বৈজ্ঞানিকের দপ্তর অংকের বিচিত্র জগত বৈজ্ঞানিক শরৎ ২০১৬

এই লেখার আগের সমস্ত এপিসোড এই লিংকে একত্রে

গণিতশাস্ত্র যত এগোচ্ছিল, ততই তার প্রয়োগও বাড়ছিল সমাজের নানান ক্ষেত্রে। আবার এর পাশাপাশি, মানুষ যত এগোচ্ছিল, ততই ব্যাবসা-বাণিজ্য থেকে শুরুকরে ধর্মাচরণ এই সবকিছুরই নতুন নতুন প্রয়োজন মেটাবার জন্য সৃষ্টি হচ্ছিল গণিতের নতুন নতুন ধারা। উন্নততর হচ্ছিল প্রচলিত গণিতের ধারাগুলোও। গণিতের ইতিহাসের ধারা থেকে একটু সরে দাঁড়িয়ে এইবারে একটু দেখে নেব আমরা কেমন করে সভ্যতার উন্নতি আর গণিতের বিবর্তন হাত ধরাধরি করে চলেছিল ভারতীয় ইতিহাসের সেই সোনালী শতাব্দিগুলোতে।

প্রথমে প্রত্যক্ষ বিনিময় ছিল। তারপর ধীরে ধীরে যখন লেনদেনের পরিমাণ ও ব্যাপ্তি বাড়ল তখন বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মুদ্রা এল। ক্রমে মুদ্রার গুরুত্ব বাড়তে শুরু করল এবং একসময় ব্যাবসার মূলধন হিসেবে বিনিময়ের পণ্যের জায়গায় মুদ্রাই হয়ে উঠল প্রধান। তারপর এল ঋণের এবং বিনিয়োগের ধারণা। সরল ও যৌগিক সুদের বিনিময়ে ঋণ, সঞ্চিত অকার্যকরী ধনকে বাজারে কার্যকরীভাবে ছড়িয়ে দেবার মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে লাগল। ঋণ, বিনিয়োগ ও লেনদেন এই তিনের জন্য মুদ্রার বিভিন্ন ব্যবহার, ও তার হিসেব রাখার প্রয়োজনে পাটিগণিত, এবং তার কিছু বিশিষ্ট শাখা, যেমন সমান্তর ও গুণক শ্রেণী, নিয়ে চর্চা বেড়ে উঠল। আবিষ্কৃত হতে লাগল নতুন নতুন গাণিতিক পদ্ধতি। বাণিজ্য ও গণিতচর্চার মধ্যে প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপন করল ব্রহ্মগুপ্তর ধন ও ঋণরাশির ধারণা।

bigganongker5802 (Medium)আমরা আগেই দেখেছি, কেমন করে পুজোপাঠের বিবিধ প্রয়োজনে শুরু হয়েছিল গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান আর চলাচল অধ্যয়নের বিজ্ঞান। সভ্যতা যখন আরো সামনে এগোল, তখন সেই বিদ্যে পুজারির মন্দির ছেড়ে এসে আশ্রয় নিল সওদাগরের জাহাজে। পণ্য নিয়ে মরুভূমি ও অরণ্যময় প্রান্তর পেরনো বণিকের সার্থবাহের কিংবা সওদাগরের সমুদ্রপোতের অজানা দুনিয়ায় দিক ঠিক করবার জন্য কাজে আসতে লাগল জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা ও তার ফলে সৃষ্ট গাণিতিক পদ্ধতিগুলো। জলযাত্রায় জোয়ার ভাঁটার আনাগোনার সময়ের হিসেব ও তার সঙ্গে চাঁদসূর্যের গতিপথের গণিত বিশেষভাবে সহায়ক হয়ে উঠল। এর হাজারো উদাহরণ মিলবে পুরোনো ভারতের জাতক, কথাসরিতসাগর এইসব গল্পমালায়।

বাণিজ্যে বের হবার জন্য তাই অবশ্যই অধিগত করতে হত তাই জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত গণিতের প্রথম পাঠ। সে কাজের বিশেষজ্ঞদের গড়ে তোলবার প্রয়োজনে একদিকে যেমন এই শাস্ত্রটা উন্নত হল, অন্যদিকে তেমনই গড়ে উঠল বিশেষজ্ঞ শিক্ষকশ্রেণী এবং বিশেষজ্ঞ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখনকার বিহারের কুসুমপুরা কিংবা মধ্যভারতের উজ্জয়িনী তেমনই দুটি প্রাচীনকালের বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। ছিল অজস্র স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও, ইতিহাস যাদের নাম ভুলে গেছে।

এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্ডিতদের মধ্যে জ্ঞানবিনিময়, সওদাগরদের অধিগত জ্ঞান এক দেশ থেকে অন্যদেশে বাণিজ্যসূত্রে ছড়িয়ে যাওয়া, এবং তাদের ভাষান্তরের মাধ্যমে গড়ে উঠল জ্ঞানবিনিময়ের প্রথম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। আজকের ইনটারনেট যা করে, সেদিনও সেই একই কাজ করত এই প্রাক কমপিউটারযুগের ধীর কিন্তু সুসঙ্গঠিত ইনটারনেট। এখন যেমন ইংরিজি, তখন তেমনই মূলত ভারতকেন্দ্রিক সেই জ্ঞান নেটওয়ার্কের মূল ভাষা ছিল সংস্কৃত।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞানকে ক্রমেই আরো বেশি করে প্রয়োগ করা হচ্ছিল কৃষিক্ষেত্রেও। জলবায়ুকে ভালো করে বোঝা, বর্ষণের গতিপ্রকৃতি হিসেব করে বীজবপনের কালনির্ধারণ এই সমস্ত প্রয়োজনেও কালপঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার সৃষ্টিতে গণিতের সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতর  ব্যবহার শুরু হল।

ওদিকে তাত্ত্বিক গণিতজ্ঞরা শুধুমাত্র ব্যবহারিক গণিতে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে ব্যবহার করছিলেন প্রকৃতিকে আরো গভীরভাবে জানা ও তার মাপজোক করবার কাজটিতে। আর্যভট সৃষ্টি করছিলেন মহাকাশে গ্রহদের অবস্থান নির্ণয়ের গাণিতিক মডেল, পৃথিবীর নিজের অক্ষের ওপর ঘূর্ণনের হিসেব, গণনা করেছিলেন পাই-এর মান, মোটামুটি নিখুঁতভাবে হিসেব করে ফেলেছিলেন পৃথিবীর ব্যাসার্ধ আর এক বছরের সময়ের পরিমাণ। এই অনুসন্ধানগুলো করতে গিয়ে যে বাধাগুলো সামনে এসেছিল সেগুলোকে অতিক্রম করতে গিয়েই আবার আবিষ্কার করেছিলেন নতুন নতুন গণিতের তত্ত্ব। এইভাবেই গড়ে উঠল বীজগণিত আর ত্রিকোণমিতির মতন গণিতের গুরুত্বপূর্ণ শাখাদের ভিত্তি।

তাঁর সে কাজকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ভাস্কর(১)গণনা করলেন গ্রহদের উদয় অস্ত, চন্দ্রকলার হ্রাসবৃদ্ধির অঙ্ক। সে কাজ করতে গিয়ে তিনিও আবিষ্কার করলেন গণিতশাস্ত্রের কিছু নতুন দিগন্ত।

ভাস্করের এমন একটা বিশিষ্ট কাজের কথা এইখানে বলে নি। যারা ত্রিকোণমিতি পড়ছ তাদের মজা bigganongkerbichitro01 (Medium)লাগবে। ধরো তোমায় বলা হল sin320 র মান নির্ণয় কর। তোমার কাছে সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর নেই। ত্রিকোণমিতির মান ছাপানো টেবিলও নেই। তখন তুমি পাশের এই ফরমুলাটা কাজে লাগাতে পারো। এখানে অজানা রাশির মান ৩২ বসালেই উত্তরটা বেরিয়ে আসবে।

ষষ্ঠ শতকে উজ্জয়িনীতে বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক বরাহমিহির অন্যান্য কাজের মধ্যে, পূর্ববর্তী জৈন গণিতজ্ঞদের সৃষ্ট বিন্যাস আর সমবায়ের অংকের প্রভুত উন্নতি ঘটিয়েছিলেন।

bigganongko5803 (Medium)এইভাবেই ধীরে ধীরে ব্যবহারিক প্রয়োজন আর গণিতের তাত্ত্বিক গবেষণা একে অন্যকে উৎসাহ দিয়ে ভারতীয় গণিতকে তুলে নিয়ে চলেছিল উন্নতির চূড়ায়। একই সাথে পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি,  ত্রিকোণমিতির উন্নতিসাধনের পাশাপাশি গণিতশাস্ত্রের এক অসীম শক্তিধর শাখার বীজ বোনবার কাজও চলিছিল এই গণিতজ্ঞদের হাতেই। সে হল ক্যালকুলাস বা কলনবিদ্যা। পরের সংখ্যায় আমরা ভারতে তার জন্মকথা পড়ব।

ক্রমশ

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s