বৈজ্ঞানিকের দপ্তর আবিষ্কারের খোঁজখবর রাজীব কুমার সাহা বসন্ত ২০১৭

আগের পর্বগুলো

এই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন খোঁজ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই বিভাগে।

পর্ব – ৫

রজ্জু-ঘাগরা (String Skirt) (খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০)

বয়নশিল্পের প্রচলনের সাথে সাথেই তা আদিম মানবের কাছে একটা অত্যন্ত মনোরঞ্জনমূলক কাজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শুরু হয় একের পর এক নিত্যনতুন পরিধেয় বস্ত্রের আবিষ্কার। পশুপাখির শক্ত শুকনো চামড়া বা কাপড় বুনে কোমরের দিকে একটা বেল্টের মতো আটকে তাতে সরু দড়িদড়া পাকিয়ে, কখনও তা বিভিন্ন লতাপাতার রঙে রাঙিয়ে নিয়ে ঝুলিয়ে দিয়ে নতুন ধরনের পরিধেয় তৈরি করা হত। আধুনিক সভ্যতার সাথে অপরিচিত এমন অনেক উপজাতি সম্প্রদায় আজও রয়েছে যারা এখনও এধরনের কাপড়চোপড় পরিধান করে। ডেনমার্কের এক তাম্রযুগীয় প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল থেকে এ জাতীয় কিছু দড়িনির্মিত ঘাগরাকৃতি পরিধেয়ের সন্ধান পাওয়া যায়।

মৃত্তিকা প্রলেপিত বেড়া (Wattle and Daub) (খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০)

প্রথমে ছিল প্রকৃতিসৃষ্ট গুহা-কন্দর। জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করায় তাতে স্থানসংকুলানের অভাব দেখা দিল। এদিক ওদিক তৈরি হতে লাগল লতাপাতা ছাওয়া আশ্রয়। কিন্তু এতে দেখা গেল বিপদ বেশি। কখনও তুমুল ঝড়বৃষ্টি, কখনও বা প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহ, কখনও হিংস্র জন্তুজানোয়ারের অতর্কিত আক্রমণ আদিম মানবকে একটা নিরাপদ বাসস্থান নির্মাণের কাজে নতুন করে ভাবাতে শুরু করল। ধীরে ধীরে জড়ো হতে লাগল গাছপালার শুকনো ডালপালা, জন্তুজানোয়ারের সরু অথচ পোক্ত আর লম্বা হাড় ইত্যাদি। তৈরি হল ঘরের বেড়া। শুকনো অথচ বড়ো আর শক্তপোক্ত পাতা দিয়ে ছাওয়া হল চাল। কিন্তু সহস্র ফাঁকফোকরযুক্ত এই বেড়া পুরোপুরি নিরাপত্তা দিতে পারল না মানুষকে। মাটি গুলে প্রলেপ লাগানো শুরু হল তাতে। তবে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল না পুরোপুরি। বৃষ্টি নামলে বা জোরে ধাক্কা লাগলে এই প্রলেপ খসে পড়তে শুরু করল। শেষে মৃৎপাত্রের মতো করে আগুনে পুড়িয়ে নিতেই সমস্যা মিটে গেল। নবপ্রস্তর যুগেই আদিমানবের বাসস্থান নির্মাণের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হল।

সেচব্যবস্থা (Irrigation) (খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০)

কে সর্বপ্রথম নিকটবর্তী নদীনালা থেকে জল তুলে এনে সেচব্যবস্থা চালু করেছিলেন তা জানা যায় না। তবে ইতিহাসবিদরা খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০-এর কাছাকাছি সময়ে মেসোপটেমিয়ার সুমের অঞ্চলে সেচব্যবস্থার এবং নীলনদের তীরবর্তী মিশরীয় ক্ষেতখামারের প্রমাণাদি খুঁজে পেয়েছেন। তদানীন্তন কালে মেসোপটেমিয়ার কৃষকেরা টাইগ্রিস বা ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে বার্লি, গম এবং অন্যান্য শস্যাদির চাষবাসে বৃষ্টিপাত আর বন্যার ওপরই নির্ভর করত। কিন্তু প্রায়শই ভয়ংকর খরার কারণে খাদ্যাভাব দেখা দিতে শুরু করলে পরিকল্পিত সেচব্যবস্থার প্রয়োজন হয়ে পড়ল। শুরু হল কাছাকাছি নদীনালা থেকে খাল খনন করে শস্যক্ষেত্রে সেচব্যবস্থা। সুমেরীয় আদিবাসীরাই সর্বপ্রথম শস্যক্ষেত্রে সেচব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।

কুঠার বা কুড়ুল (Axe) (খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০)

