বৈজ্ঞানিকের দপ্তর অঙ্কের বিচিত্র জগৎ বৈজ্ঞানিক শীত ২০১৯

অঙ্কের বিচিত্র জগত সব পর্ব একত্রে     

Untitled-1.jpg

বৈজ্ঞানিক

১৭। অঙ্কের বিদেশযাত্রা

খৃষ্টিয় দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সূচনার আশপাশের সময় থেকেই ভারতবর্ষে গণিতের প্রগতি সামান্য ধীর হয়ে এসেছিল। দেশে রাজা বদল, বহিঃশত্রুর ক্রমাগত আক্রমণ এই সবকিছু মিলিয়ে এখানকার প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্রগুলো এই সময় থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে শুরু করে। কিন্তু এই সময়টা থেকেই আবার একেবারে অন্য একটা ধাপ শুরু হয় ভারতীয় অঙ্কের ইতিহাসে। সে হল তার বিদেশযাত্রা।

এর সূচনা, বলা যায় ৭৭২ সালে। সে-বছর একভারতীয় জ্যোতির্বিদ বাগদাদের রাজসভায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলবার পর, খলিফা আল মনসুর তাঁর সভার আল ফজরিকে দায়িত্ব দিলেন কিছু আগের শতাব্দিতে রচিত ভারতীয় পুথি ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’-র জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত গণনাগুলোর আরবিক অনুবাদ করবার। এর কথা এ-লেখাতে আগেও একবার উল্লেখ করা হয়েছে। এই অনুবাদটার নাম দেয়া হয়েছিল আজ- সিন্দহিন্দ-আল কবির। এর সামান্য কিছু টুকরোটাকরা খুঁজে পাওয়া গেছে।

ইতিহাস বলছে, এরপর ফের ভারতীয় গণিতশাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে হাজির হয় খোরাজেম-এর পণ্ডিত ইবন মুসা আল খোরাজেমি-র হাত ধরে।  বাগদাদের পণ্ডিত আল মামুন সেখানে একটা লাইব্রেরি তথা গবেষণাকেন্দ্র তৈরি করেছিলেন সে যুগে। তার নাম বায়াৎ-আল-হিকমা (জ্ঞানগৃহ) (হাউজ অব উইশডম)। বাগদাদের উজ্জ্বল গবেষক ও অনুবাদকরা এইখানে একত্র হতেন।  এই বায়াৎ-আল-হিকমা-তেই খোরাজেমি জিজ-আজ-সিন্দহিন্দ (ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা সারণি বা ইন্ডিয়ান আস্ট্রোনমিক্যাল টেবল্‌স্‌) -এর দুটো সংস্করণের সম্পাদনা করলেন ফের।   বইটাকে পরবর্তীকালে নতুন করে পরিমার্জন করেন আবুল কাসিম আল মাঘৃতি (১০০৭ খৃ)। এই পরিমার্জিত সংস্করণের  লাতিন অনুবাদ করেছিলেন বাথ-এর পণ্ডিত অ্যাডেলার্ড। এখন সেই লাতিন অনুবাদটাই টিকে আছে শুধু, ভারতীয় জ্যোতির্বদ্যার গণিতের আরবদেশ হয়ে ইউরোপে ঢোকবার প্রমাণ হয়ে।  মূল পুথিটা হারিয়ে গেছে। আগের বই আজ-সিন্দহিন্দ-আল-কবির-এর টুকরোটাকরার সঙ্গে এবং ভারতীয় উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে অনুমান করা যায় এর উৎস দুটো ভারতীয় পুথি। তার একটা হল  ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত এবং অন্যটা হল সূর্য সিদ্ধান্ত। প্রসঙ্গত, সূর্য সিদ্ধান্ত এর আগেই, অষ্টম শতাব্দিতে আরবিক ভাষায় অনুদিত হয়েছিল তার পারসিক অনুবাদ থেকে। আরবিতে তার নাম ছিল জিজ-আজ-শাহ্‌ ।  খোরাজেমির এ বইতে অবশ্য ওর সঙ্গে টলেমির আলমাগেস্টে এবং হাউজ অব উইশডম-এর পণ্ডিতদের নিজস্ব মতামতও স্থান পেয়েছিল।

