার মাস পর্যন্ত গড়ে ৩০ হাজার কিউসেক পানি অপসারণ হয় সুরমা থেকে।

সুরমা নদীকে খুব ভালোবাসে বলে বাংলার মানুষেরা তাকে নিয়ে অনেক গল্প বলে থাকে। বলা হয়, হজরত শাহজালাল তার বাহিনী নিয়ে সুরমার পাড়ে উপস্থিত হলে রাজা গৌড়গোবিন্দ নদীর সব নৌকা চলাচল বন্ধ করে দেন। তখন জায়নামাজে চেপে এই নদী পার হয়েছিলেন হজরত শাহজালাল।

১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে হজরত শাহজালালের সঙ্গে দেখা করার জন্য সুরমা নদী পেরিয়ে আসেন ইতিহাসের উজ্জ্বল এক ভ্রমণপিপাসু ব্যক্তি ইবনে বতুতা।

সুরমা নদী বাংলার দুষ্টু ও দুরন্ত মেয়ে। কিন্তু তবুও এই চঞ্চল মেয়েটাকে খুব খুব ভালোবাসে সারা বাংলা। তাই তো এখনও তার বুকে পাল উড়িয়ে মাঝি গেয়ে ওঠে ভাটিয়ালি গান, আর জলকেলিতে ব্যস্ত হয় পাখিদের ঝাঁক।

 বিশ্বের জানালা       সব পর্ব একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s