বৈজ্ঞানিকের দপ্তর টেকনো টুকটাক-মুদ্রা থেকে নোট পর্ব ২ কিশোর ঘোষাল বর্ষা ২০১৭

 টেকনো টুকটাক আগের সব পর্ব

biggantechno0-medium(পর্ব-২)

আগেই বলেছি সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা দ্রব্য বিনিময় প্রথা (barter system) এবং অর্থ বিনিময়  প্রথা (money transaction system) দুটোতেই অভ্যস্ত ছিল, তা না হলে দেশের ভেতরে এবং বিদেশেও নিয়মিত বাণিজ্য করা সম্ভব হত না।  এই সভ্যতার মানুষেরা তামা, রুপো, সোনা প্রভৃতি ধাতুর ব্যবহারও যে জানত, সে প্রমাণ বহুল পাওয়া যায়। অতএব, অনুমান করা যায় যে অর্থ বিনিময়ে তারা ধাতুর ব্যবহারও শুরু করতে পেরেছিল। সেই সময় যে অঞ্চল থেকে রুপো আমদানি করা হত, তাদের মধ্যে প্রধান দেশ ছিল সুমের (এখন সে অঞ্চল ইরাকের মধ্যে), এ সুমেরের সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের ঘনিষ্ট বাণিজ্য সম্পর্কের অনেক হদিশ পাওয়া গেছে।

এ প্রসঙ্গে মহেঞ্জোদরোতে পাওয়া এগারোটি রুপোর টুকরোর কথা উল্লেখ করা যায়। একটি রুপোর বাক্সের মধ্যে কিছু গয়নার সঙ্গে এই এগারোটি রুপোর টুকরো পাওয়া গিয়েছিল। এদের মধ্যে দুটি ছাড়া, অন্যগুলির আকার গোল কিংবা আয়তাকার। এই নটি ধাতুখণ্ডের ওজন, সিন্ধুসভ্যতার তৌল ও ওজন রীতি(weighing system)-র সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু যে দুটি ধাতুখণ্ড  সিন্ধুসভ্যতার ওই প্রচলিত ওজনের সঙ্গে মেলে না, তাদের গায়ে কীলক (cuneiform) আকারের লিপি খোদাই করা আছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিশেষ করে দেখেছেন, এই আলাদা ধাতুখণ্ডদুটি সুমের থেকে এখানে এসেছিল। এই উদাহরণ থেকে ধরে নেওয়া যায়, আমাদের দেশে ধাতুকে বিনিময় মাধ্যম (medium of exchange) হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন পশ্চিম এশিয়ার প্রভাবেই শুরু হয়েছিল, যদিও তার গুণমান পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভারতীয়।

সিন্ধু সভ্যতার অবলুপ্তির অনেক কারণ অনুমান করা হয় এবং সে নিয়ে নানান বিতর্কেরও শেষ নেই। কিন্তু সিন্ধুসভ্যতার উন্নত নাগরিক সভ্যতার পর, আর্যভাষীদের সামাজিক কাঠামোর যে সন্ধান আমরা পাই, সে সভ্যতা পুরোপুরি গ্রাম নির্ভর। সেক্ষেত্রে তাদের দ্রব্য বিনিময় প্রথাই (barter system) হয়তো যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ঋগ্বেদের একটি সূত্রে ‘নিষ্ক’ ব্যবহারের যে কথা বলা হয়েছে, সেটি ধাতব খণ্ড বিশেষ করে সোনার খণ্ড ছাড়া কিছুই নয়। এই ‘নিষ্ক’ সাধারণত সোনার ছোট ছোট টুকরো জুড়ে গয়নার কথা বোঝাত। কিন্তু যেখানে ‘নিষ্ক’র বিশেষণে শত ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট ওজনের একশটি সোনার খণ্ডের কথাই বলা হয়েছে মনে করা যায়। সেক্ষেত্রে আর্যভাষী সমাজেও নির্দিষ্ট ওজনের ধাতব খণ্ডকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হত, এ কথা বলাই যায়। ঐতিহাসিকেরা বলেন, বৈদিক যুগের শেষের দিকেই অর্থাৎ ৮০০/৭০০ খৃঃপূঃ-এর কোন সময়েই নির্দিষ্ট ওজনের ধাতবখণ্ড বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত ছিল।

