বিশ্ব্বের জানালা আঙ্কল স্যাম সংহিতা শীত ২০১৬

bishwerjanalaunclesam01

সে অনেকদিন আগেকার কথা। সবে সবে খবরে কাগজ পড়ছি। নতুন নতুন বুলির সাথে চেনাশোনা হচ্ছে রোজ। সেসবের মধ্যে যে শব্দগুলো পৃথিবীর অনেকটা দেখিয়েছিল তার একটা শব্দ ছিল মার্কিন। মার্কিন মানে তখন একটা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষণ, যদিও তখনও জানি না বিশেষণ কী। তখন আবার যুক্তরাষ্ট্র বানানটা শেখাই অনেক অগ্রগতির পরিচয়, অতএব যুক্তরাষ্ট্র যে কী তা জানা-বোঝার সীমা থেকে অনেক, অনেক বছর দূরে।

আবার মার্কিনীও একটা বিশেষণ। একটু বয়স বাড়তে জেনেছিলাম, অ্যামেরিকান থেকে স্বরলোপ পেয়ে হয়েছে ম্যারিকান, তার থেকে বর্ণবিপর্যয়ে মার্কিন। কেউ কেউ মার্কিন থেকে আবার একটা বিশেষণ রূপ বানিয়েছেন মার্কিনী। ততদিনে ভূগোলে পড়ে ফেলছি ক্যানাডিয়ান শিল্ডের কথা। পৃথিবীর মানচিত্রে চিনে ফেলেছি পঞ্চহ্রদের অবস্থান। মুখস্থ করে ফেলেছি মিসিসিপি-মিসৌরি নদীর অববাহিকার পরিমাপ আর অ্যামাজন নদীর সাথে তাদের পাল্লা দেওয়ার কথা। অবশ্যই জেনে গেছি নায়াগ্রা, ভিক্টোরিয়া আর ইগাসু জলপ্রপাতের তুলনা। আইসল্যান্ডের ফিয়র্ড আর কলোরাডো নদীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের কথাও।

তারপর হিসেব করতে শিখতে মনে হল যে জাহাজি হতে হবে, যাতে আফ্রিকায় ভিক্টোরিয়া, দক্ষিণ আমেরিকায় ইগাসু আর উত্তর আমেরিকায় নায়াগ্রা দেখতে পারি। তাতে আইসল্যান্ডের ফিয়র্ড আর কলোরাডোর গ্র্যান্ড ক্যানিয়নও দেখা যাবে। কিন্তু জিম্বাবোয়ে আর জাম্বিয়া তো উপকূলে নয়। এমন কি ইগাসুও ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার উপকূলে নয়। কিন্তু নায়াগ্রা জাহাজেও যাওয়া যায়। আবার গ্র্যান্ড ক্যানিয়নও জাহাজীর পক্ষে অনেক দূরের ব্যাপার। তার ওপর এতগুলো দেশে যাওয়ার সুযোগ আর সময় পাওয়াটাও অনিশ্চিত ঠেকল। কিন্তু শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছোতে পারলেই প্রকৃতির অনেকগুলো বিশাল কীর্তি দেখা যেতে পারে। তাই মনে মনে ইচ্ছে জেগে উঠল কোথাও না হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেতেই হবে।

অতএব প্রস্তুতি হিসেবে শুরু হল জানার চেষ্টা, কীভাবে যাওয়া যায়, কত শিগগির যাওয়া যায় এইসব। তাতে আরও দুটো নতুন শব্দের সাথে চেনা হল – মেল্টিং পট আর আঙ্কল স্যাম। মেল্টিং পট কেন? সেখানে তো বরফ পড়ে, খুব গরম তেমন তো নয়, তাহলে? মেল্টিং পট কারণ, নানান সংস্কৃতির মানুষ গিয়ে পৌঁছোয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, নানান কারণে, মাতৃভূমি বা পিতৃভূমি ছেড়ে। তারপর তাদের সংস্কৃতিটা মার্কিন সংস্কৃতিতে মিশে যায়। এই মিশে যাওয়াটা খিচুড়ির হাঁড়িতে চাল, ডাল, ঘি, মশলা গলে গলে মিলে যাওয়ার মতো, সব উপকরণের স্বাদ, গন্ধের স্বকীয়তা চেনা গেলেও, পুরো মিশেলটার রং, স্বাদ আর গন্ধ তার একান্ত নিজস্ব।

খটকা লেগেছিল আঙ্কল স্যাম শুনে। জার্মানরা দেশকে বলে Vaterland (ফা-আটা-হ্‌-ল্যান্ড) মানে পিতৃভূমি। আমরা বলি আর সকলের মতোই, মাতৃভূমি। কিন্তু দেশকে আঙ্কল? ঠাট্টা নাকি?