খোরাজেমির আরো একটা পুথিতে ভারতীয় গণিতশাস্ত্রের ছাপ মেলে। সে হল পাটিগণিতের বই। এরও আসলটা হারিয়ে গেছে। টিকে গেছে দ্বাদশ শতাব্দিতে করা এর লাতিন অনুবাদ। তবে সেখানেও বইটা পাওয়া গেলেও তার কোনো নাম পাওয়া যায়নি। এ-বইটাতেই প্রথম ও-ভাষায় ভারতীয় দশমিক পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেয়া হয় বলে দেখা গেছে। আলার্ড ১৯৯২ সালে বইটার একটা সুন্দর অনুবাদ করেন। তার নাম Muhammad Ibn Musa al-Khwarizmi, Le calcul indien, (Librairie scientifique et technique, Albert Blanchard, Paris)

তবে নাম না পাওয়া গেলেও ওর প্রথম দুটো শব্দ যা খোরাজেমি লিখেছিলেন সেদুটো খুব মজার। শব্দদুটো হল ডিক্সিট অ্যালগরিজমি। আধুনিক কমপিউটার শাস্ত্রের সর্বব্যাপী শব্দ অ্যালগরিদম-এর জন্ম হয়েছে ওই শব্দটা থেকেই।

এ বইটায় ভারতীয় সংখ্যা লিখনপদ্ধতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে প্রথমে এইভাবে, “ন’টা অক্ষর দিয়ে হিন্দুরা সব সংখ্যা লিখে ফেলতে পারে! এমন অদ্ভুত এক কায়দা ওরা বানিয়েছে।” আর এইভাবেই দশমিক পদ্ধতির (ন’টি মাত্র সংখ্যাচিহ্ন ব্যবহার করে  সমস্ত সংখ্যাকে প্রকাশ করবার কায়দা) ভারতীয় উৎস ও তার আরবদেশে অনুপ্রবেশের ঐতিহাসিক দলিল রেখে যান খোরাজেমি। 

আর এইখানেই শূন্য ব্যাপারটা কী করে ভারতীয় অঙ্কশাস্ত্রে এল সে বিষয়ে খোরাজেমির বক্তব্যটা এলঃ

“ ৯ এর পরে দশ এর একটা সঙ্কেত তাদের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু যেহেতু ওর পরে ফের ১ ঘুরে আসে, তাই সে যে এক নয়, দশ, সেইটা বোঝাবার জন্য তারা ওর আগে (আরবি ভাষায় আগে মানে হল পরে কারণ ওরা ডান থেকে বাঁয়ে লেখে-সম্পা) একটা ছোটো গোল্লামত বসাত। বোঝাতে চাইত, ওটা হল খালি জায়গা। ওইটা আগে রেখে তারপর কোনো সংখ্যা লিখলে সেটা হবে দশ-এর ঘরের সংখ্যা।…”

এই যে “খালি জায়গা”, বা ভারতয় ভাষায় “শূন্য”, এর আরবি হল সিফ্র্‌। ওই থেকে ইংরিজি জিরো শব্দটা এসেছে এর পর। 

এ-পুথিতে খোরাজেমি দ্বিতীয় যে উল্লেখযোগ্য কাজটা করেছিলেন সে হল যোগ, বিয়োগ, গুণ ভাগ , বর্গমূল দশমিকের গুণভাগ, ভগ্নাংশ কষবার কায়দা এইগুলোর  বিস্তারিত অনুবাদ।

এরপর একাদশ শতাব্দির শেষাশেষি আরব গণিতজ্ঞ আল কারাজি বীজগাণিতিক বহুরাশিক (অ্যালজেব্রিক পলিনোমিয়াল)-এর বর্গমূল বের করবার কায়দার কথা লিখতে গিয়ে জানালেন, তিনি তাঁর গণনাপদ্ধতিতে হিসাব-ই-হিন্দ বা ভারতীয় গণনাপদ্ধতির জানা সংখ্যাদের বর্গমূল নির্ণয়ের কৌশলের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।

