বৈজ্ঞানিকের দপ্তর তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ- নিউক্লিয় বিজ্ঞানে নারী পর্ব ৪ গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় বর্ষা ২০২০

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়ের আরো লেখাঃ দেড়শো বছর আগের এক সূর্যগ্রহণের গল্প, স্বর্ণযুগের কাহিনি, কৃষ্ণগহ্বর, ব্যতিক্রমী বিন্দু ও স্টিফেন হকিং , তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ ১ম পর্ব,  তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ ২য় পর্ব হ্যারিয়েট ব্রুক্‌স্‌, তেজস্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ- ৩য় পর্ব 

(৪)

রাদারফোর্ড ও তাঁর ছাত্রবৃন্দঃ প্রোটন ও নিউট্রন

আমরা দেখেছি পরমাণুর পারমাণবিক সংখ্যা তার নিউক্লিয়াসের প্রোটনের সংখ্যার সঙ্গে সমান। আবার এও জেনেছি যে ভরসংখ্যা হল প্রোটন ও নিউট্রনের সংখ্যার যোগফল। প্রোটন ও নিউট্রন, দুই কণা আবিষ্কারের সঙ্গেই রাদারফোর্ড ও তাঁর ছাত্রদের নাম জড়িয়ে আছে। ১৯১৭ সালে রাদারফোর্ডের পরামর্শে তাঁর ছাত্র মার্সডেন নাইট্রোজেন গ্যাসকে আলফা কণা দিয়ে ধাক্কা মারলেন। তিনি নতুন এক কণা পেলেন যার আধান ইলেকট্রনের আধানের মানের সমান কিন্তু ধনাত্মক। নতুন কণাটার ভর হল হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের প্রায় সমান। আগেই জানা ছিল যে হাইড্রোজেন হল সবচেয়ে হালকা পরমাণু আর তাতে ইলেকট্রন আছে একটা। সহজেই বোঝা গেল যে নতুন কণাটা হল হাইড্রোজেন পরমাণুর নিউক্লিয়াস।

হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস এল কোথা থেকে? আধুনিক যুগে আমরা বিক্রিয়াটাকে এইভাবে লিখবঃ

প্রাচীনকাল থেকে মানুষ সিসার মতো সস্তা পদার্থ থেকে সোনার মতো দামি ধাতু তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছে। সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব, তবে সেভাবে তৈরি সোনার দাম বাজারের থেকে হাজার হাজার গুণ বেশি হবে। একই সঙ্গে রাদারফোর্ডরা দেখালেন যে হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস অন্যসব পরমাণুর নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকে, সেটা ইলেকট্রনের মতোই একটা মৌলিক কণা। তার নাম তাঁরা দিলেন প্রোটন।

নিউক্লিয়াসের পারমাণবিক সংখ্যা প্রোটনের সংখ্যার সঙ্গে সমান, কিন্তু ভরসংখ্যা তার থেকে বেশি। নিউক্লিয়াসের মধ্যে কতগুলো কণা থাকে? একটা উদাহরণ নেয়া যাক। উপরে যে নাইট্রোজেনের নিউক্লিয়াসে কথা এসেছিল, তার নিউক্লিয়াসের ভর চোদ্দটা প্রোটনের কাছাকাছি, কিন্তু আধান হল সাতটা প্রোটনের সমান। প্রথমে  মনে করা হত যে ঐ নিউক্লিয়াসে আছে চোদ্দটা প্রোটন আর সাতটা ইলেকট্রন। ইলেকট্রনের আধান প্রোটনের সমান ও বিপরীত, তাই মোট আধান হবে প্রোটনের আধানের সাত গুণ। ইলেকট্রনের ভর প্রোটনের প্রায় দু’হাজার ভাগের একভাগ, তাদের মোট ভর নিউক্লিয়াসের খুব ক্ষুদ্র এক অংশ। তাই অন্তত নিউক্লিয়াসের ভর মেপে এই ধারণাটাকে ভুল বলার কোনও উপায় সেই সময় ছিল না। কিন্তু শীগগিরই বোঝা গেল যে নিউক্লিয়াসের মধ্যে ইলেকট্রন থাকা সম্ভব নয়। প্রোটনের সঙ্গে সঙ্গে নিউক্লিয়াসে আরেকটি কণা থাকে যার নাম নিউট্রন, তার ভর প্রোটনের প্রায় সমান। ১৯২০ সালে রাদারফোর্ড প্রথম নিউট্রনের কথা বলেন।

নিউট্রনের খোঁজ শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। রাদারফোর্ডের ছাত্রদের মধ্যে জেমস চ্যাউউইক শেষপর্যন্ত নিউট্রন আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এখানেও একটা গল্প আছে। চ্যাডউইককে তাঁর আবিষ্কারটা করতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি, অন্যদের করা একটা পরীক্ষা থেকে তিনি তাঁর পরিকল্পনাটা সহজেই পেয়ে যান। আইরিন ও ফ্রেডরিক জোলিও-কুরি দম্পতির কথা পরে আমরা শুনব, তাঁরা দেখেছিলেন বেরিলিয়ামকে (Be) আলফা কণা দিয়ে ধাক্কা মারলে এক আধানহীন রশ্মি বেরোয়। এই রশ্মি প্রোটনকে আঘাত করলে প্রোটনের বেগ হয়ে দাঁড়ায় প্রতি সেকেন্ড পনেরো হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। জোলিও-কুরিরা মনে করেছিলেন এ অদৃশ্য রশ্মি হল গামা রশ্মি, যার কথা আমরা আগেই বলেছি। গামা রশ্মির কণা হল ফোটন। তার কোনও আধান নেই।

রাদারফোর্ড যখন এই পরীক্ষার কথা শুনলেন, তিনি সরাসরি বললেন, “আমি এতে বিশ্বাস করি না।”

তার কারণও আছে। ধরা যাক, একটা ফুটবলকে একটা টেবিল টেনিস বল দিয়ে খুব জোরে ধাক্কা মারলাম। তাহলে ফুটবলটা যত জোরে সরে যাবে, তার চেয়ে অনেক জোরে সরবে অন্য একটা ফুটবল দিয়ে আস্তে ধাক্কা মারলে। আলোর কণা ফোটনের স্থির ভর শূন্য, তা দিয়ে প্রোটনকে অত জোরে ধাক্কা মারতে গেলে তার শক্তি খুব বেশি হতে হবে। বিজ্ঞানীরা জানতেন নিউট্রনের ভর প্রোটনের ভরের প্রায় সমান। চ্যাডউইক সন্দেহ করলেন যে সম্ভবত আলফা কণা ও বেরিলিয়াম নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষে নিউট্রন কণা বেরোচ্ছে যা প্রোটনকে ধাক্কা মারছে। নিউট্রনের আধান নেই, তাকে আধানহীন গামা রশ্মির সঙ্গে জোলিও-কুরিরা গুলিয়ে ফেলেছেন। বাস্তবে তাই ঘটেছিল। এখানে বিক্রিয়াটাকে লিখতে পারি,

