বৈজ্ঞানিকের দপ্তর দ্য ইনভিজিবল ম্যান? ঋজু গাঙ্গুলী শরৎ ২০১৭

ঋজু গাঙ্গুলীর সমস্ত লেখা এইখানে

দ্য ইনভিজিবল ম্যান?

প্রায় নিঃশব্দে হাতল ঘুরিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলল লোকটা, আর ভেতরে ঢুকেই দরজাটা ঠেলে, তেমনই নিঃশব্দে, বন্ধ করে দিল।

ঘরটা অন্ধকার, তাই বাইরের আলো-জ্বলা ল্যান্ডিং আর সিঁড়ির জায়গাটা থেকে ভেতরে ঢুকেই প্রায় অন্ধ হয়ে যেতে হয়। লোকটা জানে, অন্ধকারে চোখ সইয়ে তবেই ওকে এগোতে হবে এই ঘরের অন্য প্রান্তে যাওয়ার জন্য। ঘর-ভর্তি সোফা, চেয়ার, সেন্টার টেবিল, ইতস্তত পড়ে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগ, খবরের কাগজ, ব্যাডমিন্টন খেলার র‍্যাকেট,  এসবের মধ্য দিয়ে অন্য প্রান্তে পৌঁছে, কাউকে কিছু না জানিয়ে ভেতরের ঘরে ঢুকে পড়তে না পারলে ওর খুব বিপদ!

চোখ সয়ে গেলে লোকটা বুঝতে পারল, সামনের সাক্ষাৎ মাইনফিল্ড-রূপী ড্রইং স্পেসের ডানদিকে যে ঘরটা রয়েছে, তার দরজার তলা থেকে চুঁইয়ে আসছে উজ্জ্বল আলো আর হাসির হররা। ওর উপস্থিতি টের পেলেই অবশ্য ওই হাসিগুলো মুহূর্তের মধ্যে বদলে যাবে অন্য কিছুতে। কোনো শব্দ না তুলে জুতো-মোজা খুলল লোকটা, তারপর যথাসাধ্য দ্রুতবেগে অন্ধকার আর জিনিসপত্র সামলে যাওয়ার চেষ্টা করল উলটো কোণে, যে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকতে পারলেই ও আপাতত নিরাপদ।

কিন্তু…

শেষ রক্ষা হল না। লোকটা যখন গন্তব্যের দিকে প্রায় অর্ধেক দূরত্ব পেরিয়ে গেছে, ঠিক তখনই দড়াম করে খুলে গেল ডানদিকের ঘরের দরজাটা। উজ্জ্বল আলোয় বন্দি হয়ে অসহায়ভাবে থেমে গেল লোকটা।

করাল গলাটাও ভেসে এল তখনই।

“দু’ আঁটি পাটপাতা আনার জন্য তোমাকে লেক মার্কেটে পাঠানো হয়েছিল দেড় ঘন্টা আগে। মোবাইল বাড়িতে রেখে, লেক মার্কেটে আদৌ না গিয়ে, ত্রিকোণ পার্কের সামনের দোকানটা থেকে তেলেভাজার শ্রাদ্ধ করে, আনন্দ-র আউটলেট ঘুরে এখন পা টিপে-টিপে ঘরে ঢুকছিলে এই ভেবে যে নিষ্পাপ মুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলবে, আমি তো পাটপাতা না পেয়ে অনেকক্ষণ হল ফিরে এসেছি!

কী ভেবেছ নিজেকে? মিস্টার ইন্ডিয়া, নাকি স্বয়ং ইনভিজিবল ম্যান?”

স্থান: আমার কলকাতার কোয়ার্টার;

কাল: এক শনিবারের সন্ধে;

পাত্রী: দ্য ইউজুয়াল সাসপেক্টস, মানে আমার মেয়ে মেঘনা, বোন মধুরিমা, তোষালি, অনুমিতা, এবং আমার দোর্দণ্ডপ্রতাপ বেটার হাফ;

বিশেষ ভূমিকায়: জয়া;

চক্রব্যূহে অভিমন্যু: আমি।

ঠিক কীভাবে ও কেন আমি এই সন্ধেয় চাঁদমারিতে রূপান্তরিত হলাম, তা তো ওপরেই বলেছি। তারপর, বকাঝকা শেষ হলে হাতে চায়ের কাপ নিয়ে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা করছিলাম, যখন টিভিতে বিশ্বের সেরা আজগুবি যাত্রাপালা, মানে বাংলা সিরিয়াল শুরু হবে, বাকিরা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সোফায় সেঁটে যাবে, আর আমিও সেই চান্সে হাতে বই নিয়ে বিছানায় লম্বা হব। কিন্তু পরিকল্পনা ঘেঁটে দিল আমার মেয়ে একটি নিরীহ প্রশ্ন করে,

“আচ্ছা বাবা, সত্যিই কি কারো পক্ষে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সম্ভব?”

হঠাৎই দেখলাম, সোফায় নানাভাবে কাত হয়ে থাকা চেহারাগুলো সোজা হয়ে উঠেছে, এবং আমার দিকে তাকাচ্ছে সেইভাবে, যার বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখকেরা বলেন, “চোখ ইজ জ্বলজ্বলিং”।

বুঝলাম, যেকোনো কারণেই হোক না কেন, সিরিয়ালের তুলনায় এই বিষয়টাই এখন এদের কাছে বেশি কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে উঠেছে।

গরম চায়ে আরো কয়েকটা চুমুক দিয়ে মগজটা সাফ করে নিলাম, তারপর একেবারে সরল একটা প্রতিপ্রশ্ন করলাম, “আচ্ছা, আমরা কোনো জিনিসকে কীভাবে দেখি, সেটা কি তোমরা জান?”

উত্তরে “ক্লাস টেনের পর এসব পড়িনি”, “আমরা নয়, তুমি বলো”, এসবের তোয়াক্কা না করে আমার নিরন্তর খোঁচানোর ফলে টুকরো-টাকরা কিছু কথা থেকে যা জানা গেল তা মোটামুটি এরকম:

১) সূর্য, অন্যান্য নক্ষত্র, বিভিন্ন বৈদ্যুতিক বাতি, বা অন্য কোনো ভাবে নিজে থেকে আলো ছড়াতে থাকা বস্তু থেকে বেরিয়ে আসা আলো সরাসরি, অথবা অন্য কোনো নিষ্প্রভ জিনিসের ওপর পড়ে ঠিকরে  গিয়ে আমাদের চোখে এসে পড়ে।

২) আমাদের চোখের অনেকগুলো স্তর সেই আলো একে-একে পেরিয়ে আসে। এই স্তরগুলোর মোটামুটি পরিচয় পেতে গেলে চোখের ভেতরটার একটা ছবি দেখতেই হচ্ছে:

চোখ কিন্তু খুব একটা ছোটো জিনিস নয়। চোখের যে অংশটা দেখা যায়, তার একটা বড়ো জায়গা জুড়ে থাকে সাদা রঙের স্ক্লেরা নামক একটা অস্বচ্ছ অংশ, যেটা চোখগুলো বড়ো করার চেষ্টা করতে গেলে বেশি করে বেরিয়ে আসে। এর কাজ হল অতিরিক্ত আলো বা ধুলো থেকে চোখকে বাঁচানো।

চোখের পাতার নিচ থেকে শুরু করে গোলকাকার চোখের পেছন দিক সহ প্রায় পুরোটা ঢেকে থাকে আর একটা কালচে আবরণ, যেটা চোখের ভেতরের সূক্ষ্ম অংশগুলোকে চোট-আঘাত থেকে বাঁচায়।

চোখের যে জায়গাটা দিয়ে আলো ঢোকে, মানে যাকে বইয়ে অক্ষিকোটর বলা হয়, তার একদম বাইরে আছে স্বচ্ছ কর্নিয়া। এর মধ্য দিয়ে আলো চোখে ঢোকে।