আল কারাজির শষ্য আস- সামাওয়াল (দ্বাদশ শতকের শুরু দিকে) তাঁর পুথি আল-বাহির-এতেও জানিয়ে গেছেন, বীজগাণিতিক বহুরাশিকদের ভাগ করবার ক্ষেত্রে তাঁরা ভারতীয় গণনাপদ্ধতির ব্যবহার করেছেন।

আল কারাজির ও তাঁর শিষ্যের এই কাজগুলোর ভারতীয় উৎস বহু প্রাচীন ছিল। সপ্তম শতকে ব্রহ্মগুপ্তের কুট্টক গণিত পুথিতে এদের প্রথম আবির্ভাব হয়। এই বিষয়গুলোর ওপরে আল কারাজি ও আস- সামাওয়ালের সমসময়ে স্বাধীনভাবে ভারতবরর্ষেও গবেষণা করছিলেন ভাস্কর-২। তাঁর গবেষণার ফলাফলগুলোর কথা আগেই আমরা জেনেছি।

ওপরে বলা গণিতজ্ঞ ছাড়াও আরো বহু  মধ্য এশিয় গণিতজ্ঞই আরবিক ও পারসিক ভাষায় তাঁদের নিজস্ব গবেষণাপত্র লিখতে ভারতীয় গণিতশাস্ত্রের অনুবাদকে ব্যবহার করেন। তাঁদের কয়েকজনের নাম জেনে নেয়া যাক

আল ফজরি (অষ্টম শতাব্দি। বাগদাদ)

আল কিন্দি ( নবম শতাব্দি। বসরা), আল কেয়ারাবানি (নবম শতাব্দি। মঘরেব। বইয়ের নাম কিতাব ফি আল হিসাব আল হিন্দি)

আল উকলিদিসি(দশম শতাব্দি। দামাস্কাস। বইয়ের নামের ইংরিজি অনুবাদ দ্য বুক অব চ্যাপ্টারস ইন ইন্ডিয়ান অ্যারিথমেটিক)।

ইবন আল সামা (১১শ শতাব্দি। গ্রেনাডা, স্পেন।) আল নাসাওই(১১শ শতাব্দি। খোরাজেম , পারস্য) আলবিরুনি(১১শ শতাব্দি। খিভা।), আল রাজি (১১শ শতাব্দি। তেহরান)  ইবন আল সাফফার (১১শ শতাব্দি। কোরডোবা)

এরপর ধীরে ধীরে ভারত থেকে আসা বিভিন্ন গণিত সূত্র, উপপাদ্য আর তাদের প্রমাণপদ্ধতির উৎসগুলো ঝাপসা হয়ে এলেও, আরব ও পারসিক পণ্ডিতরা কিন্তু বারংবার স্বীকৃতি দিয়েছেন ভারত থেকে উদ্ভুত গণিতচর্চার ধারাকে। আল গাহেথ নামের এক স্প্যানিশ পণ্ডিত বলেন, “ভারত হল জ্ঞান চিন্তা ও অন্তর্দৃষ্টির উৎসভূমি।” এ-শাস্ত্রের ভারতীয় উৎসের প্রতি ইঙ্গিত করে তারা এর নাম রেখেছিল ‘হিন্দিসা।’

বারংবার ভারতীয় গণিতশাস্ত্রের প্রতি তাঁদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন ভারত পরিব্রাজক আল মাঔদি(৯৫৬ খৃ), কিংবা একাদশ শতকের স্পেনীয় পণ্ডিত রাজকীয় ইতিহাসকার আল আন্দালুসি।

ধীরে ধীরে আরব দুনিয়া থেকে বিভিন্ন অনুবাদ, আত্মীকরণ এইসব পদ্ধতির হাত ধরে এরপর ভারতীয় গণিতের  বীজগণিত (আরবরা তার নাম রেখেছিল এল জেব্র ওয়াল মুকাবলা। সেই থেকে ইউরোপে ঢুকে তার নাম হল অ্যালজেব্রা), ত্রিকোণমিতি (ইউরোপে ঢুকে হল ট্রিগনমেট্রি)ইত্যাদির ধারা গিয়ে পৌঁছায় স্পেন সিসিলি হয়ে ইউরোপীয় ভুখণ্ডে। আবার একই সময়ে এই আরবদের হাত ধরেই গ্রিক মিশরীয় বিজ্ঞান গণিতচর্চার ধারা ভারতবর্ষে এসে ঢোকে।

