বৈজ্ঞানিকের দপ্তরটেকনো টুকটাক-উড়ব এবার আকাশে২-কিশোর ঘোষাল-বর্ষা ২০১৬

এই লেখার আগের পর্ব এই লিংকে                                          টেকনো টুকটাকের সমস্ত লেখা এই লিংকে

গতবারে যে সব উড়োজাহাজের কথা বলেছিলাম, সেগুলো সবই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে যুদ্ধের জন্যেই ব্যবহার হত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের(১৯৩৯ – ১৯৪২) সময় উড়োজাহাজ ভীষণ জরুরি এক যুদ্ধের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়েছিল এবং দুর্দান্ত সাফল্যও পেয়েছিল। জার্মানীর ব্লিৎসক্রিগ কিংবা আমেরিকা ও জাপানের মধ্যে প্যাসিফিক যুদ্ধের কথা, উড়োজাহাজ ছাড়া ভাবাই যেত না। এর পাশাপাশি যাত্রীবিমানের চিন্তাভাবনা চলছিলই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর, সামনে চট করে আর বড়োসড়ো যুদ্ধের সম্ভাবনা না থাকায়, সারা বিশ্বেই যাত্রীবিমান প্রস্তুতি নিয়ে জোরদার পরীক্ষা নিরীক্ষা চলতে লাগল।

যাত্রীবিমান নির্মাণের সময় অনেকগুলি নতুন বিষয় ভাবনায় উঠে এল। যেমন, এই বিমানগুলির নিরাপদে অনেক দূর যাত্রা করার ক্ষমতা থাকতে হবে। অনেক দূরের যাত্রা মানে বিমানের পেটের মধ্যে অনেক বড়োসড়ো জ্বালানির ভাণ্ডার থাকতে হবে। বিমানবন্দর নির্মাণ থেকে শুরু করে, বিমান চালাতে যে বিপুল ব্যয়, সেই ব্যয়ভার অনেকের মধ্যে ভাগ করে না নিলে, যাত্রীদের পক্ষে সেই ব্যয় বারবার বহন করাও সহজ হবে না। অতএব একটি বিমানে যত বেশি সংখ্যায় যাত্রীবহন করা যাবে, ততই কমে যাবে মাথাপিছু বিমান পরিষেবার ব্যয়। এই সব কথা মাথায় রাখতে গিয়ে দেখা গেল, বিমানের চেহারায় আমূল পরিবর্তন দরকার। কারণ বিমানের আকার বেড়ে গেল বহুগুণ, তার সঙ্গে বেড়ে গেল বিমানের ওজন। বিমানের ওজন ও আকার বেড়ে যাওয়াতে দেখা গেল পুরোনো ইঞ্জিন দিয়ে এতবড়ো বিমান সামলানো যাচ্ছে না। তখনই ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল জেট ইঞ্জিন।

biggantechnokishore01 (Medium)এই জেট ইঞ্জিনও একধরনের প্রতিক্রিয়া (Reaction) ইঞ্জিন, এর মূল তত্ত্ব নিউটনের সেই গতি তত্ত্ব মেনেই কাজ করে, যে তত্ত্বের কথা আগের সংখ্যায় বলেছিলাম। অত্যন্ত জটিল এই প্রক্রিয়া দু এক কথায় বুঝিয়ে বলা শক্ত। তবে জেট ইঞ্জিন বলতে টার্বোজেট, টার্বোফ্যান, রকেট, র‍্যামজেট আর পালস জেট নিয়ে সম্পূর্ণ এক পদ্ধতিকে বোঝায়। ওপরের ছবি থেকে এই জেট ইঞ্জিনের কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে একটা ধারণা করা সম্ভব। প্রচণ্ড গতিতে ঘুরতে থাকা টার্বো ফ্যান, সামনের থেকে বাতাস টেনে নিয়ে পিছনের দিকে ঠেলতে থাকে। এই বাতাসের কিছুটা অংশ সাধারণ প্রপালশানের কাজে ব্যবহার করা হয়। আর বাতাসের বাকি অনেকটা, ধাতব চোঙের সরু হতে থাকা অংশে ঠেলে দেওয়া হয়। এই সরু অংশের থেকে বাতাসকে সরু একটা পাইপের (Shaft) মধ্যে ঢুকিয়ে প্রচণ্ড চাপ (Compress) দিয়ে পিছনের দিকে ঠেলতে থাকে। তারপর এই শ্যাফটের ভেতরকার বাতাস পিছনের দিকে যেতে যেতে দহনকক্ষের(combustion chamber)ভিতর দিয়ে যখন যায় তখন তীব্র তাপ শোষণ করে। এবার এই তীব্র চাপ ও তাপে থাকা সংকুচিত বাতাসকে তীব্র ধাক্কায় হঠাৎ অনেকটা বড়ো মুখের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়। অনেক উচ্চতায় উড়তে থাকা শীতল এবং পাতলা বায়ুমণ্ডলের মধ্যে এই উত্তপ্ত এবং ঘন বাতাস মুক্ত হবার সময় পিছন দিকে যে প্রচণ্ড ধাক্কা দিতে থাকে, সেই প্রবল ধাক্কাতে বিমান সামনে এগোতে থাকে। শীতের দিনের সকালে বা বিকেলের দিকে এই বাতাস অনেক সময় অনেক উঁচুতে উড়তে থাকা বিমানের চলে যাবার পথে সরু সাদা মেঘের ফালির মতো অনেকক্ষণ দেখা যায়। তারপর আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়।

