বৈজ্ঞানিকের দপ্তর আবিষ্কারের খোঁজখবর রাজীবকুমার সাহা বর্ষা ২০১৯

আগের পর্বগুলো

এই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব-প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন খোঁজ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই বিভাগে।

পর্ব – ১৩

বর্শা (Pike) (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০)

আলেকজান্ডারের পিতা মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ প্রায় ২৫০০ বছর আগে তাঁর সৈন্যদলের চক্রব্যূহে নতুন ধরনের এক শস্ত্রের আমদানি করলেন। দেখতে তা বর্শার মতো, লম্বায় প্রায় ২০ ফুট। নাম তার সারিসা। এই শস্ত্রের দৈর্ঘ্যের কারণে স্বভাবতই প্রতিপক্ষের সৈন্যেরা অপেক্ষাকৃত ছোটো অস্ত্রশস্ত্র হাতে এর সামনে দাঁড়াতে পারত না। পাঁচ বৃত্তের চক্র রচনা করে রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের সৈন্যেরা গোটা কদম ফুলের মতো বর্শা হাতে ব্যূহ রচনা করত। সে ব্যূহ ভেদ করা প্রতিপক্ষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। পরবর্তীকালে আলেকজান্ডারও পিতার এই রণকৌশল অবলম্বন করে অনেক যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন।

চুম্বকীয় দিকনির্ণয় যন্ত্র (Magnetic Compass) (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০)

এই জিনিসটির আবিষ্কার হয় চিনদেশে। চিনে তখন কিন সাম্রাজ্য। সেদেশের ভবিষ্যতদ্রষ্টারা আয়রন অক্সাইডের একটুকরো পাথর ব্যবহার করতেন যেটা প্রাকৃতিক নিয়মেই সর্বদা উত্তর-দক্ষিণমুখো হয়ে থাকত। ক্রমে এই পাথরখণ্ডকে একটা চৌকোনা চ্যাটালো ধাতব খণ্ডের আকার দেওয়া হল। ওপর তলে জুড়ে দেওয়া হল একটা সূচকও। এই সূচকের আকৃতি দেখতে টেবিল চামচের মতো, হাতলটা মুখ করে থাকত দক্ষিণদিকে। সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ প্রায়। শুরু হল আদি কম্পাস থেকে বর্তমানের অত্যাধুনিক কম্পাসের জয়যাত্রা।

মারুত চুল্লি (Blast Furnace) (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০)

পৃথিবীর প্রাচীনতম মারুত চুল্লিও প্রস্তুত হয়েছিল চিনদেশেই। সময়কাল প্রায় ৪০০ খ্রিস্টপূর্ব। সেদেশে তখন হান রাজত্ব। প্রাথমিকভাবে কাস্ট আয়রন দ্বারা তৈরি ফার্নেস ব্যবহৃত হত মূলত ব্রোঞ্জ গলানোর কাজে। এই চুল্লিতে জ্বালানি এবং ধাতব আকরিক নিক্ষেপ করা হত ওপরের মুখ দিয়ে। চুল্লির তলায় ব্যবস্থা রাখা হত বায়ু চলাচলের। ওপরের মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে গিয়ে তলার নির্দিষ্ট পথে বেরিয়ে আসত গলিত ধাতু।

গুলতি (Catapult) (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০)

গুলতি আবিষ্কৃত হয় সিরাকিউসের সিসিলিয়ান শহরে ৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বে। প্রাচীন গ্রিসে এর পরিচিতি ছিল ঢাল-ছেদক হিসেবে। হাতে ছুড়ে আম পাড়ার জিনিস এ নয়। রীতিমতো কামানের আকারে তৈরি যুদ্ধাস্ত্র। এই যন্ত্র থেকে ছোড়া বল অনেক উন্নত ধনুককেও টেক্কা দিতে পারত। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বহুবার এর ব্যবহার করেছেন যুদ্ধক্ষেত্রে। চিনা, গ্রীক এবং রোমানরা পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধরনের উন্নত গুলতি ব্যবহার করত বলে প্রমাণ রয়েছে।

রেকাব (Stirrup) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০)

বারুদ আবিষ্কারের আগে অবধি রেকাব ছিল একজন যোদ্ধার জন্যে সবচেয়ে শক্তিশালী আবিষ্কার। এর আগে অশ্বারোহী যোদ্ধারা রেকাবের অভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্ণ শারীরিক বল প্রয়োগ করতে সমর্থ হত না। পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন ধাতব রেকাব খুঁজে পাওয়া যায় চিনদেশের পশ্চিমাংশে এক সমাধিক্ষেত্রে মৃৎপাত্রের ভাঙা টুকরোতে। চিনদেশে জিন সাম্রাজ্যের সময়কালে তৈরি হয় তা, প্রায় ৩০০ খ্রিস্টপূর্বে।

ঘোড়ার জিন (Saddle) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০)

ঠিক কবে থেকে আদিম মানব বন্য ঘোড়া বশ করে তার পিঠে চড়তে শিখেছিল সে তথ্য এখনও পাওয়া যায় না। তবে ফ্রান্সের কিছু গুহাচিত্রে প্রমাণ মেলে যে প্রায় ১৫০০০ খ্রিস্টপূর্বেই মানুষ ঘোড়ায় চড়তে শিখেছিল। পরবর্তীকালে গাছের লতাপাতা, মোটা কাপড় ভাঁজ করে ঘোড়ার পিঠে রেখে তাতে চড়ে বসত তারা। তার অনেক পরে প্রায় ৩০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়কালে এশিয়ার চিনা অশ্বারোহীরা কাঠের একটা কাঠামো তৈরি করে ঘোড়ার পিঠে জিন হিসেবে ব্যবহার করতে লাগল। কিন্তু মানুষ সম্পূর্ণ আরামদায়ক জিন তৈরি করতে সময় নিয়েছিল আরও প্রায় ২০০ বছর।

ছাঁচফলক লাঙল (Moldboard Plow) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০)

চাষের ক্ষেতে ছাঁচফলকের লাঙল এক যুগান্তকারী আবিষ্কার হলেও তার আবিষ্কর্তার পরিচয় হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। মানুষ প্রথমে শক্ত লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মাটি তুলে চাষের জমি তৈরি করতে শিখেছিল। সে-কাজ ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। পরবর্তীকালে কাঠের একটা ছুঁচলো টুকরোর কাঠামো ষাঁড়ের ঘাড়ে বেঁধে জমি চষার কাজ চলত। তাও প্রায় ৭০০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়কালের কথা। তারপর চিনারা তৈরি করল যুগান্তকারী ‘কুয়ান’ বা ধাতু গলিয়ে ছাঁচে ফেলে লাঙলের ফলা।

পেরেক (Nail) (খ্রিস্টপূর্ব ২৫০)

পেরেক হচ্ছে মানুষের হাতে তৈরি প্রথম ধাতব বস্তু। তখনকার দিনে পেরেক দণ্ড দেখতে গোলাকার ছিল না, ছিল চৌকোনাকৃতির। আর মাথাটাও এখনকার মতো ছিল না মোটেও। ইংরেজি ‘এল’কে উলটো ধরলে যেমন দেখতে হবে, ঠিক তেমন। খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ২৫০ বছর আগেই মানুষ তৈরি করে ফেলেছিল ধাতব পেরেক।

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s