বৈজ্ঞানিকের দপ্তর নীডহ্যাম প্রশ্ন ও ভারতীয় বিজ্ঞানের উল্টোপুরাণ-দেবজ্যোতি গঙ্গোপাধ্যায়- শরৎ২০২০

নীডহ্যাম প্রশ্ন ও ভারতীয় বিজ্ঞানের উল্টো পুরাণ

দেবজ্যোতি গঙ্গোপাধ্যায়

১। পরশুরাম পুরাণ

প্রাতঃস্মরণীয় পরশুরামের উল্টোপুরাণ  নামে এক বিখ্যাত গল্প আছে। সে গল্পের বিষয় হল, সত্যি ইতিহাসে যা ঘটেছে, তা না হয়ে যদি ঠিক তার উল্টোটা হত, যেমন অষ্টাদশ শতকে ইংরেজরা এদেশ দখল করেনি, উল্টে ইংল্যান্ড দখল করেছে ভারত! তারপর সেখানে যা হচ্ছে সেটাই পরশুরাম আমাদের বলছেন –

সেখানে রিচমন্ড বঙ্গ-ইঙ্গীয় পাঠশালায় পন্ডিত মিস্টার ক্র্যাম টম, ডিক, হ্যারিদের ইতিহাস পড়ান। 

বালক ডিক পড়ছে, “ইউরোপের দুঃখের দিন অবসান হইয়াছে। জাতিতে জাতিতে দ্বেষ, হিংসা বিবাদ দূর হইয়াছে। প্রবল পরাক্রান্ত ভারত-সরকারের দোর্দণ্ডশাসনের সুশীতল ছায়ায়…..” 

ডিক বেচারা আবার এখানে ‘দোর্দণ্ড’ মানে বুঝতে না পেরে পন্ডিতমশায়কে জিজ্ঞাসা করে বসে এ গপ্পে ব্রিটিশ অভিজাত গবসন টোডির অন্দরমহলে বাঙালি শিক্ষয়িত্রী জোছনা-দি উর্দু গজল গাওয়ার আর পান দোক্তা খাওয়ার অভ্যাস তৈরির তালিম দেন। জোছনা-দির কাছে বাঙলা শিখতে গিয়ে মেমসাহেবদের দাঁত ভেঙে যাওয়ার যোগাড় হয়। 

আরো অনেক রোমহর্ষক উল্টো কান্ড পরশুরাম আমাদের শোনান। কিন্তু পরশুরামের এই উল্টো পুরাণকথার বিশদে যাওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। ব্যাপারটা অনেকটা সেই মাসির গোঁফ গজালে মেসোর কী হত গোছের, যাকে পন্ডিতরা কাউন্টারফ্যাকচুয়াল (counterfactual) বলে থাকেন। এমন কাউন্টারফ্যাকচুয়াল সম্ভাবনার নানা গোলমেলে দিক নিয়ে পন্ডিতরা বেজায় তর্ক-বিতর্কও করে থাকেন। 

কিন্তু পন্ডিতরা তর্ক করতে থাকুন, ততক্ষণে আমরা বরং পরশুরামের দেখানো পথেই আরও কিছুদূর হেঁটে দেখি। মানে পরশুরামের গল্প বা গুল্পটাকে সামান্য এদিক ওদিক করে নিই। 

ধরা যাক যে, ইংরেজরা এদেশে কখনো আসেইনি, বা যদি এসেও থাকে, তো তারা পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের হাতে হেরে ভুত হয়েছে! ক্লাইভকে নবাব শাস্তি হিসেবে, বেশি কিছু নয়, সব কেড়ে নিয়ে এদেশী ধুতি, বেনিয়ান পরিয়ে মুর্শিদাবাদের বাজারে আফিম, সুরমা বেচতে বসিয়ে দিয়েছেন। আর ওয়াটসনের শাস্তি হয়েছে এক বছর ধরে নবাবের বেনিয়ান কাচার। 

দৃশ্যগুলো ভাবতে থাকি… কিন্তু প্রশ্নটাকে আরেকটা অন্য, কিন্তু একই জাতীয় প্রশ্নের সাথে জুড়ে দিই!

