বৈজ্ঞানিকের দপ্তর আবিষ্কারের খোঁজখবর রাজীব কুমার সাহা শরৎ ২০১৬

আগের পর্ব

 bigganabishkarlogo (Medium)

আবিষ্কারের কাহিনি

রাজীবকুমার সাহা

পর্ব ২

এই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন খোঁজ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই বিভাগে।

বড়শি (Fish Hook) (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫,০০০)

bigganabishkar (2) (Medium)আদিম জাতি যে অচিরেই মাছ শিকার করতে শিখে ফেলেছিল তার বড়সড় প্রমাণ মেলে প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন প্রায় ৩৫,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের বড়শি খোঁজে পান। এগুলো মূলত জীবজন্তুর হাড়, শক্ত ঝিনুক, পশুর শিং আর গাছের শক্ত ডালপালা দিয়েই তৈরি করা হত। প্রাথমিক অবস্থায় অবশ্য শুধুমাত্র গাছের ডালপালা দিয়েই বড়শি বানিয়ে মাছ ধরতে শিখেছিল আদি মানব। মাছ শিকারের ক্ষেত্রে হয়তো ডালপালার বড়শিই বেশি সুবিধেজনক ছিল। কেননা, সত্তরের দশকেও কাঠনির্মিত বড়শি ব্যবহৃত হত জলজ প্রাণী শিকারের কাজে। ধীরে ধীরে সাধারণ বড়শিকে কাঁটাযুক্ত বড়শিতে পরিণত করে খাবার তালিকায় নিয়মিত মাছের পদ নিশ্চিত করে ফেলে তারা। ক্যানবেরাস্থিত অস্ট্রেলীয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নত্তত্ববিদ সুসান ও’কনর ও তাঁর দলবল দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার পূর্ব টিমরে চুনাপাথরে তৈরি জেরিমালাই নামক এক গুহায় এই ধরনের বড়শিসহ বিশালাকৃতির টুনা জাতীয় মাছের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। প্রথমে ঝিনুকের শক্ত খোলের তৈরি দুটো ভাঙা বড়শি নজরে এলেও পরে এই গুহা থেকে ৩৮০০০-এরও বেশি মাছের কাঁটা আবিষ্কৃত হয় এবং পরীক্ষাগারে কাঁটাগুলোর বয়স প্রায় ৪২০০০ বছর বলে নির্ণীত হয়। এর ফলে প্রায় চল্লিশ থেকে বিয়াল্লিশ হাজার বছর আগেও আদিম মানুষ বড়শি দিয়ে মাছ শিকারে পটু ছিল বলে অনুমিত হয়।

     “Opportunities are… everywhere and so you must always let your hook be hanging.” –  Augustine ‘Og’ Mandino, writer.

হিসাবরক্ষক লাঠি (Tally Stick) (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫,০০০)

bigganabishkar (3) (Medium)১৯৬০ সালে বেলজিয়ান কঙ্গোতে একধরনের বেবুনের ঊরুর হাড় পাওয়া যায় যেটাতে লম্বভাবে তিনটি দাগের ওপর আড়াআড়িভাবে অসংখ্য দাগ কাটা ছিল। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা ও সোয়াজিল্যান্ডের মধ্যবর্তী লেবম্বো পর্বতমালায় ঠিক এই ধরনেরই বেবুনের ঊরুর হাড় আবিষ্কৃত হয় যাতে মোট ২৯টি স্পষ্ট খাঁজের হদিশ মেলে। লেবম্বো পর্বতমালার নামানুসারে এই হাড়ের নামকরণ করা হয় লেবম্বো হাড়। প্রায় দুই ডজন রেডিও কার্বন ডেটিং পরীক্ষার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে এগুলো প্রায় ৩৫,০০০ খ্রিষ্টপূর্ব সময়কার। তবে হাড়খানার একপ্রান্ত ভাঙা থাকার কারণে ঠিক কতটা খাঁজ তাতে ছিল তা অনুমান করা যায়নি। ধারণা করা হয়, এই জাতীয় হাড় বা কাঠি দ্বারা আদি মানব চান্দ্রকলা বা দশা (লুনার ফেজ) পরিমাপ করত। তবে এর আগে ১৯৩৭ সালে চেকস্লাভাকিয়ায় খননকার্যের ফলে কার্ল অ্যাবসোলন নেকড়ের হাড় বলে অনুমিত যে ট্যালি স্টিক খুঁজে পান তা ৩০,০০০ বছরের পুরনো বলে দাবি করা হয়। এতে মোট ৫৫টা দাগ ছিল যা অনেকে ট্যালি মার্কস বলে মনে করেন।

     “… with worn-out, worm-eaten rotten bits of wood… a savage mode of keeping accounts…” –  Charles Dickens, novelist.