লক্ষ লক্ষ বছর আগে ‘হোমো ইরেক্টাস’ প্রজাতি সেই প্রস্তরযুগে প্রথম কুড়ুল ব্যবহার করতে শিখেছিল। তবে তা ছিল নিতান্তই সাধারণ এক পাথরের টুকরো। পরবর্তীকালে গাছগাছড়া কেটে বসত গড়তে বা অস্ত্র হিসেবে কুড়ুলের ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে শুরু করলে তার আকার-আকৃতিরও পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটতে শুরু করে। জন্ম নেয় হাতলযুক্ত আধুনিক কুড়ুলের। ধাতব পিন্ড গলিয়ে দু’দিক ধারালো করে নিয়ে মধ্যবর্তী গোলাকার গর্তের ভেতর গাছের শক্ত ডালপালা জুড়ে নিয়ে তৈরি করা হয় কুড়ুলের পরিবর্ধিত সংস্করণ। ব্যবহার আর প্রয়োজনের নিরিখে তা অনেক বেশি কার্যকরী হয়ে দাঁড়ায়। শুধু তাই নয়, এ ধরনের আধুনিক কুড়ুল বিনিময় প্রথার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রস্তরযুগীয় জনজাতির মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ব্যবসা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা নিউ গিনির মাউন্ট হেগেন পর্বতাঞ্চলে এ ধরনের প্রায় ৮০০০ বছরের পুরনো কুড়ুল খুঁজে পান। ধীরে ধীরে এই অত্যন্ত কার্যকরী যন্ত্র কুড়ুল সমাজপতিদের প্রতিপত্তির পরিচায়ক হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বীয় বেশ কিছু বুলগেরীয় সমাধিক্ষেত্র খনন করে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অন্যান্য বহুমূল্য জিনিসপত্রের পাশাপাশি স্বর্ণপ্রলেপিত কুড়ুলও খুঁজে পান।

হল বা লাঙল (Scratch Plow) (খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০০)

পরিকল্পিত সেচব্যবস্থার পর শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে আরেক যুগান্তকারী উদ্ভাবন ছিল লাঙলের ব্যবহার। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০০ নাগাদ সিন্ধুসভ্যতার অন্তর্গত মেসোপটেমিয়ায় কাষ্ঠনির্মিত এক বিশেষ ধরনের কৃষি-উপকরণের আবিষ্কার হয় যা দেখতে অনেকটা আধুনিক লাঙলের মতোই। গৃহপালিত গরু-মোষের সাহায্যে এর দ্বারা শস্যক্ষেত্র কর্ষণ করে শস্যাদি ফলানোর প্রথা শুরু হয়। মাটির উর্বরতা বাড়াতে ক্ষেতে একবার লাঙল চালিয়ে আবার উলটোদিক থেকেও তা চালানো হত। এতে চাষবাস করা অনেকটাই সহজ হয়ে পড়ে। সুইডেনের বোহুস্ল্যান, ফ্রান্সের ফন্টান্যালবা প্রভৃতি স্থানের শিলাচিত্রে এমন অনেক হলকর্ষণরত আদিবাসীর রেখাচিত্র অঙ্কিত রয়েছে। আদিমকালের চাষ ব্যবস্থার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই উপকরণ বর্তমানকালেও সিরিয়া, মধ্য ইরাক, তুর্কিস্তান, চিনের কাংসু প্রদেশ এবং আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলেও প্রচলিত রয়েছে।

প্লাস্টার (Plaster) (খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০০)

প্রায় ৭০০০ বছর আগে বাসস্থান নির্মাণের উপকরণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে প্লাস্টারের ব্যবহার শুরু হয়। বিভিন্ন রকমের প্লাস্টার যেমন, প্লাস্টার অফ প্যারিস, শুষ্কপ্রায় জিপসাম ও ক্যালসিয়াম সালফেট হেমিহাইড্রেটের মধ্যে জিপসাম আগুনে পুড়িয়ে চূর্ণ করে জল মিশিয়ে প্লাস্টার তৈরি করত প্রাচীন মিশরীয়রা। ব্যবহার করা হত বাসস্থানের দেওয়াল এবং ছাদে। রোমানরা সর্বপ্রথম ইউরোপে এই প্লাস্টারশিল্পের কলাকৌশল চালান করেন। ধীরে ধীরে আধুনিক শিল্পকলায় প্লাস্টারের কদর বেড়ে যায়।

দন্তমঞ্জন (Toothpaste) (খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০)