২: নীডহ্যামের কাউন্টারফ্যাকচুয়াল:

প্রশ্নটা প্রথম তুলেছিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞান ঐতিহাসিক জোসেফ নীডহ্যাম আজ প্রায় ৭০ বছর আগে। চীনদেশের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই নীডহ্যামের একটা প্রশ্ন জাগে যে, চীন ও ভারতের এতরকম বিপুল বিচিত্র তাত্ত্বিক ভাবনার প্রায় ৩০০০ বছরের পুরোনো খানদানি সম্ভার থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞান বলে যেটা আজ আমরা বুঝি সেটা এখানে না হয়ে পশ্চিম ইউরোপে সপ্তদশ শতকে হলো কেন! এদেশের প্রাচীন শহর পাটলিপুত্র বা চীনে বেজিং-এ বিজ্ঞান বীজ অঙ্কুরিত না হয়ে কেন ইতালি, ইংল্যান্ডের মত সেদিনের ভু্ঁইফোড় জায়গায় হল! 

প্রশ্নটা দেখতে নিরীহ সাদামাটা হলে কি হয়, গত ৭০ বছরে যে এর খুব একটা জুৎসই উত্তর দেওয়া গেছে তা মোটেও না। কিন্তু এখানে আমরা ঠিক নীডহ্যাম প্রশ্নও নয়, বরং তারও একটা কাউন্টারফ্যাকচুয়াল ফ্যাকড়া নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করব, যেটা কোনো না কোনো ভাবে আর একটা বড় প্রশ্নের খুঁটোয় বাঁধা। 

এই বড় প্রশ্নটা হল বাঙলা বা এদেশীয় কোনো ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার। আজ থেকে কিছু না হোক ২০ -২৫ বছর আগেও প্রশ্নটা মাঝে মাঝেই এদিক ওদিক থেকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠত । অবশ্য প্রশ্নটার মুখড়া শুরু সেই উনিশ শতকের মাঝামাঝির বাঙলায় যখন থেকে হাজার বছর ধরে কাব্য, ব্যাকরণ, স্মৃতি আর ন্যায়শাস্ত্র পড়ে অতি ‘সূক্ষ্মবুদ্ধি’ আমরা খানিকটা দায়ে পড়েই নিমরাজি হয়ে এদেশে আসা নতুন বিজ্ঞানে হাত পাকাতে শুরু করলাম। অবশ্য ‘শুরু করলাম ‘ না বলে ‘করতে বাধ্য হলাম’ বললেই বোধহয় ঠিক হয়।

উইলিয়াম কেরি, ওয়ার্ড, মার্শম্যানদের মতো শ্রীরামপুরে এসে রাজপাট বিছানো ব্যাপটিস্ট মিশনারিরা এদেশে প্রথম নিউটন, গ্যালিলিওকে নিয়ে এসেছিলেন। মানে ওঁদের লেখা বই ও ভাবনা।

এছাড়াও যেটা এনেছিলেন সেটা হল আস্ত একটা ছাপার মেশিন (Printing Machine)  শ্রীরামপুরের ঘাটে সেই মূদ্রণযন্ত্র এসে পৌঁছলে, শোনা যায়, কেরি সাহেব এত নাচানাচি করেছিলেন, যে স্থানীয় নেটিভরা যন্ত্রটাকে সাহেবদের ঠাকুর ঠাউরে বসেছিল।

এসব ঘটনা উনিশ শতকের একেবারে গোড়ার দিকের। ব্যাপটিস্ট মিশনারিদের কাজে অবশ্য অনেকেই খ্রিস্টানী ধর্মান্তকরনের দুরভিসন্ধির কটূগন্ধ পায়। সেসবের মধ্যে আমরা এখন গিয়ে পড়ছি না। কিন্তু অভিসন্ধি যাই থাক, ব্যাপটিস্ট মিশনারীদের হাত ধরেই পুব ভারতে পুঁথিযুগের অবসান হচ্ছিল, তা সে কেউ চাক বা না চাক। ততদিনে অবশ্য পর্তুগিজরা গোয়ার প্রেস বসিয়ে ফেলেছে সে প্রায় বছর পঞ্চাশেক হবে।

যাহোক সব মিলিয়ে মোদ্দা কথাটা হল যে, টোল, চতুষ্পাঠীর, ব্যাকরণ কাব্য, অলঙ্কার, ন্যায়, আর দেশী গুরুমশায়ের পাঠশালার শুভঙ্করী আর্যা, দু’ছত্তর লীলাবতী আর খনার বচনের বাইরে তৈরি হতে থাকা নতুন পাঠক্রমে পশ্চিমের বিজ্ঞান এসে মিশছিল নিঃশব্দে। বহুদিনের পুরানো ন্যায়শাস্ত্রের একদা স্রোতস্বিনী ধারা ততদিনে হেজেমজে প্রায় মরা খাল।

