বিশ্বের জানালা

অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের রানি-ভেনিস->উমা ভট্টাচার্য

BHUGOL54 (6) (Small)ভেনিসিয়ান পর্যটক মার্কপোলোর কল্যাণে সবাই প্রায় জানে ভেনিসের নাম। ভেনিসের অনেক নাম-খালের শহর,জলের শহর। সবচেয়ে আদরের নামটি অ্যাড্রিয়াটিকের রানি। সত্যিই রানি। ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে উত্তরদিকে বাড়িয়ে থাকা সাগরবাহু ‘অ্যাড্রিয়াটিক সাগর’-এর সরু মাথায় কাছে অবস্থিত ভেনিস এক আশ্চর্য নগরী- ইউরোপের সবচেয়ে রোমান্টিক শহর।

ইটালির ভেনিটো অঞ্চলে  প্রায় ৪১৭.৫৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে অবস্থিত এক জলময় নগরী- এক রাজধানী শহর। জলের মধ্যে ভেসে থাকা ১১৮ টি ছোট ছোট দ্বীপ,১৭৭ টি খাল আর এক দ্বীপ থেকে আর এক দ্বীপে পায়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য ৪০৯ টি সেতু নিয়ে গড়ে ওঠা এক আশ্চর্য শহর। এক দ্বীপ থেকে আর এক দ্বীপে যাওয়া  হচ্ছে এক পাড়া থেকে আর এক পাড়ায়  যাবার মত ব্যাপার। যেতে সেতু পার হতে হয়। জলের মধ্যে থেকে গেঁথে তোলা সব বাড়ি। বাড়িগুলির সামনেই জলের রাস্তা।  বাড়িতে ঢুকতে গেলে বা দ্রষ্টব্য স্থান দেখতে গেলে যেতে হবে এদেশের সেই  প্রাচীন দেশীয় সরু সরু আর লম্বাটে নৌকো ‘গন্ডোলা’ চেপে। কোনও রাস্তা নেই, গাড়ি নেই। ইউরোপের একমাত্র মোটরগাড়িহীন,ধোঁয়াহীন শহর যেখানে এই একবিংশ শতাব্দীতেও নেই কোন গাড়ি,বাস,ট্রাক। নেই কোন হাঁটা পথ বা যানবাহনের রাস্তা। গন্ডোলা চড়ে যেতে যেতে দেখা যাবে অনেক – অনেক কেন প্রায় সব বাড়ির সামনেই বেঁধে রাখা আছে নিজেদের ব্যবহারের জন্য ছোট ছোট নৌকো,স্পিড বোট বা গন্ডোলা।

BHUGOL54 (8) (Small)ভেনিস বা ভেনিসিয়া আসলে সাগরের বুকে ভেসে থাকা একটি দ্বীপময় লেগুন। স্থাপত্যশিল্পের জন্য এ শহর পৃথিবী বিখ্যাত। ইটালির মূল ভুখণ্ড থেকে একটি বিশাল চওড়া   ক্যানেল,যাকে বলে গ্র্যাণ্ড ক্যানেল ,সেইটিই এ শহরের প্রধান জলসড়ক। ভেনিসে ঢোকার পরে গ্র্যান্ড ক্যানেল উল্টো করে লেখা বিরাট একটি ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরের আকার নিয়ে ভেনিসের প্রধান জেলাগুলির মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে। এটি প্রায় ৩৮০০ মিটার দীর্ঘ আর ৩০ থেকে ৯০ মিটার চওড়া। গড় গভীরতা ৫ মিটারের মত। সেই পথে চলে প্রমোদভ্রমণ, ছোটে BHUGOL54 (2) (Small)‘ভেপোরেট্টি’ বা জল বাস,ভাড়া পাওয়া যায় প্রাইভেট ওয়াটার ট্যাক্সি কিংবা স্পিড বোট। সে পথ ধরে গিয়ে পৌঁছোনো যায় ভেনিসের রিয়ালটো সেতুতে। জলপথে  দুপাশে দেখা যায় বিভিন্ন দ্বীপে গড়ে ওঠা নানা সুন্দর সুন্দর স্থাপত্য। প্রায় ১৭০ টির মত বড়ো বড়ো বাড়ি আছে, আছে পুরনো বন্দর,নানা বড়ো বড়ো অফিস ও বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান। বাড়িগুলির কারুকার্য আর স্থাপত্য দেখলেই মনে হয় যেন সেগুলি সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা করার জন্য তৈরি।