biggantechnokishore02 (Medium)

 

যাত্রীবাহী বিমানের মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সবথেকে সফল জেটবিমান হল বোয়িং ৭০৭ (Boeing 707), সাধারণতঃ একে “সেভেন ও সেভেন” নামেই ডাকা হত। মাঝারি আকারের এই বাণিজ্যিক বিমান ১৯৫৭ সালে শুরু হয়ে ১৯৭৯ পর্যন্ত দাপটে নানান পরিষেবার জন্য ব্যবহার হয়েছিল। এই বিমানের ১৪০ থেকে ২১৯ জন যাত্রী বহনের ক্ষমতা ছিল এবং ৪৬৩০ কিমি থেকে ১০৬৫০ কিমি পর্যন্ত দূরত্ব পাড়ি দিতে পারত। এই বিমানের খালি অবস্থায় ওজন ৬৭.৪৯৫ টন এবং সর্বোচ্চ গতি ১০০৯ কিমি প্রতি ঘন্টায়। আমেরিকায় তৈরি হওয়া এই বিমান পৃথিবীর নানান দেশ কিনেছিল তাদের নিজেদের দেশে ব্যবহারের জন্য। ১৯৫৫ সালে এই বিমানের দাম ছিল ৪.৩ মিলিয়ন ইউএস ডলার, আমাদের এখনকার টাকার হিসেবে প্রায় ২৮.৩৮ কোটি টাকা। অত্যন্ত সফল হলেও প্রথম দিককার এই বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছে বারবার, মারা গেছেন বহু যাত্রী, ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে বিস্তর। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত মোট ১০১০টি বিমান তৈরি হয়েছিল। নানান দেশে বিমানের ব্যবহার যত বেড়েছিল, পাল্লা দিয়ে বেড়েছিল দুর্ঘটনার সংখ্যাও। লাগাতার গবেষণা করে, বোয়িং ৭০৭ মডেলের অনেক উন্নত মডেল বেরিয়েছিল, তাদের মধ্যে ৭১৭, ৭২০, ৭২৭, ৭৩৭, ৭৪৭, ৭৫৭, ৭৬৭, ৭৭৭ এবং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে বোয়িং ৭৩৭, ৭৪৭, ৭৬৭, ৭৭৭ এবং ৭৮৭ এখনো চালু আছে, বাকিগুলোর নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