৩: উনিশ শতকীয় ডামাডোল

এরপর প্রায় আধা শতকের মত ব্যবধান… 

উনিশ শতকের মাঝামাঝি পেরিয়ে গেছে। অনেক টালবাহানার পর কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ চালু হয়েছে(১৮২৪)। দেশী শিক্ষাচিত্রে বহু টালমাটাল শুরু হয়েছে। সেসবের মধ্যে আমরা এখন আর যাচ্ছি না। 

কিন্তু তখন রাজেন্দ্রলাল মিত্র , ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র, অক্ষয়কুমার দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীদের মত এদেশীয় অনেকের কাছেই সঙ্গত কারণেই মনে হচ্ছিল যে, সাগরপারের এই বিজ্ঞানটা ইংরেজিতে নয়, বরং সম্ভব হলে বাংলাতেই শেখা ও লেখা উচিত। কিন্তু মনে হলেও, ব্যাপার অত সহজ নয়।  একমাত্র উপায় হচ্ছে, খটোমটো বিজ্ঞান পরিভাষাগুলো বাংলায় অনুবাদ। এখন এটা না বললেই নয় যে, এ উদ্যোগ অতি সাধু হওয়া সত্বেও বাংলা পরিভাষা তৈরির এই চেষ্টা একটা দীর্ঘ সময় ধরে বাংলা তথা ভারতীয় শিক্ষাক্ষেত্রে নানা জাতের উদ্ভট হাস্যরসের যোগান দিয়েছে, যদ্দিন না গুগল, ইন্টারনেটের বেণোজলের জোয়ারে প্রশ্নটা পাকাপাকিভাবে ভেসে যায়। 

ভাষান্তরের মানদণ্ড হিসেবে কী নেওয়া যায়, সে-প্রশ্ন সেকালে খুব স্বাভাবিকভাবেই তুলেছিলেন অনেকে। কিন্তু, এ-বিষয়ে কেউ কারো সঙ্গে একমত হননি। প্রত্যেকেই সেকালের হোমড়াচোমড়া মানুষ, এবং কে না জানে যে, হোমড়াচোমড়ারা চট করে কেউ কারো সঙ্গে একমত হন না।

কিন্তু সত্যি বলতে কি বাঙলা গদ্যভাষাও সেই উনিশ শতকের শেষভাগে নেহাতই নাবালক মাত্র। উইলিয়াম কেরী, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর, টেকচাঁদ ঠাকুরদের ধাত্রীস্নেহে বাঙলা গদ্যভাষা তখন সবে টলোমলো পায়ে হাঁটা শুরু করেছে। সে ভাষার সদ্যোজাত ভাবমন্ডল ঘেঁটে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো সাগরপারের বিজ্ঞানের গ্রিক বা ল্যাটিন উৎসের পরিভাষার অনুবাদ বা এমনকি কাছাকাছি শব্দ তৈরি করারও তেমন ভরসা পাওয়া মুশকিল। ফলে এই মাতৃভাষা-উৎসাহীদের কেউ কেউ বাঙলা ভাষার ছোট কোঁচড় ছেড়ে ভরসা রাখতে চাইছিলেন সেই আদি ও অকৃত্রিম সংস্কৃতের ওপর। কিন্তু তার ফলে ব্যাপার এমন বকচ্ছপ গোছের হয়ে উঠতে লাগল যে সে আশায় তাল ঠুকেছিল যারা, তাঁদেরও সবার একগাল মাছি! 

অবশ্য এসব ক্ষেত্রে যা যা হয়ে থাকে – ভাষাবিদ পন্ডিতদের সমিতি বা কমিটি তৈরি থেকে নিয়ে মিটিং ইত্যাদি… কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে কিছুই দাঁড়ায়নি, সেটা হাতেগরম প্রমাণ বাঙলায় লেখা সে-সময়ের বিজ্ঞান প্রবন্ধগুলো।

ভূদেব মুখুজ্জে মশাই তার পাঞ্চভৌতিক প্রবন্ধে অক্সিজেনের ভাষান্তর হিসেবে ব্যবহার করেছেন অম্লকর বায়ু, হাইড্রোজেনের মৃদঙ্গার বা জলকর বায়ু। কার্বন ডাই অক্সাইড হয়েছিল অঙ্গারাম্ল বায়ু

