বৈজ্ঞানিকের দপ্তর আবিষ্কারের খোঁজখবর রাজীবকুমার ঘোষ শরৎ ২০১৮

 আবিষ্কারের খোঁজখবর সব পর্ব একত্রে

bigganabishkar07

এই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব-প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন খোঁজ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই বিভাগে।

পর্ব – ১০

শলাকাযুক্ত চাকা (Spoked Wheel) (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০)

ওজনে হালকা এবং দ্রুতগামী যান তৈরির লক্ষ্যে আবিষ্কৃত হল শলাকাযুক্ত চাকা। কার্যকরী ধাতু হিসেবে কারিগরেরা বেছে নিল ব্রোঞ্জকে। পরিকল্পিত পরিমাণ ব্রোঞ্জের শলা ছোটো একটা মধ্যবর্তী চাকতিতে আটকে সেগুলো চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে তারপর শক্ত কাঠের গোলাকার বৃত্তে আটকে সে বৃত্তকে আবার ব্রোঞ্জের পাত দিয়ে মুড়ে দিয়ে তৈরি হল সম্পূর্ণ নতুন ধারার চাকা। করল কারা? প্রাচীন মিশরীয়রা, আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগেই।

পোড়া ইট (Fried Brick) (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০)

পূর্বে ইটের ঘর নির্মিত হত শক্ত কাদা থরে থরে সাজিয়ে রোদে শুকিয়ে। কিন্তু বাদ সাধত তুমুল ঝড়জল। এ অবস্থা থেকে একটা স্থায়ী সমাধান পেতে মানুষের লেগে গিয়েছিল বহুকাল। তারপর কালের বিবর্তনে মধ্যপ্রাচ্যের মানুষজন সে সমাধান পেয়েও গেল একদিন। নির্দিষ্ট পরিমাণ বালি, কাদা মিশিয়ে তা বড়ো বড়ো মণ্ডের মতো বানিয়ে নিয়ে কাঠের খাঁচায় নির্দিষ্ট আকার প্রদান করে শুকিয়ে নিল রোদে। তারপর প্রায় ৩৬০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ২০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে পুরিয়ে নিতেই তৈরি হয়ে গেল স্থায়ী ইট। তারপর তা সাজিয়ে মনের মতো স্থায়ী বাসস্থান তৈরি করে নিতে আর কোনও সমস্যা রইল না।

করাত (Saw) (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০)

কম পরিশ্রমে বৃহদাকারের কিছু কেটে টুকরো করার তাগিদে ধাতুর দাঁতযুক্ত প্রথম কার্যকরী করাতের আবিষ্কার ঘটে প্রাচীন মিশরে। ধাতু হিসেবে ব্যবহৃত হত তামা।

বর্ণমালা (Alphabet) (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০)

পৃথিবীর সর্বপ্রথম উচ্চারিত বর্ণমালার ইতিহাস সৃষ্টি সেই মিশরেই। ১৯৯৯ সালে জন ডার্নেল মিশরের পশ্চিমী মরুর ‘ওয়াদি-এল-হোল’ নামক স্থান থেকে প্রায় ৪০০০ হাজার বছরের পুরনো মনুষ্য ব্যবহৃত সর্বপ্রাচীন বর্ণমালা খুঁজে বের করে বিশ্ববাসীর সমক্ষে প্রকাশ করেন। নরম চুনাপাথরের গায়ে খোদিত ছিল সে বর্ণমালা।

ছাতা (Umbrella) (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০)

জমদগ্নি ছিলেন একজন দক্ষ তিরন্দাজ। তিনি যখনই কিছুকে শরবিদ্ধ করতেন, তৎক্ষণাৎ তাঁর পত্নী রেণুকা সেগুলো পুনরায় সংগ্রহ করে আনতেন। একদিন পুরো দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও রেণুকা একটা তির কিছুতেই শিকারের শরীর থেকে তুলে আনতে পারলেন না। জমদগ্নির কারণ অনুসন্ধানে রেণুকা জানালেন যে দিনের উত্তাপ এতটাই তীব্র ছিল যে তিনি সে-কাজ উত্তমরূপে সম্পন্ন করতে সক্ষম হননি। কুপিত জমদগ্নি তৎক্ষণাৎ সূর্যদেবকে তাঁর তিরের নিশানা করতেই সূর্যদেব ক্ষমাভিক্ষা চেয়ে রেণুকাকে অতীব সুন্দর এক ছাতা উপহার দেন। – এ গল্প মহাভারতের হলেও আসলে ছাতার আবিষ্কার কিন্তু চিনে প্রায় ৪০০০ হাজার বছর আগে।

