বৈজ্ঞানিকের দপ্তর টেকনো টুকটাক-লিখিব পড়িব পর্ব ২ কিশোর ঘোষাল বসন্ত ২০১৮

কিশোর ঘোষাল   এর সমস্ত লেখা একত্রে

(পর্ব ২)

কিশোর ঘোষাল

ছবি এঁকে অনেককে গোটা একটা ঘটনার কথা বলে ফেলা কী ভাবে শুরু হয়েছিল সে কথা আগের সংখ্যায় বলেছি। ছবি আঁকার জটিল দক্ষতাকে ধীরে ধীরে সহজ করে, শুরু হয়ে গেল চিত্রলিপি। এই চিত্রলিপির প্রথম ব্যবহার, মনে করা হয়, শুরু হয়েছিল ব্যবসার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বন্দর এলাকায়। আমাদের ভারতবর্ষেই হোক বা বিদেশে, নানান দ্রব্য সামগ্রী আমদানি বা রপ্তানির বাণিজ্য শুরু হয়েছিল অন্ততঃ হাজার পাঁচেক বছর বা তারও আগে। আমাদের সিন্ধু সভ্যতার বন্দরগুলির মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত বন্দর ছিল লোথাল। এই বন্দর থেকে সুদূর ইজিপ্ট, সুমের, বাহারিনের সঙ্গে যে নিয়মিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল, সে প্রমাণ অজস্র পাওয়া গেছে। ওইসব দেশের বণিকেরা এদেশ থেকে পণ্যসামগ্রী কিনে নিয়ে যেত। বিভিন্ন দেশের বণিকেরা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর এবং আগে বন্দর শহরের পান্থশালায় বেশ কিছুদিন থাকত, বিশ্রাম করত। কোথায় কী পণ্য পাওয়া যায়, কোন পান্থশালায় থাকার সুবন্দোবস্ত আছে, সে সব তথ্য বিদেশীদের নানান ভাষায় বোঝানোর থেকে অনেক সহজ ছিল চিত্রলিপি। কারণ সংক্ষিপ্ত চিত্রলিপি বোঝার জন্যে কোন বিশেষ ভাষা না জানলেও চলে।

ধীরে ধীরে চিত্রলিপির ব্যবহার বাড়তে লাগল এবং এই চিত্রলিপি দিয়ে খুব সহজেই অনেক ধরনের তথ্য, নির্দেশ, পোঁছে দেওয়া শুরু হয়ে গেল বহু মানুষের কাছে, এমন কী গোটা একটা সাম্রাজ্যের সমস্ত প্রজার কাছেও! মৌর্য রাজাদের প্রথম দিকের মুদ্রাগুলি (পাশের ছবি) লক্ষ্য করলে এমন অনেক চিত্রলিপি দেখতে পাবে। এমনকি এই রকম চিত্রলিপির সংকেত মুদ্রিত অনেক বিদেশী মুদ্রা বিভিন্ন দেশে প্রচলন করতেও খুব একটা অসুবিধে হত না।

শুনলে হয়তো আশ্চর্য হবে, আজও আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এই চিত্রলিপির ব্যবহারের গুরুত্ব কমেনি তো বটেই, বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। রেলস্টশন, এয়ারপোর্ট, বড়ো বড়ো হসপিটাল, পার্ক, হাইওয়েতে চলার পথে,  চিত্রলিপির বহুল ব্যবহার হয়। লিখিত কোন নির্দেশ না থাকলেও, বিশেষ কিছু চিত্র সংকেত দেখলেই আমরা প্রশাসনের বক্তব্য বা নির্দেশ স্পষ্ট বুঝে যাই।  নিচেয় সেরকম কিছু চিত্রলিপি বা সংকেতের নমুনা দেখলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে।

বড়োরাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় ওপরের চিত্রলিপির নির্দেশ দেখেই আমরা সামনের রাস্তা এবং তার আশেপাশের খবরাখবর অগ্রিম পেয়ে যাই। আবার নিচের চিত্রলিপিটি দেখঃ-

পাশের চিত্রলিপি থেকে ছেলেদের, মেয়েদের কিংবা বিশেষভাবে-সমর্থদের ব্যবহারের জন্য টয়লেট খুঁজতে আমাদের অসুবিধে হয় কী? হয় না। 