আরও সব রকমারি নতুন বৈজ্ঞানিক প্রতিশব্দ সংস্কৃতের পুরোনো কুলুঙ্গি হাতড়ে বানানোর কম চেষ্টা হয়নি একসময়। 

রামেন্দ্রসুন্দর কথায় ছোট করে আসতেই হয়। তাঁর সংস্কৃতগন্ধী ভাষা ব্যবহার বিষয়ে তাঁর সমসাময়িক যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি সরব হয়েছিলেন। যোগেশচন্দ্র লিখছেন,

“তিনি ক্লোরিনের নাম ‘হরিণ’ রাখিয়াছিলেন; অক্সিজেনের নাম “দহন বায়ু“, অক্সাইড ‘দগ্ধ।’ অতএব chlorous anhydride-এর অর্থ ‘দগ্ধ হরিণ‘।”

অবশ্য এই বিচিত্র পরিভাষা উদ্ভাবনের কারণ যতটা না বিজ্ঞান, সেকালে তার চেয়ে ঢের বেশি ছিল জাতীয়তাবাদী প্রেরণা। সেকথা ও যোগেশচন্দ্রের সোজাসপাট বিশ্লেষণে ধরা পড়েছে। 

বিদ্যানিধি লিখছেন, “এই মনোবৃত্তির কারণ বুঝিতে পারা যায়। আমরা পর-পদানত, আমাদের মানসম্ভ্রম কিছুই নাই; কিন্তু আছে আমাদের ভাষা, আমাদের সাহিত্য। আমরা যেমন তেমন জাতি নহি। ইংরেজি নামের বঙ্গানুবাদ করিয়া এই আত্মতৃপ্তি লাভ হইত।”

কিন্তু শেষটায় এই পরিভাষা তৈরির এই অসম্ভবের রণে সবাইকেই ভঙ্গ দিতে হয়েছিল। 

স্বয়ং রামেন্দ্রসুন্দরের লেখায় ক্লান্ত অকপট স্বীকারোক্তি, “বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পরিভাষা সমিতিতে কয়েক বছর পরিশ্রম করিয়া বুঝিয়াছি যে, কাগজ কলম হাতে লইয়া কোনো একটা বিজ্ঞান-বিদ্যার পরিভাষা গড়িয়া তোলা বৃথা পরিশ্রম।”

এটা বোঝার খুব কিছু বাকি ছিল না যে, বিজ্ঞানটা তৈরি হলো ওদেশের এক অন্য সমাজে অন্য ভাবকাঠামোর মধ্যে, আর তার পরিভাষাগুলোর অর্থগত সমতুল্য (semantic equivalent) এদেশের অন্যতম প্রাচীন বা অর্বাচীন ভাষা ঘেঁটে তৈরি করা যাবে – এ ভাবনার গোড়ায় গলদ । কিন্তু সেটা বোঝা যেতে মাঝখান থেকে একটু সময় লেগে গেল! 

অবশ্য দু একটা প্রতিশব্দ যে দাঁড়িয়ে যায়নি তা বলা যায় না। যেমন ultraviolet এর প্রতিশব্দ অতিবেগুনী, infra red-এর অবলোহিত । শুনতে লাগেও বেশ। 

এরকম যদি পদার্থবিজ্ঞানের কথাই ধরি, শ্রুতি মধুর থেকে শ্রুতিকটু হয়ে এমনকি রোমহর্ষক প্রতিশব্দও এদেশী ভাষায় বিজ্ঞানের ভাঁড়ারে মজুদ। রোমহর্ষক হিসাবে পেশ করতে পারি Latent Heat এর হিন্দি হিসাবে যেটা চালু আছে – গুপ্ত্ উষ্মা  Energy র হিন্দি প্রতি শব্দ আবার পুরোনো সংস্কৃতর হাত ধরেছে – ঊর্জা । এছাড়াও Gravitation এর প্রতিশব্দ গুরুত্ব , বা Force বল , Velocity বেগ , Acceleration ত্বরণ, Momentum ভরবেগ

