বৈজ্ঞানিকের দপ্তর দুমুখো দর্পন সুমন পাল বসন্ত ২০১৭

biggandumukho01 (Medium)

একটি পরিচিত দৃশ্য দিয়ে শুরু করা যাক এবং যেটা আমাদের জন্য ইতিবাচক। এটা পুলিশের পদ্ধতিগত একটি অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপট। একটি উজ্জ্বল ঘর যেখানে একজন অপরাধীর অপরাধের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আর তার একটি সংলগ্ন অন্ধকার ঘরে, পুলিশের অন্যান্য কর্মকর্তারা কফি বা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞাসাবাদের কার্যধারা পর্যবেক্ষণ করছেন। এই দুটি ঘরের মধ্যের সাধারন দেওয়ালে যে আয়নাটি থাকে, যার পিছনে পুলিশের কর্মকর্তা নিজে মেঘনাদ হয়ে সন্দেহভাজনের জিজ্ঞাসাবাদ পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হন, সেটি কিভাবে সম্ভব হয় সেটাই আলোচ্য (চিত্র ১)।

biggandumukho02-medium

চিত্র ২

আরেকটি ঘটনা লক্ষ করা যাক যেটা বেশির ভাগ সময়ই নেতিবাচক ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন একটা প্রচলন হয়েছে যে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে আধুনিক পোশাক-আশাক বাজারে এসেছে তা অত্যাধুনিক মল-এ বিক্রি হচ্ছে। সেখানে অনেক আইটেম থেকে পছন্দ করাটা সত্যি খুব সহজ। শুধু তাই নয়। এই জাতীয় শপিং মলগুলিতে থাকছে ট্রায়াল রুম। সেখানে পোশাকগুলি পরিধান করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ফিটিংস সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কেনার ব্যাপারে। আর এখানেই একটু গোলমালের খবর শোনা যায় মাঝেমাঝেই। সাম্প্রতিক অতীতে, মহিলাদের পোশাক পরিবর্তনের ট্রায়াল রুমে কিছু অসাধু লোক ব্যবহার করছে এক বিশেষ জাতীয় আয়না (দুমুখো আয়না) (চিত্র ২)। এছাড়াও টয়লেট, বাথরুম, হোটেল রুম, বিশ্রাম কক্ষ ইত্যাদিতে অসৎ উদ্দেশ্যে গোপনে ব্যবহার করা হচ্ছে এই বিশেষ জাতীয় আয়না। কিন্তু আমাদের মধ্যে কজন নিশ্চিত করে জানি যে আপাতদৃষ্টিতে দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা সাধারণ আয়না বাস্তবে একটি ‘সাধারণ’ আয়না নাকি আসলে একটি ‘দুমুখো’ আয়না? এটা ঠিক যে শুধু একনজর দেখেই দুটোর মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত করা খুবই কঠিন। কিন্তু এটা ভীষণই জরুরি। সুতরাং, কীভাবে আমরা নিশ্চিত হব এবিষয়ে? সেটাও বিবেচ্য।

biggandumukho03-medium

চিত্র ৩

যে আয়নাটি আংশিক ভাবে প্রতিফলনে সক্ষম এবং আংশিক ভাবে স্বচ্ছ সেটিই আসলে একটি দুমুখো আয়না। যখন এই আয়নার একপাশ উজ্জ্বল ভাবে আলোকিত রাখা হয় এবং অন্যদিকটি অন্ধকার থাকে, তখন অন্ধকার দিক থেকে আলোকিত দিক দেখা যায় কিন্তু বিপরীত দিক থেকে কিছু দেখা যায়না। কিভাবে করা হয় এটি? আয়নার কাচকে একটি পাতলা এবং প্রায় স্বচ্ছ ধাতু – সাধারণত অ্যালুমিনিয়াম–দিয়ে আচ্ছাদিত করা হয়। এই প্রতিফলক তলের প্রলেপ এতটাই পাতলা করা হয় যে এটিকে একটি অর্ধ-ধাতব (half-silvered) পৃষ্ঠ বলা হয়ে থাকে। এর নাম এরকম half-silvered বলা হয় এই জন্য যে প্রতিফলক তলের অণুর আচ্ছাদন এতটাই পাতলা যে শুধুমাত্র প্রায় অর্ধেক অণু প্রয়োজন আয়নাটিকে একটি অস্বচ্ছ আয়নায় পরিণত করতে। অর্ধ-ধাতবপৃষ্ঠ, এর ওপর যে আলো আপতিত হয়, তার প্রায় অর্ধেক তার পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত করে প্রথম মাধ্যমেই ফিরিয়ে দেয় এবং বাকি অর্ধেক উল্টোদিকে প্রতিসৃত করে দেয়।

সাধারণ একটি আয়নার সাথে এর তফাত তাহলে কোথায়? কাচের ওপর রূপা, টিন বা নিকেল ধাতুর প্রলেপ দিয়ে সাধারণ আয়না তৈরি করা হয়। আর ধাতুর বায়ুর অক্সিজেন দ্বারা যাতে জারণ না হয়ে যায় তাই তামার একটি স্তর যোগ করা হয় বা রং-এর একটি স্তর প্রয়োগ করা হয়। এতে দুটো দিক বজায় থাকে – এক, প্রতিফলক প্রলেপ রক্ষা পায়, এবং দুই, এটা নিশ্চিত করা যায় যে সব আলো প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসবে-যার অর্থ হল এটি একটি নিয়মিত আয়নার মতো আচরণ করবে। তাহলে এটা বলা যায় যে, দ্বিমুখী আয়নার কলাকৌশল লুকিয়ে রয়েছে এর উৎপাদন এবং যথোপযুক্ত আলোকসম্পাতের ওপর।

biggandumukho04 (Medium)