বইপত্রে দেখা গেল যে ১৮১২ থেকে ১৮১৫ সালে যখন নব সংগঠিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধ করছিল, তখন কোনও এক স্যামুয়েল উইলসন ছিলেন ইউনিয়ন আর্মির মাংসের যোগানদার। মাংসের প্যাকেটের গায়ে সিলমোহর থাকত ঠিকাদারের নামের আদ্যাক্ষর আর ইউনাইটেড স্টেটস্‌-এর আদ্যাক্ষর। সে আদ্যাক্ষরের তেমন চল ছিল না সাধারণের কথোপকথনে। তাই সেনারাও অনেকেই জানতেন না এর মানে কী। এক সেনা মাংস যোগান দিতে আসা লোককে জিজ্ঞেস করেন আদ্যাক্ষরের মানে। সেও ঠিকটা জানত না। সে মনে করেছিল যে আদ্যাক্ষরে মাংসের যোগানদার যাকে সে কাকা বা আঙ্কল স্যাম বলে ডাকে তাঁর পরিচয় আছে। সেই থেকে ঠাট্টা করে সেনারা রেশনের মাংসকে আঙ্কল স্যামের দেওয়া মাংস বলতেন। কারণ, সেনা বাহিনীকে খাবার যোগায় রাষ্ট্র। অর্থাৎ, ইউনিয়ন আর্মির সেনাদের খাবারের মাংসের যোগানদার আসলে ইউনাইটেড স্টেটস্‌ (United States) যাকে সংক্ষেপে ইউ. এস. (U.S.) বলা হয়। ইউ. এস. আবার আঙ্কল স্যামেরও (Uncle Sam) আদ্যাক্ষর। মনে করা হয় যে এইভাবেই ইউনাইটেড স্টেটস্‌ রাষ্ট্রকে ব্যক্তিস্বত্ত্বা দিয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে অন্য গল্পও আছে, যেগুলো স্যাম উইলসনের গল্পের থেকে কম চালু। যেমন ১৮০৭ সালে আর্মির একটা বিশেষ রেজিমেন্ট তৈরি হয়েছিল যার নাম ছিল ইউনাইটেড স্টেটস্‌ লাইট ড্রাগনস। সংক্ষেপে ইউ.এস.এল.ডি.। সেই রেজিমেন্টের সেনারা ঠাট্টা করে নিজেদের বলতেন নাকি আঙ্কল স্যামস লেজি ডগস। আবার কেউ কেউ বলে যে  ইউ. এস. থেকেই কথায় কথায় আঙ্কল স্যাম নামটা তৈরি হয়ে গেছে।