এমনকি ছোট্ট ছেলেমেয়েদের সহজে যোগ বিয়োগ শেখাতেও চিত্রলিপির কোন বিকল্প নেই, নিচের এই ছোট্ট যোগটি আপেলের চিত্রলিপি দিয়ে বোঝানো কত সহজ দেখলেই বুঝতে পারবেঃ-

শুধু ছোটদের পড়াশুনোর জন্যে নয়, তোমাদের বাবা-কাকুদের মতো বড়োরাও নানান জটিল তত্ত্ব এবং তথ্য

সহজে সবাইকে বোঝানোর জন্যে গ্রাফ বা চার্ট ব্যবহার করেন, সেগুলিও মূলতঃ চিত্রলিপি ছাড়া আর কিছুই নয়। নিচের দুটি চিত্রলিপি দেখলে, ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

ভাষার বাধা কাটিয়ে, চিত্রলিপি বা চিত্রসংকেতের ব্যবহার খুবই কার্যকরী সন্দেহ নেই। কিন্তু চিত্রলিপি অত্যন্ত সীমিত বিষয়েই ব্যবহার করা চলে। আজ এই লেখাটা আমি যে লিখছি এবং তোমরা যে পড়ছো, সেটা চিত্রলিপি দিয়ে বোঝাতে এবং তোমাদেরও বুঝতে গলদঘর্ম হতে হত, তাতে কোন সন্দেহ নেই। ছবি বা চিত্রলিপির এই সীমাকে অতিক্রম করতে ধীরে ধীরে তাই এসে গেল ‘লিপি’ (script) ।  

‘লিপি’ (script) ব্যাপারটা বলতে ঠিক কী, সেটা বুঝতে গেলে ভাষা ব্যাপারটা কী, সেটা আগে বোঝা জরুরি। প্রাণীদের নিজ নিজ গোষ্ঠীতে পরষ্পরের সঙ্গে যোগাযোগের একটা অন্যতম মাধ্যম হল শব্দ বা আওয়াজ (sound)। মুখের কয়েকটি অংশ যেমন, ঠোঁট, গলা, জিভ, তালু, নাক ব্যবহার করে অধিকাংশ প্রাণীই নানান আওয়াজ (sound) তৈরি করে। বাঘ, সিংহ, হাতি, পাখিদের আওয়াজ বা ডাক নিশ্চয়ই শুনেছ। এই ধরনের প্রাণীদের ভাষা যদিও খুব সীমিত, তবু শিকারের আগে কিংবা বিপদের সময়, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বা বার্তার আদানপ্রদানের জন্যে এই শব্দ খুবই অর্থবহ।

মানুষ প্রাণীদের মধ্যে সব থেকে উন্নত এবং বুদ্ধিমান। জঙ্গলের আদিম মানুষ সভ্য হতে হতে, যখন চাষবাস, পশুপালন, ব্যবসাবাণিজ্য শিখতে লাগল, গ্রামশহর বানাতে শিখল – এককথায় সভ্য মানুষের জীবনযাত্রা যত জটিল হয়ে উঠতে লাগল, তখন আর দু দশটা আওয়াজ দিয়ে যোগাযোগ বা বার্তার আদানপ্রদান সম্ভব হচ্ছিল না। অনেকগুলি আওয়াজ দিয়ে গড়ে উঠতে লাগল অর্থবহ শব্দ (word), আবার অনেকগুলি শব্দ জুড়ে গড়ে তুলতে হল বাক্য (Sentence)। তারপর বাক্যের পর বাক্য সাজিয়ে চলতে লাগল কথোপকথন (conversation)। ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল সকলের বোধগম্য অনেক নিয়ম, অনেক বিন্যাস (Syntax)। যে নিয়ম বা বিন্যাস অনুসরণ করে কথা বললে একই গোষ্ঠীর সমস্ত মানুষ নিজেদের মধ্যে সকল কথা বলতে পারবে, বুঝতেও পারবে অন্যের সকল কথা। এই নিয়ম বা বিন্যাস হল ব্যাকরণ (grammar)। একই গোষ্ঠীর বোধগম্য কথাবার্তার নাম হল ভাষা (language)।  বিভিন্ন দেশে, এমনকি একই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, মানুষের শব্দ উচ্চারণের পদ্ধতি আলাদা হওয়ার জন্যে ভাষাও হয়ে উঠল আলাদা আলাদা। দুই ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের ভাষা বোঝার আগে বা বলার আগে সে ভাষা শিখতে হয়।

