বৈজ্ঞানিকের দপ্তর আত্মভোজি পান্নালাল গোস্বামী শীত ২০১৯

চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার – ২০১৬ -য়োশিনরি ওসুমি

আত্মভোজী

পান্নালাল গোস্বামী। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, কটন কলেজ

পরমপুরুষ মহাশক্তিধর ব্রহ্ম। তিনি নির্গুণ, নিরাকার। তিনি বর্ণহীন, গন্ধহীন। তিনি সর্বত্র বিরাজমান কিন্তু তথাপিও তিনি অদৃশ্য। তিনি সকল ইন্দ্রিয়ের অগোচর। তিনি সীমাহীন, তিনি বর্ণনারও অতীত। তিনি মহাকাল। উপলব্ধির বাইরে তার অস্তিত্বের কথা জানার বা বোঝার কোনো গত্যন্তর নেই। মহাশক্তিধর হয়েও আদি পিতার মনে কোনো সুখ বা আনন্দ নেই। তিনি বড়োই একাকী। তাই মনোরঞ্জনের জন্যে নিজেরই সেই নিরাকার মহাশক্তির এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশকে দিলেন সাকার রূপ। সৃষ্টি হল পরমা প্রকৃতির। জন্মলাভ করেই সুন্দরী প্রকৃতি মহাকালের দুন্দুভির ‘ডুগ ডুগ’ ‘ডুগ ডুগ’ বাদ্যধ্বনির তালে তালে নাচতে শুরু করলেন। কে এই পরমা প্রকৃতি? ইনি সর্বগুণে গুণান্বিতা, সৃষ্টিশীলা। ইনি অঙ্কবিদ, ইনি শিল্পী। ইনি এক মহাবিজ্ঞানী। প্রভুর আনন্দ বিধানের জন্যে সৃষ্টি করতে শুরু করলেন অলেখ বস্তুর। নিত্য নতুন সৃষ্টির উল্লাসে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে পড়লেন। সমগ্র জগৎখানি গাছগাছালি, ফল-ফুল আর জীবজন্তুর দ্বারা সমৃদ্ধ হতে শুরু করল। আর সর্বশেষে সৃষ্ট হল প্রকৃতির আধুনিকতম উদ্ভাবন— মানবকুল। (উপনিষদের ছায়া অবলম্বনে) 

এই মানবদেহটা যেন এক বিশাল বড় ‘ইন্ডাস্ট্রিয়েল কমপ্লেক্স। এই কমপ্লেক্স-এর অনেক ইউনিট। মস্তিষ্ক, হার্ট, লিভার, কিডনি, স্টমাক ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতিটি ইউনিটেরই নির্দিষ্ট কামকাজ। সহস্র ধরনের ক্রিয়াকাণ্ড প্রতিটি মুহূর্তে এখানে সংঘটিত হচ্ছে। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ মূল কন্ট্রোলিং ইউনিট’ মস্তিষ্কের নির্দেশমর্মে সুচারুরূপে আর নির্ভুলভাবে সংঘটিত হয়ে এই মানবজীবন সংবাহিত হচ্ছে। 

এই বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়েল কমপ্লেক্সে অহরহ চলতে থাকা কর্মযজ্ঞের জন্যে চাই প্রচুর শক্তি। এই বিশাল চালিকা শক্তির উৎস কী? কোথা থেকে এবং কীভাবে এই শক্তি উৎপাদিত হয়? এর উত্তর পাবার জন্যে এই দেহখানার  আরও কিছু অন্তর্নিহিত কথা জানতে হবে। আমাদের দেহের সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিভিন্ন দেহকোষের সমন্বয়ে গঠিত। 