এলিজাবেথ রোনাঃ

একটি পাদটীকা, দুটি নোবেল পুরস্কার এবং লিটল বয়

ইংল্যান্ডে যখন রাদারফোর্ড ও তাঁর ছাত্ররা আলফা কণা দিয়ে নিউক্লিয়াসকে ধাক্কা মেরে তা কী দিয়ে তৈরি দেখছেন, ইউরোপের অন্যত্র তখন মূলত তেজস্ক্রিয় পদার্থের রাসায়নিক ধর্ম নিয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। সেই রসায়নবিদদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হাঙ্গেরির মেয়ে ‘পোলোনিয়াম ওম্যান’ এলিজাবেথ রোনা। ইউরোপীয় সমাজের ইহুদি বিদ্বেষ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, হাঙ্গেরিতে বিপ্লব ও প্রতি বিপ্লব, জার্মানিতে নাৎসিদের উত্থান ও অস্ট্রিয়া দখল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ—এই সমস্ত নানা উথালপাতালের মধ্যে রোনার কর্মজীবনের একটা বড়ো অংশ কেটেছে। ফলে এক দেশ থেকে অন্য দেশে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। নানা জায়গায় তিনি কাজ করেছেন এমন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যাঁদের অনেকেই বিশ্ববিখ্যাত, কিন্তু আমেরিকাতে পালিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত দীর্ঘদিন কোথাও থিতু হয়ে বসতে পারেননি। অন্তত চারজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর সঙ্গে গবেষণা করার অভিজ্ঞতা এলিজাবেথের হয়েছিল—বুদাপেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে জর্জ ডি হেভেসি, প্যারিতে মেরি কুরি ও আইরিন কুরি এবং বার্লিনে অটো হান। রাদারফোর্ডের সঙ্গেও তিনি আলোচনা করেছেন, কিন্তু তাঁর গবেষণাগারে কাজ করার প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দেন। এছাড়াও ভিয়েনাতে স্টেফান মেয়ার ও বার্লিনে লিজে মাইটনারের সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন। এঁদের অনেকের নামই আমাদের আলোচনাতে এসেছে।

এলিজাবেথ রোনার জন্ম ১৮৯০ সালের ২০ মার্চ। ১৯১২ সালে বুদাপেস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে ডক্টরেট করার পরে জার্মানির কার্লসরুহেতে কাসিমির ফাইয়ান্সের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। ফাইয়ান্সের কথা আমরা আগে শুনেছি। ১৯১৪ সালে বুদাপেস্টে ফিরে রোনা সেখানকার কেমিক্যাল ইন্সটিটিউটে যোগ দেন। কয়েকবছর আগে একটা নতুন মৌল ইউরেনিয়াম-Y পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন রাদারফোর্ডের গবেষণাগারের এক বিজ্ঞানী জি এন আন্তোনফ, জর্জ ডি হেভেসি এলিজাবেথকে মৌলটার অস্তিত্ব নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেন। মনে রেখো তখনও আইসোটোপের ব্যাপারে জানা ছিল না, সমস্ত আইসোটোপকেই আলাদা আলাদা মৌল বলা হত। নতুন মৌলটা ছিল থোরিয়ামের আইসোটোপ থোরিয়াম-২৩১। এর আগে অনেকেই এই কাজে ব্যর্থ হয়েছিলেন, এলিজাবেথ কিন্তু সফল হলেন। তিনি দেখালেন যে এই আইসোটোপের অর্ধায়ু কাল পঁচিশ ঘণ্টা, বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে তা ভেঙে পড়ে। তেজস্ক্রিয় পদার্থের রসায়নে তাঁর পারদর্শিতার কথা বিজ্ঞানী মহলে ছড়িয়ে পড়ল, তাঁর অভিজ্ঞতার জন্য অনেকেই তাঁকে নিজেদের গবেষণাগারে আমন্ত্রণ জানাতেন। কয়েকবছর পরে বার্লিনে অটো হানের সঙ্গে কাজ করে তিনি একই পদ্ধতিতে থোরিয়াম-২৩০ আইসোটোপ পৃথক করেছিলেন।

বুদাপেস্টে এলিজাবেথ জলের ভিতর দিয়ে রেডনের পরমাণু কত তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে যায় সেই বিষয়ে প্রথমে কাজ করেছিলেন। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে ডিফিউশন বা ব্যাপন। এর থেকে তিনি রেডন পরমাণুর আয়তন নির্ণয় করেছিলেন। জর্জ ডি হেভেসি ঠিক তার আগে সিসার পরমাণু কেমনভাবে তরল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সেই বিষয়ে গবেষণা করছিলেন। সাধারণ সিসার পরমাণু দেখা শক্ত, তাই তিনি সিসার তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ সিসা-২১২ নিয়ে কাজ করছিলেন। তেজস্ক্রিয় পরমাণু থেকে যে বিকিরণ বেরোয় তা যন্ত্রে ধরা পড়ে, তার থেকে সহজেই বোঝা যায় যে পরমাণুটা কোথায় আছে। ডি হেভেসি ও রোনা একসঙ্গে এই বিষয়ে কাজ শুরু করলেন। এভাবে ব্যবহার করা তেজস্ক্রিয় পরমাণুকে বিজ্ঞানীরা বলেন ট্রেসার বা রেখক। ট্রেসার হিসাবে যৌগকেও ব্যবহার করা যায়, কোনও যৌগের সাধারণ পরমাণুর জায়গায় তেজস্ক্রিয় পরমাণু বসিয়ে দেওয়াকে বলে আইসোটোপ লেবেলিং। এই দুটি পরিভাষাই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন রোনা। কিন্তু কোনও এক জায়গায় দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ রোনার হচ্ছিল না, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই বিষয়ে গবেষণাও তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল। ডি হেভেসি এই বিষয়ে কাজ চালিয়ে যান। রাসায়নিক বিক্রিয়াতে আইসোটোপদের ট্রেসার হিসাবে ব্যবহারের জন্য ১৯৪৩ সালের রসায়নের নোবেল পুরস্কার পান তিনি।

পরীক্ষাগারের বাইরেও ট্রেসারের ব্যবহার আজকাল ব্যাপক। ধরা যাক দেহের ভিতরে কোথাও রক্তপাত ঘটছে। ডাক্তাররা রক্তকণিকা নিয়ে তার মধ্যেকার কোনও সাধারণ মৌলকে তার তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ দিয়ে লেবেল করলেন। এবার তা দেহে ইনজেকশনে করে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। ওই তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ থেকে যে গামা রশ্মি বেরোয় তা দেখে কোথায় গিয়ে রক্ত জমে যাচ্ছে অর্থাৎ রক্তপাত ঘটছে তা বোঝা যায়, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। শিল্পক্ষেত্রেও এর ব্যবহার হচ্ছে, যন্ত্রের মধ্যে কোথাও ফাটল ধরেছে কি না, তা যন্ত্র না খুলেই বোঝা যায়।

