বৈজ্ঞানিকের দপ্তর আবিষ্কারের খোঁজখবর রাজীব কুমার সাহা শীত ২০১৭

   আবিষ্কারের খোঁজখবর  আগের পর্বগুলো একত্রে

এই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব-প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন খোঁজ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই বিভাগে।

পর্ব – ৭

চুল্লি (Oven) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০)

তন্দুরি টিক্কা বা তন্দুরি নান খেতে কেমন? দারুণ তো? তৈরি করতে প্রথমেই কী দরকার? না, একটা চুলো। এই চুলোটাই মানুষ আবিষ্কার করেছিল আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে। এক ফলমূল বাদে তখন মানুষের খাবারদাবার প্রায় সবই তন্দুরি। ২০১৪ সালে পৃথিবীর প্রাচীনতম চুল্লি আবিষ্কৃত হয় ক্রোয়েশিয়ায়। সেকালে মাটিতে অগভীর গর্ত করে তাতে জ্বলন্ত কয়লা ফেলে ছাইচাপা দিয়ে রাখা হত। তারপর খাদ্যবস্তু ছোটোবড়ো আকারের পাতায় মুড়ে চুল্লিতে রেখে ওপরে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হত। আনুমানিক সময়জ্ঞানের ভিত্তিতে তারপর পাতামোড়া পুঁটুলি তুলে নিয়ে এলেই খাবার তৈরি। পরবর্তীকালে সময় আর বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জন্ম নিল ইটনির্মিত চুলো, যা আজও বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়। প্রাচীন সিন্ধুসভ্যতায়ও এধরনের চুল্লির প্রমাণ মেলে। মহেঞ্জোদারোতে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সময়কার চুল্লির হদিশ মিলেছে।

তবে প্রাচীন চুল্লি থেকে অত্যাধুনিক চুল্লির এই বিবর্তনের মূল কারিগর কিন্তু গ্রিকরা। তারা সাধারণ রুটিকে আরও সুন্দর রূপ দিতে চেয়েছিল। তখন দরকার হয়ে পড়েছিল সাধারণ চুল্লির উন্নতিকরণ। আর অচিরেই তারা সেঁকা খাদ্য প্রস্তুতিকে (বেকারি) একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হল। কারণ, ততদিনে তারা আটা-ময়দার সঙ্গে ব্যবহার করতে শিখে গেছিল এক যুগান্তকারী উপাদান – ইস্ট।

মাড়াইযন্ত্র (Flail) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০)

গাঁয়ে-গঞ্জে পিচের ড্রাম বা কাঠের টুলের ওপর আছড়ে আছড়ে গাছ থেকে পাকা ধানের ছড়া আলাদা করতে দেখেছ নিশ্চয়ই? শস্য মাড়াইয়ের এই ধারণা কিন্তু আজকের নয়। কালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কিছুটা রূপ পরিবর্তন করেছে মাত্র। মানুষের কৃষিসভ্যতার আদিমতম যন্ত্রপাতিগুলোর মধ্যে এই মাড়াইযন্ত্র একটি। প্রায় হাজার পাঁচেক বছর আগে প্রাচীন মিশরীয়রা একটা ধাতব দন্ডের একপ্রান্তে চামড়ার সরু ফিতে বেঁধে শস্যের আঁটিতে পিটিয়ে পিটিয়ে মাড়াই করত। তারপর শস্য আলাদা হয়ে গেলে ঠিক একই পদ্ধতিতেই শস্যের খোসা ছাড়াত।

পরবর্তীকালে এই যন্ত্রটাই খানিকটা রূপ বদলে রাজকীয় শাসনদণ্ডে রূপান্তরিত হয় প্রাচীন মিশরে। ততদিনে অবশ্য ধাতুবিদ্যার দারুণ উন্নতি হয়। ধাতবদণ্ডে শেকল আটকে তার আগায় মোটা কাঁটাওয়ালা ধাতব পিণ্ড যুক্ত করে এককালের সাধারণ মাড়াইযন্ত্র রাজার হাতে উঠে আসে শাসনদণ্ড রূপে। ফ্যারাও তুতনখামেনের সমাধির মধ্যেও এই অস্ত্রের সন্ধান মেলে।

ঘণ্টা (Bell) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০)