এই সময়েই উত্তরপশ্চিম থেকে, পূর্বে গঙ্গার উপনদী ও শাখানদীর অববাহিকা ধরে, আর্যভাষীদের সমাজ ও সভ্যতার প্রসার হচ্ছিল। এই অঞ্চলের ষোড়শ মহাজনপদের হাত ধরেই আর্যভাষীদের নগরায়ণ ও নাগরিক সভ্যতার সূত্রপাত। সুতরাং সেই সময়েই উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বিভিন্ন নগরে বেড়ে উঠতে লাগল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। এই বাণিজ্যের প্রয়োজনেই নির্দিষ্ট ওজন এবং নির্দিষ্ট গুণমানের ধাতুখণ্ডের নির্ধারিত মূল্য এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতা জরুরি হয়ে উঠতে লাগল। জরুরি হয়ে উঠল এই ধাতুখণ্ড তৈরির নির্দিষ্ট পদ্ধতি। কোন রাজ্যের শক্তিশালী রাজা বা তাঁর প্রতিনিধি কিংবা সকলের কাছেই গ্রহণযোগ্য কোন বণিকসভা ছাড়া এই ধাতবখণ্ডের নির্দিষ্ট মূল্যমান নিয়ন্ত্রণের কঠিন দায়িত্ব নেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ধাতব মুদ্রা বা টাকা অপরিহার্য হয়ে উঠতে লাগল।

ভারতবর্ষে ঠিক কবে থেকে টাকার প্রচলন শুরু হয়েছিল, আজ তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে বৌদ্ধ কাহিনী ও বুদ্ধদেবের জীবনী, জাতকের নানান কাহিনীতে এই টাকা ও মুদ্রার ব্যবহারের ইঙ্গিত প্রচুর পাওয়া যায়। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের মোটামুটি ৬০০ থেকে ৫০০ বছর আগে, ঐতিহাসিকেরা এই সময়টাকে নির্দিষ্ট করেন। এই প্রসঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ বিনয়পিটকের একটি কাহিনী শুনলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়।

সে সময়কার একজন ধনী ব্যবসায়ী বা শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ ছিলেন বুদ্ধের একান্ত ভক্ত। তিনি একবার মনস্থ করলেন, ভগবান বুদ্ধ ও তাঁর সকল শিষ্যদের থাকার জন্যে একটি সঙ্ঘবিহার নির্মাণ করাবেন। উপযুক্ত জমির খোঁজ করতে করতে তিনি শ্রাবস্তী (বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের সাহেত-মাহেত) নগরের কাছে মনোমত বেশ অনেকটা জমির সন্ধান পেলেন। সেই জমির মালিকের নাম জেত। শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ জেতের কাছে ওই জমি কিনে নেবার প্রস্তাব দিলে, শুরুতে জেত কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। অনেক অনুরোধের পর জেত রাজি হলেন, কিন্তু জমির যে দাম দাবি করলেন, তা শুনলে চমকে উঠতে হয়। তিনি দাবি করলেন, জমির দাম হিসেবে, পুরো জমিটা সোনার ধাতুখণ্ড দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ রাজি হয়ে গেলেন এবং গরুর গাড়িতে হাজার হাজার সোনার খণ্ড এনে, প্রচুর লোক দিয়ে সেই খণ্ড বিছিয়ে, ঢেকে দিতে লাগলেন সেই জমি। শ্রেষ্ঠীর এই অদ্ভূত ভক্তি দেখে জেত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং শেষ অব্দি তিনি কোন দাম না নিয়ে জমিটি শ্রেষ্ঠীকে দান করে দিয়েছিলেন। সেই উপকারের কথা মনে রেখে শ্রেষ্ঠী সেই বিহারের নাম জেতবনবিহার রেখে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। এই আশ্চর্য ঘটনার কথা অজানা কোন শিল্পী ছবির ভাষায় লিখে রেখে গেছেন মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলার ভারহুত স্তূপের কাছে, একটি স্তম্ভের গায়ে।