ডি হেভেসি ও রোনা কিন্তু অপর একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা করছিলেন। মৌলের বিভিন্ন আইসোটোপের ভরসংখ্যা আলাদা আলাদা। তরল বা গ্যাসের মধ্যে পরমাণুর ব্যাপনের হার তার ভরের উপর নির্ভর করে। ডি হেভেসি ও রোনা থোরিয়াম-২৩১ ও ২৩৪ নিয়ে কাজ করছিলেন, সেই সময়ের প্রযুক্তি দিয়ে তাদের বেগের পার্থক্য মাপা সম্ভব ছিল না, কিন্তু পার্থক্য যে থাকবে কথা তাঁরা তাঁদের এক গবেষণাপত্রের পাদটীকায় লিখেছিলেন।

সেই মুহূর্তে মাপা না গেলেও আইসোটোপদের বেগের পার্থক্যের কথাটা বিজ্ঞানীদের মনে ছিল। পাঁচ বছর পরে অ্যাস্টন পরমাণুর ভর মাপার যে মাস স্পেকট্রোগ্রাফ তৈরি করেছিলেন, তা আইসোটোপদের বেগের পার্থক্যের উপরেই নির্ভর করে। মাস স্পেকট্রোগ্রাফ দিয়ে কোনও মৌলের আইসোটোপদের পৃথক করে তাদের ভর মাপা সম্ভব হয়েছিল। পনেরো বছর পরে হ্যারল্ড উরে হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ডয়টেরিয়াম আবিষ্কার করেছিলেন। সাধারণ হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াসে আছে একটি প্রোটন, তার ভরসংখ্যা এক। ডয়টেরিয়ামের নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সঙ্গে আছে একটা নিউট্রন, তাই তার ভরসংখ্যা দুই। এই দুই আইসোটোপের বেগের পার্থক্যকেই ব্যবহার করেছিলেন উরে। পঁচিশ বছর পরে যখন পরমাণু বোমা তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামের আইসোটোপ ২৩৫-কে ২৩৮-এর থেকে আলাদা করার দরকার হয়েছিল, তখনও বিজ্ঞানীদের মনে সেই কথাটা ছিল। অ্যাস্টন ১৯২২ সালে এবং  উরে ১৯৩৪ সালে তাঁদের গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। হিরোশিমার উপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে লিটল বয় পরমাণু বোমা ফেলেছিল, তার ইউরেনিয়াম-২৩৫-কে তরল এবং গ্যাসীয় মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে ব্যাপনের মাধ্যমেই প্রাথমিকভাবে পাওয়া গিয়েছিল।

১৯১৮ সালে এলিজাবেথকে পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়, হাঙ্গেরিতে প্রথম মহিলা যিনি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে রসায়ন পড়িয়েছেন। কিন্তু বিপ্লব ও প্রতি বিপ্লবের ডামাডোলের ফলে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়, অটো হানের আমন্ত্রণে বার্লিন কাইজার উইলহেলম ইন্সটিটিউটে হান ও মাইটনারের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। ১৯২৩ সালে দেশে ফেরেন, কিন্তু গবেষণার সুযোগ না পেয়ে ১৯২৪-এ আবার দেশ ছাড়েন, এবার লক্ষ অস্ট্রিয়া। ভিয়েনার ইন্সটিটিউট ফর রেডিয়াম রিসার্চে তাঁকে আমন্ত্রণ জানান স্টেফান মেয়ার।

ভিয়েনাতে টানা চোদ্দ বছর ছিলেন রোনা। রাদারফোর্ড বা মেরি যে মহিলা বিজ্ঞানীদের সুযোগ করে দেওয়ার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন, সে কথা আমরা দেখেছি। তাঁদের সঙ্গেই নাম করতে হয় ভিয়েনার ইন্সটিটিউটের অধিকর্তা ফ্রাঞ্জ এক্সনার ও বিশেষ করে তাঁর উত্তরসূরি স্টেফান মেয়ারের কথা। ইন্সটিটিউট ফর রেডিয়াম রিসার্চে একসময় বিজ্ঞানীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিলেন মহিলা, এর পিছনে ছিলেন মেয়ার। শুধু বিজ্ঞানীর সংখ্যা নয়, গবেষণাপত্রের সংখ্যাতেও একই অনুপাত লক্ষ করা যায় (পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য)। রোনাকেও কাজের সুযোগ করে দিতে সচেষ্ট ছিলেন মেয়ার।

রোনা এই সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করেন। তখনকার পরমাণু গবেষণাতে পদার্থের উপর রেডিয়াম থেকে বেরোনো বিকিরণ পদার্থের উপর ফেলে কী পরিবর্তন হয় তা দেখা হত, তাই রেডিয়ামের চাহিদা ছিল খুব বেশি। রেডিয়াম খুব দামি, কারণ তা পিচব্লেন্ড থেকে নিষ্কাশন করতে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। পোলোনিয়াম থেকে নির্গত বিকিরণের ধর্ম রেডিয়ামেরই মতো, কিন্তু পোলোনিয়াম অপেক্ষাকৃত অনেক সস্তা, কারণ তার নিষ্কাশন সহজ। মেয়ারের আগ্রহে কিছুদিনের জন্য প্যারিতে গিয়ে মেরি কুরি ও আইরিন জোলিও-কুরির সাহায্যে রোনা বিশুদ্ধ পোলোনিয়ামকে পৃথক করার কাজটা করেন। তারপর পোলোনিয়ামের নানা ধর্ম মেপে তিনি পোলোনিয়ামকে তেজস্ক্রিয়তার পরীক্ষাতে রেডিয়ামের পরিবর্তে ব্যবহার করাকে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই জন্য তাঁর নাম হয়েছিল ‘পোলোনিয়াম ওম্যান’। এই কাজে তিনি ও তাঁর সহযোগী মারিয়েটা ব্লাউ ক্যাথরিন শ্যামির আবিষ্কৃত এক পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেম। শ্যামি ও ব্লাউয়ের কথা আমাদের লেখাতে আসবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরমাণু বোমা নির্মাণের মানহাটান প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা পোলোনিয়াম নিষ্কাশনের জন্য রোনার সাহায্য নিয়েছিলেন। পরেও প্যারিতে কুরি ইন্সটিটিউটে স্বল্পকাল কাটিয়েছিলেন রোনা। ১৯৩৩ সালে তিনি অস্ট্রিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের হাইটিঙ্গার পুরস্কার পেয়েছিলেন।