এসব নিরীহ প্রতিশব্দগুলো কমবেশি চালু তো বটেই। কিন্তু মহা গোলমাল বাধে কিছু আরও জটিল বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নিয়ে। যেমন ধরা যাক Entropy! এই বিষয়ের অর্থের প্রকৃত অনুকূল দেশী শব্দ তৈরি করা অভিধান চষে ফেললেও অসম্ভব, কারণ অর্থের অবকাশ বা অবকাঠামোটা মূলত গাণিতিক। হালকাভাবে ‘বিশৃঙ্খলা‘ প্রতিশব্দ দিয়ে কাজ চালাতে চাইলেও ব্যাপারটার আগা ডগা কিছুই বোঝা যায় না যদি না তার পেছনের রাশিগণিতটা(statistical reasoning) বোঝা যায়। উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই। 

আরও এগিয়ে ২০ শতকের বিজ্ঞানের বাংলা অনুবাদের কথা পাড়লে তো একেবারেই অথৈ জল! 

মোট কথা “মাতৃভাষায় বিজ্ঞানই মাতৃদুগ্ধ ” যদিও একটা দীর্ঘ সময় মোক্ষম শ্লোগান বলে ভাবা হচ্ছিল, নানাবিধ অর্থ অনর্থের ভাঙাঘাটে ঠোকর খেয়ে এর বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে নানা সন্দেহ উঠে গিয়েছিল। এছাড়াও এটা লিখতে বসে মনে অন্য বেয়াড়া কৌতুকও উঁকিঝুঁকি দিলো – যদি বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ এদেশী ভাষান্তরই উদ্দেশ্য হয়, তবে সমীকরণগুলোই বা বাদ যাবে কি যুক্তিতে ?

অর্থাৎ কিনা, ধরা যাক সরলসাদাসিধে F=ma না লিখে দেবনাগরী লিপিতে फ = म× अ  বা বলের ব, ভরের ভ আর ত্বরণের ত নিয়ে ব=ভ×ত ….

আরও জটিল সমীকরণের দিকে আর হাত বাড়ালাম না। তবে মন্দ হবে না, যদি আজও কোনো বেজায় ভাষাদুঃসাহসী মানুষ কেবলমাত্র পদার্থবিজ্ঞানের যত সমীকরণ আজ অবধি রয়েছে – সেই সনাতনী নিউটনীয় বলবিদ্যা থেকে আধুনিক String theory অবধি, সব সমীকরণের লিপ্যন্তর, মানে দেশী লিপিতে বদল করে ফেলেন। ভাবতেই বেশ গা ঝিম ঝিম করে। 

তবে একমাত্র বিজ্ঞানে ব্যবহৃত বিভিন্ন এককগুলো – নিউটন, জুল, ভোল্ট, কুলম্ব, অ্যাম্পিয়ার, ফ্যারাডে, ওহম…, এরা নিশ্চিতভাবেই এই ভাষা সন্ত্রাস থেকে বেঁচে যেত! কারণ আর যাই হোক পরিভাষার ভাষান্তর হলেও, এককের ভাষান্তর হতে পারে না। নিউটন, কুলম্ব বা ফ্যারাড এমনকি জুলু, সোয়াহিলি ভাষাতেও দারুব্রহ্মের মতো নিত্য অপরিবর্তনীয় থাকবে। 

কিন্তু এ তো গেলো একটা দিকের কথা। এছাড়াও দিশি শাস্ত্রজ্ঞরা সেসময় বিজ্ঞান আসার পর অনেক শব্দেরই নতুন অর্থব্যাপ্তি নিয়েও বেশ বিপদে পড়ে গিয়েছিলেন। যেমন ভূতের কথাই ধরা যাক! কারণ বেশ গুরুতর… 

সেই কপিল, কণাদের সময় থেকেই এদেশে জানা পড়া ছিল যে, ভূত বলতে পাঁচটি মোটে – পৃথিবী, জল, বায়ু, আগুন ও (সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী) আকাশ। আজকের ভাষায় এই পাঁচ ভূতকেই মৌলিক বলে ভাবা হত, যাদের আর বিশ্লেষণ করা সম্ভব বলে মানা হত না। ভূতের অর্থ এখানে দ্রব্য বা ম্যাটার

যা কিছু আছে তা এই পঞ্চভূতের সমষ্টি। এ শব্দবন্ধের অবকাশ অবশ্য শাস্ত্রের ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে লোক ব্যবহারের দূর দূর আঙিনাতেও বিস্তৃত। “পাঁচ ভূতে লুটেপুটে খাওয়া”-র কথা হামেশাই বলা হয়। অবশ্য ভূতের অর্থ এখানে দুর্বৃত্ত বা বজ্জাত, কিন্তু ভূতের অনুষঙ্গে পাঁচ সংখ্যার উল্লেখটা খেয়াল রাখার মতো। 