বৌদ্ধ কাহিনীর বর্ণনা এবং উপরের চিত্র দেখে অনুমান করা যায়, চারকোণা এই সোনার পাতের টুকরোগুলিই মুদ্রা, আর এই মুদ্রার নাম ছিল কার্ষাপণ। প্রথমে ধাতুকে গলিয়ে ছাঁচের মধ্যে সমান উচ্চতায়(thickness) ঢালাই (casting) করে লম্বা পাত বানানো হতো। অন্যদিকে নানান চিহ্ন এবং নকশা উলটো খোদাই করে, ছোট ছোট ছাঁচ বানানো হত। মিষ্টির দোকানে আজও সন্দেশ বানানোর যেমন ছাঁচ থাকে, অনেকটা সেরকম। এবার ঢালাই করা ধাতুর পাত, সমান মাপে কেটে ফেলে, একটু গরম করে, ধাতুকে সামান্য নরম করে নেওয়া হত। তারপর ওই ছোট ছাঁচ নরম ধাতুর পাতের ওপর রেখে হাতুড়ি দিয়ে জোরে ঘা দিলেই, নরম পাতের টুকরোতে ছাপা হয়ে যেত সোজা চিহ্ন বা নকশা। তৈরি হয়ে যেত মুদ্রা (coin)। এই ধরনের মুদ্রাকে ছাপদেওয়া মুদ্রা (punch marked coin)বলা হত। সোনার কার্ষাপণ আজ পর্যন্ত উদ্ধার না হলেও রুপোর অজস্র কার্ষাপণ উদ্ধার করা গেছে। প্রাচীনতম রুপোর যে কার্ষাপণ পাওয়া গেছে, সেগুলি মৌর্য আমলের, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সময়কাল মোটামুটি ৩২০-থেকে ২৭০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ধরা হয়।

    

সম্পূর্ণ ভারতীয় উপমহাদেশ এবং তার বাইরের প্রতিবেশী কিছু দেশও সেই সময় মৌর্য রাজাদের অধীনে ছিল। বিশাল এই সাম্রাজ্যের সর্বত্র মুদ্রার ঠিকঠাক প্রচলন করা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। জাল বা নকল মুদ্রার প্রচলন ঠেকাতে, মৌর্য রাজারা বিশেষ কয়েকটি রাজকীয় প্রতীক ব্যবহার করতেন। নিচের এই নকশাগুলির মধ্যে বাঁদিক থেকে প্রথম চারটি চিহ্ন বা সংকেত মৌর্য আমলের পাওয়া, প্রায় সব মুদ্রাতেই দেখা যায়, এই চারটি ছাড়াও নানান সময়ের নানান মুদ্রায় আরো কিছু চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রধান চারটি চিহ্ন ছিল রাজা কিংবা রাজ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের নির্দিষ্ট চিহ্ন, আর অন্যগুলি হয়তো স্থানীয় প্রশাসন কিংবা নানান সময়ের মুদ্রা হিসেবে অথবা কোন বিশেষ উৎসবের সংকেত হিসেবে ছাপ দেওয়া হত।    

(মৌর্য যুগের মুদ্রা ও মুদ্রায় ব্যবহার করা কিছু বিশেষ সংকেত চিহ্ন)

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের গুরু ও মহামন্ত্রী কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে, মুদ্রার গুণমান এবং তার নিয়ন্ত্রণের নিয়ম কানুন নিয়ে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর মতে মুদ্রা তৈরির সম্পূর্ণ দায়িত্ব লক্ষণাধ্যক্ষের – ইনি রাজকোষের বা টাঁকশালের অধ্যক্ষ। লক্ষণাধ্যক্ষই রাজ্যের প্রয়োজন অনুসারে, পণ (কার্ষাপণ), অর্ধপণ, পাদপণ ও অষ্টভাগপণ মুদ্রা তৈরি করাবেন। এক পণ মানে ৩২ রতি বা ৫৭.৬ গ্রেন কিংবা ৩.৭৩২ গ্রাম। যদিও এখনকার হিসাবে ৩২ রতি মানে ৩.৮৮৮গ্রাম ধরা হয়। অর্ধপণ মানে ১৬ রতি, পাদপণ মানে ৮ রতি, আর অষ্টভাগপণ মানে ৪ রতি। খাঁটি রুপো কিন্তু বেশ নরম ধাতু। [কাঠের হাতুড়ি পিটিয়ে বানানো অতি পাতলা রুপোর তবক দেওয়া ভালো সন্দেশ তোমরা নিশ্চয়ই খেয়েছ] খাঁটি রুপোর মধ্যে খাদ অর্থাৎ অন্য ধাতু মিশিয়ে, মুদ্রার জন্যে উপযোগী শক্ত সংকর ধাতু বানানো হত। কৌটিল্যের নির্দেশ ছিল, একটি ৩২ রতি মুদ্রার মধ্যে ২২ রতি খাঁটি রুপো থাকতেই হবে, আর বাকি ১০ রতি হবে তামা। প্রচলিত মুদ্রার গুণমান পরীক্ষা এবং নকল মুদ্রা ধরার জন্যে ‘রূপদর্শক’ নামে মুদ্রা পরীক্ষক নিযুক্ত হতেন। ‘রূপদর্শক’-এর দায়িত্বে গাফিলতি ধরা পড়লে ১০০০ পণ জরিমানার নির্দেশ ছিল এবং রাজকোষে নকল মুদ্রা চালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়লে, রূপদর্শকের মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠিন শাস্তিরও নির্দেশ ছিল।