এই সময় এলিজাবেথ একটা কাজ শুরু করেন যে বিষয়ে তিনি পৃথিবীতে পথিকৃৎ। সমুদ্রবিজ্ঞানী হান্স পেটারসন সমুদ্রের তলার অধঃক্ষেপের মধ্যে রেডিয়ামের পরিমাণ নির্ণয় করতে চাইছিলেন, সেই কাজটা করেন রোনা। নানারকমের তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকার জন্য ভিয়েনার ইন্সটিটিউটের পরিবেশ খুব অল্প পরিমাণের তেজস্ক্রিয়তা মাপার উপযোগী ছিল না। রোনা বারো বছর ধরে প্রতিটি গ্রীষ্মকাল সুইডেনের বোর্নোতে সমুদ্র গবেষণাগারে কাটান। রোনা দেখেন যে মহাসমুদ্রের জলে ইউরেনিয়াম মিশে থাকে, কিন্তু থোরিয়াম সমুদ্রের তলায় অধঃক্ষিপ্ত হয়। থোরিয়ামের অর্ধায়ুকাল ইউরেনিয়ামের থেকে আলাদা। রোনা বুঝলেন যেকোনও প্রবাল প্রাচীর বা দ্বীপের মধ্যে থোরিয়াম ও ইউরেনিয়ামের পরিমাণের অনুপাত নির্ণয় করে তা কতবছর আগে তৈরি হয়েছিল তা নির্ণয় করা সম্ভব। একইভাবে সমুদ্রের তলার বিভিন্ন স্তরে থোরিয়ামের পরিমাণ নির্ণয় করে সেই স্তরের বয়স নির্ণয় করা সম্ভব। এভাবে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক যুগে ভূপ্রকৃতির গঠন, সমুদ্রতলের উচ্চতা ইত্যাদি সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। তেজস্ক্রিয়তা ব্যবহার করে ভূতাত্ত্বিক কাল নির্ণয় শুরু করেছিলেন এলিজাবেথ রোনা, আমরা এখনও তাঁর পদ্ধতিই অনুসরণ করি।

নাৎসি জার্মানির অস্ট্রিয়া দখলের পরে ইহুদি রোনা বুদাপেস্টে ফিরে যান। একের পর এক অস্থায়ী চাকরি করেছিলেন, এই সময় এলেন গ্লেডিশের আমন্ত্রণে নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন কাটান। কিন্তু হাঙ্গেরিও আর তাঁর মতো ইহুদির পক্ষে নিরাপদ ছিল না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হাঙ্গেরি জার্মানির পক্ষে যোগদান করে। ১৯৪১ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। সেখানে ওয়াশিংটনের কার্নেগি ইন্সটিটিউটে সমুদ্র ও নদীর জলে ইউরেনিয়াম ও রেডিয়ামের পরিমাণ নিয়ে গবেষণা করেন। এই সময়েই পরমাণু বোমা প্রকল্পের জন্য পোলোনিয়াম নিষ্কাশন বিষয়ে কাজ করেছিলেন। ১৯৫০ সালে ওক রিজ ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার স্টাডিজে বিজ্ঞানী হিসাবে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে সেখান থেকে অবসর নিলেও কর্মজীবন থেকে অবসর নেননি। মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্সটিটিউট অফ মেরিন সায়েন্সে এক দশক কাটান। দ্বিতীয়বার অবসরের পরে বন্ধুদের উৎসাহে তেজস্ক্রিয়তা, নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যা, পরমাণু শক্তি ইত্যাদি আবিষ্কারের প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন ছোট্ট একটি বইতে, ‘হাউ ইট কেম অ্যাবাউট’।

প্রথম যুগের তেজস্ক্রিয়তা গবেষকরা অনেকেই বিকিরণজনিত রোগে মারা গিয়েছিলেন, ব্যতিক্রম রোনা। তিনি গবেষণাতে সবসময় সাবধানতা অবলম্বন করতেন। একানব্বই বছর বয়সে ১৯৮১ সালের ২৭ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়।

তেজস্ক্রিয়তার দুই শিকার
ক্যাথরিন শ্যামি ও এলিজাবেথা কারা-মিহাইলোভা

এলিজাবেথের মতো সাবধানতা সবাই নিতেন না। প্রথম যুগে তেজস্ক্রিয়তা যে কতটা বিপজ্জনক তা বোঝা যায়নি। মেরি কুরি তো তেজস্ক্রিয়তা যে মানব শরীরে ক্ষতি করে, সে কথাই বিশ্বাস করতেন না। মেরি বা হ্যারিয়েট ব্রুক্‌সের মতোই ক্যাথরিন শ্যামি, এলিজাবেথা কারা-মিহাইলোভা সহ বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর মৃত্যুর কারণ তেজস্ক্রিয়তা। ক্যাথরিন ছিলেন এলিজাবেথ রোনার বিশেষ বন্ধু। এলিজাবেথ যখন এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন, ক্যাথরিন তখন টানা তিন দশক একই গবেষণাগারে কাজ করেছিলেন। তাঁর জন্ম ১৩ ডিসেম্বর ১৮৮৮। ফরাসি বংশোদ্ভূত হলেও তাঁর জন্ম ইউক্রেনের ওডেসাতে। ইউক্রেন ছিল রাশিয়ার সাম্রাজ্যের অন্তর্গত, সেখানে মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ ছিল না। মেরি কুরির জন্ম রাশিয়ার শাসনাধীন পোল্যান্ডে, তাঁরও একই সমস্যা হয়েছিল। মেরি পড়তে গিয়েছিলেন প্যারিতে, উনিশ বছর বয়সে ক্যাথরিন ভর্তি হলেন সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯১৩ সালে সেখান থেকে পদার্থবিদ্যাতে ডক্টরেট করেন। দেশে ফিরে তিনি গবেষক হিসাবে কাজ করেছিলেন, কিন্তু ১৯১৯ সালে এক জাতি-দাঙ্গার সময় তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