 বিজ্ঞান আসার পর এই পাঁচ ভূতের একচ্ছত্র মৌলিকত্ব ঘোরতর সন্দেহের কাঠগড়ায় উঠল। এছাড়াও আকাশের নির্বিকল্প ভূতত্ত্বও আর সন্দেহের উর্ধ্বে থাকল না। অবশ্য আকাশকে বাকি চার ভূতের সাথে এক ব্রাকেটে রাখাটা ঠিক না বেঠিক, এনিয়ে অনেক দিন থেকেই অনেক কথা উঠেছে। কিন্তু সাগরপারের বিজ্ঞান এসে আকাশকে আর তার আগের মহিমায় থাকতে দিল না। এই ভূত প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের অসাধারণ আলোচনা আছে ‘বিজ্ঞান রহস্য ‘ প্রবন্ধমালায় ‘জৈবনিক’ শিরোনামে। বঙ্কিম সেখানে প্রশ্ন তুলেছেন, “তোমরা আবার কীসের ভুত?”

মোটকথা এদেশীয় ঔপনিবেশিক বাজার বিজ্ঞান ও তার এদেশী ভাষান্তর নিয়ে সরগরম হয়ে ছিল অনেকদিন ধরে – আগে থাকতে জানা এদেশী শাস্ত্র আর বিজ্ঞানের তালমিল আর এদেশী ভাষার খাঁচায় ওদের বিজ্ঞানকে ধরার সম্ভাবনা নিয়ে।

স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এই ভাষান্তরে উৎসাহ নিয়ে ছিলেন, যার ফল বিশ্বপরিচয়। কিন্তু বিশ্বপরিচয় আসলে কে লিখেছেন সে নিয়ে অনেক তীর্যক কথা আছে। আশীষ লাহিড়ী মশায় এ-নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন – কেমন করে তরুণ পদার্থবিজ্ঞানী, কবির স্নেহভাজন সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ছাত্র প্রমথনাথ কবির আমন্ত্রণ স্বীকার করে শান্তিনিকেতনে এসে বিশ্বপরিচয়ের মূল খসড়া বানালেন ও তারপর কবি সেই খসড়ায় হাত বুলিয়ে কিভাবে নাকি তার আমূল পরিবর্তন করলেন ।

যাহোক, কথাটা হোলো এই যে, কবি, বিজ্ঞানী, দেশীয় পন্ডিত, সবরকমের হেভিওয়েট মানুষজন একসঙ্গে মাথা দিলেও শেষমেশ বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার ব্যাপারটা খুব একটা জমেনি।

৪: গুগল পুরাণ, ও কী হলে কী হত বা না হত

 শেষমেষ ‘দৌর্দন্ড’প্রতাপ গুগলবাবার মহিমায় বাংলা বা সংস্কৃত ভাষায় বিজ্ঞানের পরিভাষা তৈরির সেই শুরুর দিকের কোমর বেঁধে লড়ে যাবার চেষ্টায় এখন অনেকদিন যুদ্ধবিরতি। দু’একটা নিয়মমাফিক কমিটি হয়ত খাতায় কলমে আজও আছে, কিন্তু এই সারসত্যটা সম্ভবত ভাষার ব্যাপারে কোনো কাঠগোঁয়ারও আজ আর অস্বীকার করবে না যে, বাংলা, ইংরাজি, উর্দু, জাপানী, সংস্কৃত, পালি বড় কথা নয়, বিজ্ঞানের একটাই ভাষা, যেটা হল গণিত। এ-ভাষা ঠিকঠাক না বুঝলে সব মাটি।

তাই আজ ২০২০ তে এসব চেষ্টাগুলোকে ফিরে দেখলে স্বীকার করতে বোধহয় বাধা নেই যে, আপাতদৃষ্টিতে সঙ্গত বলে মনে হলেও, প্রশ্নটায় পরশুরামী উপাদান ভরপুর ছিল, কারণ এ-ও একরকম উল্টো পুরাণ লেখার চেষ্টা যা কার্যত অসম্ভব।

 ব্যাপারটা খানিকটা এরকম যে, ইতিহাসের এই উল্টোপুরাণে মাধ্যাকর্ষণ বল, তড়িৎ চুম্বকীয় ব্যাপারস্যাপার, আলোকবিজ্ঞান.… মায় আরও সব যাকে আমরা সব মিলিয়ে (পশ্চিমের) বিজ্ঞান বলে শিখি, সওওব এদেশে আবিষ্কার হয়েছে।