প্রাচীন চিনারা সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিবিদ্যায় প্রভূত উন্নতি লাভ করেছিল। ৩৯৫০ এবং ১৭০০ খ্রিস্টপূর্বের মধ্যবর্তী সময়ে ইয়াং-শাও অঞ্চলের বাসিন্দারা রঙিন ছবি অঙ্কিত মৃৎশিল্পে দারুণ দক্ষতা অর্জন করেছিল। অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পাশাপাশি তারা মাটির ঢেলার মতো একধরনের সঙ্গীতযন্ত্র তৈরি করে ফেলল যেটা কায়দা করে নাড়াচাড়া করলেই দারুণ মিষ্টি এক আওয়াজ বের হত। এই জিনিসটাই পৃথিবীর প্রাচীনতম ঘণ্টা হিসেবে গণ্য করা হয়। মধ্য চিনের হেনান প্রদেশে খননকার্য চালিয়ে ছোটো লাল রঙের এধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়।

মোমবাতি (Candle) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০)

এটা অনুমান করা নিশ্চয়ই ভুল হবে না যে প্রাচীনকালে মানুষ জীবজন্তুর চর্বিপিন্ডে আগুন জ্বালিয়েই হয়তো প্রথম মোমবাতির প্রচলন করেছিল। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলে যে গ্রীক এবং মিশরীয়রাই সর্বপ্রথম সলতেযুক্ত মোমবাতির স্রষ্টা। ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বেই মানুষ মৌমাছির বাসা থেকে মোম সংগ্রহ করে তা সলতের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে মোমবাতি জ্বেলেছিল। এর অনেক পরে মধ্যযুগে প্রায় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে (১৮৩০ সাল) বাণিজ্যিক রূপে প্যারাফিন ঢুকে পড়ে ঘরে ঘরে।

চিমটে (Pliers) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০)

চিমটে জিনিসটা মানুষ ঠিক কখন আবিষ্কার করেছিল তা নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এখনও পর্যন্ত নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। তবে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা আর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তারা দৃঢ় ধারণা পোষণ করেন যে প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়কালেই মানুষ জিনিসটার ব্যবহার করতে শিখে গিয়েছিল নিতান্ত প্রয়োজনের নিরিখেই। সে সময় নিজেদের খাদ্য প্রস্তুত করতে জ্বলন্ত অঙ্গার, কাঠকুটো ইত্যাদি নাড়াচাড়া করার প্রয়োজনে মানুষ চিমটে ব্যবহার করত। কামারশালায় জ্বলন্ত লোহা পিটিয়ে সে সময়ই মানুষ চিমটে তৈরি করে নিয়েছিল বলে অনুমান করা হয়।

ঢালাই (Casting) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০)

বিশ্বের ধাতুশিল্পের ইতিহাসে প্রাচীনতম কৌশলের মধ্যে একটি হচ্ছে এই ঢালাই। প্রাচীন মিশরীয় এবং মেসোপটেমীয় সভ্যতায় মানুষ প্রথমে ছাঁচ তৈরি করে তাতে গলিত ধাতু ঢেলে দিয়ে ছোটো ছোটো পুতুল, অলঙ্কারাদি প্রস্তুত করতে শিখল। সময়ের সঙ্গে দক্ষতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ একদিন তাক লাগানোর মতো জটিল ধাঁচের বিভিন্ন জিনিসপত্রও তৈরি করতে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠল।

৩০০০ খ্রিস্টপূর্বেই মানুষ প্রথমে মৌমাছি-মোম দিয়ে প্রয়োজনীয় ছাঁচ তৈরি করে তাতে তাপ শোষক হিসেবে কাদামাটির প্রলেপ দিয়ে রাখত। তারপর এতে গলিত ধাতু ঢেলে জলে চুবিয়ে ঠাণ্ডা করে মোমের ছাঁচ ভেঙে ফেলে ঢালাইয়ের কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি বের করে নিত।

এই কৌশলের পরবর্তী ধাপের নিদর্শন হিসেবে বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত হরপ্পা সভ্যতায় বিভিন্ন পুতুল, মিশরের তুতনখামেনের সমাধিতে, আফ্রিকার অ্যাজটেক, মায়া ও বেনিন সভ্যতায় তামা, ব্রোঞ্জ ও সোনার বিভিন্ন শিল্পকর্মের সন্ধান মেলে।

বোতাম (Button) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০)

একবার যদি ভাবি যে কাউকে একটা বোতামহীন জামা পরতে দেওয়া হলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? প্রাচীনই বলি আর আধুনিকই বলি, পোশাকআশাকের ক্ষেত্রে বোতামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই বোতাম কিন্তু আবিষ্কৃত হয়েছিল সেই হাজার পাঁচেক বছর আগে, প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্ব নাগাদ। জীবজন্তুর হাড়, শিং আর কাঠের টুকরো মাপমতো কেটে নিয়ে গ্রীকরা প্রথম তার দড়িবাঁধা পরিচ্ছদে বোতামের ব্যবহার শিখল। জামাতে সুতোর লুপ তৈরি করে তাতে বোতাম আটকে দিল।