আমেরিকার বোয়িং যুগের গৌরব অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথ উদ্যোগে তৈরি এয়ারবাস আসার পর। ২৮শে অক্টোবর ১৯৭২ সালে প্রথম এয়ারবাস-এ৩০০ মডেলটি চালু করেছিল এয়ার ফ্রান্স। এই বিমান ২৬৬ জন যাত্রী বহন করতে পারে এবং কোথাও না থেমে টানা ৭৫৪০ কিমি পাড়ি দিতে পারে। এই বিমানের কারিগরি দক্ষতা অনেক উচ্চমানের এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য অনেক বেশি। ৩৫০০০ ফুট উচ্চতায় এই বিমানের অধিকতম গতি ৮৭৬কিমি প্রতিঘন্টায়। biggantechnokishore03 (Medium)এই বিমান ৬৮১৫০ লিটার জ্বালানি তেল বহন করতে পারে। খালি অবস্থায় এই বিমানের ওজন ৭৮.২০১ টন। ১৯৭২ সালে শুরু হওয়া থেকে ২০১৫ পর্যন্ত এই বিমানের দুর্ঘটনার সংখ্যা মাত্র ৭০টি। এয়ারবাস মডেলেরও অনেক উন্নতি হয়ে এখন সবথেকে জনপ্রিয় মডেলগুলি হল এয়ারবাস এ৩১৯, ৩২০ ও ৩২১; এই নির্মাণ সংস্থা ২০১৫-র ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৮২১টি বিমান বিভিন্ন দেশকে সরবরাহ করেছে।  

ভারতবর্ষে বিমান পরিষেবার সূত্রপাত হয়েছিল জামসেদজি টাটার হাত ধরে। ১৯২৯ সালে তিনি biggantechnokishore04 (Medium)ভারতের প্রথম বিমান চালকের লাইসেন্স পান এবং পরের বছর ভারত থেকে ইংল্যাণ্ডে বিমান প্রতিযোগিতা – আগা খাঁ ট্রোফিতে অংশ নিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। এই সাফল্যের পর তিনি ১৯৩২ সালে, ভারতবর্ষের মধ্যে যাত্রী ও মাল পরিবহন পরিষেবার জন্য, টাটা এয়ারলাইন্সের প্রতিষ্ঠা করেন। মুম্বাইয়ের জুহু এয়ার স্ট্রিপ থেকে আমেদাবাদ হয়ে, চেন্নাই (তখনকার ম্যাড্রাস) পর্যন্ত প্রথম বিমানটি তিনিই চালিয়েছিলেন। প্রথম বছরেই টাটা এয়ার লাইন্স, ১৫৫ জন যাত্রী আর ১০ টন মাল নিয়ে প্রায় ১,৬০,০০০ মাইল উড়েছিল। সেই সময় সেই বিমানটি ছিল De Havilland Puss Moth মডেলের। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত তিন আরোহীর এই বিমান তৈরি করত ইংল্যাণ্ডের ডি হ্যাভিলাণ্ড এয়ারক্রাফট কোম্পানি। এর গতি ছিল ঘন্টায় ২০০ কিমি, সেই যুগের সব থেকে সফল ব্যক্তিগত বিমান ছিল এই মডেলটি।

১৯৪৬ সালে টাটা এয়ারলাইন্সের নাম বদলে এয়ার ইণ্ডিয়া হল এবং ভারতের স্বাধীনতার পর, ১৯৫৩ সালে ভারত সরকার এই কোম্পানিকে অধিগ্রহণ করলেন, তখন সেই কোম্পানির নাম হল ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স। সেই সময় আমাদের হাতে ছিল বৃটিশদের ছেড়ে যাওয়া ৯৯টি বিমানের বহর, যার মধ্যে ৭৪টি ডগলাস ডিসি-৩ ডাকোটা, ১২টা ভাইকার ভাইকিং, ৩টে ডগলাস ডিসি-৪ আর বাকিগুলো ছিল নানান ধরনের ছোট মডেলের বিমান। এরপর ১৯৫৭ সালে আরও কিছু নতুন ভাইকারস ভিসকাউন্ট এবং ফকার এফ২৭ কিনে আমাদের বিমানের বহর বাড়িয়েছিলেন ভারত সরকার। ১৯৬০ সালে আমাদের দেশের বিমান নির্মাণ কোম্পানি হিন্দুস্থান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (HAL) থেকে নির্মিত প্রথম Hawker Siddeley HS 748s আমাদের বিমানবহরে সংযুক্ত হয়েছিল।

