বৈজ্ঞানিকের দপ্তর টেকনো টুকটাক ঘড়ি করে টিক টিক কিশোর ঘোষাল বর্ষা ২০১৯

কিশোর ঘোষাল   এর সমস্ত লেখা একত্রে

এই লেখার আগের পর্ব এই লিঙ্কে


কিশোর ঘোষাল
দ্বিতীয় পর্ব

সূর্য ঘড়ি, জল ঘড়ি দিয়ে যে সূক্ষ্ম সময়ের পরিমাপ করা যায় না, তাছাড়া তাদের নানান সমস্যার কথা গত পর্বেই লিখেছি। সে সব সমস্যা মিটিয়ে নতুন কিছু বানিয়ে সময়ের পরিমাপ করার চেষ্টা কম হয়নি সেযুগে। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর এমন ঘড়ি তৈরি সম্ভব হল এই সেদিন, মোটামুটি ৯৯৬ খ্রীষ্টাব্দে। এই ঘড়িগুলিই প্রথম দিককার যান্ত্রিক ঘড়ি। এই ঘড়ি বানানোর বিষয়ে সে যুগে কাদের অবদান সবথেকে বেশি, সেটা জানলে ভীষণ আশ্চর্য হবে! সে যুগে যান্ত্রিক ঘড়ি বানানোর ব্যাপারে সব থেকে বেশি আগ্রহ ছিল চার্চের monk বা সন্ন্যাসীদের। ৯৯৬ সালে আবিষ্কার করা প্রথম যে যান্ত্রিক ঘড়ির কথা উল্লেখ করলাম, সেই ঘড়ি যিনি বানিয়েছিলেন, তিনিই পরবর্তী কালে জার্মানের ম্যাগড়েবুর্গ (Magdeburg) শহরের পোপ হয়েছিলেন, নাম পোপ সিলভেস্টা টু (Pope Sylvester II)। চার্চের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রীতিনিয়মের জন্যে সময়ের সূক্ষ্ম পরিমাপ এতটাই জরুরি ছিলে যে, ধর্ম আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ি বানানোতেও তাঁরা গভীর মনোনিবেশ করতেন। তবে সে ঘড়ির আর অস্তিত্ব নেই। সবচেয়ে প্রাচীন যে যান্ত্রিক ঘড়ি লণ্ডন সায়েন্স মিউজিয়ামে রাখা আছে, সেটি চতুর্দশ শতাব্দীর এক সন্ন্যাসীর বানানো। তাঁর নাম পিটার লাইটফুট (Peter Lightfoot), তিনি গ্ল্যাসটনবেরির (Glastonbury) সন্ন্যাসী ছিলেন।

