বৈজ্ঞানিকের দপ্তর অঙ্কের বিচিত্র জগৎ বৈজ্ঞানিক শীত ২০১৭

এই লেখার আগের সমস্ত এপিসোড এই লিংকে একত্রে

এই সংখ্যার লেখা পড়বার আগে আগের সংখ্যার লেখাটা একবার একটু ঝালিয়ে নিলে সুবিধে হবে

কেমন করে ‘জ্যা’ শব্দটা ভারত থেকে আরব হয়ে বিলেত যাবার রাস্তায় ‘সাইন’ এ বদলে গেল সেইটে বোঝবার আগে সাইন কাকে বলে সেটা জেনে নেয়া যাক।

আগের সংখ্যায় পৃথিবী থেকে চাঁদের গতি মাপবার জন্যে আর্যভট্টের ব্যবহার করা যে ছবি দিয়েছিলাম তার একখানা ফের এইখানে দিচ্ছিঃ

বিজ্ঞানি বসে আছেন E বিন্দুতে। চাঁদ A বিন্দু থেকে B বিন্দুতে এল। তিনি খড়ি পেতে মাটিতে AEB এই কোণটাকে মেপে ফেললেন। এখন পৃথিবী থেকে চাঁদ কতটা দূরে আছে (মানে AE) তার একটা আন্দাজ যদি থাকে, তাহলে চাঁদ কৌণিক সরণ AEBর জন্য কতটা দূরত্ব রৈখিকভাবে সরলো, মানে AB দূরত্বটা কতটা সেটা কীভাবে বের করা যায়?

আগেই বলেছি বিন্দুদুটোর মধ্যে দূরত্ব যত কম হবে ততই A ও Bর মধ্যেকার রৈখিক দূরত্ব (নীল দাগ) ও আসল দূরত্ব (বৃত্তের জ্যা (Chord) টুকু। সবুজ দাগ) সমান হয়ে আসবে। ধরা যাক A ও Bর মধ্যেকার দূরত্ব খুব কাছাকাছি। সেক্ষেত্রে AEB এই কোণটা আর AE বাহুটার সম্পর্ক থেকে AB , মানে ওই জ্যাটুকুর মান বের করবার কৌশল করতে হবে।

দেখা গেল, ABE যদি সমকোণ হয় AEB কোণটা যদি একই থাকে তাহলে ত্রিভূজটা যত বড়ই হোক না কেন, তার AB আর AE বাহুদুটোর অনুপাত সবসময় ধ্রুব থাকবে।  নিচের ছবিটা দেখঃ

পাশের সমকোণী ত্রিভূজদুটোর ক্ষেত্রে কোণটার মান একই আছে। সেক্ষেত্রে AB/AE এবংCD/CEর মান সবসময় এক হবে।

“ক” কোনটার বিভিন্ন মান হলে, এই অনুপাতটারও বিভিন্ন মান হয়।

তাহলে মাটিতে ছোটো ত্রিভূজটা এঁকে তার “ক” কোণটার বিভিন্ন মানের জন্য যদি উল্লম্ব আর অতিভূজের অনুপাতের বিভিন্ন মান বের করে নেয়া যায় তাহলে, লক্ষলক্ষ মাইল লম্বা চওড়া বড়ো ত্রিভূজটার ক্ষেত্রেও অতিভূজটাকে জানলে, আর কৌণিক সরণটাকে মাপতে  সে অনুপাতটা দিয়ে তার সরনের মাপ বা ওই জ্যা ABর মাপ বের করে ফেলা যাবে।

“ক” এর নির্দিষ্ট কোন মানের  জন্য, উল্লম্ব আর অতিভূজের অনুপাতের ধ্রুব মানকে আর্যভট্ট বললেন সে কোণের জ্যা।

এবারে মাটিতে ছবি এঁকে এঁকে “ক” এর বিভিন্ন মানের জন্য উল্লম্ব আর অতিভূজের বিভিন্ন অনুপাতগুলোকে কষে কষে তিনি কোণটার বিভিন্ন জ্যা-এর একটা তালিকা বানিয়েছিলেন। এর বিভিন্ন প্রয়োগের মধ্যে একটা ছিল, রাতের আকাশের তারার অবস্থান মেপে সমুদ্রগামী জাহাজের অবস্থান নির্ণয়। শূন্য ডিগ্রি থেকে নব্বই ডিগ্রি অবধি এলাকাটার মধ্যে চব্বিশটা সমদূরত্বের কোণের জন্য এই জ্যায়ের মান নির্ধারণ করে সে তালকাকে একটা সংস্কৃত কবিতা বানিয়ে লিখে ফেলেছিলেন তিনি। বেজায় নিখুঁত মাপজোক।

