বিশ্ব্বের জানালা অচেনা ঈশান-যাদবের অসাধ্য সাধন মালিনী ভট্টাচার্য শীত ২০১৬

biswerjanalaishan01রবীন্দ্রনাথের মতো আমাদের অনেকেরই শ্রাবণ মাসটা খুব পছন্দের, তাই না? কারণ, বাইরে যখন ঝমঝম বৃষ্টি হয়, আমরা তখন ঘরে বসে উচ্চস্বরে গেয়ে উঠি, “জানি নে, জানি নে, কিছুতে কেন যে মন লাগে না…”। কিন্তু, এবারের শ্রাবণের চিত্রটা আলাদা – আষাঢ়ে ঘনবর্ষা পেলাম কিছুদিন, তো শ্রাবণে পেলাম কাঠফাটা রোদ। শ্রাবণী পূর্ণিমা ফাঁকি গেল। “আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে…” আর গাইতে পারলাম না। কেন এমনটি হচ্ছে বল তো? বিশ্ব পরিবেশ দিবস প্রতিবছর আসছে, চলে যাচ্ছে – ছেলেমেয়েরা এসে-ডিবেট-ড্রয়িং কম্পিটিশন ইত্যাদি দিয়ে পালন করছে। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে হয় না, কেন প্রকৃতি-মা এতটাই রুষ্ট – আমরা আমাদের স্বল্প পরিসরে কী করতে পারি? কোনও রাস্তা আছে কি প্রকৃতি-মাকে স্নিগ্ধ শান্ত করার?

হ্যাঁ, আছে। দেখে এলাম, ঘুরে এলাম। একা মানুষ, একা হাতে – কোনওরকম সরকারি অনুদান, বনবিভাগের সহায়তা, নেতাদের সাবাশি, মিডিয়ার প্রচার, সব শেষে পড়শির বাহবা ছাড়াই নিজ লক্ষ্যে অটল থেকে শুধু সদিচ্ছা ও সংকল্পের দ্বারা কঠিন পরিশ্রমে এক বালুকাভূমিকে পরিণত করেছেন ‘জঙ্গলে’, যা আয়তনে নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের থেকেও বড়ো।

এবার বলি যার টানে চলে গেলাম ‘মাজুলি’তে। সেই মানুষটির নাম যাদব পেয়াং, যাকে আমরা “ The Forest man of India” নামে ২৬শে জানুয়ারিতে দূরদর্শনের পর্দায় দেখেছি রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পদ্মশ্রী পুরষ্কার পেতে। তাঁর কৃতিত্বের কথা শুনলে আমাদের সকলের মনে একটা উত্তেজনা জাগবে কিছু করার জন্য (অন্ততঃ আমার তো জেগেছে!)। মনে হবে উনি পারলে আমরা কেন পারব না! ঐ যে বললাম, সবার আগে রাখতে হবে ‘সংকল্প’ – কিছু ভালো কাজ করার।

আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল গৌহাটি থেকে। জনশতাব্দি চড়ে পৌঁছে গেলাম যোরহাট। সেখান থেকে নিয়ামাতিঘাট, যে ঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ে মাজুলির উদ্দেশ্যে। সময় লাগে দেড় ঘণ্টা, আসতে একটু বেশি। মাজুলি ব্রহ্মপুত্রের মাঝে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম বালুকাময় দ্বীপ (largest riverine island of the world)। মাজুলির সৌন্দর্যের গল্প শোনাব পরে কখনও।

এই দ্বীপের এক অংশে প্রায় ৫৫০ হেক্টর বালুজমিতে যাদববাবু একা হাতে এক একটি করে গাছ লাগিয়ে ঘন জঙ্গলে পরিণত করেছেন, যা গড়তে সময় লেগেছে তিন দশকেরও বেশি। এই ঘন জঙ্গলে আছে শতাধিক হরিণ, খরগোশ, হাতি, বিভিন্ন প্রজাতির বানর, গণ্ডার, বাঘ, পাখি ও আছে হাজারোধিক গাছ।

সহজ সরল এই মানুষটির সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এই জঙ্গল গড়ে ওঠার ইতিহাস। যাদবের ষোলো বছর বয়সে (১৯৭৯ ইং) এক ভয়ানক বন্যায় এই sand bar-এর বিশাল অংশ ক্ষয়ে ধুয়ে যায় (মাজুলি প্রত্যেক বছরই বন্যায় আক্রান্ত হয়)। জল সরে যাওয়ার পর চোখের সামনে ভেসে ওঠা মরা সরীসৃপ, সাপ, জন্তু-জানোয়ারের দেহ ওঁর অনুভবী মনকে কাঁদিয়ে দিয়েছিল। ওঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল যে ‘এই অবোধ প্রাণীগুলি কতটা অসহায়ভাবে প্রাণ হারাল। আমি কী করতে পারি ওদের জন্যে? ওরা যদি একটু গাছের আশ্রয় পেত, তাহলে কি ওরা বাঁচত না?’ তাই, ষোলো বছর বয়সেই উনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে ঐ বালুকাময় দ্বীপে গাছ লাগিয়ে এক জঙ্গল তৈরি করবেন। সেই মহান ব্রতে ব্রতী হয়ে নিজ প্রচেষ্টায় মাজুলিবাসীকে উপহার দিয়েছেন ঐ শ্যামলিমা।

তবে আপনাদের সবার মতো আমারও ২০১২ সালের আগে ওঁর সম্বন্ধে কিছু জানা ছিল না। ২০০৯ সালে জীতু কলিতা (nature photographer) যাদব পেয়াংকে আবিষ্কার করেন ও স্থানীয় খবরের কাগজে ওঁর ওপরে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেই লেখা পড়ে কানাডার চিত্র নির্মাতা William Douglas Mcmaster ২০১২ সালে ভারতে আসেন ও যাদবকে নিয়ে ১৮ মিনিটের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি করেন, যার নাম “Forest Man”। সেই হল সূত্রপাত। আরও উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে Cannes Film Festival-এ এই ছবি Best Documentary Award পেয়েছিল।

biswerjanalaishan02দেখলাম প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালবাসার ছবি। আবার দেশজুড়ে সবাই অনুভব করলাম মানুষের উপর প্রকৃতির রোষের ছবিটাও। তাই কোনটা বেছে নেওয়া উচিত সেটা তোমাদের বিচার্য।

 বিশ্বের জানালা       সব পর্ব একত্রে

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s