যান্ত্রিক ঘড়ির রহস্যটা বুঝতে গেলে প্রথমেই এস্কেপমেন্ট (Escapement) ব্যাপারটা বোঝা দরকার। ইংরিজিতে to escape মানে পালানো, সে তো জানোই। যান্ত্রিক ঘড়ির মধ্যে পালানো আর ধরে ফেলা এই চলতে থাকে নিরন্তর। পাশের ছবিটা দেখলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে।
ছবিতে দেখ অনেক খাঁজকাটা একটা লোহার চাকা রয়েছে, যার কেন্দ্রে একটা পিন দিয়ে তাকে এক জায়গায় ধরে রাখা হয়েছে। ধরে আছে মানে চাকাটা নড়াচড়া করতে পারবে না, কিন্তু পিনটাকে অক্ষ করে ঘুরতে পারবে। এই চাকার পিছনে ঝোলানো থাকে তিরের ফলার মতো দেখতে লম্বা লোহার একটা কাঠি, ওই তিরের ফলার দুই ধারে হুকের মতো খাঁজ কাটা আছে। ওই তিরের মতো কাঠিটাও নড়বে চড়বে না, কিন্তু তার ভরকেন্দ্রে, মাথার কাছে ছোট্ট ছিদ্রটাকে অক্ষ করে দু পাশে দুলতে পারবে।
এইবার ওই লোহার কাঠিটাকে নির্দিষ্ট মাপে যদি দোলানো যায়, তাহলে তার হুকের ধাক্কায় লোহার চাকাটা ঘুরবে, কিন্তু দুলতে থাকা তিরের অন্য হুকের জন্যে চাকাটা মাত্র এক ঘাটের বেশি ঘুরতে পারবে না। অর্থাৎ তিরের ধাক্কায় চাকাটা যেন পালাতে চাইছে, কিন্তু অন্য ঘাটটা চাকাটাকে পালাতে দিচ্ছে না। এই ব্যাপারটাই এস্কেপমেন্টের মূল তত্ত্ব।
এবার তীরের মতো কাঠিটাকে দোলানোর জন্যে প্রথমদিকে ভারি ওজন ঝোলানো হত, পরের দিকে স্প্রিংয়ের সঙ্গে পেণ্ডুলাম এবং তারও পরে ব্যলান্স-হুইল (balance wheel) ব্যবহার করা হত। খাঁজকাটা ওই চাকার নাম হুইল গিয়ার (wheel gear)। দুলতে থাকা ওই কাঠি আর হুইল গিয়ারের ধাক্কার থেকেই আওয়াজ হত “টিক-টক” বা “টিক-টিক” আর সেই থেকে কিছু দিন আগে পর্যন্ত, ঘড়ি আর ওই আওয়াজ সমার্থক হয়ে উঠেছিল।
ভারি ওজন ঝোলানো ঘড়িগুলো আকারে বিশাল বড়ো আর ভারি হত। এই ঘড়িগুলি সাধারণতঃ বড় বড়ো চার্চের মাথায় কিংবা শহরের প্রধান জায়গায় বেশ উঁচু ঘড়িঘর বানিয়ে তার মাথায় বসিয়ে রাখা হত। ওই সব ঘড়িতে প্রহর ঘোষণার জন্যে ঘড়ির সঙ্গে বড় বড় ঘন্টাও রাখা হত। প্রতি ঘন্টায় সে সব ঘন্টা গম্ভীর আওয়াজ তুলে বাজত, ঢং ঢং। শহরের লোক নানান কাজে ব্যস্ত থাকলেও ঘন্টা শুনে বুঝতে পারতো কটা বাজে। আমাদের দেশে সময়ের পরিমাপ ঘটিকা বা ঘন্টা (hour) এইভাবেই পেতল বা অন্য ধাতু দিয়ে বানানো ঘন্টা (bell)-র সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে।