ক্যাথরিন মাদামের গবেষণাগারে কাজের জন্য আবেদন করেন। তাঁর শিক্ষক ও সহযোগীদের দরাজ প্রশংসাতে অভিভূত মাদাম তাঁর আবেদন মঞ্জুর করেন। ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে ক্যাথরিন কাজ শুরু করেন; পরের তিন দশক তিনি ছিলেন কুরি ইন্সটিটিউটের এক প্রধান স্তম্ভ। মাদাম লিখেছেন যে গবেষণাগার পরিচালনার জন্য তিনি ক্যাথরিনের পরামর্শের উপর নির্ভর করেন। (একটা কথা বলে রাখা ভালো, কুরি ইন্সটিটিউট নামে পরিচিত হলেও সেই সময় মাদামের গবেষণাগারের আসল নাম ছিল রেডিয়াম ইন্সটিটিউট। ১৯৭০ সালে তার নাম পালটে মাদামের নামে কুরি ইন্সটিটিউট রাখা হয়।) আগেই জেনেছি যে রেডিয়ামের দাম খুব বেশি। ক্যাথরিন ছিলেন সেই রেডিয়াম রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে। মেরির অনুপস্থিতিতে তিনিই গবেষণাগার পরিচালনার দায়িত্ব নিতেন। নিজের কাজ ছাড়াও বহু বিজ্ঞানীকে তাঁদের কাজে তিনি সাহায্য করেছিলেন। তেজস্ক্রিয় মৌলের যৌগ কোনও তরল মাধ্যমে দ্রবীভূত হয়েছে নাকি কলয়েড রূপে আছে, তা বোঝার জন্য তিনি ফটোগ্রাফ ব্যবহার করে এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, মৌলের রাসায়নিক ধর্ম নির্ধারণে শ্যামির এই অবদান উল্লেখযোগ্য। রোনা ও ব্লাউ পোলোনিয়ামের ধর্ম নিরূপণে এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। এত দায়িত্ব পালন করলেও ক্যাথরিনকে প্রায়শই খুব কম মাইনেতে কাজ করতে হয়েছে, মাদাম কুরিকে নিয়মিত নানা জায়গা থেকে তাঁর জন্য অর্থ জোগাড় করতে হত। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি কুরি ল্যাবরেটরিতে ছিলেন। পরের বছর ১৪ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়। অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়ার সংস্পর্শে দীর্ঘদিন কাটানো তাঁর মৃত্যুর কারণ।

এলিজাবেথা কারা-মিহাইলোভা

অন্যত্র আমরা প্রথম মহিলা নিউক্লিয় বিজ্ঞানীর কথা বলছি, ইউরোপের ছোট্ট দেশ বুলগেরিয়াতে নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যাতে শিক্ষা ও গবেষণা শুরুই করেছিলেন এক মহিলা। এলিজাবেথা কারা-মিহাইলোভার বাবা ছিলেন বুলগেরিয়ান, মা ব্রিটিশ। তাঁর জন্ম ১৮৯৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। জন্ম ভিয়েনায় হলেও তাঁর ছোটবেলাতেই তাঁর পরিবার বুলগেরিয়ায় চলে যায়। উচ্চশিক্ষার সুযোগ বুলগেরিয়াতে ছিল না, তাই তাঁকে ফিরে যেতে হয় ভিয়েনা। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২২ সালে তিনি ডক্টরেট করেন। বুলগেরিয়াতে ফিরে সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভিয়েনার ইন্সটিটিউট ফর রেডিয়াম রিসার্চ ও কেম্ব্রিজের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে দীর্ঘকাল কাটানোর পরে ১৯৩৯ সালে অবশেষে সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর চাকরি পান। মারিয়েটা ব্লাউ ও এলিজাবেথা ভিয়েনাতে একত্রে কাজ করেছিলেন। ১৯৩৩ সালে তাঁরাও নিউট্রন দেখেছিলেন, কিন্তু তার তাৎপর্য বুঝতে পারেননি। ১৯৪৪ সালে বুলগেরিয়াতে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করে। এলিজাবেথার রাজনৈতিক মতের জন্য তিনি সরকারের সুনজরে ছিলেন না, তাঁর বিদেশ যাওয়া নিষিদ্ধ হয়। পরে তিনি বুলগেরিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সে প্রফেসর হয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালের ২৪ এপ্রিল ক্যান্সারে তাঁর মৃত্যু হয়, অনুমান করা হয় সেই মারণ রোগের কারণ তেজস্ক্রিয়তা।

মাদাম কুরির উত্তরসূরিরা:
কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা

উত্তরসূরি শব্দের অর্থ অভিধানে দেওয়া আছে বংশধর অথবা পরবর্তীকালের যুগের বিজ্ঞ ব্যক্তি। এখানে শব্দটাকে এই দুটো অর্থেই একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। মাদামের গবেষণাগারে তাঁর পরে যাঁরা কাজ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত নিঃসন্দেহে আইরিন ও তাঁর স্বামী ফ্রেডরিক জোলিও-কুরি। আইরিন মেরি ও পিয়ের কুরির বড়ো মেয়ে। কুরি দম্পতি দুটি তেজস্ক্রিয় মৌল আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত, প্রকৃতিতে যে সমস্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যায় তাদের নিয়ে তাঁরা কাজ করেছিলেন। আইরিন ও ফ্রেডরিক আবিষ্কার করেন কৃত্রিম তেজস্ক্রিয় পদার্থ।

আইরিন কুরির জন্ম ১৮৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। সরবোন অর্থাৎ প্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্তরের পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন আইরিন, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য পড়াশোনাতে ছেদ পড়ে। মেরি কুরি আহত সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে এক্স-রশ্মি ছবি তোলার কাজ করেছিলেন, আইরিন প্রথমে তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন, পরে তিনি স্বাধীনভাবে সেই দায়িত্ব নেন। যুদ্ধশেষে ১৯১৮ সালে সরবোন থেকে স্নাতক হওয়ার পরে তিনি মায়ের ল্যাবরেটরিতে কাজ শুরু করেন। ১৯২৫ সালে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি পান। সেখানেই তাঁর ফ্রেডরিক জোলিও-র সঙ্গে আলাপ। ১৯২৬ সালে বিয়ের পরে ফ্রেডরিক ও আইরিন দুজনেই পদবি লিখতেন জোলিও-কুরি। তাঁরা দু’জনেই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে আইরিন ফরাসি সরকারে কাজ করেছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কুরি ইন্সটিটিউটের গবেষণা অধিকর্তা হয়েছিলেন।