ছিদ্র (Pierce) (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫,০০০)

bigganabishkar (4) (Medium)মনে করা হয়, সুতীক্ষ্ণ বর্শা জাতীয় কোনও অস্ত্রদ্বারা মানুষ একসময় কাঠ, পশুর মোটা চামড়া ইত্যাদি ছিদ্র করতে শিখেছিল উপস্থিত প্রয়োজনে। অনেক পরে প্রাচীন মিশরীয় কাষ্ঠশিল্পীরা আস্তে আস্তে ধনুকের মতো বাঁকানো একধরনের দড়ি প্যাঁচানো যন্ত্রদ্বারা ছোটবড় নানাধরনের ছিদ্র করতে শিখেছিল। ৯,০০০ খ্রিষ্টপূর্বে দাঁত ছিদ্র করার কৌশল মানুষের অবগত ছিল বলে প্রমাণিত হয়েছে। কালে কালে রোমানরা ছিদ্রের কাজে আগর ব্যবহার করতে শুরু করে।

ধারালো পাথর ফলক (Sharp Stone Blade) (খ্রিষ্টপূর্ব ৩০,০০০)

bigganabishkar (5) (Medium)আদিম মানব শিকার করতে শিখল। পাশাপাশি শিকারের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত উৎকর্ষতা এবং অস্ত্রশস্ত্রের আধুনিকীকরণের দিকে সচেষ্ট হল। মানুষ উপলব্ধি করল, ভোঁতা পাথর বা সাধারণ লাঠিসোঁটার চেয়ে ধারালো বা তীক্ষ্ণ অস্ত্রশস্ত্রই শিকারের পক্ষে আদর্শ। শুরু হল সাধারণ কোনও কঠিন পাথরকে কোনও শক্ত কাঠের টুকরো বা হাড়গোড় বা অপর কোনও অপেক্ষাকৃত শক্ত পাথর দ্বারা আঘাত করে করে ধারালো এবং তীক্ষ্ণ করে তোলা। পাথর থেকে নির্গত প্রচুরসংখ্যক ছোটবড় পাথরকুচিগুলো দিয়ে আবার ছোটখাটো অস্ত্র যেমন, কাস্তে, ছুরি, তির বা বর্শার ফলক ইত্যাদি তৈরি করা হত। নিরীহ পাথরকে ধারালো করে তোলার এই কৌশলকে বর্তমানে ‘লিথিক রিডাকশন’ বলা হয়। যে ধরনের পাথর এ কাজের জন্য বেছে নেওয়া হয় সেগুলোর মধ্যে চকমকি পাথর ছিল অন্যতম।

     “Regardless of our ancestral heritage, we’re all descended from flintknappers.” –  Bert Mathews, sharp stone maker.

সেলাই (Sewing) (খ্রিষ্টপূর্ব ২৫,০০০)

bigganabishkar (1) (Medium)সূচ আর সুতো দিয়ে দুটো জিনিস একত্রে গেঁথে দেওয়া নতুন কোনও ব্যাপার নয়। তবে এই শিল্পটা যে এত প্রাচীন তা হয়তো আমাদের অনেকেই ধারণার বাইরে। আদি প্রস্তরযুগ তথা খ্রিষ্টপূর্ব ২৫,০০০-এর কাছাকাছি সময়ই মানুষ যে সুই-সুতোর সাহায্যে গাছের বড়ো বড়ো মজবুত পাতা, ছাল-বাকল আর পশুর চামড়া সেলাই করে নিজের পোশাক পরিচ্ছদ তৈরি করত তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্স আর রাশিয়ার মস্কোর কাছাকাছি। প্রত্নতাত্ত্বিকরা পশুপাখির হাড়গোড় দ্বারা নির্মিত সূচের সন্ধান পান। শুধু তাই নয়, ফ্রান্স এবং সুইজারল্যান্ডে বিভিন্ন সুদৃশ্য বীজ আর পশুপাখির দন্ত-খচিত আদিম মানবের কিছু পরিধেয় বস্ত্রও উদ্ধার করা হয়। তাছাড়া সাধারণ সূচ হিসেবে আমেরিকার আদিবাসীরা গাছ-গাছড়ার কাঁটাযুক্ত পাতাও ব্যবহার করত।

এর পর আগামী সংখ্যায়

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s