মৌর্যযুগে মুদ্রা তৈরির অধিকার ছিল শুধুমাত্র রাজা ও রাজসরকারের। সে সময় আসমুদ্র হিমাচল বিস্তৃত বিশাল সাম্রাজ্যের সকল জনসাধারণ এই সমস্ত মুদ্রাই ব্যবহার করত। সাম্রাজ্যের সকল রাজকর্মচারীদের বেতনও এই মুদ্রাতেই দেওয়া হত। সাধারণ জনগণের মনে রাজা ও রাজ প্রতিনিধিদের উপর যে যথেষ্ট আস্থা ও বিশ্বাস ছিল, এই মুদ্রা ব্যবস্থার বিপুল ব্যবহার দেখে বোঝা যায়। এর থেকে এও স্পষ্ট বোঝা যায় মৌর্য যুগের রাজাদের যথেষ্ট প্রতিপত্তি, প্রভাব ছিল ও সারা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন।

তবে সর্বকালে সর্বদেশেই দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের যেমন অভাব হয় না, তেমনি সে সময়েও হয়নি। এত সব কঠোর নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ থাকলেও, সে সময়কার এমন অনেক মুদ্রার সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলি নিঃসন্দেহে জাল। এই মুদ্রাগুলি পাৎলা রুপোর পাত মোড়া তামার মুদ্রা!

মৌর্য যুগের পরে ছাঁচে ঢালা বিভিন্ন আকারের তামার মুদ্রার বহুল প্রচলন হয়েছিল। উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দুদিকে ছবির ছাপযুক্ত তামার মুদ্রা অনেক আবিষ্কৃত হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর গোড়ার দিকেই লেখসমেত ছাঁচের আঘাতে মুদ্রিত ভারতীয় মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইরাণে পাওয়া ‘ধমপালস’ এবং ‘উজেনিয়ি’ লিপির ছাপযুক্ত উজ্জয়িনীর মুদ্রার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। এই সময়ের মুদ্রাগুলির উপর শক্তিশালী কোন রাজসরকারের কিংবা প্রভাবশালী প্রশাসকের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না, কিন্তু দুপাশেই ছবি ও লেখ সমেত ছাঁচে ঢালা মুদ্রার ব্যবহার প্রচুর হয়েছিল।

‘টাকা’ কথাটি এসেছে ‘টঙ্ক’ বা ‘টঙ্কক’ শব্দ থেকে, এই দুটি শব্দের অর্থ ‘বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের উপযুক্ত প্রশাসনিক ছাপমারা ধাতবখণ্ড’। ইংরিজি coin  শব্দের উৎপত্তি ল্যাটিন ‘কুনেউস’ (cuneus) থেকে যার মানে কীলক। যে কোন পোস্ট অফিসে, কাঠের হাতলের সামনে গোল ছাপ মারার যে যন্ত্রটি দিয়ে পোস্ট অফিসের অফিসাররা সবকিছুতে ছাপ মারেন, সেই রকম কীলক দিয়ে ছাপ দিয়ে ধাতব মুদ্রায় ছবি ছাপা হত বলেই, ইংরিজিতে এই ধাতব মুদ্রাকে coin বলা হয়। আবার মুদ্রা তৈরির জন্যে, একটি কাঠের পাটার মধ্যে উলটো ছবির ছাঁচ বানিয়ে, রোমের লোকেরা মুদ্রা ছাপাত। সেই কাঠের পাটার নাম মনেতা (Moneta)। রোমের  Juno Moneta মন্দিরে এই পদ্ধতিতে মুদ্রা তৈরি করা হত বলেই, ইংরিজিতে  বিনিময় যোগ্য ধাতব খণ্ডকে, ওই মন্দিরের দেবতার নাম অনুসারে money বলা হত।