জোলিও-কুরি দম্পতি তাঁদের গবেষণার জন্য বেশ পরিচিত ছিলেন। একাধিকবার তাঁরা নতুন আবিষ্কারের খুব কাছে পৌঁছেছিলেন। আগেই বলেছি আইরিন ও ফ্রেডরিক নিউট্রন দেখতে পেয়েছিলেন, কিন্তু তার তাৎপর্য বুঝতে পারেননি। অন্য একটা মৌলিক কণার ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছিল। ১৯২৯ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী পল ডিরাক ইলেকট্রনের গতিবিধি ব্যাখ্যা করার জন্য একটি তত্ত্ব তৈরি করেন। তা থেকে দেখা যায় ইলেকট্রনের সমান ভরের একটা কণা থাকা উচিত, যার তড়িৎ আধানের মান ইলেকট্রনের সমান, কিন্তু ধনাত্মক। আমাদের অনেকে হয়তো প্রতিকণা বা আ্যান্টিপার্টিকলের নাম শুনেছি। এই নতুন কণাটা হল ইলেকট্রনের প্রতিকণা পজিট্রন। মহাকাশ থেকে সবসময় আমাদের পৃথিবীতে এসে মহাজাগতিক রশ্মি পড়ছে, তার মধ্যে থাকে নানা মৌলিক কণা। বিজ্ঞানীরা সেখানে পজিট্রনকে খুঁজতে শুরু করেছিলেন। ১৯৩২ সালে সফল হলেন মার্কিন বিজ্ঞানী কার্ল অ্যান্ডারসন। ১৯৩৬ সালে তিনি নোবেল পুরষ্কার পান। পজিট্রনকে কিন্তু আগে সোভিয়েত ইউনিয়নে স্কোবেল্টসিন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চুং ইয়াও চাও দেখেছিলেন, কিন্তু তাঁরা ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি। আইরিন ও ফ্রেডরিক জোলিও-কুরিও ক্লাউড চেম্বারে পজিট্রনের ছবি তুলেছিলেন, কিন্তু তাঁরা সেটাকে প্রোটন মনে করে কোনও গুরুত্ব দেননি। পরে দেখব যে আইরিন নিউক্লিয় ফিশন বা বিভাজন আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। প্রতিবারই কি সাফল্য এভাবে একেবারে হাতের কাছে এসে ফিরে যাবে?

যে নিউট্রন ও পজিট্রনকে তাঁরা দেখেও চিনতে পারেননি, জোলিও-কুরিদের নোবেল জয়ের সঙ্গে সেই দুটি কণা অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। ১৯৩৪ সালে আইরিন কুরি ও ফ্রেডরিক জোলিও কুরি অ্যালুমিনিয়ামের (Al) নিউক্লিয়াসকে আলফা কণা দিয়ে আঘাত করেন। আলফা কণারা হল হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস। তাঁদের পরীক্ষাকে সংক্ষেপে লেখা যায়ঃ

ফসফরাসের যে আইসোটোপ তৈরি করেছিলেন তার নিউক্লিয়াসে ছিল ১৫টি নিউট্রন। সাধারণ বিটা ক্ষয়ে ইলেকট্রন বেরোয়, এই নতুন আইসোটোপটা পজিট্রন(e+) বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে সিলিকনের (Si) নিউক্লিয়াসে পরিবর্তিত হয়। তার সঙ্গে নির্গত হয় নিউট্রিনো (v) । বিটা ক্ষয়ে যে নিউট্রিনো (বা অ্যান্টিনিউট্রিনো v^ ) বেরোয়, তা বলেছিলেন উলফগ্যাং পাউলি, সেই কথা দিয়েই এই লেখা শুরু হয়েছিল। পোলোনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার পরেও পজিট্রন বেরোতে থাকে, অর্থাৎ এটা সত্যিই তেজস্ক্রিয়তা। ফসফরাস তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ছে না, প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় মৌলের মতো ধীরে ধীরে ভাঙছে। নতুন আইসোটোপটার অর্ধায়ু কাল দেখা গেল সাড়ে তিন মিনিট।

কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তার গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না। পদার্থবিদ্যার গবেষণাতে তো বটেই, পরীক্ষাগারের বাইরেও বহু জায়গায় তাকে ব্যবহার করা হয়। আমরা ট্রেসারের কথা আগে শুনেছি, প্রায় সমস্ত ট্রেসারই কৃত্রিম তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ। রেডিওথেরাপিতে, থাইরয়েডের চিকিৎসাতে, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে—এরকম বহু জায়গায় কৃত্রিম তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ব্যবহার করা হয়। এই আবিষ্কারের জন্য জোলিও-কুরি দম্পতি ১৯৩৫ সালে রসায়নে নোবেল পান।

যে দুটি কণা আইরিনদের পরীক্ষাতে পাওয়া গিয়েছিল, সেই নিউট্রন এবং পজিট্রন দুয়েরই আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন জোলিও-কুরিরা। আবার তাঁদের আবিষ্কারের প্রায় এক দশক আগে তাঁদেরই গবেষণাগারে প্রথম কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা দেখার দাবি করেছিলেন আর এক মহিলা বিজ্ঞানী স্টেফানিয়া মারাসিনিয়ানু। আইরিন নিজেও লিখেছেন যে মারাসিনিয়ানুই প্রথম কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তার কথা বলেছিলেন। স্টেফানিয়া কিন্তু জোলিও-কুরিরা যে তাঁদের গবেষণাপত্রে তাঁর কৃতিত্ব স্বীকার করেননি, তা নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন।

স্টেফানিয়া মারাসিনিয়ানুর জন্ম রোমানিয়ার বুখারেস্টে ১৮৮২ সালের ১৮ জুন। তাঁর ছোটবেলা কষ্টে কেটেছিল, কিন্তু সেই নিয়ে কথা বলতে তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি স্কুলে পড়াতেন। ১৯২২ সালে চল্লিশ বছর বয়সে এক সরকারি বৃত্তি নিয়ে প্যারিতে কুরির ইন্সটিটিউটে আসেন। তাঁর প্রথম কাজ ছিল পোলোনিয়ামের অর্ধায়ু কাল নিরূপণ করা। তিনি দেখেছিলেন যে সিসার পাতের উপরে পোলোনিয়ামের নমুনা রাখা আছে, তা পরে তেজস্ক্রিয়তার লক্ষণ দেখাচ্ছে। তিনি বলেছিলেন পোলোনিয়াম সিসাতে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা সৃষ্টি করছে।

কিন্তু বলা এক, প্রমাণ করা আলাদা। আমরা দেখেছি যে হ্যারিয়েট ব্রুকস যে প্রতিক্ষেপ ক্রিয়ার কথা বলেছিলেন, তাতে আলফা কণা কোনও পরমাণু থেকে যেদিকে বেরোয়, পরমাণুটা তার উলটোদিকে যায়।  সত্যিই স্টেফানিয়া কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা দেখেছিলেন, নাকি প্রতিক্ষেপ ক্রিয়াতে পোলোনিয়ামের পরমাণু আলফা ক্ষয়ের সময় সিসার পাতে ঢুকে গিয়েছিল এবং তেজস্ক্রিয়তা দেখাচ্ছিল, তা ঠিক করা সম্ভব হয়নি। শুধু তাই নয়, জোলিও-কুরিদের মতো কোনও ব্যাখ্যা মারাসিনিয়ানু দিতে পারেননি। মারসিনিয়ানু নিজেও প্রথমে সিসার তেজস্ক্রিয়তার অন্য এক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে আরও অনেক কিছু বলেছিলেন যা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাঁর দাবি বিজ্ঞানী মহল কখনোই মেনে নেয়নি। জোলিও-কুরিদের বিজ্ঞানী মহলে প্রতিষ্ঠা ছিল অনেক বেশি। তাঁদের পরীক্ষার ফল নিয়েও কোনও সন্দেহের অবকাশ ছিল না। আমাদের বর্তমান জ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে মারাসিনিয়ানুকে ভ্রান্তই মনে হয়, কারণ পোলোনিয়াম থেকে নির্গত আলফা রশ্মির যা শক্তি তাতে তা একমাত্র খুব হালকা পরমাণুর সঙ্গে বিক্রিয়া করতে সক্ষম। অ্যালুমিনিয়ামের পরমাণু খুব হালকা, আমরা দেখেছি জোলিও-কুরিরা অ্যালুমিনিয়ামের সঙ্গে আলফা কণার বিক্রিয়া দেখেছিলেন। সিসার সঙ্গে পোলোনিয়ামের আলফা কণার বিক্রিয়া মারাসিনিয়ানুর পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল না। তাই আইরিন ও ফ্রেডরিককেই  কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তার আবিষ্কর্তা বলে মেনে নেওয়াতে কোনও ভুল নেই।

