বিশ্বের জানালা অচেনা ঈশান মালিনী ভট্টাচার্য বসন্ত ২০১৭

এই লেখার আগের পর্ব অচেনা ঈশান (১)

biswerjanala01-medium

(পর্ব ২ – মহিলা দিবস)

গৌহাটি শহর থেকে প্রায় ২০ কিমি দূরে আসাম-মেঘালয় ছুঁয়ে ‘বর্নিহাট’ বলে একটা জায়গা আছে। সেখানে দিগারু নদীর ধারে ছবির মতন ছোট্টো শ্যামলী গ্রাম ‘আপরিকুলা’। সেখানে পা রেখে আলাপ হল “মালোই তেরন” নামে এক মহিলার সাথে। তিনি জানালেন যে এক সময় গ্রামের ‘উপদেষ্টা’ হয়ে সবার মুশকিল আসান করাই ছিল তার কাজ। ওই কাজ করতে করতে প্রায় ১৫ বছর আগে গ্রামের মেয়ে বউদের নিয়ে কিছু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নকে সাকার করতে প্রথমেই তিনি সকলের জন্য ব্যাংকে খাতা খোলান (যা আজ আমরা ‘জনধন যোজনা’ নামে জানি) ও ছোটখাটো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করান, যেমন বয়ন, মুর্গী চাষ, ইত্যাদি। কিন্তু স্বল্পপুঁজিতে বেশি দূর এগোতে সাহস পাননি – তাই অবশেষে সকলের চেনা গণ্ডিতেই ফিরে গেছেন, যা হল “চাষ-বাস”।

এই প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল সবচেয়ে বর্ষিয়ান মহিলা কল্পনা তেরনের (লাহন) সাথে… তিনি জানালেন যে ২০০১ সালে তাঁরা একত্রিত হন ও কয়েকজনকে নিয়ে একটি ছোটো দল তৈরি করেন, যার নাম “আতুর”।

২০০২ সাল থেকে তাঁরা সমবেত ভাবে চাষ শুরু করেন ‘হলুদ ও পানের’। পরে সদস্য বাড়লে নতুন উৎসাহে নেমে পড়েন ‘ধান’ চাষ করতে। এখন তারা মনের আনন্দে গ্রামের জমিতে বিভিন্ন ধরনের ধানচাষ করেন, যেমন আইজং, আমপাখি, জোহা, ইত্যাদি। আজ ৪টি স্বনির্ভর গোষ্ঠী সম্মিলিত ভাবে কৃষিকাজ করছে ও নিজেরা রোজগার করে ব্যাংকে টাকাও জমা করছে। ঘর-কন্না, স্বামী-সংসার সামলে দিনের অনেকটা সময় তাঁরা কাটান মাঠে মাঠে ফসল ফলিয়ে। কী যে ভাল লাগল ওদের দেখে। তাই ওদের সাথে মাঠে দাঁড়িয়ে “আমরা চাষ করি আনন্দে…” গানটি গেয়ে ওদের মানে বুঝিয়ে দিলাম।

ওঁদের উন্নতমানের ফলন দেখে জানতে চাইলাম ‘সার’ এর কথা। ওঁরা জানালেন যে সরকারের তরফ থেকে সার সরবরাহের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু তা কখনোই তাদের হাতে এসে পৌঁছোয় না। তাতে কিন্তু তাঁরা থেমে থাকেননি – নিজেরাই জৈবিক সার তৈরি করে ফসল ফলাচ্ছেন –  বাজারে বিক্রি করছে্ন – তার লভ্যাংশ ব্যাংকে জমাও করছেন। কী সার ব্যবহার করে্ন জানতে চাইলে সরল একগাল হেসে কল্পনা জানালেন যে বৃষ্টির সময় পাহাড় থেকে ধস নামলে সেই পাহাড়-ভাঙা মাটিই হল সবচেয়ে ভাল সার।

এদিকে গল্প করতে করতে সন্ধ্যা নেমে এল দেখে আমিও গুটিগুটি পায়ে গাড়ির দিকে এগোলাম। মনে এঁকে নিলাম এক ছবি – হলদে-সবুজ পাকা ধানের খেতে কমলা, লাল, নীল হলুদের ওড়নায় মাথা ঢেকে, কল্পনা, নীরুলা, জুনালীরা ধান কাটছে। গাড়ি চালু হতেই ড্রাইভারকে বললাম – রেডিও নয়, আমি গাইব “সকল গর্ব দূর করি দিব, (কল্পনা) তোমার গর্ব ছাড়িব না”।

এই প্রসঙ্গে “সীমান্ত বাজার” বা “Border Hat” এর কথা একটু জানাই, যা এ অঞ্চলে খুবই সফল। আপাতত চারটি সীমান্ত বাজার রমরমিয়ে চলছে, যেখানে কল্পনারাও তাদের এই কৃষিজাত পণ্য বিক্রি করেন। বাজারগুলি ২টি মেঘালয়-বাংলাদেশ সীমান্তে (কালাইচর ও বালাত) এবং ২টি ত্রিপুরা-বাংলাদেশ সীমান্তে (কমলাসাগর ও শ্রীনগর)।

আর এক সাহসী মা-মেয়ের জীবন সংগ্রামের কাহিনী শুনিয়ে এই লেখা শেষ করব। বড়দিনের ছুটিতে কড়কড়ে ঠান্ডায় চলেছিলাম গৌহাটি থেকে মিজোরামের Mt. Hmuifang এর উদ্দেশ্যে। ২০ ঘন্টা সফর করে ক্লান্ত-শ্রান্ত আমরা থামলাম “রাতচোরা” বলে একটি জায়গায়। নামের সাথে মিল রেখে যা রাতের বেলায় চুরি ডাকাতির জন্য বিখ্যাত। দেখলাম সারি সারি অনেক দোকান। কিন্তু বন্ধুদের পরামর্শে পা রাখলাম ছোট্ট এক দোকানে গরম চা খেয়ে চাঙ্গা হব বলে। ভিতরে ঢুকতেই অবাক হলাম – ওই রাতে ওই জায়গায় এক যুবতী মা ও তার কিশোরী মেয়ে সেই দোকান চালাচ্ছে দেখে। গরম চা হাতে নিয়ে ওদের সাথে এগিয়ে গিয়ে আলাপ করে জানতে পারলাম যে তারা ওই গ্রামেরই ও মহিলা স্বামী-পরিত্যক্তা। ওই দোকানই তার রুজি-রুটি। কত সৎ সাহস ও মনের জোর থাকলে ওইরকম বিপরীত পরিস্থিতিকেও অনুকুল করে নেওয়া যায়!

 বল তো, নারী দিবসে ওদের সেলাম না জানিয়ে থাকা যায়?

  বিশ্বের জানালা সব পর্ব

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s