বোতামের স্রষ্টা মূলত গ্রীকদের ভাবা হলেও প্রাচীন সিন্ধুসভ্যতায় ঝিনুক থেকে তৈরি বেশ কিছু ছিদ্রযুক্ত বোতামের সন্ধান মেলে যেগুলোতে অনায়াসেই সুতো গলিয়ে পোশাকের সঙ্গে এঁটে দেওয়া যেত। ১৯৯০ সালে ইয়ান ম্যাক নীল উক্তি করেন, “প্রাচীন সিন্ধুসভ্যতার মহেঞ্জোদারোতে জিনিসটা শুধুমাত্র বোতামের চেয়ে অলঙ্কার হিসেবেই বহুল প্রচলিত ছিল। তদানীন্তন সময়ে ঝিনুকের বাঁকা অংশ কাজে লাগিয়ে মানুষ বোতাম তৈরি করত এবং সেগুলোর বয়স প্রায় ৫০০০ বছর।”

শিরস্ত্রাণ (Helmet) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০)

প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করেন খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সময়কালে মেসোপটেমীয় সভ্যতার যুগে মানুষ শিরস্ত্রাণ ব্যবহার করতে শুরু করে দিয়েছিল। প্রাচীন এই শিরস্ত্রাণ মূলত ব্রোঞ্জনির্মিত হলেও লোহা বা শিংওয়ালা বিভিন্ন বন্যজন্তুর করোটি দ্বারাও তৈরি করা হত। এর অনেককাল পরে প্রায় ৯০০ খ্রিস্টপূর্বে অ্যাসিরীয় সৈনিকরা সর্বপ্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে মাথায় শিরস্ত্রাণ ব্যবহার করতে শুরু করে। আর এই ধারা বর্তমানকালের বিভিন্ন নির্মাণকর্মী, বাইক আরোহী আর খেলোয়াড়দের মাধ্যমে বয়ে চলেছে।

স্কি (Ski) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০)

বরফদেশের বাসিন্দাদের প্রায়শই অত্যধিক তুষারপাতের ফলে আটকে পড়ে তীব্র খাদ্যসঙ্কটে পড়তে হত। কারণ, সেদেশে প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়। সংরক্ষণ তো দূরের কথা। খাদ্য হিসেবে নির্ভর করতে হত বন্যজন্তুর মাংসের ওপর। অথচ পুরু বরফ ঠেঙিয়ে তাড়া করে শিকার করা এককথায় প্রায় অসম্ভব ছিল। দরকার পড়ল এমন একটা কিছুর, যাতে ভর করে অনায়াসে জীবজন্তু ধাওয়া করে শিকার করে আনা যায়। উদ্ভাবনী শক্তি ধরা দিল পাতের মতো দু’টুকরো পাতলা কাঠের আকারে। আবিষ্কৃত হল স্কি।

৩০০০ খ্রিস্টপূর্বে স্কি আবিষ্কার নিঃসন্দেহে একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ব্যাপার ছিল। বর্তমানকালের নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড আর রাশিয়া অঞ্চলের সে যুগের অধিবাসীরা স্কিতে চড়ে সহজেই পশুশিকার করতে শুরু করল। ১৯২৪ সালে সুইডেনের কাল্ভত্রাস্ক নামক স্থানে সরলগাছের কাঠের তৈরি পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন স্কিয়ের সন্ধান মেলে যার বয়স প্রায় ৫০০০ বছর। জিনিসটি ৮০ ইঞ্চি (২০৪ সেমি) লম্বা এবং ৬ ইঞ্চি (১৫.৫ সেমি) প্রশস্ত, যা আধুনিক স্কিয়ের তুলনায় সামান্য বড়ো।

আইস স্কেইট (Ice Skate) (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০)

প্রাচীন বরফদেশবাসীদের আইস স্কেইটিং ছিল দারুণ এক বিনোদনের উপায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সময়কালের একজোড়া সর্বপ্রাচীন আইস স্কেইট খুঁজে পাওয়া যায় সুইডেনের এক জলাশয়ের তলায়। প্রত্যেক প্রান্তে ছিদ্রযুক্ত এই স্কেইটজোড়া অতিকায় কোনও জন্তুর পায়ের লম্বা লম্বা হাড় যোগাড় করে তৈরি করা হয়েছিল। আর পায়ের পাতার সঙ্গে বাঁধার জন্যে চামড়ার ফিতেও ব্যবহৃত হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ধারণা করেন।

এরপর আগামী সংখ্যায়

রাজীবকুমার সাহা র সব লেখা   জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s