স্টেফানিয়া ১৯২৫ সালে বুখারেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজ পেয়েছিলেন। অল্পদিন পরে তিনি আবার প্যারিসে ফিরে যান। ১৯৩০ সালে পাকাপাকিভাবে রোমানিয়াতে ফিরে আসেন। তিনিই রোমানিয়ার প্রথম তেজস্ক্রিয়তা বিষয়ে গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তেজস্ক্রিয় পদার্থের সাহায্যে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানো নিয়ে তিনি বেশ কিছু কাজ করেছিলেন। তাঁর কাজে আগ্রহী হয়ে ফরাসি সরকার আলজেরিয়াতে তাঁকে এই বিষয়ে পরীক্ষা করার দায়িত্ব দেয়। তিনি বলেছিলেন যে ভূমিকম্পের সময় ভূমিকম্পের কেন্দ্র থেকে রেডন গ্যাস বেরোয়, তার থেকে ভূমিকম্প যে আসন্ন তা বোঝা সম্ভব। অনেক বছর পরে তাঁর সেই প্রকল্প পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।

যুদ্ধের জন্য তাঁর মৃত্যুসংক্রান্ত সমস্ত তথ্য হারিয়ে গেছে। সম্ভবত ১৯৪৪ সালের ১৫ আগস্ট ক্যান্সারে তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯৫৬ সালের ১৭ মার্চ রক্তের ক্যান্সারে মারা যান আইরিন। একবছর পরেই যকৃতের রোগে ফ্রেডরিকের মৃত্যু হয়। কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত তিনজনেরই মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ তেজস্ক্রিয়তাজনিত রোগ।

একটি মৌল ও একা বিজ্ঞানীঃ মার্গারিট পেরেই

আমরা দেখেছি যে পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম আবিষ্কার করেছিলেন মেরি ও পিয়ের কুরি। কুরি দম্পতি ছাড়াও রেডন আবিষ্কারের পিছনে আছেন রাদারফোর্ড ও হ্যারিয়েট ব্রুকস। প্রোট্যাক্টিনিয়ামের আবিষ্কারকদের মধ্যে লিজে মাইটনার ছাড়াও অনেকের ভূমিকা ছিল। তেজস্ক্রিয় নয় এমন একটি মৌল আবিষ্কারের পিছনে আছেন এক বিজ্ঞানী দম্পতি ওয়াল্টার নড্যাক ও ইডা টাকে-নড্যাক। ইডার কথা আমাদের আলোচনাতে পরে সংক্ষেপে আসবে। একমাত্র যে মৌলটি কোনও মহিলা বিজ্ঞানী এককভাবে আবিষ্কার করেছেন, তা হল ফ্রান্সিয়াম (Fr)। ১৯৩০-এর দশকের শেষদিকে ইউরেনিয়ামের থেকে হালকা মৌলদের মধ্যে দুটি মাত্র অনাবিষ্কৃত ছিল, যাদের পারমাণবিক সংখ্যা ৪৩ ও ৮৭। তাই তাদের খোঁজার নানা চেষ্টা চলছিল। অনেকেই দাবি করেছিলেন যে তাঁরা সফল হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের দাবির সপক্ষে প্রমাণ মেলেনি। মাদাম কুরির এক সময়কার ছাত্রী মার্গারিট পেরেই প্যারির কুরি ইনস্টিটিউটে প্রথম ৮৭ পারমাণবিক সংখ্যার মৌলটির সন্ধান পান। মেরি তাঁর জন্মভূমি পোল্যান্ডের নামে তাঁর ও পিয়েরের প্রথম আবিষ্কৃত মৌলের নাম রেখেছিলেন পোলোনিয়াম। পেরেই নিজের জন্মভূমির নামে মৌলটির নাম দেন। ফ্রান্সিয়ামই প্রাকৃতিক পদার্থের মধ্যে আবিষ্কৃত শেষ মৌল।

মার্গারেট পেরেই-এর জন্ম ১৯০৯ সালের ১৯ অক্টোবর ফ্রান্সে। আর্থিক সমস্যার জন্য পড়াশোনা শেষ না করেই তিনি উনিশ বছর বয়সে মাদাম কুরির ইন্সটিটিউটে মাদামের ব্যক্তিগত সহকারীর চাকরি নেন। মাদামের কাছেই তিনি তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করতে শেখেন। মাদামের মৃত্যুর পরে তাঁকে গবেষণাগারের রেডিও-কেমিস্ট পদে উন্নীত করা হয়।

পেরেই অ্যাক্টিনিয়াম-২২৭ আইসোটোপ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। অ্যাক্টিনিয়ামের প্রোটন সংখ্যা ৮৯। তা বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে থোরিয়াম-২২৭ আইসোটোপে পরিবর্তিত হয়ে যায়, এই কথাই জানা ছিল। ১৯৩৯ সালে পেরেই দেখালেন যে মাত্র এক শতাংশ ক্ষেত্রে অ্যাক্টিনিয়াম-২২৭ আলফা ক্ষয়ের মাধ্যমে ফ্রান্সিয়াম-২২৩ আইসোটোপে রূপান্তরিত হয়। (ছবিতে দেখো।) এর অর্ধায়ু কাল বাইশ মিনিট, তারপর বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে এর থেকে রেডিয়াম-২২৩ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে থোরিয়াম-২২৭ আবার আলফা ক্ষয়ের মাধ্যমে রেডিয়াম-২২৩ সৃষ্টি করে। দেখা যাচ্ছে দুই ক্ষেত্রেই শেষপর্যন্ত অ্যাক্টিনিয়াম-২২৭ থেকে রেডিয়াম-২২৩ পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে ফ্রান্সিয়ামের পথ ধরছে মাত্র এক শতাংশ অ্যাক্টিনিয়াম নিউক্লিয়াস, তাই ফ্রান্সিয়াম অন্যদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।