একটি উজ্জ্বলতর ঘরে এটা একটি আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক আয়না হিসেবে কাজ করে যখন বিপরীত দিকে অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল ঘর থাকে (চিত্র ৪)। যারা উজ্জ্বলতর ঘরে থাকবে তারা তাদের নিজস্ব প্রতিবিম্ব দেখতে পাবে – অর্থাৎ এটা সাধারন আয়নার মতো আচরণ করবে; আর যারা অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল ঘরে থাকবে তারা আয়নার মধ্যে দিয়ে দেখতে পাবে – অর্থাৎ এটা একটা সাধারণ স্বচ্ছ জানালার মতো আচরণ করবে।

এখন প্রশ্ন হল, কীভাবে চেনা যাবে এই দুমুখো দর্পণকে? সাধারন আয়নায় সাধারনত 1 mm থেকে 5 mm পর্যন্ত বেধ হয়, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে। এই রকম পুরু একটি কাচের স্ল্যাবের পিছনে ধাতব প্রলেপ (সাধারণত রূপা, টিন বা নিকেল ধাতু) থাকায় এই আয়নায় বহু প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হতে পারে। কাচের সামনের তল থেকে আলোকরশ্মি প্রতিফলিত হয়ে একটি প্রতিবিম্ব গঠন করবে (I´) (চিত্র ৫);

biggandumukho05 (Medium)

আলোর অপর অংশ কাচ মাধ্যমে প্রতিসৃত হয়ে ধাতব প্রলেপ অংশ থেকে প্রতিফলিত হবে এবং পুনরায় বায়ু মাধ্যমে প্রতিসৃত হয়ে দ্বিতীয় প্রতিবিম্ব গঠন করবে (I)। এই দ্বিতীয় প্রতিবিম্বটিই উজ্জ্বলতম এবং এটিই আমরা দেখে থাকি। প্রথম প্রতিবিম্বটি তৈরি হয় খুব কম পরিমান আলোকরশ্মির প্রতিফলনে আর তৃতীয় (I1) বা চতুর্থ (I2) প্রতিবিম্বের উজ্জ্বলতাও কমে যায় কারন আয়নার প্রথমতল থেকে কাচ মাধ্যমে আলোর খুব সামান্য অংশই প্রতিফলিত হয়। ফলে এভাবে তৈরি হওয়া প্রতিবিম্বগুলি আমাদের দৃষ্টিগোচরে সাধারনত আসে না। এখন, কোন একটি বস্তু (বা কিছু না পেলে নিজের হাতের আঙ্গুল) যদি তির্যকভাবে আয়নায় স্পর্শ করানো যায়, তাহলে উৎপন্ন প্রতিবিম্ব ও বস্তুর মধ্যে একটি ফাঁক পরিলক্ষিত হয় (চিত্র ৬)।

biggandumukho06 (Medium)

অপরদিকে, দুমুখো আয়নার বেধ তুলনামূলক ভাবে কম এবং গঠনে আগেই বলা হয়েছে যে ধাতব প্রলেপ হল half-silvered;ফলে তুলনামূলক ভাবে আলোর একটি বড় অংশ আয়নার মধ্যে দিয়ে প্রতিসৃত তথা নির্গত হয়ে যায়; আর উৎপন্ন প্রতিবিম্ব ও বস্তুর মধ্যে কোন ফাঁক পরিলক্ষিত হয় না। অর্থাৎ, সহজ এই যান্ত্রিক উপায়েই আমরা বুঝে ফেলতে পারি যে আয়নাটি সাধারন নাকি দুমুখো।

দুমুখো আয়নাকে পাবলিক এলাকায় এবং জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে, পরীক্ষামূলক গবেষণায়, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করা যেতেই পারে। এর ছোট সংস্করণ মাঝে মাঝে সিকিউরিটি ক্যামেরার ক্ষেত্রে–যেখানে ক্যামেরা একটি লুকোনো জায়গায় রাখা প্রয়োজন, টেলিপ্রম্পটার-এর ক্ষেত্রে – যেখানে একজন উপস্থাপক একটি চলচ্চিত্র বা টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে সরাসরি অভিক্ষিপ্ত লেখা থেকে পাঠ করবেন, ব্যবহার করা হয়। পরিশেষে, মানব মনের জটিল কুটিল খেলার অংশে আমরা প্রবেশ না করে ধরেই নিলাম যে কিছু অসাধু লোক সমাজে চিরকালই থাকবে (যদিও আদর্শগত দিক থেকে না থাকাই বাঞ্ছনীয়), সচেতন হতে হবে আমাদেরই নিজ স্বার্থে ও নিজ নিজ দায়িত্বে যাতে এর কু-ব্যবহারে আমরা বিপদগ্রস্ত না হয়ে পড়ি।

তথ্যসুত্র

১। https://en.wikipedia.org/wiki/One-way_mirror

২। http://science.howstuffworks.com/question421.htm

৩। http://mentalfloss.com/article/12969/how-do-two-way-mirrors-work

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s