বৈজ্ঞানিকের দপ্তর আবিষ্কারের খোঁজখবর রাজীব কুমার সাহা শীত ২০১৭

   আবিষ্কারের খোঁজখবর  আগের পর্বগুলো একত্রে

এই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব-প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন খোঁজ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই বিভাগে।

পর্ব – ৯

নিকাশি ব্যবস্থা (Sewage System) (খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০)

মানুষ চিন্তাভাবনায়, দৈনন্দিন চাহিদায় উন্নততর হতে শুরু করল। দরকার পড়ল একটা নিয়মানুগ জল নিকাশি ব্যবস্থার। প্রাচীন সভ্যতায় ব্যাবলনীয়রা সর্বপ্রথম তাদের বাড়িঘরের ভিতের তলা দিয়ে মলকুণ্ড খনন করে অশোধিত জল নিকাশের ব্যবস্থা করেছিল। তবে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ সময়কালে সিন্ধুসভ্যতায় সুনির্দিষ্ট নিয়মানুগ জল নিকাশি ব্যবস্থার প্রচলন হয়। এই ব্যবস্থায় আধুনিক কালের মতো প্রতি বাড়ির জল রাস্তার বড়ো নিকাশি নালার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া

প্রামাণ্য মাপ (Standard Measures) (খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০)

হাটেবাজারে পণ্য বেচাকেনার ক্ষেত্রে সঠিক মাপ এবং ক্রেতার সন্তুষ্টি বজায় রাখতে গিয়ে প্রচলন শুরু হল কিছু প্রামাণ্য মাপের। আর সেটা প্রথম শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার সিন্ধুসভ্যতাবাসীরা। এই সময়ে সিন্ধুসভ্যতার মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা পৃথিবীতে অতি আধুনিক শহরগুলোর মধ্যে দুটো ছিল। প্রাথমিকভাবে চুনাপাথরের তৈরি ছোটোবড়ো কিছু ঘনক জোগাড় করে শুরু হল প্রামাণ্য মাপের ব্যবস্থা। মাপের একক হিসেবে এই ঘনকগুলোকে ১, ২, ৪, ৮ – এভাবে চৌষট্টি পর্যন্ত ক্রমভুক্ত করে নেওয়া হল। পরবর্তী বড়ো মাপের ক্ষেত্রে ১৬০, তারপর ৩২০ এবং এভাবে ১৬০-এর গুণিতকের হারে মাপের একক স্থির করা হল। তবে সমস্যা দেখা দিল বিভিন্ন গয়নাপত্রের ওজন স্থির করতে গিয়ে। শেষে শুধুমাত্র বিভিন্ন মূল্যবান ধাতু এবং মণিমুক্তো মাপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ছোটো একক স্থির হল। তদানীন্তন সময়ে সর্ববৃহৎ মাপের একক এতটাই সুবিশাল আকারের ছিল যে সেটা দড়িদড়া বেঁধে ব্যবহার করতে হত। সে মাপ অবশ্য বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে যেমন, ফসল বা কাঠ পরিমাপ করতে ব্যবহৃত হত।

পাশাপাশি সময়কালে মেসোপটেমিয়ায় মাপজোখের ক্ষেত্রে সমপরিমাণ শস্যদানার ব্যবহারের প্রচলন ছিল। তবে শস্যদানার রকমভেদে সেগুলোর আকার এবং ওজনে ভেদ থাকায় সে মাপ প্রামাণ্য রূপে স্বীকৃত ছিল না। ফলে স্থানীয় ইটপাথর কুঁদে সুপ্ত মরালীর আকৃতিতে প্রামাণ্য মাপের ব্যবস্থা করা হয়। আর বলাই বাহুল্য, সে ব্যবস্থা দারুণ ফলপ্রসূও হয়।

পেটা লোহা (Wrought Iron) (খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০)

লোহা বললে প্রাথমিকভাবে সাধারণত পেটা লোহাকেই বোঝানো হয়ে থাকে। পেটা লোহা হচ্ছে খনিজ লৌহ আকরিকের অন্যতম পরিশোধিত ও পরিবর্ধিত রূপ যা সহজেই অন্য ধাতুর সঙ্গে মিলেমিশে নতুন ধাতুর জন্ম দিতে সক্ষম।