পেণ্ডুলাম ঘড়ি

এতদিন ধরে যে যান্ত্রিক ঘড়ি চলছিল, সেগুলো বেশ জবড়জং জটিল আর খুব ভারি লোহা, ইস্পাত দিয়ে বানানো ভজকট ব্যাপার। ওপরের ছবিটা দেখ না, দেখে কী মনে হচ্ছে, যে ওটা একটা ঘড়ির অন্দরমহল! কাজেই এই ঘড়িকে আরো উন্নত করে, কীভাবে আরো সহজ সরল যন্ত্র তৈরি করা যায়, যা দিয়ে আরো সূক্ষ্ম সময়ের হিসাব করা সম্ভব, সে প্রচেষ্টা চলছিলই! তাছাড়া দেশের ধনী ব্যক্তিরাও চাইছিল, তাদের প্রাসাদে এবং সম্ভব হলে প্রত্যেক ঘরে ঘরে সুন্দর সাজিয়ে রাখার মতো একটা করে ঘড়ি হোক, যাতে সাধারণ মানুষের মতো ঘড়িঘরের ঘন্টার আওয়াজ শুনে সময়ের হিসেব করতে না হয়।
১৫৮০ সালে ইটালির গ্যালিলিও গ্যালিলি পেণ্ডুলাম আবিষ্কার করলেন এবং তিনি আবিষ্কার করলেন আশ্চর্য এক তত্ত্ব। একটি সাধারণ পেণ্ডুলাম বলতে সুতোয় ঝোলানো একটি বল বা ওজনকে বোঝায়, ওই সুতো যতো সূক্ষ্ম ও হাল্কা হবে পেণ্ডুলাম তত ভালো কাজ করবে, অবিশ্যি সুতোটা যথেষ্ট শক্তও হতে হবে, যাতে বলটি ছিঁড়ে না পরে যায়। এবার ওই সুতোর অন্য প্রান্তটি কোন একটি কীলক বিন্দুতে (pivot point) ঝুলিয়ে, যদি দুলিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সুতোয় বাঁধা বলটি নির্দিষ্ট গতিতে ডান থেকে বাঁদিকে সমান দূরত্বে দুলতে (oscillate) থাকে। আদর্শ শর্ত (ideal conditions) অনুযায়ী এই বলটির অনন্তকাল একই দূরত্বে, একই গতিতে দুলতে থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না, কারণ, সূক্ষ্ম ভরহীন সূতো (mass-less rod or thread) দিয়ে ভরগোলক (mass bob) ঝোলানো অসম্ভব, যাকে কেন্দ্র করে পেন্ডুলাম দুলবে, সেই কীলকটি ঘর্ষণহীন (frictionless pivot) হওয়াও অসম্ভব। তাছাড়া আছে বাতাসের ঘর্ষণ।
পেণ্ডুলামের এই নির্দিষ্ট সময়ের দোলাকে (oscillation) কাজে লাগিয়ে যে ঘড়ি বানানো সম্ভব, সে কথা গ্যালিলিও আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন এবং ঘড়ি বানানোর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তিনি পেণ্ডুলাম ব্যবহার করে ঘড়ি বানাতে পারেননি। তার পরিবর্তে ১৬৫৬ সালে ক্রিস্টিয়ান হিউজেন্স (Christiaan Huygens) নামে একজন ডাচ
অংকবিদ ও বিজ্ঞানী প্রথম এই পেণ্ডুলাম ব্যবহার করে ঘড়ি বানিয়েছিলেন। পাশের ছবিদুটি হিউজেন্স সায়েবের বানানো প্রথম পেণ্ডুলাম ঘড়ির ছবি। বাঁদিকের ছবিটি বাইরে থেকে ঘড়ির চেহারা, আর ডানদিকের ছবিটি ঘড়ির অন্দরের কলকব্জার ছবি। দুটি ছবিতেই পেণ্ডুলামের গোলকদুটি চিনতে পারছো নিশ্চয়ই। ওই পেণ্ডুলামের সাহায্যে এস্কেপমেন্ট সিস্টেম কাজে লাগিয়ে এই ঘড়ি বানানো হয়েছিল। প্রথম দিকের এই ঘড়িতে দিনে মাত্র এক মিনিটের ভুল (error) হতো!
একবার পেণ্ডুলাম ঘড়ি চালু হয়ে যাওয়াতে, ইংল্যাণ্ডে এই ঘড়ি বানানোর যেন হিড়িক পড়ে গেল। ১৬৭০-৭১ সালে উইলিয়াম ক্লিমেন্ট নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোক, বিশাল বাক্সের মধ্যে পেণ্ডুলাম ঘড়ি বানিয়ে ফেললেন, সে ঘড়ির নাম ঠাকুরদাদা ঘড়ি (Grandfather  clock)।
১৭০০ সালের এরকমই একটি গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক দোরাব টাটাজি মুম্বাইয়ের প্রিন্স অব ওয়েল্‌স্‌ মিউজিয়ামে দান করেছিলেন। এই ঘড়ির ডায়ালে তামিল ভাষায় ১ থেকে ১২ সংখ্যা লেখা আছে। মনে করা হয়, ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে মাদ্রাজের শিল্পকলা স্কুল থেকে এটির বাইরের বাক্সটি বানানো হয়েছিল, সেই সময়েই তামিল ভাষায় সংখ্যাগুলি লেখা হয়েছিল।
ক্লিমেন্ট সায়েবের পরে কয়েক বছরের মধ্যে পেণ্ডুলাম ও এস্কেপমেন্ট পদ্ধতির অনেক উন্নতি হয়ে ঘরের দেওয়ালে ঝোলানোর মতো সুদৃশ্য ছোট ঘড়ি, প্রচুর পরিমাণে বানানো শুরু হয়ে গেল। সে সব ঘড়ি আমাদের ছোটবেলাতেও অনেক উচ্চবিত্ত বাড়িতেই দেখা যেত।