লিপি হল ভাষা অনুযায়ি প্রতিটি শব্দের চিহ্ন, তার মানে কথা বলতে যে যে শব্দ আমরা উচ্চারণ করি, ঠিক সেই শব্দটিকে সংকেতে লিখে ফেলা। “তোমরা আমার কথা বুঝতে পারছো?” পারছো, তার মানে, সামনে বসে আমি যা বলতাম, তা না বলে, আমি একই কথা এমন ভাবে লিখেছি, যেটা পড়ে তুমি বুঝতে পারছো। এটাই লিপি। এখানে যে সংকেতগুলির ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলি হলো,

ত+ও+ম+র+আ আ+ম+আ+র ক+থ+আ ব+উ+ঝ+ত+এ প+আ+র+ছ+ও?

এই প্রত্যেকটি চিহ্নকে বলে অক্ষর বা বর্ণ (alphabet – আজকাল characterও বলা হয়)। এই বর্ণকে আবার দুটো ভাগে ভাগ করা হয়েছে স্বরবর্ণ (vowel) এবং ব্যঞ্জনবর্ণ (consonant)। স্বরবর্ণগুলিকে স্বাধীন বর্ণ বলা যায়, কারণ এদের উচ্চারণে অন্য কোন বর্ণের সাহায্য দরকার হয় না। অ আ ই ঈ উ ঊ এ ঐ ও ঔ। আরেকটা বিশেষত্ব হল, এই বর্ণগুলি গলা থেকে বেরোনো আওয়াজকে শুধু ঠোঁটের নিয়ন্ত্রণেই খুব সহজে উচ্চারণ করা যায়। কিন্তু ব্যঞ্জনবর্ণে কণ্ঠস্বর আর ঠোঁট ছাড়াও জিভ, তালু, দাঁত, নাকেরও সাহায্য নিতে হয়। ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণ, স্বরবর্ণের সাহায্য ছাড়া খুবই কম ব্যবহার হয়। ওপরের শব্দগুলিতে, নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ, ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে জুড়ে থাকা স্বরবর্ণগুলিকে ঠিকঠাক স্বরবর্ণের আকারে চেনা যাচ্ছে না। “তোমরা” – এখানে ও-বর্ণ (ো)ও-কার হয়ে গেছে, আর আ-বর্ণ (া) আ-কার হয়ে গেছে।  ব্যঞ্জনের সঙ্গে স্বর বর্ণগুলির সংযোগ, এভাবেই আলাদা আলাদা চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হয়। এই শব্দে ‘ম’- বর্ণে কোন স্বরবর্ণের যোগ নেই, এখানে ম-বর্ণের উচ্চারণ বিশুদ্ধ ব্যঞ্জন বলা যায়।

এইভাবে অনেকগুলি স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণ জুড়ে ঠিকঠিক কথা তৈরিকেই বলে শব্দ। কাজেই শুধু পরপর বর্ণ সাজালেই শব্দ হবে না, শব্দ মানে তার অর্থ থাকতে হবে, সেই শব্দর অর্থ যারা পড়বে তারা সক্কলে যেন বুঝতে পারে, তা নাহলে যে লিখছে সে জব্দ হয়ে যাবে। কারণ যে লিখছে সে তো অন্যকে বোঝানোর জন্যেই লিখছে!

ভাষা অনুযায়ি লিপির ধারণা এবং প্রচলন অন্ততঃ দুটো প্রাচীন সভ্যতায় আলাদা আলাদা ভাবে শুরু হয়েছিল।  কিন্তু সে কথা পরের সংখ্যায়।

চলবে

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

Advertisements

One Response to বৈজ্ঞানিকের দপ্তর টেকনো টুকটাক-লিখিব পড়িব পর্ব ২ কিশোর ঘোষাল বসন্ত ২০১৮

  1. Cinthia says:

    Osadharon. Eto sundor Kore chotoder monoronjonmulok, sohoj, pranjol bhasai chitrolipir itihas er age kokhono porini. Mone hoi banglai joto itihas boi ache ta kishoredake diye lekhano hole bachchader porar itihas otyonto sukhopathyo hoto.chomotkar kaj.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s