এই সময়ে সারা বিশ্বেই মুদ্রার বহুল ব্যবহার শুরু এবং জনপ্রিয় হলেও বিনিময় প্রথা (barter system) কিংবা দ্রব্যধন বিনিময়ের (Commodity exchange system)  প্রথা একদম বন্ধ হয়ে যায়নি। এই দ্রব্যধনের মধ্যে নানান শস্য, যেমন ধান, গম; নানান পশু, যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া; এমনকি মানুষও ব্যবহার হত। আয়ারল্যাণ্ডে প্রাচীনকালে অর্থের বিনিময়ে এক বিশেষ জাতির ক্রীতদাসী একক হিসাবে ব্যবহার হত! আফ্রিকার সুদানে আজ থেকে ১৫০/২০০ বছর আগেও ক্রীতদাসকে দ্রব্যধন হিসাবে ব্যবহার করা হত।

পৃথিবীর যাবতীয় দ্রব্যধনের মধ্যে সব থেকে বেশি দেশে যে দ্রব্যধনের বহুল প্রচলন ছিল, তার নাম কড়ি (cowry)এবং পুঁতি (bead)। প্রাচীন ভারতের বহু বসতিতে উৎখননের সময় অজস্র পুঁতি পাওয়া গেছে। এই পুঁতির মধ্যে অনেকসময় মূল্যবান পাথরও থাকত।

একসময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপসমূহ এবং মালদিভ্‌স অঞ্চলের দ্বীপপুঞ্জে প্রচুর কড়ি পাওয়া যেত। বিনিময় মাধ্যম হিসাবে কড়ির নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, যার জন্যে সেই সময়ে কড়ি প্রায় গোটা বিশ্বেই জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রথমতঃ নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল ছাড়া কড়ি বেশ বিরল, অতএব কড়ির সরবরাহ সীমিত ছিল। তাছাড়া আকারে এবং ওজনে কড়ি যথেষ্ট হালকা হওয়ায় বহন করতে সুবিধে হত। তার চেয়েও বড় ব্যাপার হল, প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ভালো জাতের কড়ির গুণ বা মান পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু সোনা, রুপো কিংবা তামার মুদ্রার ক্ষেত্রে গুণ বা মানের কারচুপি হামেশাই হত এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই সব নকল মুদ্রা চট করে ধরাও সম্ভব হত না। এই সব কারণে যে সব জায়গায় কড়ি সহজলভ্য নয়, সে সব অঞ্চলে দৈনন্দিন ছোটখাটো কেনা বেচার ক্ষেত্রে কড়ি ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। খ্রিষ্টিয় চতুর্থ শতকের শেষদিকে কিংবা পঞ্চম শতাব্দীর শুরুতে, ফা হিয়েন যখন ভারতে এসেছিলেন, তিনি মধ্যভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জিনিষপত্র কেনা বেচায় কড়ির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করেছিলেন। সংস্কৃত ‘কপর্দ্দক’ শব্দ থেকে কড়ি শব্দের সৃষ্টি। বেশ কিছু কাল কড়ির ব্যবহার লুপ্ত হলেও, আমাদের চলতি নানান কথায়, সেই স্মৃতি আমরা আজও বহন করে চলেছি, যেমনঃ ‘টাকাকড়ি’ কেমন দেবে? আমার কাছে এখন একটা ‘কানাকড়ি’ও নেই, ব্যক্তি নাম হিসেবে ‘তিনকড়ি’, ‘পাঁচকড়ি’ ইত্যাদি এবং কাউকে ‘নিঃস্ব’ বোঝাতে আজও ‘কপর্দকহীন’ বলা হয়। লক্ষ্মীপুজোর সময়, লক্ষ্মীঠাকুরের ঝাঁপিতে দু একটা কড়ি আটকে ধনের দেবীকে অর্থপূর্ণ করে তোলার স্মৃতি, আজও সেই সব দিনের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।

যে কড়িগুলি টাকার মতো ব্যবহার করা হত, সেগুলির বৈজ্ঞানিক নাম মনেটারিয়া মনেটা (Monetaria moneta)। এগুলি এক প্রজাতির সামুদ্রিক শামুক (sea shell), যাকে জীববিজ্ঞানের পরিভাষায় সাইপ্রেডি (cypraeidae) গোষ্ঠীর  gastropod mollusc বলা হয়।

(পরের সংখ্যায় শেষ কিস্তি)

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s