শেষের কথা

আর এইভাবেই পারস্পরিক বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলল গণিতবিদ্যা, আর তাকে পশ্চাৎপটে রেখে, তার ডানায় ভর দিয়ে এগিয়ে চলল মানুষ আধুনিক যুগের পথে। ইউরোপে রেনেসাঁ এল। তার উন্নত হতে থাকা বিজ্ঞানের ভিৎ-এ বেশ কিছু ইটের জোগান দিল মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আরবি ফারসির হাত ধরে আসা ও ভারত থেকে জেসুইট পাদ্রিদের নিয়ে আসা গাণিতিক জ্ঞান। অন্যদিকে ভারতীয় বিজ্ঞান সমাজ তার দীর্ঘ আলোকোজ্জ্বল যাত্রা শেষে ক্রমে ক্রমে ডুবে গেল মধ্যযুগের অন্ধকারের সমুদ্রে। তারপর একদিন বিজ্ঞানের বলে বলীয়ান ইউরোপের এক দেশ এসে “জ্ঞান চিন্তা ও অন্তর্দৃষ্টির উৎসভূমি” বলে একদা স্বীকৃত এই দেশের দখল নিল। তাদের পণ্ডিত গর্ব করে বলল, এ-দেশের সব জ্ঞান একত্র করলে আমাদের দেশের লাইব্রেরির একটা তাক ভরবে না।তারপর তারা ফের আমাদের নতুন করে আমাদের গড়া গণিতের পাঠ দিতে শুরু করল তাদের ইশকুলে। আর এমনি করেই ইতিহাস নাগরদোলার পাক তার ম্যাজিক দেখাল।

বহুদিন পরে ফের একবার আমাদের দেশটা খানিক খানিক জেগে উঠছে। আবার আমাদের বিজ্ঞানচর্চা আন্তর্জাতিক মহলে খানিক হলেও সমীহ আদায় করা শুরু করেছে গত এক শতাব্দি ধরে। তোমরা যারা এই লেখাটা পড়েছ তাদের কাছেই আমাদের তাই আশা, ফের একবার তোমাদের মধ্যে থেকেই হয়ত এবার ধীরে ধীরে উঠে আসবে আগামী ভারতের নতুন আর্যভট, ব্রহ্মগুপ্ত বা ভাস্কররা। ফের একবার আমরা পৃথিবীকে নতুন নতুন রাস্তা দেখাব। শূন্য থেকে অসীম, সেই সবকিছুর ধারণা, অজানা মহাবশ্বের গ্রহতারার চলাচল নির্ণয়ের উপায় এইসব তো একবার আমরা বিশ্বকে উপহার দিয়েছি। তবু আধুনিক বিজ্ঞান প্রকৃতির আরো অনেক রহস্যের বন্ধ দরজা খুঁজে বের করছে। যেমন ধরো আলোর গতিকে ছাড়িয়ে যাবার পথ। যেমন ধরো ডার্ক এনার্জি। এখনকার গণিত তাদের ছুঁতে পারেনি। তার জন্য হয়ত দরকার হবে একেবারে নতুন কোনো ধ্যানধারণার। দশমিক গণনাপদ্ধতি, ত্রিকোণমিতির প্রয়োগ যেমন একবার কিছু বন্ধ দরজাকে খুলে দিয়েছিল এদেশের মাটতে, কে জানে, হয়ত তোমাদের মধ্যেই কেউ কেউ বড়ো হয়ে তেমনই গণিতচর্চায় নতুন কোনো অদেখা দিগন্ত খুলে দিয়ে, সেই বন্ধ দরজাদের চাবিকাঠি তুলে দেবে মানুষের হাতে! অপেক্ষায় রইলাম।  

সমাপ্ত

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s