দুশো রকমের দেহকোষ এই কাজ করছে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দেহগঠনের জন্যে সর্বসাকুল্যে কত সংখ্যক দেহকোষ নিয়োজিত? এর সংখ্যা কয়েকশো ট্রিলিয়ন। এক ট্রিলিয়ন মানে এক লক্ষ কোটি। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয় যে এই বিশাল সংখ্যক দেহকোষের সৃষ্টি হয় নামমাত্র একটা কোষ থেকে। পিতার একটা শুক্রাণু এবং মাতার মাত্র একটা ডিম্বাণুর মিলনের ফলে সৃষ্ট একটা সম্মিলিত তথা নিষিক্ত দেহকোষ বিভাজিত হতে শুরু করে প্রথমে ‘মরুলা, এরপর ব্লাস্টোসিস্ট’ তথা বীজপুটিতে রূপান্তরিত হয়। এই বীজপুটি থেকে আরও কোষ বিভাজনের মাধ্যমে সৃষ্ট হয় কাণ্ডকোষ তথা ‘স্টেমসেল’। এই স্টেমসেলই হল বিভিন্ন ধরনের কোষ প্রজননের উৎসস্থলী। এখান থেকেই বিভিন্ন ধরনের নির্দিষ্ট কোষগুলির সৃষ্টি হয়ে হয়ে বিভিন্ন ধরনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি গঠিত হতে থাকে। তাহলে দেখা গেল যে সম্পূর্ণ মানবদেহ (তথা জীবদেহ) অসংখ্য দেহকোষের সমষ্টির বাইরে আর কিছুই নয়। প্রকৃতপক্ষে সবকটা দেহকোষেরই প্রাথমিক উপাদানগুলি কিন্তু একই। সামান্য তারতম্যের ফলে বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গজনিত কোষগুলির উৎপত্তি ঘটে। এই বিশালসংখ্যক কোষগুলিই প্রকাণ্ড দেহটার জন্যে প্রয়োজনীয় সমস্ত শক্তির উৎসস্থল। 

শক্তি উৎপাদনের জন্যে প্রয়োজন ইন্ধনের। আমাদের খাদ্যবস্তুগুলিই ওই ইন্ধনের কাজ করে যাচ্ছে। খাদ্যবস্তুগুলি স্টমাকে পাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র কণিকাতে পর্যবসিত হয়ে খাদ্যনালীর মধ্য দিয়ে গিয়ে রক্তনালীর মাধ্যমে রক্তবাহিত হয়ে সবকটা দেহকোষে গিয়ে প্রবেশ করে। দেহকোষে নিউক্লিয়াসের বাইরে সাইটোপ্লাজম অংশে বহু ধরনের ‘অরগানেল’ তথা কোষাংশ (Chamber) আছে। তার মধ্যে প্রধান কয়টি হল রাইবোজোম, মাইটোকনড্রিয়া, লাইসোজোম, পেরক্সিজোম, প্রোটিয়াজোম, গলগি বডি ইত্যাদি ইত্যাদি। রক্তের মাধ্যমে খাদ্যবস্তুর কণিকাগুলির সঙ্গে অক্সিজেনও সংবাহিত হয়ে দেহকোষে এসে ঢােকে। এবার মাইটোকনড্রিয়াতে থাকা বিশেষ ধরনের এনজাইমগুলি অনুঘটক হিসাবে এই জৈব অণুগুলিকে আণবিক অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটিয়ে দহনকার্য সম্পন্ন করে। মাইটোকনড্রিয়াতে ঘটতে থাকা এই জারণ প্রক্রিয়ার ফলে উদ্ভূত রাসায়নিক শক্তি ATP (Adenosin Tri Phosphate) বানাতে শুরু করে দেয়। এই ATPই প্রধান শক্তিবাহক হিসেবে কোষের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে দেহকোষের সবধরনের কামকাজের জন্যে শক্তির জোগান ধরে। এইজন্যে মাইটোকনড্রিয়াকে ‘সেলের ব্যাটারি’ বলেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। এখন যদি খাদ্য তথা ইন্ধনের জোগান বন্ধ করে দেওয়া হয়, মানে জীব একটা উপোসে থাকে তাহলে তার শক্তি কোথা থেকে আসবে? এই অবস্থাটা শিশু একটার জন্মের ঠিক অব্যবহিত পরই অর্থাৎ মাতৃর সঙ্গে সংযুক্তিটা ছিন্ন হওয়ার পরই শিশুটির ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। তখন শিশুটির শক্তির জন্যে ইন্ধন কোথা থেকে আসে? এইগুলির উত্তর আমরা ধীরে ধীরে পেতে থাকব। 

বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে বেলজিয়ান বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান দ্য ডুভ দেহকোষের ভেতরে থাকা একটা অদ্ভুত ধরনের কোষাংশ (Organelle) আবিষ্কার করেন। লাইসোজোম বলে তিনি এর নামকরণ করলেন। কী এটার বিশেষত্ব ? এই চেম্বারটির ভেতর আছে বিশেষ কিছু ধরনের এনজাইম। এই চেম্বারে থাকা তরল যথেষ্ট আম্লিক (pH < 5)। এই পারিপার্শ্বিক অবস্থায় দেহকোষে থাকা যথেষ্ট সংখ্যক প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, লিপিড ইত্যাদিকে সেই চেম্বারে ঢুকিয়ে সে হজম করে দেয়। শুধু তাই নয়, অনেক সময় কোষে থাকা অন্যান্য অরগানেল বা তাদের ভগ্নাংশকেও লাইসোজোম তার চেম্বারে ঢুকিয়ে নিয়ে ভেঙে দিতে পারে। মানে কোষে থাকা কম প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় অরগানেল বা তাদের ভগ্নাংশ, লিপিড, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ইত্যাদিকে নির্দিষ্ট এনজাইমের সাহায্যে জলবিশ্লেষণ (Hydrolysis) ঘটিয়ে সেইগুলির প্রাথমিক একক-অণুর সৃষ্টি করে। এরপর ওই দেহকোষ সেই প্রাথমিক একক-অণুগুলিকে কাজে লাগিয়ে আবার তার প্রয়োজনীয় প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ইত্যাদি বানিয়ে তার জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে। লাইসোজোম চেম্বারটা যেন একটা ওয়ার্কশপ বা ওয়ার্কস্টেশন যেখানে অপ্রয়োজনীয়, অব্যবহৃত বা বিকল হওয়া যন্ত্রপাতি ঢুকিয়ে দিয়ে সেইগুলি থেকে নাট-বল্টু ইত্যাদি খুলে খুলে সরু সরু যন্ত্রাংশগুলি আহরণ করে সেইগুলিকে আবারও কার্যকরী এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্র বানানোর জন্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এটা এক সুন্দর ‘রিসাইক্লিং’ প্রক্রিয়া। জরুরিকালীন অবস্থায় অর্থাৎ উপবাসে থাকলে কোষে পুষ্টি তথা ইন্ধন জোগাতে এই ব্যবস্থাটাই কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করে। লাইসোজোম সেলেরই একটা অংশ আর সেলেরই অন্যান্য অংশ বা কম প্রয়োজনীয় (তথা অপ্রয়োজনীয়) বা ভাঙা অংশকে এটা হজম করে দেয়। প্রক্রিয়াটা এইরকমই প্রতীয়মান হচ্ছে যেন কোষ একটা নিজেকে নিজেই খাচ্ছে। বিজ্ঞানী স্লভ এই প্রক্রিয়াটির নাম দিলেন ‘Autophagy(Greek = Auto = Self; and Phagein = to eat), মানে ‘self eating.’ তাই আমরাও এটাকে ‘আত্মভোজী’ প্রক্রিয়াই বলব। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটাতে সেলে থাকা, ভাঙার জন্যে নির্দিষ্ট, বস্তুসামগ্রীকে যেন একটা বোচকা বেঁধে বয়ে এনে লাইসোজোম চেম্বারে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। প্রক্রিয়াটা ঠিক যেন আমাদের মিনিউসিপালিটির আবর্জনা এককাট্টা করে বস্তায় পুরে বোচকা বেঁধে এনে কোনো প্রসেসিং ইউনিটে ঠেলে দেওয়া। সেলের এই বিশেষ বোচকাগুলির নাম দেওয়া হল। ‘অটোফেগোজোম (Autophagosome)। ডুভ অটোফেগোজোমের কথা কল্পনা করলেন ঠিকই কিন্তু এর অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারেননি। যাই হােক, এই লাইসোজোম আবিষ্কারের জন্যে ক্রিশ্চিয়ান দ্য ডুভ 1974 সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। 

এরপরই আরম্ভ হল এই অটোফেগোজোমের অস্তিত্বকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের চিন্তা-ভাবনা। ভাবার সঙ্গে খুঁজতে থাকলেন— কী প্রক্রিয়ায় এই ‘আত্মভোজী’ পর্ব চলছে? কে নিয়ন্ত্রণ করছে এর গতিপথ? গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে এসবেরই উত্তর খুঁজে পেলেন জাপানের বিজ্ঞানী য়োশিনরি ওসুমি ও তার সঙ্গীরা। এই কাজের জন্য 2016 সালের চিকিৎসা বিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার দিয়ে ওসুমিকে সম্মান জানাল বিজ্ঞান জগৎ। 

পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্যে ওসুমি ইস্ট সেলের সাহায্য নেন। কেননা, ইস্ট সেলের সঙ্গে মানুষের দেহকোষের যথেষ্ট মিল পাওয়া যায়। এই ইস্ট সেলের মধ্যে Vacuole নামে একটা থলে আছে যার সঙ্গে মানুষের দেহকোষের লাইসোজোমের সঙ্গে যথেষ্ট মিল আছে। এই Vacuole-এ প্রোটিনের বিভঙ্গন ঘটে থাকে। কিন্তু এটা আত্মভোজী প্রক্রিয়ার মতোই হয় কি না তা-ই বিচার্য। এদিকে অটোফেগোজোমও গঠিত হয় কি না সেটাই বা কী করে দেখা যাবে ? কারণ, ইস্ট সেল এতই সরু যে মাইক্রোস্কোপের তলায় এটাকে ভালো করে নজরে আনাই যথেষ্ট কষ্টকর। তথাপি, ইস্ট সেলে ‘অটোফেজি’ হয় কি না এই সব নিয়ে ভাবতে ভাবতে ওসুমি এক অদ্ভুত পন্থা বের করলেন। প্রথমেই স্বাভাবিক ইস্ট সেলের Vacuole-এ থাকা এনজাইমগুলোকে নিষ্ক্রিয় (ডি-অ্যাক্টিভেট) করে অটোফেজি হওয়ার অবস্থাকে সক্রিয় করে দিলেন, মানে ইস্ট সেলটাকে উপোস রেখে দিলেন। স্বাভাবিক খাদ্যের জোগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অটোফেজি জনিত কার্যকলাপ শুরু হয়ে গেল। বেশ কিছু সময় পার হয়ে যাওয়ার পর ওই ইস্টসেলটাকে আবার মাইক্রোস্কোপের তলায় নিয়ে আসতেই আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলেন যে সেই সেলটার Vacuole-এ বেশ কয়েকটা থলে জমা হয়েছে আর সেগুলো বিভাজিত হয়নি। 

বলা বাহুল্য যে ওই থলেগুলি অটোফেগোজোম অর্থাৎ ‘অটোফেজি’ মানে ‘আত্মভোজী’ প্রক্রিয়াটা যে ইস্টসেলেও ঘটে আর সেটা যে মানুষের দেহকোষে ঘটতে থাকার মতোই, তা-ই প্রমাণিত হল।। 

এরপরই আরম্ভ হল ধারাবাহিক প্রণালীবদ্ধ এক্সপেরিমেন্ট। প্রথমেই ওসুমি অটোফেগোজোম প্রস্তুতকারী জিন আবিষ্কার করে ফেললেন। তারপর সেই জিন দ্বারা নির্ধারিত কার্যকরী প্রোটিনের সনাক্তকরণ ঘটল। অটোফেজি প্রক্রিয়া একগুচ্ছ প্রোটিন এবং প্রোটিন কমপ্লেক্স কীভাবে অটোফেগোজোম প্রস্তুত করছে সেটাই (আরম্ভ থেকে শেষ পর্যায় অবধি) নীচের ছবিতে দেখানো হল। 