প্রায় ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বে সর্বপ্রথম পেটা লোহা প্রস্তুত করা হয়। এক নতুন যুগের সূচনা হয় পৃথিবীতে যা লৌহযুগ নামে খ্যাত। উন্মোচিত হয় ধাতুবিদ্যার এক নতুন এবং অন্যতম দিক।

কীটনাশক (Pesticide) (খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০)

প্রায় ৯০০০ বছর পূর্বে রাখালশ্রেণির যাযাবর সম্প্রদায় মেসোপটেমিয়ায় প্রথম থিতু হয়ে বসবাস করতে শুরু করে। খাদ্যের সংস্থান করতে গিয়ে তখন শুধুমাত্র শিকারের ওপর আর নির্ভর করা সম্ভব হল না। পশুপালনের পাশাপাশি শুরু হল কৃষিকাজ ও ফসল সংরক্ষণ ব্যবস্থার। কিন্তু অতি-বর্ষণের পাশাপাশি পোকামাকড়ের উপদ্রবে বছরভর সে ফসল সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না কিছুতেই। সঙ্গে ফসলি গাছের রোগ তো ছিলই। প্রয়োজন হয়ে পড়ল এমন এক জিনিসের যা অন্তত ফসলের রোগ ও পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে মুক্তি দেবে।

২৫০০ খ্রিস্টপূর্বে প্রাচীন সুমেরিয়াতে কীটনাশক হিসেবে প্রথম রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। এলিমেন্টাল সালফার পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন কীটনাশক রাসায়নিক যা সুমেরীয়রা ব্যবহার করত। এতে আশাতীতভাবে তারা ফসলি গাছের ছত্রাকঘটিত বিভিন্ন রোগ এবং ফসলে পোকামাকড়ের আক্রমণ রোধ করতে সমর্থ হয়।

কালি (Ink) (খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০)

সভ্যতার ক্রমবিকাশে এই অতি-প্রয়োজনীয় জিনিসটার আবিষ্কারের কৃতিত্ব সম্পূর্ণরূপে চিনেদের। প্রায় ৪৫০০ বছর আগে চিনদেশে প্রস্তুত হয় ঝুল, লন্ঠনের জ্বালানী, প্রাণীদেহজাত বিশেষ আঠা এবং কস্তূরীর মিশ্রণে তৈরি হয় অজাতপূর্ব এক তরল পদার্থের যা কালি নামে পরিচিত। চিনেরা এর আগেই পাথরের টুকরো কুঁদে নিজস্ব সাংকেতিক চিহ্নের আকৃতি তৈরি করে নিয়েছিল। এইবারে অধুনা আবিষ্কৃত কালিতে ওই চিহ্ন চুবিয়ে স্থায়ী ছাপ দিতে শিখে গেল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধাতুর মিহি গুঁড়ো, গাছের নির্যাস আর রঞ্জক হিসেবে জামের রস দ্বারা লেখ্য কালির উন্নতিসাধন সম্ভব হয়েছিল।

ঘেরা পোতাশ্রয় (Enclosed Harbor) (খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০)

লোথাল বন্দর

সিন্ধুসভ্যতায় হরপ্পাবাসীদের দ্বারা পৃথিবীর সর্বপ্রথম বেষ্টিত পোতাশ্রয় নির্মিত হয়েছিল। ভারত মহাসাগরের তীরে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৫০০-এ নির্মিত এই জোয়ার পোতাশ্রয় বর্তমান ভারতের গুজরাট উপকূলে লোথাল নামক জায়গায় ‘মংরৌল হারবার’ নামে প্রসিদ্ধ। ১৯৫৫ সালে এই পোতাশ্রয় আবিষ্কৃত হয়। পূর্বপশ্চিমে ৩৭ মিটার ও উত্তর-দক্ষিণে ২২ মিটার দৈর্ঘ্যপ্রস্থের ট্র্যাপিজয়েড আকৃতির এই পোতাশ্রয়ের দেওয়াল পোড়া ইটের নির্মিত। পাড়ের ভূমিক্ষয় রোধে পার্শ্ববর্তী খাঁড়িতে জল চলাচলের ব্যবস্থা ছিল। পোতাশ্রয়ের উত্তরাংশ সরাসরি সাবরমতী নদীর মোহনার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং তাতে একসঙ্গে দুটো জাহাজ নোঙর ফেলতে পারত। সম্ভবত এই পোতাশ্রয় থেকে জাহাজ সুদূর টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটস নদীর ব-দ্বীপসমূহে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করত। সুমেরীয় পণ্য যেমন, কার্পাসজাত বস্ত্র, পুঁতির অলঙ্কার এবং বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী এই পোতাশ্রয়ে আমদানি হত।

খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ এবং খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০-তে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে এই পোতাশ্রয় সম্পূর্ণ বালি এবং পলিমাটির নিচে তলিয়ে যায়। শেষে ১৯৫০ সালে খনন শুরু করে ১৯৫৫ সালে নৃতত্ত্ববিদেরা এই পোতাশ্রয় আবিষ্কার করেন।

সুড়ঙ্গ (Tunnel) (খ্রিস্টপূর্ব ২১৮০)

২১৮০ খ্রিস্টপূর্বে ইউফ্রেটস নদীর নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ কেটে ব্যাবিলনিয়রা এক অভূতপূর্ব কৃতিত্বের পরিচয় দেয়। প্রথমে বাঁধ দিয়ে তারা নদীর জলের গতিমুখ পালটে দিয়ে আড়াআড়িভাবে নদীর বুকে চওড়া এক গভীর খাল কেটে দু’পাশের দেওয়াল, ভূমি এবং ছাদে ইট গেঁথে বাঁধ কেটে দেয়। এতে নদী পুনরায় নিজস্ব পূর্ব গতিপথে চলে এলে জলের নিচে সুড়ঙ্গ তৈরি হয়ে যায়।

জল ছাঁকনি (Water Filter) (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০)

সিন্ধুসভ্যতায় প্রায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়কালেই পরিস্রুত পানীয় জল পান করার রীতি প্রচলিত ছিল বলে ইতিহাসবিদেরা মনে করেন। সুশ্রুত সংহিতায় জল কড়া রোদে রেখে বা সেদ্ধ করে তারপর ছেঁকে পান করার বিধান রয়েছে। এর অল্প পরেই প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বে মিশরীয়রা ফিটকিরির মাধ্যমে জল পরিশোধন করে পান করতে শিখে গিয়েছিল। প্রাচীনকালের পানীয় জল পরিশোধন পদ্ধতির সময়োপযুগী পরিবর্তনই আমাদের আজকের ‘ওয়াটার ফিল্টার’।

অসাড়করণ (Anesthesia) (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০)

শুরু থেকে আজ অবধি শল্য চিকিৎসায় অসংখ্য পরিবর্তন, উন্নীতকরণ হয়েছে। শল্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে মানবদেহ অসাড়করণের ইতিহাস কিন্তু সুপ্রাচীন। এই প্রক্রিয়ার উদ্ভব হয়েছিল প্রাচীন মিশরে। তখনকার সময়ে চিকিৎসকগণ রোগীর দেহে অস্ত্রোপচার করার প্রাক্কালে রোগীর ক্যারোটিড আর্টারিদ্বয়কে একই সময়ে এক বিশেষ কৌশলে চেপে ধরতেন। তাতে রোগীর মাথায় রক্ত সঞ্চালনে ব্যাঘাত ঘটত এবং রোগী আংশিক অসাড় হয়ে পড়লে দেহে অস্ত্রোপচার করা হত। এছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে আফিম খাইয়ে অচৈতন্য করে ফেলে অস্ত্রোপচার করা হত। অ্যাসিরিয়ানরা বেলাডোনা, ক্যানাবি, ম্যান্ড্রেকের মূলের মিশ্রণ তৈরি করে যন্ত্রণা নিরামক ঔষধি তৈরি করত।

যান্ত্রিক তালা (Mechanical Lock) (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০)

প্রায় ৪০০০ হাজার বছর পূর্বে মিশরীয়দের হাতে তখনকার সময়ের আধুনিকতম যান্ত্রিক তালার উদ্ভাবন ঘটে। দরজার পেছনদিকে অনুভূমিক কাঠে চলনশীল বল্টু লাগিয়ে তালা তৈরি করত তারা। দরজার বাইরের দিকে থাকত চাবির গর্ত। বাইরে থেকে এই তালা খুলতে এরা বিশেষ ধরনের এক কাঠের চাবি ব্যবহার করত। এই চাবির দৈর্ঘ্য তালার ধরন অনুসারে ২ ফুট অবধি লম্বা হত।

এরপর আগামী সংখ্যায়

রাজীবকুমার সাহা র সব লেখা   জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s