কর্নিয়া আর চোখের পরের স্তরের মধ্যে আছে একটা জলীয় তরল, যেটার খটমট নাম হল অ্যাকোয়াস হিউমার। এই অংশটার প্রধান কাজ হল চোখকে নরম আর ভেজা-ভেজা রাখা।

তারপরেই আসে আইরিস, যার রং কালো, বাদামি, নীল, সবুজ, ধূসর, এমন অনেক কিছু হতে পারে। এটা কিন্তু আসলে একটা পর্দা, যেটা পরিবেশে আলোর পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে আকারে বড়ো হয়ে গিয়ে চোখে কম আলো ঢুকতে দেয়; আবার আবছায়া বা অন্ধকারে এই আইরিস-ই চোখে বেশি করে আলো ঢুকতে দেওয়ার জন্য নিজেকে সরিয়ে নেয়।

আইরিস-এর পাহারাদারি যেখানে আলোর ঢোকাকে সামলে রাখার জন্য, সেটা হল চোখের মণি, বা পিউপিল, যার একটা চমৎকার বাংলা নাম আছে।

“কনীণিকা!”, এটা সমস্বরে শুনতে পেয়ে মনে-মনে অভিনেত্রী কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়-কে ধন্যবাদ জানালাম, কারণ এই শব্দটার সঙ্গে অন্তত এবাড়ির সবার পরিচয় ওঁর নামের মানে খুঁজতে গিয়েই যে হয়েছে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

পিউপিল আসলে একটা খুব পাতলা পর্দা, যার পেছনে আছে চোখের আসল জিনিস, মানে একটা লেন্স। তার পেছনে আছে একটা ঘন জেলি, যার কঠিন নাম হল ভিট্রিয়াস হিউমার। লেন্সে আলো পড়ে বেঁকে যায়, আর এই জেলির মধ্য দিয়ে গিয়ে চোখের পর্দা বা রেটিনায় আছড়ে পড়ে। রেটিনায় আছে অসংখ্য আলোক-সংবেদী স্নায়ুকোষ, যাদের চেহারার ভিত্তিতে দু’ভাগে ভাগ করা চলে।

প্রথম ভাগে আছে চোঙার মতো দেখতে কোন কোষ, যারা জটলা করে থাকে রেটিনার মাঝখানের অংশটায়, যাকে ম্যাকুলা বলে। উজ্জ্বল পরিবেশে এই কোন কোষেরা যে জিনিসটাকে দেখা হচ্ছে তার ঝকঝকে রঙিন আর স্পষ্ট ছবি ফুটিয়ে তোলে।

দ্বিতীয় ভাগে আছে লম্বা লম্বা রড কোষ, যারা ছড়িয়ে থাকে রেটিনার প্রান্তীয় এলাকা জুড়ে। অল্প আলো বা অন্ধকারে এরা বস্তুর একটা মোটামুটি অবয়ব তৈরি করে দেয়, আর অন্য সময়ে এদের অবদান হল চোখের কোণের দিকে থাকা জিনিসগুলোকে পেরিফেরাল বা সাইড ভিশনের মাধ্যমে মাথায় পৌঁছে দেওয়া। নিশাচর প্রাণীদের চোখে এই রড কোষ কোন কোষের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় থাকে, তাই তারা অন্ধকারে আমাদের চেয়ে বেশি দেখতে পায়। কিন্তু…

“তারা রং দেখে খুব কম”, এবারো উত্তরটা আসে সমস্বরে।

রেটিনায় আলো পড়লেই কিন্তু জিনিসটাকে দেখা যায় না। ওই আলোক-সংবেদী কোষেরা আলোকে ঝটপট বিদ্যুতের আকার দেয়, যাতে সেটা পরপর সাজানো স্নায়ুকোষের রাস্তা ধরে মগজে পৌঁছে যায়, আর সেখানে, শেষ অবধি, যা দেখলাম তার একটা ঠিকঠাক ছবি ফুটে ওঠে।

তবে হ্যাঁ, পুরো ব্যাপারটা প্রায় আলোর গতিতেই হয় বলে আমাদের দেখা আর বোঝার মধ্যে সময়ের ফারাক থাকে না বললেই চলে।

“কিন্তু এর থেকে এটা খুব সহজেই বোঝা যায়”, জীবন বিজ্ঞানের বইয়ের বাইরে আসতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বলি আমি, “যে অদৃশ্য মানুষ নিজেও কিছুই দেখতে পাবে না, ফলে এইসব কাহিনি স্রেফ গল্প হয়েই থেকে যাবে”।

আলোচনাটা জমতে না জমতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে স্রোতাদের মুখগুলো লম্বা হয়ে গেল। নিরুপায় হয়েই আমি এবার পিছিয়ে গেলাম একশো বছরেরো বেশি আগে।

“১৮৯৭ সালে ‘পিয়ার্সনস উইকলি’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে, এবং ওই বছরেই উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত হয় ‘দ্য ইনভিজিবল ম্যান’”, আমি বলি।

“হারবার্ট জর্জ ওয়েলস, যিনি কল্পবিজ্ঞান তথা স্পেকুলেটিভ ফিকশনের জগতে এইচ.জি.ওয়েলস নামেই অমর হয়ে আছেন, এই উপন্যাসের আগেই এমন দুটি উপন্যাস লিখেছিলেন, যাদের যেকোনো একটা লিখতে পারলেই লোকের জীবন সার্থক হয়ে যায়: ‘দ্য টাইম মেশিন’, এবং ‘দ্য আইল্যান্ড অফ ডক্টর মোরো’। কিন্তু সেখানেই থেমে না গিয়ে উনি আমাদের এক বিজ্ঞানী, গ্রিফিনের কথা শোনান।

গ্রিফিন প্রথাগত পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে অপটিক্স, তথা আলোর গতি-প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এমন একটা রাসায়নিক আবিষ্কার করেন, যেটা মানুষের দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিসরাংক বায়ুর সমান করে দেয়”।

চোখগুলো বিদ্রোহী হয়ে উঠছে দেখে বুঝলাম, এখন যদি আমি খাতা-কলম টেনে আলোর এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে ঢোকার পর তুলনামূলক ভাবে বেঁকে যাওয়া বোঝাতে চাই, তাহলে কপালে দুঃখ আছে, তাই আমি হুড়মুড়িয়ে বললাম, “মানে গ্রিফিন এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করেছিলেন, যেটা মানুষকে স্বচ্ছ করে দেয়।

শরীরের থেকে তো চোখকে আলাদা করা যায় না। তাই ওই প্রক্রিয়ায় রেটিনাও স্বচ্ছ হয়ে যাবে, ফলে সেখানে কোনো আলো এসে থামতেই পারবে না!

বিজ্ঞান জনপ্রিয় করায় বড়ো ভূমিকা নেওয়া রাশিয়ান লেখক ওয়াই. আই. পেরেলম্যান এইজন্য সেই ১৯১৩ সালেই বলেছিলেন, অদৃশ্য মানুষ কিছুই দেখতে পাবে না।

একজন বিজ্ঞানী হিসেবে ওয়েলস সেটা জানতেন, সেজন্য গ্রিফিনের পরীক্ষানিরীক্ষা যে বেড়ালটার ওপর হয়েছিল, তার চোখের রেটিনা শেষ অবধি দৃশ্যমান হয়ে থাকার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে তাতেও সমস্যা থাকতই, কারণ স্ক্লেরা এবং আইরিসের খবরদারির অভাবে এত বেশি আলো রেটিনায় এসে পৌঁছত, যে বেচারির কিছুই দেখতে পাওয়ার কথা নয়”।

“তারপর?”, আমার সামনে নতুন এক কাপ চা আর বাটিতে মুড়িমাখা রেখে প্রশ্ন করলেন শ্রীমতী।