অবশ্য গত প্রায় ১৫০ বছরে, যবে থেকে ওদেশি বিজ্ঞানের কথায় এদেশীয় আমাদের পাত পাড়ার আয়োজন হয়েছে, মাঝে মধ্যেই ফিসফাস কানাঘুষা এমনকি কখনো রীতিমতো হুঙ্কার শোনা যায় যে বেদে এই অর্বাচীন বিজ্ঞানের সবটাই ছিল তবে কিনা যেহেতু একেবারে দুর্বোধ্য দেবভাষায় লেখা ছিল কিনা, তাই আমরা বেশির ভাগ ঘরের মানুষ হয়েও ঠিক ঠাওর করতে পারিনি, যদ্দিন না সাগরপার থেকে সেই ‘একই জিনিস’ সাহেবদের হাত ঘুরে অন্য চেহারায় এসে হাজির হল। 

কিন্তু যাক, সে কথার সত্যিমিথ্যের জল এখুনি না মেপে, পরশুরামের ধরনে এই উল্টো পুরাণের ক’এক পাতা ভাবার চেষ্টা করলে মন্দ হয় না – 

ধরা যাক, নিউটন নয়, মাধ্যাকর্ষণ বল আবিষ্কার করেছেন বরাহমিহির বা আর্যভট্ট বা মিথিলার কোনো পণ্ডিত। বিদ্যুৎ বা চুম্বকীয় তত্ত্বতালাশ যেসব আমরা বিজ্ঞানের ইতিহাসে পড়ি সেগুলোর কোনোটাই ধরা যাক স্রেফ হয়নি। ধরা যাক কোনো বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ঝোড়ো দিনে বাদলমেঘের থেকে বিদ্যুৎ টেনে আনার পাগলপারা চেষ্টায় ঘুড়ি ওড়ায়নি। বরং সে চেষ্টা করেছিল কোনো এদেশীয় পন্ডিত! ধরা যাক তাঁর নাম শিতিকন্ঠ বাচস্পতি বা শঙ্কর মিশ্র যাহোক একটা কিছু! দু-তিন শতাব্দি আগের বাঙলা বা মিথিলার কোনো দূর দেহাতে কোনো বাচস্পতি বা মিশ্র মশাই ঘোড়ায় চড়ে বাজ ধরতে বেরিয়েছেন, এমনটা ভাবলেই রোমহর্ষ হয়।

কোনো গ্যালভানি মৃত ব্যাঙের পায়ে বৈদ্যুতিক তার বেঁধে বিদ্যুতের ছোঁয়ায় তাতে গতির সঞ্চার করেনি। ভোল্টা, কুলম্ব, অ্যাম্পিয়ার, ফ্যারাডের পরীক্ষাগুলো স্রেফ হয়নি। বজ্রবিদ্যুত এদেশের আকাশেও দেখা দিয়ে এসেছে সেই কবে কোন কাল থেকে। এদেশে বজ্রের অধিকার দেওয়া ছিল ইন্দ্রকে, গ্রিক পুরাণে যেমন জিউসকে। 

কিন্তু জিউস হোক বা ইন্দ্র, যদি ভাবি যে বজ্রবিদ্যুতে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞানটা এদেশে আবিষ্কার হয়েছে, তবে সে বিজ্ঞানটা সত্যি কেমন হতো? 

কিন্তু কেবলমাত্র তখনই একক নিয়ে যেটা একটু আগে বলেছি তার অন্যথা হতো। 

যেসব একক আজ আমরা আবিষ্কারক বিদেশী বিজ্ঞানীদের নামে শিখে পড়ে এসেছি, সেসবের জায়গায় এদেশী বিজ্ঞানীদের পদবী ব্যবহার করা হতো। বলের একক ডাইন বা নিউটন না হয়ে হতো এদেশী আবিষ্কারকের পদবী অনুসারে – ফলে ধরা যাক , যদি মৈথিল পন্ডিতরা এ আবিষ্কার করতেন তো বলের একক অবধারিতভাবে ঝা, মিশ্র, উপাধ্যায় কিছু একটা হতো…এই ভয়ানক counterfactual আজ শুনলে কানে ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে উঠতে পারে ! কিন্তু এদেশে বিজ্ঞান হলে এ তো স্বাভাবিক ছিল।

 “১০ উপাধ্যায় বল প্রয়োগ করে ২০ লি প্রতি নিমেষ প্রাথমিক গতিতে ছোঁড়া এক নাতিবৃহদাকার গোলা…”

এ ভাষায় অনেক চেনা কথাও অচেনা ঠেকবে! 