বেজায় চাহিদা ছিল আর্যভটের জ্যায়ের তালিকার , সে সময়কার জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিষী, নাবিক, পুরুৎ সবার মধ্যে। ধর্ম, বিজ্ঞান যাতায়াত এই তিন ক্ষেত্রেই গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান নিয়ে যাঁদের কারবার তাঁদের সবার কাছেই অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল এই জ্যা-এর তালিকা।

আরব বিজ্ঞানি মহম্মদ ইবন মুসা খারিজমি নবমশতকে আর্যভটের পুঁথির আরবিক অনুবাদ করেন তখন তিনি, জ্যা-এর বদলে ‘জিভা’  শব্দটাকে ব্যবহার করেছিলেন। সেই আরবিক বই আবার দ্বাদশ শতকে ইউরোপে গিয়ে লাতিন ভাষায় অনুবাদ হল। করলেন ক্রেমোনা-র জেরার্ড।তিনি ভাবলেন খারিজমি বুঝি ভুল করে আরবিক শব্দ ‘জেব’ (মানে পকেট) লিখতে গিয়ে জিভা লিখে ফেলেছিলেন। অতএব তিনি সযত্নে সেই ‘ভুল’টি ঠিক করে ফেললেন নিজের পুঁথিতে। তাঁর বইতে তা হয়ে দাঁড়াল পকেট, বা কাপড় ভাঁজ করে তৈরি গর্ত,বা লাতিনে “সাইনাস”। ইংরেজরা তাদের অঙ্ক বইতে সমকোণী ত্রিভূজের যেকোন নির্দিষ্ট কোণের জন্য ত্রিভূজের উল্লম্ব আর অতিভূজের অনুপাতের এই মানটাকে সেই কোণের সাইন বলে লিখে দিল। আমরা পেলাম আজকের ত্রিকোণমিতির  sin θ কে (ওই কোণের মান, যাকে আমরা “ক” লিখেছি, সাহেবি অঙ্কে তাকে লাতিন বর্ণ θ, α, β এইসব দিয়ে দেখানো হয়।)

ভাবো কাণ্ড! ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল।

সাইন এর মানের তালিকা বা সাইন টেবিল বানিয়েই আর্যভট্ট ক্ষ্যান্ত দেননি কিন্তু। একটা জিনিস তিনি বুঝেছিলেন। শূন্য থেকে নব্বই ডিগ্রির মধ্যে অসংখ্য কোন হতে পারে। ( নব্বই কেন, শূন্য থেকে এক ডিগ্রির মধ্যেও  তো ভগ্নাংশ ধরলে অজস্র কোণ হতে পারে, যথা শূন্য শূন্য দশমিক এক ডিগ্রি, শূন্য দশমিক দুই ডিগ্রি, শূন্য দশমিক শূন্য এক ডিগ্রি, তাই না?) তিনি তো শূন্য ডিগ্রি থেকে নব্বই ডিগ্রির মধ্যে মাত্র চব্বিশটা কোণের সাইন বের করেছেন অনেক মাথা খাটিয়ে। আর কেউ হয়ত  খেটেখুটে আটচল্লিশটা বেরকরল, কিন্তু সবগুলোকণের মান তো কেউ কখনো বের করতে পারবে না। তাহলে ধরো কুড়ি ডিগ্রির সাইনবের হয়েছে, একুশ ডিগ্রির সাইন বের হয়েছে। অথচ কেউ কোন গ্রহের দৌড়োদৌড়ি মাপতে গিয়ে পেয়েছে সাড়ে কুড়ি ডিগ্রি। তখন কী হবে? 

ভেবেচিন্তে এর একটা সমাধান বের হল। সেটা হল ঐকিক নিয়ম।

ব্যাপারটা অনেকটা এইরকম। ধরো তুমি দশ ডিগ্রি আর বারো ডিগ্রির সাইনের মান জানো।(দশমিক সতের আর দশমিক একুশ) এই দু ডিগ্রি কোণ বাড়লে সাইনের মান বাড়ে দশমিক শূন্য চার। তাহলে ঐকিক নিয়ম খাটিয়ে এক ডিগ্রি বাড়লে সাইনের মান কত বাড়বে তার একটা আন্দাজ পেতে পারো।(দশমিক উনিশ)

অতএব আর্যভট্ট এরপর হাত দেন সাইনের মানের হ্রাসবৃদ্ধির টেবিল বানানোতে, যাতে ওই কায়দা খাটিয়ে টেবিলে নেই এমন কোণের সাইনের মোটামুটি মান বের করবার উপায় হাতে আসে। আর ওইটেই ছিল ক্যালকুলাস বা কলনবিদ্যার সূচনা।

এরপর সেই গল্প।

ক্রমশ

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s