“একজন যথার্থ চিন্তাবিদ, এবং ডারউইনের মতবাদের সমর্থক অল্ডাস হাক্সলে-র ভাবশিষ্য হিসেবে ওয়েলস তাঁর প্রত্যেকটা কাহিনিই তৈরি করেছিলেন কল্পবিজ্ঞানের মোড়কে কোনো না কোনো অস্তিত্ত্ববাচক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করার জন্য”, বলি আমি।

“‘দ্য ইনভিজিবল ম্যান’-এর গল্পেও উনি দেখিয়েছিলেন, কীভাবে গ্রিফিন নিজেকে অদৃশ্য থেকে দৃশ্য করতে ব্যর্থ হয়ে শেষে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য চুরি, ডাকাতি, মায় খুনের আশ্রয় নেয়। ইস্ট সাসেক্স-এর এক প্রত্যন্ত গ্রামে নিজেকে লুকোনোর চেষ্টা করে সে, কিন্তু খুব শিগগিরি তার স্বভাব, মেজাজ, এবং হিংস্রতা এমন পর্যায়ে যায় যেখানে গোটা গ্রাম তাকে শত্রু হিসেবেই দেখতে থাকে।

মানবজাতির ওপর এক সন্ত্রাসের রাজত্ব আরোপ করতে চেয়েছিল গ্রিফিন, আর এই কাজে সে তার এক সময়ের সহপাঠী ডক্টর কেম্পকেও শামিল করতে চেয়েছিল। কেম্প অবশ্য তাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিতেই চেষ্টা করেন। শেষ অবধি গণরোষের শিকার হয়ে মারা যায় গ্রিফিন”।

“তুমি কী বলতে চাইছ”, চ্যালেঞ্জের সুরে প্রশ্ন তোলে তোষালি, “এই গল্পটা আসলে কল্পবিজ্ঞান কম, আর নীতিকথা বেশি?”

“আমি নয়”, রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে বলি আমি, “অদৃশ্য মানব নিয়ে লিখতে বসে প্রায় সব লেখক এই কথাই বলতে চেয়েছেন। ওয়েলস-এর আগেই জেমস ডালটন লিখেছিলেন এক ঘটনার ঘনঘটায় ভরপুর সুবিশাল উপন্যাস ‘দ্য ইনভিজবল জেন্টলম্যান’। সেটায়, ই.পি.মিশেল-এর গল্প ‘দ্য ক্রিস্টাল ম্যান’-এ, জ্যাক লন্ডন-এর গল্প ‘দ্য শ্যাডো অ্যান্ড দ্য ফ্ল্যাশ’-এ, এই সবক’টা গল্পেই মোটামুটি এটাই বলা হয়েছে যে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারলে তার ফল ভালো হয় না।

এর একটা বড়ো কারণ সম্ভবত এটাই যে এই সাহিত্যিকেরা সবাই দার্শনিক প্লেটোর বিখ্যাত কাজ, ‘রিপাবলিক’-এর দ্বিতীয় খণ্ডে উল্লিখিত একটি অণুগল্প, যা ‘রিং অফ জাইজিস’ নামে খ্যাত, তার কথা কিছুতেই ভুলতে পারেননি”।

“কী কিংবদন্তি?”, প্রশ্ন তোলে অনুমিতা।

বাইরে তখন রাত ঝিমঝিম করছে। সিরিয়ালের সময় পার হয়ে গেলেও, এবং জয়া এসে শ্রীমতীকে, “ম্যাডাম, মাছগুলো একবার দেখে যান” বলে তোলার চেষ্টা করলেও সবাইকে সোফায় গ্যাঁট হয়ে বসে থাকতে দেখে বুঝি, দৃশ্য-অদৃশ্যের এই টানাপোড়েনের একটা এসপার-ওসপার না হওয়া অবধি কেউ উঠতে চাইছে না। উৎসাহিত হয়ে, দু’হাজার বছরেরো বেশি পুরোনো একটা বইয়ের তর্ক-বিতর্কের মধ্যে লুকিয়ে থাকা গল্পটাকে খুঁজে বের করে আনি আমি।

“প্লেটোর ভাই গ্লকন সক্রেটিসকে একটা কিংবদন্তির প্রসঙ্গ তুলে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

জাইজেস অফ লিডিয়া এক সত্যিকারের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। হেরেডোটাস-এর ‘দ্য হিস্টরিজ’ বলছে, জাইজিস ছিলেন লিডিয়ার রাজা ক্যান্ডুলেসের অধীনস্থ এক অভিজাত, যিনি ক্যান্ডুলেসকে হত্যা করে ও তাঁর রানিকে বিয়ে করে সিংহাসনে বসেন, এবং লিডিয়ায় মের্মনাড বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। গ্লকন এই কাহিনিকে কিছুটা অন্য রকম আকার দিয়েছিলেন।

গ্লকন-এর গল্পে জাইজিস-এর পূর্বসুরী এক মেষপালক এক ভূমিকম্পের সময় নিজের ভেড়াদের নিয়ে পালাতে গিয়ে দেখে, পাহাড়ের গায়ে ফাটল ধরে বেরিয়ে এসেছে একটা গুহা। সেই গুহায় ঢুকে সে বুঝতে পারে, আসলে ওটা একটা সমাধি, যেখানে একটা ব্রোঞ্জের ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের তুলনায় বিশালদেহী এক পুরুষের মৃতদেহ। লোভের বশে সেই মৃতদেহের হাতে থাকা একটা সোনার আংটি নিয়ে নেয় সেই মেষপালক। ক্রমে সে বুঝতে পারে, ওই আংটিটা হাতে পরলেই তাকে আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না।

এই ‘সুবিধা’ কাজে লাগিয়ে সেই মেষপালক সবরকম শঠতা ও কৌশল কাজে লাগিয়ে প্রথমে রাজার ঘনিষ্ঠ হয়, এবং শেষে তাকে মেরে রাজ্যের সিংহাসন দখল করে।

গ্লকনের বক্তব্য ছিল, এমন কোনো আংটি একজন সৎ ও একজন অসৎ মানুষের হাতে পরিয়ে দিলে ক্রমেই দেখা যাবে যে তাদের কার্যকলাপ একই রকম হয়ে পড়েছে, কারণ অন্যের নজরে পড়ার ভয় না থাকলে ন্যায়-নীতির সংজ্ঞা ভেঙে পড়ে, বরং যা আমার নয় তাকেই নিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে, ও সুযোগ দুই-ই বেড়ে চলে পাল্লা দিয়ে।

সক্রেটিস গ্লকনের কথা মানেননি। তিনি বরং বলেছিলেন যে ন্যায় বা নীতির সংজ্ঞা স্রেফ অন্যের নজরবন্দি হয়ে বাঁচার ওপরেই নির্ভর করে না, বরং যে সৎ সে সব অবস্থাতেই সৎ থাকে।

অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার, এবং তার ফলে অন্যের সবরকমের জাজমেন্টের বাইরে চলে যেতে পারার এই প্রায় ঐশ্বরিক ক্ষমতা নিয়ে দুশ্চিন্তা এই বিষয় নিয়ে লেখালেখি করা সব সাহিত্যিককেই ভুগিয়েছে। এর সঙ্গে যদি যোগ করি অদৃশ্য ব্যক্তি বা বস্তুকে নিয়ে মানবমনে খুব স্বাভাবিক ভাবেই জেগে ওঠা ভয়, বিতৃষ্ণা, বা বীভৎস ভাবের কথা, তাহলে বোঝা যায় সাহিত্যে ‘অদৃশ্য’ জিনিসের এত গুরুত্ব কেন”।

“এই নিয়ে আরো কেউ লিখেছে বুঝি?”, জিজ্ঞেস করে মধুরিমা।

একটা বড়ো শ্বাস ফেলে ফিরিস্তি দিই আমি।

“কল্পবিজ্ঞান আর অপ্রাকৃত বা অতিপ্রাকৃত বিষয়ের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকা এই জিনিসটা নিয়ে সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় কিছু গল্পই তো লেখা হয়েছে।