এর পরে পেরেই সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্তরের পাঠক্রমে ভর্তি হন এবং ১৯৪৬ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালে তিনি ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে তিনি ফরাসি অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের সভ্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিই ফরাসি অ্যাকাডেমির প্রথম নারী সদস্য, পঞ্চাশ বছর আগে সভ্যপদের নির্বাচনে মাদাম কুরিও পরাজিত হয়েছিলেন। মাদামের ছাত্রীকে নির্বাচিত করে অ্যাকাডেমি সেই কলঙ্কিত ইতিহাসে যবনিকা ফেলল। পেরেই যে সমস্ত পুরস্কার জিতেছেন তার মধ্যে আছে ফরাসি অ্যাকাডেমির উইল্ড ও লেকঁত পুরস্কার, ফরাসি কেমিক্যাল সোসাইটির ল্যাভয়সিয়র পুরস্কার, ফরাসি সরকারের লিজিয়ন অফ অনার, ইত্যাদি। মার্গারেট মারা যান ১৯৭৫ সালের ১৩ মে, তাঁর মৃত্যুর কারণ হাড়ের ক্যান্সার। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত মেরি কুরির গবেষণাগারে যে মহিলারা বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছিলেন, তাঁদের কয়েকজনের কথা এই লেখাতে বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা হল। সকলের নাম পরিশিষ্টে দেওয়া আছে।

আমরা এই পর্বের শেষে এসে পৌঁছেছি। ১৯৩৯ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পেরেই ফ্রান্সিয়ামের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছিলেন। সেই বছরই ১লা সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে অন্তিম লগ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানে দুটি পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করেছিল একথা আমরা সকলে জানি। বোমাতে ব্যবহার হয়েছিল নিউক্লিয় ফিশন বা বিভাজন বিক্রিয়া। সেই বিভাজন বিক্রিয়ার আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এক বিজ্ঞানী যাঁর সঙ্গে আমাদের এই লেখাতে আগে পরিচয় হয়েছে।  লিজে মাইটনার ও নিউক্লিয় বিভাজন আবিষ্কারের নাটকীয় ঘটনাক্রম শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগেই, আমরা পরের পর্বে সেই কাহিনি শুনব।

পরিশিষ্টঃ

ভিয়েনা ও প্যারির ইন্সটিটিউট

 ভিয়েনার ইন্সটিটিউট ফর রেডিয়াম রিসার্চে ১৯২০ থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত সময়ে মোট বত্রিশ জন মহিলা এবং পঁয়ষট্টি জন পুরুষ বিজ্ঞানী গবেষণা করেন। এই সময়কালে তাঁদের মধ্যে আটজন পুরুষ ও চারজন মহিলা দশের বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। দু’জন পুরুষ ছাড়া বাকি দশজনেরই প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা বারো থেকে পনেরোর মধ্যে। সেই চারজন মহিলা হলেন মারিয়েটা ব্লাউ, এলিজাবেথ রোনা, এলিজাবেথা কারা-মিহাইলোভা এবং বার্টা কার্লিক।

প্যারির রেডিয়াম ইন্সটিটিউটে মেরির সঙ্গে কোনও না কোনও সময় কাজ করেছেন এমন মহিলা বিজ্ঞানীর সংখ্যা সাতচল্লিশ। তাঁদের সকলের নাম নিচে দেওয়া হল।

নাম জন্মভূমি নাম জন্মভূমি
হ্যারিয়েট ব্রুকস কানাডা উইসনার ফ্রান্স
এলেন গ্লেডিচ নরওয়ে সোনিয়া দেদিচেন নরওয়ে
লুসি ব্ল্যাঙ্কিস ফ্রান্স এলিসিয়া ডোরাবিয়ালস্কা পোল্যান্ড
মে সিবিল লেসলি ব্রিটেন গাউরভিচ লিথুয়ানিয়া
এভা র‍্যামস্টেড সুইডেন জার্মেইন পিলরগেট সুইজারল্যান্ড
জাডউইগা স্মিড্‌ট রাশিয়া এলেইন মন্তেল ফ্রান্স
আইরেন গোয়েজ্‌ হাঙ্গেরি এলিজাবেথ রোনা হাঙ্গেরি
র‍্যাঙ্গেল লার্চে ফ্রান্স
সুজান ভেইল ফ্রান্স জোসেলিন ওয়াল্ডবাউয়ার-প্যাটন কানাডা
অ্যাস্কোউভার্ত ফ্রান্স মার্থে লেব্ল্যাংক ফ্রান্স
ম্যাদেলেইন মোনিন ফ্রান্স অ্যাঞ্জেল পম্পেই ফ্রান্স
সোনিয়া স্লোবোদকিন পোল্যান্ড ইসাবেল আর্চিনার্ড সুইজারল্যান্ড
রেনি গ্যালাবার্ত ফ্রান্স মার্গারিট পেরেই ফ্রান্স
রান্ডি হলোয়েচ নরওয়ে সিউয়েরিন গ্রাবিয়াঙ্কা পোল্যান্ড
আইরিন কুরি ফ্রান্স করভেজি হল্যান্ড
মার্থে ক্লাইন ফ্রান্স লাব উইলি হল্যান্ড
স্টেফানিয়া মারসিনিয়ানু রোমানিয়া ব্র্যান্ডা এডমি মার্কেস পর্তুগাল
জিন স্যা্মুয়েল ওয়েইল ফ্রান্স মেরি-হেনরিয়েট উইব্রাতে ফ্রান্স
ক্যাথরিন শ্যামি রাশিয়া ম্যাকাইন ফ্রান্স
জিন স্যা্মুয়েল লাতেস ফ্রান্স ম্যান্তিউফেল পোল্যান্ড
ওয়েইল আদ্রিয়েনে ব্রুন্স্‌ভিগ ফ্রান্স এলিস প্রেবিল যুগোস্লাভিয়া
লুসিয়েন ওয়াইনবাখ ফ্রান্স ব্যাসুইজ-লেভি
জ্যানিন গারসিন্সকা পোল্যান্ড মারিয়েটা ব্লাউ অস্ট্রিয়া
হেলেন ইম্যানুয়েল জাভিজিয়ানো গ্রিস

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

2 Responses to বৈজ্ঞানিকের দপ্তর তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ- নিউক্লিয় বিজ্ঞানে নারী পর্ব ৪ গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় বর্ষা ২০২০

  1. Arjun Dawn says:

    স্যার, পড়ে খুব ভালো লাগলো। ছোটদের জন্য খুব প্রাথমিক জায়গা থেকে তুলে এনেছেন ব্যাপার গুলো। তবে বড়ো-বুড়োরাও আশা করি তথ্য অনুসন্ধান ও ঘটনাক্রম বুঝতে পেরে বেশ মজাই পাবেন।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s