বাহারি রং, নানা প্রস্তুতকারী সংস্থা, রঙচঙে প্যাকেট, লোভনীয় স্বাদ, অত্যাবশ্যকীয় বিভিন্ন উপকরণ আর সর্বোপরি মনমাতানো বিজ্ঞাপনের বাহার – টুথপেস্ট বা দাঁতের মাজন। ছেলে থেকে বুড়ো কেউই আজ আর এই জিনিসটি ছাড়া দিনের শুরুটা কল্পনাই করতে পারেন না। জিনিসটির ব্যবহার শুরু হয় কিন্তু সেই সুদূর ৫৫০০ খ্রিস্টপূর্বের কাছাকাছি সময়ে। কী ছিল সে সময়কার দাঁতের মাজনের উপকরণ? ম্যার (বৃক্ষজ আঠাবিশেষ), অগ্ন্যুৎপাতজাত পাথরগুঁড়ো, গরু-মোষের খুর পোড়ানো ছাই, ডিমের খোলা, ঝিনুকের খোলা প্রভৃতি চূর্ণ করে একসাথে মিশিয়ে তৈরি হত সেকালের টুথপেস্ট। আঙুলের ডগায় নিয়ে দাঁতে মাজতে থাকলে বেরিয়ে আসত বাসি খাদ্যকণা, ময়লা-আবর্জনা। পাশাপাশি দাঁতের ঔজ্জ্বল্যও ফিরিয়ে আনত এই দন্তমঞ্জন।

কাষ্ঠশিল্প (Carpentry) (খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০)

কাঠ মানবসভ্যতার শুরু থেকেই প্রাচীনতম স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম প্রধান উপকরণ। প্রস্তরযুগ, ব্রোঞ্জযুগ থেকে মানবসভ্যতা লৌহযুগে উন্নীত হওয়ার পাশাপাশি কাষ্ঠশিল্পেরও প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। নবপ্রস্তরযুগে কাষ্ঠনির্মিত বিভিন্ন জিনিসপত্র শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়। জাপানে খুঁজে পাওয়া কাষ্ঠনির্মিত ঘোড়া প্রায় ৫০০০ খ্রিস্টপূর্বে নির্মিত বলে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অনুমান করেন।

দাঁড় টানা নৌকো (Rowboat) (খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০০)

আদিমানব এতদিন নদীনালা পারাপার করতে ভাসমান প্রকাণ্ড গাছের গুঁড়ি বা শালতির ওপরই নির্ভরশীল ছিল। এবার প্রয়োজন পড়ল সেগুলোকে নিজের ইচ্ছেমতো চালনা করে জলে বিচরণ করার। আদিম মিশরীয়রা শালতির আরও কিছু উন্নতি ঘটিয়ে তার সাথে যোগ করে ফেলল দাঁড়, যা টেনে প্রয়োজনমতো জলের বুকে চলাফেরা করা যায়। শুরু হল মানুষজন পারাপার, মালপত্র স্থানান্তর আর ব্যবসায়িক কাজে এর ব্যবহার। স্রোতের টানে ভেসে যাওয়া মানুষজন, গবাদিপশুর জীবন রক্ষার্থেও এই দাঁড় টানা নৌকো এক আশীর্বাদস্বরূপ হয়ে দাঁড়াল। প্রায় ৬৫০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়ায় আবিষ্কৃত নৌকো চালনার সেই চিরাচরিত কৌশল আজও বিদ্যমান।

কৃত্রিম খাল (Canal) (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০)

মধ্যপ্রাচ্যের অধিবাসীরা কৃষি-ব্যবস্থার উন্নতিকরণের পাশাপাশি নদী বা বৃষ্টিপাতের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে সারাবছরের জন্যে একটা নির্দিষ্ট স্থানে জল ধরে রাখার চিন্তাভাবনা শুরু করে দিয়েছিল। তদানীন্তন মেসোপটেমিয়ায় খননকৃত খাল হচ্ছে বিশ্বের সর্বপ্রাচীন খাল যা প্রায় ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বে খনন করা হয়। বর্তমানে ইরাক এবং সিরিয়ায় তা অবস্থিত। পরবর্তী সময়ে সিন্ধু, মিশরীয় প্রভৃতি সভ্যতাগুলো বিভিন্ন কৃত্রিম খালের জল দ্বারা আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ওঠে। মনুষ্যসৃষ্ট কৃত্রিম খালের জল বর্তমান যুগেও কৃষিক্ষেত্রে সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়।

এরপর আগামী সংখ্যায়

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

Advertisements

2 Responses to বৈজ্ঞানিকের দপ্তর আবিষ্কারের খোঁজখবর রাজীব কুমার সাহা বসন্ত ২০১৭

  1. SABIH OMAR says:

    ‘বৈজ্ঞানিক’ শব্দটি বিশেষণ, যেমন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। এক্ষেত্রে সঠিক শব্দটি হবে ‘বিজ্ঞানী’। যেমন বিজ্ঞানী আইনস্টাইন…

    Like

    • joydhakwalla says:

      বৈজ্ঞানিক শব্দটির অর্থ যিনি বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করেন অথবা বিজ্ঞানসম্বন্ধীয়। একে বিশেষ্য বা বিশেষণ দুটি রূপেই ব্যবহার করা হয়।

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s