যেকোনো ভয়ের গল্পের সংকলনেই জায়গা পাবে এমন বেশ কিছু গল্প, যেমন,  ফিৎজ-জেমস ও’ব্রায়েন-এর গল্প “হোয়াট ওয়াজ ইট?”, গায় দ্য’ মপাসাঁ-র ‘দ্য হরলা’, অ্যামব্রোজ বিয়ার্স-এর ‘দ্য ড্যামড থিং’… এগুলো সবই অদৃশ্য ‘কিছু’ একটার মুখোমুখি হওয়ার প্রতিক্রিয়া নিয়ে লেখা। তবে হ্যাঁ, এই ঘরানায় আমার নিজের পছন্দের গল্প তিনটে হল এডমন্ড হ্যামিলটনের ‘দ্য মনস্টার গড অফ মামুর্থ’, এইচ.পি. লাভক্র্যাফটের ‘দ্য ডানউইচ হরর’, আর এরিক ফ্র্যাঙ্ক রাসেলের ‘সিনিস্টার ব্যারিয়ার’।

তবে, কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা বাস্তবে করে তোলা অসম্ভব বলেই হয়তো রিং অফ জাইজিস-এর সবচেয়ে সার্থক সাহিত্যিক প্রকাশ ঘটে ফ্যান্টাসিতে। এখনও বিভিন্ন ফ্যান্টাসিতে উইজার্ডরা বিশেষ বিশেষ মন্ত্র বা স্পেলের সাহায্য নিয়ে দর্শকের মন ও নজরকে এমনভাবে ঘুলিয়ে দেয়, যে চোখের সামনে থাকা ব্যক্তি বা বস্তুও অদৃশ্য হয়ে যায়। জে.আর.আর টোকিয়েন-এর ‘দ্য হবিট’, এবং পরে আস্ত ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’ ট্রিলজিতেই আসে সেই আংটির কথা, যা আঙুলে পরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া যায় ঠিকই, তবে মানুষটির স্বভাবও বদলে যেতে থাকে তার ফলে, একটু-একটু করে।”।

“জানো বাবা”, এবার মেঘনা মুখ খোলে, “টিভিতে একটা সিনেমা দিয়েছিল কিছুদিন আগে, যেটা খুব ভায়োলেন্ট বলে মা আমাকে দেখতে দেয়নি। সেটাও না, এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নিয়েই ছিল”।

শ্রীমতীর দিকে না তাকিয়েই আমি বুঝতে পারি কোন সিনেমাটার কথা বলা হচ্ছে। ২০০০ সালে রিলিজ হওয়া, পল ভেরহোভেনের সাড়া-জাগানো সিনেমা ‘হলো ম্যান’ ছিল ওয়েলসের গল্পের আধুনিক, অনেক বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং টেকনো-থ্রিলার হিসেবে পরিবেশিত সংস্করণ, যাতে কেন্দ্রীয় চরিত্র বিজ্ঞানীটি মেগালোম্যানিয়া এবং ঈর্ষার বশে অদৃশ্য অবস্থায় কার্যত পশুর অধম, অথচ আর পাঁচজন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি চতুর আচরণ করতে থাকে। সিনেমাটা কোনোমতেই শিশুতোষ নয়, তাই মনে-মনে বউকে সমর্থন জানিয়েও আমি আলোচনাটা অন্য দিকে নিয়ে যেতে চাই।

“কল্পবিজ্ঞান ধুম-ধাড়াক্কা কার্যকলাপ আর ভিনগ্রহী বা রকেটের কারবার ছাড়িয়ে যেই গভীরতর ব্যাপ্তি পেতে থাকে”, আমি কথা চালু রাখি, “ততই এই ‘অদৃশ্য’ ব্যাপারটা সাহিত্যে এসে পড়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা বিষয়ের প্রসঙ্গে।

১৯৫২ সালে র‍্যালফ এলিসন প্রকাশ করেন পরবর্তীকালের মার্কিন সাহিত্যে চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যাওয়া উপন্যাস ‘ইনভিজিবল ম্যান’। পঞ্চাশের দশকের আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের অবস্থা, তাদের কখনও পশু, আবার কখনও ট্রফি হিসেবে দেখা, সর্বোপরি, রক্তমাংসের মানুষের বদলে দর্শক শ্বেতাঙ্গ মানুষটির কল্পনা, ধারণা, ও পরিবেশ দিয়েই তার চেহারা তৈরি হওয়ার এই অসমশক্তিশালী উপন্যাস ‘অদৃশ্য’ কথাটার এক সম্পূর্ণ নতুন অর্থ তুলে আনে।

এই ধারাতেই ড্যামন নাইট লেখেন ‘কান্ট্রি অফ দ্য কাইন্ড’, এবং তারপরে আসে রবার্ট সিলভারবার্গ-এর ‘টু সি দ্য ইনভিজিবল ম্যান’। এই গল্পগুলোর বিষয় ছিল অপরাধীদের সামাজিক নির্বাসনে পাঠানো, যেখানে বাকি সমাজ তাদের ‘দেখতে’ অস্বীকার করে, এবং জনারণ্যে একাকিত্বের অসহনীয় যন্ত্রণাই হয় অপরাধীদের শাস্তি।

ব্যাপারটার অস্তিত্ত্বগত দিকটা আরো ভালো করে ধরা পড়ে কিছু-কিছু কল্পবিজ্ঞান আর পরাবাস্তব মেশানো গল্পে, যেখানে এমন সামাজিকভাবে ‘অদৃশ্য’ মানুষেরা সত্যিই ‘আবছা’ হয়ে মুছে যেতে থাকে কথক বা দর্শকের নজর থেকে। এর সেরা নিদর্শন হল চার্লস ব্যুমন্টের ‘দ্য ভ্যানিশিং অ্যামেরিকান’, হারলান এলিসন-এর ‘আর ইউ লিসনিং’, এবং সিলভিয়া এডওয়ার্ডস-এর ‘দ্য এন্ড অফ এভান এসান্ট’, তবে এগুলোকে কল্পবিজ্ঞান না বলে ফ্যান্টাসি বলাই যুক্তিসঙ্গত”।

“এই নিয়ে কখনও ক্রাইম থ্রিলার লেখা হয়নি?”, রহস্য গল্পের ভক্ত মধুরিমা প্রশ্নটা তোলে।

“বিখ্যাত লেখক জি.কে চেস্টারটন তাঁর অদ্বিতীয় রহস্যভেদী ফাদার ব্রাউন-কে কেন্দ্রে রেখে ‘দ্য ইনভিজিবল ম্যান’ নামে একটা গল্প লিখেছিলেন, যাতে খুনিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা সবাই দেখেছিল, কিন্তু সেখানে তার উপস্থিতি এতই স্বাভাবিক ছিল, এবং যে খুন হয়েছে তার সঙ্গে যে খুনির কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে সেটাও যেহেতু কেউ ভাবতেই পারেনি, তাই খুনি কার্যত ‘অদৃশ্য’-ই হয়ে গেছিল। পঞ্চাশের দশকে প্রকাশিত জ্যাক ভ্যান্স-এর গল্প সংকলন ‘দ্য ডাইং আর্থ’-এ আমরা একটি শহরের কথা পাই, যেখানে বাসিন্দারা হয় ধূসর, নয় সবুজ রঙের পোশাক পরে, আর এক রঙের পোশাক-পরা লোকেরা অন্যদের উপস্থিতি হয় টের পায় না, নয় পেতে চায় না।

২০০৯-এ প্রকাশিত চায়না মিভিল-এর সাড়া জাগানো কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস ‘দ্য সিটি অ্যান্ড দ্য সিটি’-তে আমরা দেখি, প্রায় একই জায়গায় অবস্থিত দুটো শহরের বাসিন্দারা একে অপরকে দেখতে পায় না, অথচ তাদের মধ্যেই তদন্ত চালিয়ে বের করতে হবে, খুনি কে। ভাবা যায়!”