সেলে যখনই উপোস কিংবা অন্য কোনো ধরনে চাপ সৃষ্টি হয় অর্থাৎ স্বাভাবিক নিয়মে শক্তি উৎপাদনে ব্যাঘাত জন্মে তখনই নির্ধারিত জিনের সংকেতমর্মে কিছু নির্দিষ্ট প্রোটিনগুচ্ছ সেলে থাকা বড় বড় প্রোটিন কমপ্লেক্স (যেগুলিকে প্রোটিয়াজোম ভাঙতে পারে না), ভাঙা কোষাংশ (Broken Organelle), সময় বিশেষে অপ্রয়োজনীয় বা কম প্রয়োজনীয় কোষাংশ (Organelle), বড় অথবা ভাঙা কার্বোহাইড্রেট, লিপিড (যেগুলিকে মাইটোকনড্রিয়া ‘কনজিউম করতে পারে না) ইত্যাদিকে পাকড়াও করে দুই পর্দা বিশিষ্ট ঢাকনি দিয়ে ‘অটোফেগোজোম’ নামের থলে বানিয়ে লাইসোজোম এর দিকে যেতে শুরু করে দেয়। এই অটোফেগোজোম যেন সাফাইওয়ালা, সেলের আবর্জনাকে এককাট্টা করে থলে বানিয়ে নিষ্কাশন কক্ষ তথা প্রসেসিং ইউনিট লাইসোজোমে নিয়ে যায়। লাইসোজোমের বহিরাবরণে থাকা প্রোটিনগুলি অটোফেগোজোমকে সনাক্ত করলেই তার দুয়ার খুলে দিয়ে একে তার ভেতরে ঢুকিয়ে নেয়। এরপরই লাইসোজোমে থাকা এনজাইমগুলি আম্লিক জলবিশ্লেষণের (Acidic Hydrolysis) সাহায্যে অটোফেগোজোমে বয়ে আনা বস্তুগুলিকে ভেঙে ভেঙে ছোট ছোট, পুনর্ব্যবহারযােগ্য জৈব-অণু বানাতে শুরু করে দেয়। এই হল আত্মভোজী প্রক্রিয়া। এরপর ওই ছোট ছোট জৈব-অণুগুলিকে লাইসোজোম তার কারখানা থেকে আবার সাইটোপ্লাজমে বের করে দেয়। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একক জৈব-অণুগুলিকে দিয়ে সেল আবার তার প্রয়োজনীয় সামগ্রী (যেমন মাইটোনকড্রিয়াতে ব্যবহৃত হওয়ার মতো ইন্ধন, প্রয়োজনীয় Organelle ইত্যাদি) বানিয়ে সেলটাকে কার্যক্ষম করে রাখে। মাইটোকনড্রিয়াতে ইন্ধন জোগান দিতে পারা সামগ্রী বানিয়ে পরোক্ষভাবে এ শক্তির জোগান দিচ্ছে। লাইসোজোম যেন সেল একটার ইনভার্টার। 

এই আত্মভোজী প্রক্রিয়াটা জ্বণ গঠনের সময় থেকেই আরম্ভ হয়ে যায়। ছোটবেলায় এই প্রক্রিয়া যথেষ্ট সক্রিয় থাকে, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। আত্মভোজী প্রক্রিয়া কমতে থাকলে সেলে বহু অকামা, আবর্জনা জাতীয় পদার্থ জমতে শুরু করে দেয়, তখন সেলটা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে বলে বলা হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারিয়ে সেল একটা সময় মরেও যায়। তাহলে দেখা গেল যে আত্মভোজী প্রক্রিয়াটাকে সক্রিয় করে রাখতে পারলে সেল একটার আয়ুও বেড়ে যায়। বহুধরনের ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস-রা সবসময়ই আমাদের আক্রমণ করে যাচ্ছে। এই আত্মভোজী প্রক্রিয়া সেলের মধ্যে প্রবেশ করা ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদিকে অটোফেগোজোমের মাধ্যমে বেঁধে নিয়ে লাইসোজোমে ঢুকিয়ে দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। বার্ধক্যের সময় এই অটোফেজি প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে পার্কিনসন, ডায়াবিটিস-২ এবং অন্যান্য বার্ধক্যজনিত সমস্যাগুলি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ক্যান্সার হওয়া এবং তার নিরাময়ের সঙ্গে অটোফেজির সম্পর্কের বিষয়েও অধ্যয়ন চলছে। অটোফেজি মেকানিজম’-কে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের জন্যে ওষুধপত্র বানানোর কাজও শুরু হয়ে গেছে। ওসুমীর এই যুগান্তকারী আবিষ্কার চিকিৎসা জগতের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। 

মহাবিজ্ঞানী প্রকৃতি তার আধুনিকতম অপরূপ সৃষ্টি এই মানবদেহটাকে জিইয়ে রাখার জন্য অন্তঃশরীরিয় ভাবে কত ধরনের ব্যবস্থা যে করে রেখেছেন তার ইয়ত্বা নেই। বিভিন্ন ধরনের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা ইমিউনিটি, ডি.এন.এ. মেরামতির সাহায্যে বংশগতির সুরক্ষা, আত্মভোজী প্রক্রিয়ায় সেলের বিশুদ্ধিকরণ তথা বিকল্প শক্তির জোগান— 

ইত্যাদির মাধ্যমেই আমরা বেঁচে আছি। 

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s