আবার অন্যদিক থেকে ভাবলে মনে হয় এই আঙ্কল ডাকটা যথার্থ। কারণ, ইউনাইটেড স্টেটস তো ল্যান্ড অফ ইমিগ্রান্টস অর্থাৎ অভিবাসীদের দেশ। দেশটাতে আজকে যাঁরা বাস করেন, হয় তাঁরা বর্তমান প্রজন্মে পৃথিবীর অন্য কোনও দেশ থেকে ইউনাইটেড স্টেটস-এ পৌঁছেছেন, নয়তো তাঁদের কোনও এক পূর্বপুরুষ ইউনাইটেড স্টেটসস-এ পৌঁছেছিলেন পৃথিবীর অন্য কোনও দেশ থেকে। এমনকি রেড ইন্ডিয়ান বা আমেরিকান ইন্ডিয়ানরাও আমেরিকাতে অভিবাসী, বলা ভালো প্রাচীনতম অভিবাসী। পুরাতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক এবং জীববিজ্ঞানভিত্তিক ডি.এন.এ. চর্চা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে আজকের ইউনাইটেড স্টেটস-এ তথা সমগ্র আমেরিকা – উত্তর ও দক্ষিণ – মহাদেশে কোথাও মানুষের অভ্যুত্থান ঘটেনি। মানুষের অভ্যুত্থান ঘটেছে কেবলমাত্র আফ্রিকা মহাদেশে। আফ্রিকা থেকে শুরু যে মানুষের সেই মানুষ মধ্য এশিয়া পেরিয়ে সাইবেরিয়া হয়ে আমেরিকা পৌঁছোয়। আধুনিক কালে আমেরিগো ভেসপুচির পিছু পিছু প্রথমে ইউরোপ ও পরে প্রাচ্যের দেশগুলোর মানুষ আমেরিকা গিয়ে নববিশ্বে সভ্যতা তৈরি করার অনেক আগে, প্রাগৈতিহাসিক কালে, প্রায় সাড়ে ষোলো হাজার বছর আগে মানুষ উত্তরের বেরিং প্রণালী দিয়ে সাইবেরিয়া হয়ে আলাস্কায় পৌঁছেছিল। অর্থাৎ আমেরিকা মানুষের জন্মস্থল নয়। মানুষ জন্মভূমি ছেড়ে সে দেশে পৌঁছোয়। অর্থাৎ কালে কালে আমেরিকাতে পৌঁছোনো অভিবাসীদের বর্তমান বা উত্তরপুরুষ তাদের বাসস্থলকে পিতৃভূমি বা মাতৃভূমি না ডেকে আঙ্কল ডাকলে অস্বাভাবিক কিছু ঘটে না। 

bishwerjanalaunclesam02আবার এটাও সত্যি যে ইউনাইটেড স্টেটস-এর নাগরিকরা তাদের দেশকে আঙ্কল ল্যান্ড বলেন না, মাদারল্যান্ডই বলেন। কিন্তু সরকারি আপিস বিজ্ঞাপন দেয় এই বলে যে, ‘আঙ্কল স্যাম ওয়ান্টস ইউ টু…’ মানে ‘আঙ্কল স্যাম চান যে তুমি…’।

মেল্টিং পট ব্যাপারটা যখন খিচুড়ির হাঁড়ির সঙ্গেই তুলনা করলাম, তখন আরেকটু খাবারের কথা বলা যাক। একটা বাংলা সিনেমায় দেখেছিলাম যে পটভূমিতে কলকাতা শহর আর তার একটা রেস্টুরেন্ট যার নাম কাসা প্ল্যানেটেরিয়া। কাসা শব্দটা এসপানিয়ল বা স্প্যানিশ হলেও স্প্যানিশে প্ল্যানেটেরিয়া বলে কোনও কথা হয় না। এখন সত্যিকারের রেস্টুরেন্ট নোলা। নোলা তো আর ইংরেজি শব্দ নয়, বাংলা শব্দ, কিন্তু লেখা থাকে ইংরেজিতে। তাই ভাবলাম স্প্যানিশ কিংবা মেক্সিকান কিংবা লাতিনো খাবারের খদ্দের টানতে রেস্টুরেন্টের নাম রাখা হয়েছে কাসা প্ল্যানেটেরিয়া। কিন্তু গুগল ম্যাপে তার ঠিকানা নেই। বলা বাহুল্য, খাবার লোভেই খুঁজেছিলাম রেস্টুরেন্টটা। কিন্তু…।