অনেকক্ষণ ধরে আলোচনা করে ক্লান্ত আমি এবার পালাই-পালাই করছিলাম। তাই এবার আর চা বা আনুষঙ্গিক উপচার নয়, আরো শক্তিশালী উপকরণ হিসেবে প্রায় এক মগ ধূমায়মান কফি আমার সামনে এসে পৌঁছল। কফিতে চুমুক দিয়েও কীভাবে আলোচনাটা শেষ করা যায় সেটাই যখন ভাবার চেষ্টা করছি, তখনই অনুমিতা বলল, “তার মানে হল এই, যে অদৃশ্য হওয়া সম্ভব নয়, তাই তো?”

“হুঁ” বলে মাথা ঝাঁকালেই হত, কিন্তু কফির টানেই আমার মুখ আবার খুলে গেল একটা প্রশ্ন তোলার জন্য।

“অদৃশ্য মানে আসলে কী?”

“মানে যাকে কেউ দেখতে পায় না”, বলেন শ্রীমতী।

“বুঝতে পেরেছি”, উত্তেজিত হয়ে ওঠে মধুরিমা, “তুমি বলতে চাইছ, সে থাকবে, কিন্তু এমনভাবে থাকবে, যাতে তাকে কেউ দেখতে না পায়, তাই তো?”

“কারেক্ট”, শ্রোতাদের অবশেষে ট্র্যাকে আনা গেছে বলে খুশিয়াল হয়ে উঠি আমি, “তাহলে বলো তো, আমি কীভাবে অদৃশ্য হওয়ার কথা বলছি?”

“ক্যামোফ্লাজ”! সমস্বরে বলে ওঠে শনিচক্র।

কফিতে চুমুক দিয়ে আমি কথা শুরু করি।

ক্যামোফ্লাজ, যাকে আমরা জটায়ূর ভাষা নকল করে ছদমবেশ বলতে পারি, মানে হল কোনো প্রাণীর চেহারা সাময়িকভাবে বদলে গিয়ে অন্য রকম হয়ে যাওয়া, যাতে তাকে দেখা না যায়, বা দেখলেও অন্য কোনো প্রাণী বলেই মনে হয়। জীববিজ্ঞানী এডোয়ার্ড ব্যাগনাল পোল্টন ১৮৯৪ সালে পর্যবেক্ষণ ও তথ্যের সাহায্যে দেখিয়েছিলেন, প্রাণীজগতে এই ক্যামোফ্লাজ ঘটে মূলত চারটে উদ্দেশ্য নিয়ে।

প্রথম পদ্ধতি হল প্রোটেক্টিভ রেসেমব্লেন্স, যাতে প্রাণীটি শিকারীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য চেহারা বদলে ফেলে। দু’রকম ভাবে এই বদলটা হয়। বিশেষ-বিশেষ ক্ষেত্রে কোনো একটি প্রাণীর চেহারা অন্য কোনো জিনিসের মতো দেখায়, যেমনটা হয় অনেক শুঁয়োপোকার ক্ষেত্রে, যারা নিজের চেহারাকে ভাঙা ডাল, বা শুকনো পাতার মতো করে ফেলতে পারে। সাধারণত প্রাণীরা আত্মরক্ষার জন্য এত গুছিয়ে কিছু করার সুযোগ পায় না, তাই তারা স্রেফ নিজের চেহারাকে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট পরিমাণে বদলে নেয়। প্রজাপতি বা মথেরা এই ভাবেই নিজেদের গাছের কাণ্ড বা পাথরের টুকরোর সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। একটা দারুণ উদাহরণ হল ক্যাটিডিড, বা বুশ ক্রিকেট, মানে ঝিঁঝিপোকা, যাকে পরিবেশের থেকে আলাদাই করা যায় না।

ক্যামোফ্লাজের দ্বিতীয় পদ্ধতি হল অ্যাগ্রেসিভ রেসেমব্লেন্স, যেটা শিকারী প্রাণী বা পরজীবীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এতেও বিশেষ ক্ষেত্রে শিকারীটি নিজের চেহারা নিরীহ কিছুর মতো করে নেয়, যেমন ফ্লাওয়ার ম্যানটিস নিজের চেহারা ফুলের মতোই করে নেয়, সম্ভাব্য শিকারকে বোকা বানানোর জন্য। সাধারণত অবশ্য শিকারী প্রাণীরা নিজেকে পরিবেশের সঙ্গে মিশিয়ে দিতেই চায়, আর প্রকৃতিও তাদের চেহারা তেমন ভাবেই বানায়। স্টোন ফিশ এই ঘরানার সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণীর মধ্যে পড়বে, কারণ এর গায়ে ছোঁয়া লাগলেই বিষাক্ত হুলের আক্রমণ ধেয়ে আসে, অথচ একে খুঁজে পাওয়া…

তিন নম্বর ক্যামোফ্লাজে কোনো প্রাণী নিজের চেহারা বদলায় না, তবে আশেপাশের ছোটোখাটো নানা উপকরণ দিয়ে নিজেকে পরিবেশের সঙ্গে একাকার করে দেয়। একে বলে অ্যাডভেন্টিশাস ক্যামোফ্লাজ। শুঁয়োপোকা নিজের পিঠে ভাঙা ডালের টুকরো চড়ায়, কাঁকড়ারা স্পঞ্জ বা শ্যাওলা নিজের পিঠের ওপর রেখে চলতে চায়, এসবই এই কারণে।

“কিন্তু বাবা,” মেঘনা এতক্ষণ প্রায় ছটফট করছিল, “তাহলে গিরগিটি কী করে?”

“গিরগিটি, মানে ক্যামেলিয়ন, আর কিছু-কিছু ক্ষেত্রে ফ্ল্যাটফিশ, স্কুইড, আর অক্টোপাস যেটা করে”, আমি বলি, “সেটা হল ভেরিয়েবল প্রোটেক্টিভ রেসেমব্লেন্স। এতে প্রাণীটি নিজের গায়ের চামড়ার রং এমনভাবে বদলে ফেলে যে তাকে তার পরিবেশের থেকে কিছুতেই আলাদা করা যায় না।

এরা একেবারে ভেরি-ভেরি স্পেশাল একটা পর্যায়ে আছে, তাই এদের নিয়ে কথা বলার জন্য এই কফি যথেষ্ট নয়, ফলে…”

“হুঁহ” বলে আমার বউ সোফা ছেড়ে উঠে যায়, সম্ভাব্য পকোড়ার প্লেটের আশায় আমি গুছিয়ে বসি।

“আচ্ছা”, এবার অনুমিতা প্রশ্ন তোলে, “এই গিরগিটি, বা অক্টোপাস ছাড়া বাকিদের কি তাহলে চেহারাটা একই থেকে যায়?”