আমাদের দেশে জেট বিমানের শুরু ১৯৭০ সালে বোয়িং ৭৩৭-২০০এস বিমান দিয়ে আর এয়ারবাস যুগের শুরু ১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসে এয়ারবাস এ৩০০ দিয়ে। ১৯৯০ সালে ভারতের মুক্ত অর্থনীতির দৌলতে অনেক বেসরকারি সংস্থাও ভারতের বিমান পরিষেবায় অংশ নেয় এবং আজ আরো অনেক বেসরকারি সংস্থা কম ব্যয়ে বিমান পরিষেবা দিতে শুরু করেছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জেট এয়ারওয়েজ, ইন্ডিগো, স্পাইসজেট, গোএয়ার প্রভৃতি। এরা সকলেই যাত্রী পরিবহনের জন্য এয়ারবাস এ৩২০ মডেল বিমান ব্যবহার করে।

বাতাসের মধ্যে শব্দের গতি ১২৩৬ কিমি প্রতি ঘন্টায়, আমরা এতক্ষণ যত বিমানের কথা বললাম তাদের গতি শব্দের গতির থেকে কম, সেই কারণে তাদের সাবসনিক (Subsonic) বলে। আর শব্দের থেকেও দ্রুতগামী বিমানকে সুপারসনিক (Supersonic) বলা হয়।  এখনো পর্যন্ত যত সুপারসনিক বিমান নির্মাণ হয়েছে অথবা ব্যবহার হয়েছে, তাদের অধিকাংশই যুদ্ধ সংক্রান্ত কাজে। ১৯৬০ -৭০ দশকে সারা বিশ্বেই সুপারসনিক যাত্রীবাহী বিমান নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তাদের মধ্যে অ্যাংলো-ফ্রেঞ্চ বিমান কনকর্ড (Concorde) এবং রাশিয়ান বিমান টুপোলেভ টিইউ-১৪৪ (Tupolev TU-144) মোটামুটি সফল হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক, পরিবেশগত এবং বাণিজ্যিক কারণে এই বিমানের ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার ওপর এক মারাত্মক দুর্ঘটনায় কনকর্ড বিমানের সকল যাত্রীর মৃত্যুও এই বিমানের সাফল্যে অন্তরায় হয়ে উঠেছে।

biggantechnokishore05 (Medium)সুপারসোনিক এই কনকর্ড বিমানের গতি ছিল শব্দের গতির প্রায় দ্বিগুণ – ২১৮০ কিমি প্রতি ঘণ্টায়। ৯২ থেকে ১২৮ যাত্রী আসনের ব্যবস্থা ছিল এই বিমানে। ১৯৬৯ সালে নির্মাণ হয়ে গেলেও যাত্রীপরিষেবা শুরু করেছিল ১৯৭৬ সালে এবং তারপর ২৭ বছর এই বিমান পরিষেবা দিয়েছিল। লণ্ডনের হিথরো বিমান বন্দর থেকে, ফ্রান্সের দা’গল  বিমান বন্দর হয়ে, এই বিমানের গন্তব্য ছিল আমেরিকার নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন এবং বারবাডোজ। অন্যান্য বিমানের এই দূরত্ব পার হতে যা সময় লাগে, কনকর্ডের সময় লাগত প্রায় তার অর্ধেক। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভয়ংকর এক দুর্ঘটনায় সকলের মৃত্যুতে এবং ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর, বিমানের ধাক্কায় আমেরিকার যুগল টাওয়ার ধ্বংসের পর এই বিমানের পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০০৩ সালের ২৬শে নভেম্বর এই বিমানের পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কনকর্ড ৫০,০০০ ফুট থেকে ৬০,০০০ ফুট উচ্চতায় উড়ত, যাঁরা এই বিমানে চড়েছেন তাঁদের কাছে এই বিমানের উড়ান এক বিরল অভিজ্ঞতা, খালি অবস্থায় এই বিমানের ওজন ছিল ৭৮.৬৯৯ টন, ৯৫.২৫৬ টন জ্বালানি তেল বহন করার ক্ষমতা ছিল এবং উড়ানের সর্বোচ্চ ওজন ছিল ১৮৫ টন।

মানুষের ওড়ার শখ অনেকটাই মিটেছে ঠিকই কিন্তু কিছুতেই সন্তুষ্ট না হওয়া মানুষের স্বভাব। তোমাদের মধ্যে কেউ, একদিন হয়তো আরো নিরাপদ, আরো সাবলীল, আর গতিমান অন্য কোন বিমান আবিষ্কার করে ফেলবে, নিজের সৃষ্টিতে মানুষ নিজেই অবাক হয়ে ভাববে এও সম্ভব?