টাইম পিস (time piece) এবং পকেট ঘড়ি (Pocket watch)

আকারে বড়ো হোক কিংবা ছোট, পেণ্ডুলাম ঘড়ি, বড় হল ঘরের মেঝেয় বসিয়ে কিংবা ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে সময় দেখার জিনিষ। পথে ঘাটে, দূর বিদেশের অপরিচিত জায়গায় সময় জানতে গেলে সে ঘড়ি কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাছাড়া পেণ্ডুলাম ঘড়ি ভালো কাজ করে, একজায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে অথবা ঝুলে থাকলে, একটু নড়াচড়া হলেই ঘড়ি বিগড়ে যেত। অতএব, আকারে ছোট্ট, পকেটে রাখা যায় এবং ঠিকঠাক সময়ও দেখা যায় এমন ঘড়ির ভাবনা চিন্তা শুরু হয়ে গেল।
ক্রিশ্চিয়ান হিউজেন্স, যাঁর উন্নত পেণ্ডুলাম ঘড়ি আবিষ্কারের কথা আগেই বলেছি, তিনি পেণ্ডুলামের পরিবর্তে ব্যালান্স স্প্রিং (Balance Spring) এবং ব্যালান্স হুইল (Balance Wheel) দিয়ে ছোট্ট ঘড়ি যে বানানো সম্ভব সেই আবিষ্কারের কথা তখনকার দিনের বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশ করলেন। এবং ১৬৭৫ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি, স্পাইর‍্যাল ব্যালান্স স্প্রিং (Spiral balance spring) বা স্পাইর‍্যাল হেয়ার স্প্রিং (spiral hairspring) ব্যবহার করে, সর্বদা কাছে রাখার মতো ছোট্ট ঘড়ি বানিয়ে ফেলে নতুন যুগের সূচনা করে ফেললেন! এই ঘড়িরও মূল তত্ত্ব সেই এস্কেপমেন্ট তত্ত্ব, যার কথা তোমাদের আগেই বলেছি।
এবার অ্যালার্ম দেওয়া টাইম-পিস ঘড়ির ভেতরের জটিল কথা একটু সহজ করে বলার চেষ্টা করছি। এই ঘড়িতে ছোট্ট ছোট্ট অনেক পার্টস বা অংশ থাকে। তাদের মধ্যে প্রধানগুলি হল,
১. অ্যাংকার (anchor) – এটি একটি লিভার, ঘড়ির পেছনে লাগানো থাকে,
এর কাজ হল এস্কেপমেন্ট গিয়ারকে একজায়গায় ধরে রাখা এবং গিয়ারের এক একটি দাঁতকে ঘুরতে দেওয়া। এই লিভারের সঙ্গে আরেকটি লিভারও জুড়ে দেওয়া হয়, যেটি অ্যালার্ম গিয়ারকে নিয়ন্ত্রণ করে।
২. ব্যালান্স স্প্রিং (balance spring) – হেয়ার স্প্রিং ও ব্যলান্স হুইল মিলে ব্যলান্স স্প্রিং বানানো হয় । এরা দুজনে মিলে নির্দিষ্ট সময়ের মাপে অ্যাংকারকে কেন্দ্র করে দুলতে (oscillate) থাকে। খুব পাৎলা ধাতব তার দিয়ে হেয়ার স্প্রিং বানানো হয়। এই স্প্রিং বিশেষ এক ধরনের সংকর ধাতু, নিভারক্স (nivarox) দিয়ে বানানো হয়।
এই ধাতুর বিশেষত্ব হল, খুব গরম অথবা ঠান্ডার সময়, এই ধাতুর বৈশিষ্ট্যে তেমন কোন পরিবর্তন হয় না। যার ফলে, সব ঋতুতেই
ঠিকঠাক সময় হিসেব করতে পারে। ব্যালান্স স্প্রিংয়ের সাহায্যে ব্যালান্স হুইল এস্কেপমেন্টের তত্ত্ব মেনে নির্দিষ্ট সময়ে দুলতে থাকে এবং সময়কে নির্দিষ্ট ভাগে গুনতে থাকে।