“ক্যামোফ্লাজ, বা নিজের চেহারাকে অন্য কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য যেমন চার রকম, সেটা হওয়ার পদ্ধতিটাকেও পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়”, আমি বলি।

সবচেয়ে আগে আছে পরিবেশের সঙ্গে নিজের চেহারাকে মোটামুটি মিশিয়ে দেওয়া। একে বলা হয় ক্রিপসিস। জীবজগতে এর উদাহরণ সবচেয়ে বেশি। যেকোনো প্রাণীর বিবর্তিত চেহারা দেখলেই তাদের মধ্যে এই ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

এরপর আছে ডিসরাপটিভ কালারিং, যাতে প্রাণীটির গায়ের রং এমন হয় যাতে তার শরীরের পুরো চেহারাটা পটভূমি থেকে আলাদা করে, স্পষ্টভাবে চোখে ধরা পড়তে চায় না। শিকারী, এবং শিকার, দু’ধরনের প্রাণীই এর ব্যবহার করে।

তারপর হল চেহারাটা এমন রাখা, যেটা দর্শকের মধ্যে কোনো রকম কৌতূহল, আগ্রহ, বা সতর্কতা জাগাবে না। মানে শিকারী যা দেখবে হয় সে আক্ষরিক অর্থে অখাদ্য, নয় যাকে আক্রমণ করলে বিপদ আছে। একে বলা হয় মিমেসিস।

এরপর আছে কাউন্টারশেডিং, যাতেও চামড়ার রঙের বেশি-কম করে পটভূমির সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে রাখা হয়।

শেষে আছে কাউন্টারইল্যুমিনেশন, যেখানে পটভূমির সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য আলো তৈরি করে প্রাণীটি। কিছু-কিছু স্কুইড এটা পারে, ও করে।

“ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল,” নাকে পকোড়ার গন্ধ ভেসে আসায় উজ্জীবিত হয়ে বলি আমি, “এই অদৃশ্য হওয়ার ঠিক উলটো কাজটা করতে, মানে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার জন্যেও প্রাণীজগতে রঙের ব্যাপক প্রয়োগ হয়”।

“যেমন?”, জানতে চায় তোষালি।

“বিজ্ঞাপন কিন্তু শুধু মানুষদের মধ্যেই নেই”, আমি বলি, “প্রাণীজগতে তার ব্যবহার হয় যথেষ্ট পরিমাণে। ব্যান্ডেড কোরাল শ্রিম্প, অর্থাৎ প্রবালের মধ্যে থাকা এক ধরনের কুচো চিংড়ি গোছের পোকা শুধু মাছ নয়, কচ্ছপদের নজরেও পড়ে।

সেই মাছ ও কচ্ছপেরা যখন প্রবালের স্তরের মধ্য দিয়ে যায়, তখন এই শ্রিম্প তাদের গায়ে জমে ওঠা প্ল্যাঙ্কটন সাফ করে দেয়। এই ‘ক্লিনিং স্টেশনের’ দিকে নিজের ‘কাস্টমার’-দের আকৃষ্ট করার জন্য শ্রিম্প রং, আর নিজের নড়াচড়ার মাধ্যমে রীতিমতো একটা প্রচার চালায়।

অন্যদিকে বিষাক্ত কোরাল স্নেক তার উজ্জ্বল রঙের সাহায্যে অন্যদের বোঝায়, তার থেকে দূরে থাকাই ভালো। ঠিক একই ভাবে সিনাবার মথ ক্যাটারপিলার, মানে শুঁয়োপোকার লার্ভার গায়ের উজ্জ্বল হলুদ আর কালো রং দেখে পাখিরা তাদের এড়িয়ে চলে। মনার্ক প্রজাপতির গায়ের রং যত উজ্জ্বল, তার শরীরে থাকা ডিজিটালিস-ধর্মী বিষ ততটাই মারাত্মক। এই উলটো বিজ্ঞাপনের ‘ভালো’ বা বৈজ্ঞানিক নাম হল অ্যাপোসেমাটিসম”।

গরম পকোড়ায় ভরা বাটিটা রাখামাত্র সবাই সেটার ওপর যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাতে বুকের ভেতরটা খালি হয়ে গেল এই আশঙ্কায় যে, আমি গিরগিটিদের কথা বলার আগেই সব শেষ হয়ে যাবে। বাড়ির অন্নপূর্ণা আমাকে আশ্বস্ত করে একটা আলাদা বাটিতে পকোড়া ভরে সামনে রাখলেন। আমি কোনো রিস্ক না নিয়ে, বাটিটাকে রীতিমতো কোলবন্দি করে কথা শুরু করলাম।

“শরীরের রং বদলানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হল পিগমেন্ট। উত্তর মেরুর শিয়াল, মানে আর্কটিক ফক্স-এর শরীরে শীতকালে কম পিগমেন্ট থাকে, যাতে সে পরিবেশের সাদা রঙের সঙ্গে মিশে থাকতে পারে। গ্রীষ্মকালে তার শরীরে পিগমেন্ট বেড়ে গিয়ে তার রং বাদামি হয়ে যায়। এই সিজনাল ক্যামোফ্লাজ, বা পলিফেনিজম, অবশ্য প্রাণীদের মধ্যে খুব বেশি দেখা যায় না, কারণ এই পিগমেন্টগুলো অধিকাংশ প্রাণীর শরীরের ভেতরে নিজে থেকে তৈরি হয় না।

কিন্তু যেসব প্রাণীর ত্বকে রয়েছে একটা বিশেষ ধরনের পিগমেন্ট-বাহক কোষ, যাদের নাম হল ক্রোমাটোফোর, তারা দস্তুরমতো নিজের রং বদলে ফেলে ক্যামোফ্লাজের জন্য। শুধু গিরগিটি নয়, মাছ, ব্যাং, স্কুইড, অক্টোপাস এমন অনেকের মধ্যেই এই বিশেষ ব্যাপারটা দেখা যায় কিন্তু।

কীভাবে তারা সেটা করে”, পায়ের ওপর পা তুলে বাবু হয়ে বসি আমি এবার, “সেটাই এবার বুঝতে হবে”।

সবথেকে সহজে যাদের এই রংবদল বোঝা যায়, তারা হল স্কুইড আর কাটলফিশ। এদের শরীরে যে নক্ষত্রাকার ক্রোমাটোফোরগুলো আছে, সেগুলোর নড়াচড়া করে এরা পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নেয়। যেমন, পটভূমি যদি হালকা রঙের, বা উজ্জ্বল হয়, এরা তখন ক্রোমাটোফোরের পিগমেন্টগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে আসে, যাতে সেই একটা জায়গা ছাড়া বাকি পুরো শরীরটা হালকা রঙের হয়ে যায়। আবার অন্ধকারে, বা গভীর জলে, এই পিগমেন্টগুলো সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, যাতে তাদের গায়ের রং হয়ে যায় গাঢ়, প্রায় কালো।

তবে হ্যাঁ, কাটলফিশ কিন্তু দুরন্ত প্রাণী! তার ত্বকের প্রতি বর্গ মিলিমিটারে ২০০ অবধি ক্রোমাটোফোর থাকতে পারে। অত্যন্ত কম সময়ে পিগমেন্টের অবস্থান বদলে কনট্রাস্টের মাধ্যমে নিজেকে অদৃশ্য করে দেওয়ার ক্ষেত্রে সে অদ্বিতীয়।

ব্যাং, এবং আরো কিছু উভচর জীবের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটা একটু জটিল। ব্যাঙের চামড়ায় তিন রকম ক্রোমাটোফোর থাকে। সবচেয়ে ওপরের স্তরে থাকে জ্যানথোফোর, যাতে থাকে কমলা, লাল, ও হলুদ পিগমেন্ট। মাঝের স্তরে থাকে ইরিডোফোর, যেখানে থাকে খুব হালকা রঙের পিগমেন্ট। আর শেষে, মানে সবচেয়ে নিচের স্তরে থাকে মেলানোফোর, যাতে থাকে মেলানিন, যে পিগমেন্টটা আমাদের শরীরেও আছে।

গিরগিটি বা ক্যামেলিয়ন সম্পর্কে এই ধারণা ছিল অনেকদিন অবধি, যে তারাও ব্যাঙের মতো এই তিন ধরনের কোষের সাহায্যে রং বদলায়। কিন্তু একেবারে সম্প্রতি জানা গেছে, গিরগিটির শরীরে আদতে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা রকমের চামড়া বা ত্বক আছে। একদম ওপরের স্তরে আছে গুয়ানিন ন্যানোক্রিস্ট্যাল দিয়ে তৈরি একটা বিন্যাস বা ল্যাটিস। স্বাভাবিক অবস্থায় এই ন্যানোক্রিস্ট্যালগুলো ঘন হয়ে থাকে, তাই আলোর যে রংগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম, যেমন বেগুনি বা নীল, সেগুলোই ত্বক থেকে প্রতিফলিত হয়। ওই স্তরে যেহেতু কিছু হলুদ পিগমেন্ট সব সময়েই থাকে, তাই নীল আর হলুদ মিশে গিরগিটির রং সবুজ ঠেকে। কিন্তু…