ইটালিয়ান ভাষায়  ডিউককে বলে ডগি, ইংরেজি বানানে হল DOGE[ল্যাটিন শব্দ DUX মানে হল লিডার বা প্রধান শাসক, DUX ইংরেজিতে হল DUKE,কিন্তু ইটালির ভাষাতে সেটা দাঁড়ালো DOGE তে। রিয়ালটো সেতু থেকে দেখা যায় ডগিজ্‌ হাউস, মানে ডিউকের প্রাসা। দেখা যায় সেণ্ট মার্ক বাসিলিকা, মাদার মেরির নামে উৎসর্গীকৃত বিশাল আকৃতির ডোম সমন্বিত মেরীজ্‌ চার্চ,আরও কত কী! স্থাপত্যগুলির সৌন্দর্য, বিশালত্ব, কারুকার্য,পাথরে খোদাই করা সিংহমূর্তি,দেবশিশু বা দেবদূতের মূর্তি,কিংবা চিন্তাবিদ, BHUGOL54 (1) (Small)শিল্পী, বীর ও মনিষীদের মূর্তি দেখলে মনে হয় যেন জীবন্ত,যেন দর্শকদের দিকে তাকিয়ে আছেন তাঁরা। দোকানে দোকানে আছে অপূর্ব সব মুখোশের সম্ভার,পাথরের পুতুল,মূর্তি,দামি পাথরের গয়না।

সেন্ট মার্ক বাসিলিকা স্কোয়ারে আছে প্রাচীন গির্জা,ঘড়িঘর,শপিং মল। সে জায়গাটা পেরিয়ে মূল শহরে ঢুকতে গেলে চড়তে হবে গণ্ডোলা।

ডোরাকাটা জার্সি গায়ে  গণ্ডোলিয়ানরা নিয়ে যাবে শহর দেখাতে। এ গলি,সে গলির বদলে এ খাল সে খাল বেয়ে চলতে হবে। BHUGOL54 (4) (Small)অনেকে  জন্মদিন বা বিয়ের উৎসবও করেন  গণ্ডোলা চেপে। সেতুর তলা দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় গণ্ডোলা নিয়ে পার হয়ে যাবে  মাথার দিকে উঁচু অংশে দাঁড়িয়ে  থাকা গণ্ডোলার মাঝি । 

সুদূর অতীতে লেগুনের জলা জমিতে বাস করত জেলেরা। মাছ ধরা আর অন্য জিনিস আনতে সমুদ্রের দিকে যাওয়া ছিল তাদের জীবিকার উপায়। ছিল জলদস্যুদের উৎপাত। পরবর্তী কালে হুন ও জার্মানদের ক্রমাগত আক্রমণে ইটালির মূল ভূখণ্ড থেকে দলে দলে বাস্তুহারা মানুষ আসতে থাকে এই লেগুনে। ক্রমে এই বাস্তুহারা নবাগতরাই  ভেনিসে  গড়ে তোলে বসতির জন্য সুন্দর সুন্দর স্থাপত্য।

ষষ্ঠ খ্রিষ্টাব্দে ভেনিসিয়ানরা  গড়ে তোলে  এক স্বশাসিত শাসন ব্যবস্থা। নবম শতাব্দী থেকে  দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে এরা নৌশক্তিতে প্রবল হয়ে ওঠে আর অ্যাড্রিয়াটিক সাগর বেয়ে ভূমধ্যসাগরের  পথে নৌ বাণিজ্যে প্রভূত উন্নতি করে। যদিও সমুদ্রতল থেকে মাত্র ফুটখানেক উঁচু ভেনিসের স্থলভাগ এবং সামুদ্রিক জোয়ারের সময়  খালগুলির জলস্তর খানিকটা করে উঠেই যায়, কিন্তু তবু সমুদ্র একে গ্রাস করতে পারে না, কারণ ‘লিডো’ নামে এক খণ্ড দীর্ঘ ও সামান্য উঁচু ভুখণ্ড ভেনিসকে সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ থেকে সুরক্ষিত রাখে।

অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের মাথার দিকে সুবিধাজনক স্থানে অবস্থানের জন্যই সামুদ্রিক বাণিজ্যে এত উন্নতি করেছিল ভেনিসিয়ানরা।  অন্যান্য অসুবিধাগুলি দূর করে  উন্নতির চূড়ায় পৌঁছেছিল ভেনিস। একটা সময়  প্রায় ৩৬০০০ নাবিক আর ৩৩০০ জাহাজ নিয়ে ভূমধ্যসাগরের উপর বাণিজ্যিক দখলদারি চালিয়ে গেছে ভেনিস।

আরো কিছু তথ্য

 জলবায়ু

উপ নিরক্ষীয় জলবায়ুর দেশ ভেনিসের  জলবায়ু আর্দ্র প্রকৃতির। শীতকাল  সহনীয় আর  অসম্ভব ঊষ্ণ গ্রীষ্মকাল।

 শিক্ষা

শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই উন্নত। বর্তমানেও উচ্চশিক্ষার এক প্রধান আন্তর্জাতিক কেন্দ্র ভেনিস। সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে  “ভেনিস ইন্সস্টিটিউট, ইউনিভারসিটি  এণ্ড ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ সেণ্টার। ” ১৯৯৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সান সারভোলো দ্বীপে।

খেলাধুলো

ফুটবল আর বাস্কেটবলই এখানকার প্রধান ও প্রিয় খেলা।   

উৎসব

মুখোশ উৎসব এখানকার বিখ্যাত উৎসব।

BHUGOL54 (5) (Small)

উপগ্রহ চিত্রটি গুগল আর্থ থেকে সংগৃহীত। বাকি ফটোগ্রাফিঃ লেখক

আগের পর্বগুলো একত্রে এইখানে