দলপতি বা সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ব্যতিরেকে তৎকালে অবশ্য সাধারণের ছাতার ব্যবহারে অনুমতি ছিল না।

পেষণযন্ত্র বা জাঁতাকল (Quernstone) (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০)

প্রায় ৪০০০ বছর আগে মানুষ হঠাৎ আবিষ্কার করল যে একটা শক্ত পাথরখণ্ডের ওপর রোদে শুকানো কিছু শস্যদানা রেখে ওপরে আরেকটা অনুরূপ পাথরখণ্ড চাপা দিয়ে নাড়াচাড়া করলে বেশ ভালো পেষাই হয়ে যাচ্ছে শস্যের দানাগুলো। অচিরেই শুরু হয়ে এই জাঁতাকলের বহুল ব্যবহার। কালে কালে এই যন্ত্র তার স্বরূপ বদলেছে, কিন্তু মূল কারিগরি একই রয়ে গেছে আজও। আর এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় প্রাচীন মায়া সভ্যতাকে।

নালা (Aqueduct) (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০)

প্রাচীন সভ্যতায় সেচব্যবস্থা সরাসরি নির্ভর করত টাইগ্রিস, ইউফ্রেটস আর নীলনদের অফুরন্ত জলধারার ওপর। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক ক্রিট দেশে সে ব্যবস্থার বিশেষ সুবিধে না থাকায় তারা নালা কেটে নদীর জল এনে জমিতে চাষবাস করে শুরু করে।

রবারের বল (Rubber Ball) (খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০)

প্রায় ১৬০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মেসো-আমেরিকানরা (বর্তমানে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা) আধ শুকনো ভঙ্গুর রবারের কষ দিয়ে প্রথম রবারের বল তৈরি করতে শেখে। এরা দেখল, কিছু পরিমাণ এই কষ একত্র করে সেটাকে বিভিন্ন রূপ দেওয়া যাচ্ছে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই যখন জিনিসটা শক্ত হয়ে আসছে তখন সেটা আর আগের আকৃতিতে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এরা এই কষের সাহায্যে বিভিন্ন কারুশিল্পের জন্ম দিতে লাগল।

ছায়াঘড়ি (Shadow Clock) (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০)

সূর্য প্রতি ঘণ্টায় ১৫ ডিগ্রি সরে এসে গোটা আকাশটাকে চক্কর মারে। সেই হিসেব মেনেই ছায়াঘড়ির প্রবর্তন। প্রাচীন মিশরীয়রা ছোটো একধরনের ছায়াঘড়ির ব্যবহার জানত। তবে সেটা ব্যবহার করতে গেলে সূর্যের অঙ্কবাচক অবস্থানের জ্ঞান থাকা আবশ্যক ছিল। আর মিশরীয়রা সে বিদ্যায় পারদর্শী ছিল। পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণদিকের নিখুঁত অবস্থানের ভিত্তিতে তারা পিরামিড স্থাপন করতেও সিদ্ধহস্ত ছিল।

কাঁচি (Scissors) (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০)

স্প্রিংযুক্ত কাঁচির ব্যবহার খুব সম্ভবত সেই ব্রোঞ্জযুগের মেধার ফসল। দুই ধারালো পাতের হাতলের গোড়ায় ইংরেজি ‘সি’ আকারের স্প্রিং লাগিয়ে মিশরীয়রা উপযোগী কাঁচি তৈরি করে নিয়েছিল সেই ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বেই। পরবর্তীকালে প্রাচীন রোমে পিভটের কাঁচি আর এশিয়ার এক বৃহদাংশে ব্রোঞ্জ ও লোহার কাঁচির প্রচলন ঘটে।

চলবে

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s