“কিন্তু?” প্রশ্নটা সমস্বরে ছুটে আসে।

“কিন্তু যখন গিরগিটি রেগে যায়, ভয় পায়, বা অন্য কোনো কারণে উত্তেজিত হয়, তখন এই ন্যানোক্রিস্ট্যালগুলোর মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায়। ফলে, তার ত্বক থেকে সেই রংগুলোই প্রতিফলিত হয় যেগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি, যেমন হলুদ, কমলা, বা লাল।

এর নিচেও যে স্তর আছে গিরগিটির চামড়ায়, সেটাও মোটামুটি একই রকম ভাবে কাজ করে, তবে অবলোহিত রশ্মি, বা ইনফ্রারেড রে-র ক্ষেত্রে। তাই গিরগিটির চামড়ার দ্বিতীয় স্তরটা কাজ করে থার্মোরেগুলেশনে, অর্থাৎ শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে।

এই প্রত্যেকটা জিনিস কিন্তু মানুষ মাথায় রেখেছে, যখন সে নিজেকে অদৃশ্য করার চেষ্টা করেছে”।

প্রসঙ্গটা আবার অদৃশ্য মানুষে ফিরে আসায় সবাই চনমনিয়ে ওঠে। পকোড়া আর চাইলে ফল খারাপ হতে পারে জেনে বাটিতে থাকা ক’টি কাঙালের ধন সাবধানে সামলে আমি বলে চলি।

মিলিটারি ট্যাকটিক্স, বা প্যাসিভ ইলেকট্রনিক কাউন্টারমেজার্স-এর মধ্যে অন্যতম জিনিস হল লো অবজার্ভেবল টেকনলজি, যাকে চলতি কথায় ‘স্টিলথ’ বলা হয়। একটা সময় এর লক্ষ্য ছিল স্রেফ নজরের বাইরে থাকা। কিন্তু রেডার এবং আরো নতুন-নতুন যেসব প্রযুক্তি আসছে, তাদের ‘নজর’ এড়ানোর জন্য এই ব্যবস্থায় উড়োজাহাজ ও ডুবোজাহাজ এমন করে বানানো হয়, যাতে তাদের অস্তিত্ত্বই টের না পাওয়া যায়।

একসময় ঠাণ্ডা লড়াইয়ের অঙ্গ হিসেবে গুপ্তচরবৃত্তির জন্যই এই প্রযুক্তির প্রসার ঘটেছিল বটে, তবে এর আক্রমণাত্মক ব্যবহার দেখা যায় ১৯৮৯-এ পানামায় মার্কিন ‘অপারেশন জাস্ট কজ’-এ, আর তারপর ১৯৯১-এর গালফ ওয়ারে। প্রথম ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল এফ-১১৭এ, আর দ্বিতীয়টায় লকহিড মার্টিন এফ-১১৭। এই প্লেনগুলোর রেডার সিগনেচার, মানে রেডারের চোখ যেভাবে তাদের ‘দেখে’ সেটা প্রায় অদৃশ্য হওয়ার মতোই।

পঞ্চাশের দশকে তৈরি হওয়া ব্রিটিশ বম্বার আভ্রো ভালকান ছিল প্রথম প্লেন, যা স্রেফ তার আকারের জন্যই রেডারের কাছে খুব ছোটো আকারে, অনেকটা পাখির মতো হয়ে ধরা পড়ত।

এই সময়ের প্লেনের মধ্যে এফ-২২এ র‍্যাপটর এই ব্যাপারটা করতে পারে তার সুনির্দিষ্ট আকারের জন্য, যাতে রেডারের সিগন্যাল প্লেনে ধাক্কা খেয়ে যেখান থেকে এসেছে সেদিকে না গিয়ে অন্য একটা দিকে যেতে চলে যায়, যাকে ‘গ্লিটার’ বলা হয়। বেচারা অপারেটর এ জিনিস দেখতে পেলেও যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়া অন্য কিছু ভাববেই না!

শুধু প্লেন নয়, জাহাজেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার করে প্রথমে ফরাসি লাফায়েত-ক্লাস ফ্রিগেট, এবং এখন জার্মানি, সুইডেন, আমেরিকা, মায় তাইওয়ান।

তবে বিমান বা সাবমেরিন-কে অদৃশ্য করার জন্য শুধু গঠন নয়, বড়ো ভূমিকা নেয় তাদের গায়ের রঙে মেশানো রেডার-অ্যাবসর্বিং মেটিরিয়াল। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল ‘আয়রন বল পেইন্ট’, যাতে রঙের মধ্যে মাইক্রোস্কোপিক লোহার গোলক বা বল ভরা থাকে। রেডার থেকে আসা তরঙ্গ এর ওপরে আছড়ে পড়লে এই লোহার বলগুলো সেই একই তালে কেঁপে ওঠে, ফলে রেডারের তরঙ্গে থাকা প্রায় পুরো শক্তিটাই প্লেনের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে তাপ হয়ে, রেডারে কিছুই ফিরে যায় না।

সাবমেরিন যেখানে চলাচল করে, সেই জলই তার সবচেয়ে বড়ো শত্রু, কারণ জলের মদ্য দিয়ে শব্দও খুব সহজে অনেক দূর অবধি পৌঁছে যেতে পারে। তাই সেখানে অ্যাকাউস্টিক বা শব্দের ব্যাপারে অদৃশ্য, বা নিঃশব্দ হওয়ায় জন্য রবার মাউন্টিং ব্যবহার করা হয়, যাতে জলের নিচে বিছিয়ে রাখা শব্দগ্রাহক সোনারে তার শব্দগুলো না পৌঁছয়। হেলিকপ্টারের রোটর ব্লেডে মডিউলেটেড ব্লেড স্পেসিং করে তার আওয়াজ কমানো হয় একই কারণে।

রাতে ওড়া স্টিলথ বিমান গাঢ় রঙের হওয়াই যথেষ্ট, কিন্তু দিনের বেলায় ভিসুয়াল ক্যামোফ্লাজ পাওয়ার জন্য তার রং হয় ধূসর, এবং সেই রঙের ব্যবহারও করা হয় ডিসরাপটিভ প্যাটার্নে, যাতে একটা সুনির্দিষ্ট আকার দর্শকের চোখে না ধরা পড়ে। কখনও বা সম্ভাব্য দর্শকের দিকে একটা মসৃণ আয়নার মতো তল তুলে ধরা হয়, যাতে শূন্যস্থান ছাড়া দর্শক কিছু দেখতে না পায়।

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, সেনাবাহিনী এই জিনিসগুলো প্রয়োগ করার আগেই কিন্তু কল্পবিজ্ঞান লেখকেরা এগুলো তাঁদের লেখার মাধ্যমে পাঠকদের কাছে তুলে ধরেছিলেন। ই.ই. স্মিথ এবং নিল স্টিফেনসন-এর লেখায় আমরা এমন মহাকাশযানের কথা পাই, যারা ঠিক এই ভাবেই শত্রুর নজর এড়িয়ে আক্রমণ চালায়। তবে জিন উলফ তাঁর ‘দ্য বুক অফ দ্য নিউ সান’-এ দর্শকের চোখকে বিভ্রান্ত করে দেওয়া যে ক্যাটপট্রিক আর্মার-এর কথা লিখেছেন, আজকের পৃথিবীতে প্রায় সব দেশের সেনাবাহিনী সেই জিনিসটি খুঁজে পাওয়ার জন্যই গবেষণা করছে ও করাচ্ছে।