৩. মেন স্প্রিং (Main spring) – মেন স্প্রিংয়ের কাজ হল শক্তি সঞ্চয় করা, এই স্প্রিংয়ের জট একটু একটু খুলতে থাকলে ব্যালান্স স্প্রিংয়ের দোলা ও এস্কেপমেন্ট চলতে থাকে। এই ধরনের ঘড়িতে দিনে একবার দম (winding) দেওয়ার নিয়ম ছিল। দম দেওয়া মানে স্প্রিংটিকে পাকিয়ে তোলা। একবার পুরো দম দিলে একটি ঘড়ি ২৪ ঘন্টা থেকে ছত্রিশ ঘন্টা পর্যন্ত চলতে থাকত ঠিকঠিক টিকটিক। আবার দম বেশি হয়ে গেলে, এই স্প্রিং কেটে গিয়ে ঘড়ি বন্ধই হয়ে যেত। এই মেন স্প্রিংয়ে দম দেওয়ার জন্যে ঘড়ির পেছনদিকে চাবি লাগাতে হত, একটি ঘড়ির জন্যে অন্যটি অ্যালার্মে ঘন্টি বাজানোর জন্যে। পাশের ছবিতে মেন স্প্রিং ও চাবির ছবি দেওয়া হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে একটা মজার কথা বলে রাখি, আগেকার দিনে খুব বড়লোকদের বাড়িতে ঘরে ঘরে ছোট বড়ো অনেক ঘড়ি থাকত। দিনের কোন এক সময়, সাধারণতঃ একটু বেলার দিকে সেই সব ঘড়িতে শুধু দম দেওয়ার জন্যেই এক বা একাধিক লোক থাকতেন। তাঁদের পদ (designation) ছিল “ঘড়িবাবু” (winding man)।
ঘড়িতে এই দম দেওয়া ব্যাপারটা বেশ নিয়মিত দায়িত্বের কাজ ছিল, কারণ দম না দেওয়ার ফলে ঘড়ি যদি বন্ধ হয়ে যায়, কাছাকাছির মধ্যে ঘড়িওয়ালা লোক বা বাড়ি না পেলে সময় মিলিয়ে নেওয়ার কোন উপায় থাকত না। আর আগেই বলেছি, বেশি দম দিয়ে ফেললে ঘড়ি বিগড়েই যেত, তখন বড়ো শহর ছাড়া সে ঘড়ি সারানো সম্ভব হত না, সেক্ষেত্রে ঘড়ি সারানোটাও বেশ সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠত।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বালক পুত্র রবিকে সঙ্গে নিয়ে বেশ কিছুদিনের জন্যে যখন হিমালয় বেড়াতে গিয়েছিলেন, তখন রবিকে তাঁর হাত ঘড়িতে দম দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। রবি এই দায়িত্ব পেয়ে খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন, কারণ পিতা তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়াতে তিনি নিজেকে বেশ বড় ছেলে ভাবতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু অতি উৎসাহে দম দিতে গিয়ে তিনি যে ঘড়িটি খারাপ করে ফেলেছিলেন, সে কথাও তিনি বলতে ভোলেননি!
৪. গিয়ার ট্রেন (Gear train) – এইবার দম দেওয়া মেন স্প্রিংয়ের একটি করে গাঁট বা ঘাট খুলতে থাকার সঙ্গে ব্যালান্স হুইল ও ব্যালান্স স্প্রিং এস্কেপমেন্ট পদ্ধতিতে দুলতে শুরু করে। সেই দোলার সময়কে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন মাপের গিয়ার গুলিও ঘুরতে থাকে। গিয়ারগুলির সাইজ ও তার ঘাটগুলি খুব হিসেব করে বানাতে হয়, সে কথা বলাই বাহুল্য। এক একটি গিয়ার বিভিন্ন সময়ের কাঁটাকে ঘোরাতে থাকে। যেমন সব থেকে ছোটটি সেকেণ্ডের কাঁটাকে ঘোরায়, তার পরেরটি মিনিট, সব থেকে বড়োটি ঘন্টার।