ইউনাইটেড স্টেটস-এ কিন্তু খাবার লোভে কক্ষনও হতাশ হতে হয় না। কী খেতে চাই? বাড়ির ডাল-ভাত, কিন্তু নিজে না রেঁধে রেস্টুরেন্টে? পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে মেক্সিকান, মেডিটেরানিয়ান বা ভূমধ্যসাগরীয়, গ্রিক, ইতালিয়ান, পাকিস্তানি, বাংলাদেশি, চিনে, কোরিয়ান, মঙ্গোলিয়ান, টার্কিশ, স্যুইস, মধ্যপ্রাচ্যীয়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এবং আরও যতরকম সম্ভব তত রকম খাবার। তবে ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট শুনেই দৌড়ে গেলে কিন্তু ডাল-ভাত নাও পাওয়া যেতে পারে। বিরিয়ানি কিংবা পরোটা খেয়ে ঢেকুর তুলতে হবে। কিংবা ধোসা আর উত্থাপাম। আবার চিনে দোকানে গিয়ে লেমন চিকেন চাইলে বা মাঞ্চুরিয়ান চাইলে কিংবা স্যুইট এন্ড সাওয়ার চিকেন চাইলে বড়া বড়া করে ভাজা মাংস পাওয়া যাবে। মানে ঝোলটা যেমনই হোক মাংসটা বড়া করে দেয়। তাই অনেকেই খোঁজে ইন্ডিয়ান-চাইনিজ খাবারের দোকান। সেখানে ছাড়া আর কোথাও চিলি-চিকেন পাওয়া যায় না। তা বাদে সত্যিকারের চিনা মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করি, “তোমরাও কী এমন করে সব মাংস কর্ন ব্যাটারে চুবিয়ে ভাজা করে খাও?” তবে তিনি নাকটা কুঁচকে ঘাড় নেড়ে বলবেন, “না।” আবার নিন্দুকে বলে যে সত্যিকারের চিনে খাবার এমন পচা হয় যে তার গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে। তা বাদে আছে আমেরিকার নিজস্ব ফসল আলু আর ভুট্টা। ভুট্টার দানা আর সেই দানার থেকে বানানো ময়দা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন রকম রুটি। ছোটো রুটি ভাঁজ করে খেলে ট্যাকো, রুটির মধ্যে কিছু রোল করে খেলে টর্টিলা। আবার ভাত, রাজমা, চিকেন বা গোমাংস বড়ো আটার রুটিতে মুড়ে খেলে তাকে বলে বারিটো।

bishwerjanalaunclesam04বারিটো এসেছে বারিদো থেকে। বারো মানে গাধা, বারিদো মানে বাচ্ছা গাধা বা গাধা শাবক। ইউনাইটেড স্টেটসে বারিটো বিক্রি হয় মেক্সিকান খাবার বলে। কিন্তু খোদ মেক্সিকোতে বারিটো বলে কিছু হয় না। চিকেন ক্যাসেটিলাও তাই। মাখন দিয়ে ঠেসে মাখা ময়দার রুটি বা পরোটা বেলে, তার মধ্যে কুচো চিজ আর ম্যারিনেট করে রাখা কুচো কুচো মাংস পরতে পরতে রেখে, পুরো ব্যাপারটা গ্রিলারে সেঁকে নিলেই ক্যাসেটিলা তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু এই খাবারটা মেক্সিকান বলে বিক্রি হলেও bishwerjanalaunclesam03আদতে মেক্সিকান নয়। মেক্সিকান খাবার মানে চিপোতেলে-র ব্যবহার। চিপোতেলে তেল নয়, শুকনো লঙ্কা। নানা প্রজাতির, নানান মাপের লঙ্কা শুকিয়ে চিপোতেলে তৈরি হয়। খাবারে ব্যবহার না করে, গৃহসজ্জার মালা হিসেবেও সেগুলো ব্যবহার হয়।


কিন্তু মেল্টিং পটের এটাই মজা। যার যা কিছু উপকরণ তাই গলে, মিলেমিশে যা পরিবেশিত হয় সেটার স্বাদ, গন্ধ তার উৎসের স্বাদ, গন্ধ থেকে একদম আলাদা। এই উপকরণ গ্রহণের উৎসাহে কিন্তু মেল্টিং পট সাংঘাতিক উদার। কিছুতেই তার মিশতে মিলতে আপত্তি নেই। কিন্তু মেশার পর স্বকীয়তা রাখতে গেলেই বিকট গরমিল হয়ে যায়। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বলব যে একটা শহরে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের উৎসবে পুরো শহর সামিল হয়। দীপাবলীর উৎসব যেমন শুধু ভারতীয়দের নয়, তেমনই চিনে নববর্ষও শুধু চিনেদের নয়, দিয়া দে মুয়ের্তেসও শুধুমাত্র মেক্সিকানদের নয়, হলউইনও শুধুমাত্র ইউরোপিয়ানদের নয়। সব উৎসবেই সমাজের সক্কলকে সমানভাবে অংশ নিতে দেখেছি। আবার রোজকার কাজের জগতে দেখেছি কাজ করতে পারা না পারাটাই কর্মীর একমাত্র মূল্যায়ন, কর্মীর মাতৃভূমি বা জাতি পরিচয় আমল পায় না।

ক্রমশ

 বিশ্বের জানালা       সব পর্ব একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s