“সেটা কী?”, সরল প্রশ্ন করে তোষালি।

“এটা অনেকদিন আগেই প্রমাণিত হয়ে গেছিল যে মাল্টিস্পেক্ট্রাম ক্যামোফ্লাজ যন্ত্রের ক্ষেত্রে সম্ভব হলেও, মানে শুধু চোখের নয়, বরং রেডার, সোনার, হিট-সেন্সর ইত্যাদি থেকে প্লেন বা ট্যাংককে লুকিয়ে রাখা গেলেও, মানুষকে সেটা করা যায় না”, আমি বলি।

তাই খোঁজ করা হচ্ছে এমন জিনিসের, যেটা কোনো মানুষ, বা আরো বাস্তব চোখে দেখলে কোনো সৈন্যকে পুরোপুরি নজরের বাইরে রেখে দেবে।

এখন বিভিন্ন বাহিনী তার সৈন্যদের, বিশেষত জঙ্গুলে পরিবেশে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করার জন্য যে পোশাকটিকে ব্যবহার করে, তাকে বলা হয় ঘিলি স্যুট, বা ইয়াওয়ি স্যুট। এতে টেঁকসই ফেব্রিক দিয়ে তৈরি করা একটা নেটের ওপর কাপড় লাগিয়ে, তাতে প্রাকৃতিক রং লাগিয়ে এবং সেটাকে মাটিতে ও কাদায় ঘষটে এমন চেহারা দেওয়া হয় যে সেটা পরলেই ক্যামোফ্লাজ হয়ে যাবে। কিন্তু, খুব স্বাভাবিক ভাবেই, এই পোশাক পরে থাকা বেশ কষ্টকর। তাছাড়া সব জায়গায় এই পোশাক কাজ করবেও না।

বাস্তবে কোনো সৈন্যকে অদৃশ্য করতে হলে তাদের পোশাকে এমন একটা ভাব নিয়ে আসতেই হয়, যাতে তারা খুব কাছে দাঁড়িয়ে থাকা শত্রুর নজরও এড়িয়ে যেতে পারে। পৃথিবীর চারটে দেশের ক্যামোফ্লাজ ইউনিফর্মের প্যাটার্ন দেখলেই এটা বোঝা যায়।

গল্প-উপন্যাসে আখছার পড়ি, কিন্তু বাস্তবে যেটা তৈরি করা প্রায় অসম্ভব সেটা হল ‘ক্লোকিং ডিভাইস’, যা আলোকে তার লক্ষ্যের চারপাশে বেঁকিয়ে, পাথরের চারদিকে চক্কর কেটে চলে যাওয়া নদীর মতো করে চলে যেতে দেবে, যাতে দর্শকের চোখে কিছুই ধরা না পড়ে।

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফর্নিয়া, বার্কলে-র দুটো টিম এই নিয়ে কাজ করেছে। দুটো দলেরই লক্ষ্য ছিল এমন একটা জিনিস, বা মেটামেটিরিয়াল তৈরি করা, যাতে আলো পড়ে প্রতিফলিত না হয়ে বরং প্রতিসৃত হয়, মানে বেঁকে যায়। তাদের এই চেষ্টা অনেকটাই সফল হয়। রুপো এবং অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের সাহায্যে এই গবেষকেরা এমন এক মেটামেটিরিয়াল বানিয়েছিলেন, যাতে ন্যানোওয়্যার, মানে দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়েও কম দূরত্বে সাজানো তারের এমন একটা জাল বিছানো হয়েছিল যার মধ্য দিয়ে আলো যেতে পারেনি, বরং বেঁকে গেছিল।

জাপানের কেইয়ো ইউনিভার্সিটির সুসুমি তাচি এই পদ্ধতিতে একটা রিফ্লেকশন ক্লোক বানিয়েছেন, যাতে দর্শক সামনে থাকা হুড ও ক্লোকের আড়ালে থাকা মানুষটিকে না দেখে বরং তার ‘মধ্য’ দিয়ে পেছনের দৃশ্যকে দেখতে পান, তবে সেটা দেখে কেমন যেন, ভূতুড়ে লাগে!

এই মুহূর্তে ন্যানোটেকনলজির দিকেই সবাই তাকিয়ে আছে প্রচুর আশা নিয়ে, তবে একটা পোশাক পরে নিয়ে, হাতে রিস্টওয়াচের মতো একটা লাল-নীল আলোজ্বলা ঘড়ি পরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার দিন আসতে এখনও অনেএএএএএএক দেরি আছে!

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সবাই আঁতকে উঠলেও, এবং জয়াকে চটপট ছুটি দেওয়ার জন্য ভাত নিয়ে বসতেই হল। চা-কফি-পকোড়া ইত্যাদি খেয়ে আমার হাল খারাপ হয়ে গেছিল। কোনো ভাবে ভাতের বেশিরভাগ অংশ, আর তরকারির বাটিটা বাড়ির প্রধান, মতান্তরে একমাত্র অভিভাবকের নজরের আড়ালে নিয়ে যাওয়ার উপায় যখন খুঁজছি, তখন মধুরিমা-ই প্রশ্নটা তুলল, “আমি অনেক লোককে দেখেছি, যারা এমনিতে যথেষ্ট সুস্থ-স্বাভাবিক হলেও অনেক সময় অনেক কিছু, বা অনেককে দেখতে পায় না। এটা কেন হয়?”

তরকারির বাটিটা ততক্ষণে সরাতে সক্ষম হয়েছিলাম। শনিচক্রের অধিকাংশ সদস্যই আমার প্রতি সহানুভূতিশীল, তাই তারা একটা খালি থালা আমার দিকে সন্তর্পনে এগিয়েও দিয়েছিল, যাতে আমি রান্নাঘরে মাছ গরম হওয়ার ফাঁকে ভাত যথাসম্ভব সেই থালায় পাচার করে দিতে পারি। তার মাঝেই আমি প্রশ্নটার উত্তর দিলাম, “কোনো মানুষের চোখে, বা স্নায়ুতে কোনো সমস্যা থাকতেই পারে। উইশফুল ফরগেটিং, মানে কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে জড়িত স্মৃতি খুব বেদনাদায়ক হলে আমরা যেমন সেটা বেমালুম ভুলে যাই, তেমন করেই কেউ-কেউ হয়তো সামনে থাকা সেই মানুষটিকে দেখতে পান না।

নিউরোলজির এই বিশেষ দিকটা তুলে ধরেছিলেন পিটার ওয়াটস তাঁর ‘ব্লাইন্ডসাইট’ উপন্যাসে। তাতে এমন একদল এলিয়েনের কথা বলা হয়েছিল, যারা অসম্ভব রকম দ্রুত বেগে গণনা করতে পারে, এবং সামনে থাকা মানুষটির স্নায়ুতন্ত্রে সেই মুহূর্তে কী ঘটছে সেটাও তারা বুঝতে পারে। তাই, তারা সেই বিশেষ-বিশেষ মুহূর্তে, বা সেকেন্ডের ভগ্নাংশে, স্থির থাকে যখন স্নায়ুর মাধ্যমে মাথায় আপলোড হওয়া ছবিটা আমাদের সামনে আসে। অথচ যে মুহূর্তগুলোয় আমাদের চোখ দেখছে, কিন্তু মস্তিষ্কে তার কোনো ছবি উঠছে না, সেই অন্ধ অনুভবের সময়গুলোতেই তারা শুধু চলাফেরা করে। আমাদের দৃষ্টি যেহেতু একটা নিরবিচ্ছিন্ন জিনিস নয়, তাই তারা মানুষদের এই ব্লাইন্ডস্পট কাজে লাগাতে পেরেছিল”।

“কিন্তু তুমি পারনি!”, বলে নিঃশব্দে সরানো থালাটাকে আবার আমার সামনে ঠেলে দিয়ে বলেন শ্রীমতী। “আমি আগেই বলেছি, তুমি মিস্টার ইন্ডিয়া নও”, আমার বুক-ভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাসকে স্রেফ উড়িয়ে দিয়ে এবার তরকারির বাটিটাকেও আমার সামনে রেখে দিয়ে বলেন তিনি, “এলিয়েনও নও”।

 বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s