এই গিয়ার বা পিনিয়নগুলি যেমন যেমন ঘুরতে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতে থাকে তার কেন্দ্রের শ্যাফট (shaft), যার মাথায় নির্দিষ্ট লেভেলে ঘড়ির কাঁটাগুলিও ঘুরতে থাকে আর ঘড়ির সামনের ডায়ালের ওপর লেখা সময়কে নির্দেশ করে আমাদের ঘন্টা মিনিট, সেকেণ্ড দেখাতে থাকে।

ওপরের ছবিতে মেন স্প্রিংয়ের ব্যারেল B থেকে এস্কেপ হুইল Eকে দোলানোর শক্তি যোগায়, সঙ্গে Z1 কেন্দ্রিয় হুইল, Z3 তিন নম্বর হুইল, Z5 চারনম্বর হুইলকেও ঘোরাতে থাকে। এই হুইলগুলি আবার যথাক্রমে Z2, Z4 এবং Z6 পিনিয়নগুলিকে ঘুরিয়ে ঘড়ির কাঁটা ঘোরাতে থাকে। পিনিয়নের মাথায় কাঁটাগুলি এক লেভেলে বা একই তলে থাকতে পারবে না, তাই সব থেকে ওপরে সেকেণ্ডের, তার নিচে মিনিট এবং সব শেষে ঘন্টার কাঁটা বসানো হয়। একটি পকেট ঘড়ির ভেতরের নানান পার্টস্‌ এবং তার পাশে সুদৃশ্য একটি পকেট ঘড়ির ছবি নিচে দেওয়া হল।

প্রায় সাড়ে তিনশ বছর ধরে, দম দেওয়া পেণ্ডুলাম ঘড়ি অথবা ব্যালান্স স্প্রিং ব্যবহার করা টেবিল ঘড়ি ও হাতঘড়ির রাজত্ব চালু ছিল। বিশ্বের সেরা যান্ত্রিক (Mechanical) ঘড়ি তৈরিতে একসময় সুইজ্যারল্যাণ্ডের ভীষণ সুনাম ছিল এবং বিশ্বের লোকের কাছে সুইস (Swiss) ঘড়ির আলাদা কদর ছিল। মোটামুটি ১৯৮০ সাল নাগাদ যখন থেকে ইলেকট্রনিক কোয়ার্জ্‌ (Electronic Quartz) ঘড়ি আবিষ্কার হল, তখন থেকে আমাদের জীবন থেকে যান্ত্রিক ঘড়ি তার মহিমা হারিয়ে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যেতে শুরু করল।
রাত্রে দেরি করে বাড়ি ফেরা সন্তানের অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা অথবা স্বামীর প্রতীক্ষায় থাকা স্ত্রীদের উৎকণ্ঠিত হৃৎ-স্পন্দনের সঙ্গে যে ঘড়ির টিকটিক অথবা টিকটক আওয়াজ মিশে যেত, আমাদের এখনকার ব্যস্ত জীবন থেকে সেই সব যান্ত্রিক ঘড়ি আজ অবলুপ্ত।

আজ এই অব্দিই থাক, পরবর্তী ও শেষ পর্বে বলব, সেই সব আধুনিক ঘড়ির কথা।

তথ্য ও চিত্র কৃতজ্ঞতাঃ আই.আই.টি কানপুর ও উইকিপিডিয়া।

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

1 Response to বৈজ্ঞানিকের দপ্তর টেকনো টুকটাক ঘড়ি করে টিক টিক কিশোর ঘোষাল বর্ষা ২০১৯

  1. Cinthia says:

    Khub darun o sundor Kore ghorir kotha likhechen kishoreda.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s