এখানে বলে দিই যে, লি ছিল সেকালে চীনদেশে দূরত্ব মাপার এক প্রচলিত একক। হিউয়েন সাঙের লেখায় (৬ষ্ঠ শতক) দেখা যায় ” …. হিডড থেকে ক্রমশ আরো দক্ষিণ-পূবদিকে এগিয়ে চললাম। শুধু পাহাড় আর উপত্যকার চড়াই আর উৎরাই। ৫০০ লি’র মতো পথ পেরিয়ে আসার পর দেখা পেলাম গান্ধার রাজ্যের। ” 

অবশ্য দূরত্ব পরিমাপে সেকালে যোজনের উল্লেখও দেখা যায় । ৪০ লি’তে এক যোজনের হিসাব দেখা যায়। আবার অন্য নথিতে অন্য হিসাবও মেলে। আবার ক্রোশ কথাটাও পাওয়া যায় । এক যোজন আট ক্রোশ! তবে এসব মাপজোকের এককের কোনো নির্দিষ্ট হিসাব সেকালে ছিল না বলেই মনে হয়, কারণ মাপকাঠিগুলো আজ বিচিত্র লাগবে, যেমন গরুর ডাক যদ্দুর অবধি শোনা যায় সেই দূরত্বকে ক্রোশ ধরা হত, এমন কথাও আকছার। যদিও বলা নেই কেমন গরু – মূলতানী না ভাগলপুরী। আবার রাজরাজড়ার কালে সৈন্য বাহিনীর একদিনের পথকে যোজন বলে উল্লেখ করতে দেখা যায়। কিন্তু বলা নেই কেমন পথ। 

ওদিকে আবার নিমেষ কথাটার আজও চলন আছে। নিমেষ সময়ের বেশ ছোট একক। নিমেষ, পল, ক্ষণ এসব স্বল্পসময়ের দেশি একক। 

কিন্তু বৃহৎসময়কাল নিয়ে হিসাবেনিকেশে আজকের পাঠকের মাথা ঘুরিয়ে দেবার সবরকম মালমশলা এদেশী পুরাণ, জ্যোতির্বিজ্ঞানের পুঁথিতে মজুদ। প্রথমত বৃহৎ সময়ের হিসাবে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর উপস্থিত! ব্রহ্মার এক দিবারাত্র মানুষের হিসাবে ৮৬৪০০০০০০০ বছর , মানে প্রায় ১ বিলিয়ন বছর , যেখানে ব্রহ্মান্ডের বয়স আধুনিক বিজ্ঞানের হিসাবমত ১৪ বিলিয়ন বছর!! কিন্তু এখানেই শেষ নয়… ব্রহ্মার বয়সেরও হিসাব আছে, যেটা হল গিয়ে মানুষের হিসাবে ৩১১০৪০০০০০০০০০০ বছর। 

কারো কান মাথা ভোঁ ভোঁ করলে কিছুই করার নেই। তবে আরও একটু বাকি আছে। ব্রহ্মার জীবৎকাল হিসাবে এই দানবীয় সংখ্যায় যদি কেউ হাঁপিয়ে ওঠে, তবে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ তাদের প্রতি যে সদয় তা বলা যাবে না, কারণ, বলা হচ্ছে ব্রহ্মার এই বি- রা-ট জীবনকালও কৃষ্ণের এক নিমেষমাত্র। নিমেষের অর্থ করা হচ্ছে চোখের পলক! কিন্তু সে হিসেবে বিষ্ণুর জীবনকালের হিসাবটা যে কী দাঁড়ায় সেটা ভাবতেও ভয় হয়। অবশ্য শিবপুরাণে বিষ্ণুর জায়গায় শিবের পলকের কথা বলা হচ্ছে। যাক, সময়ের এই দানবীয় পৌরাণিক হিসাব নিকাশের মর্মোদ্ধার করার চেষ্টা আজ আর না করাই ভালো। 

আসলে দূরত্ব ও সময় যদিও কেউ আবিষ্কার করেনি, কিন্তু এদের পরিমাপের একক নির্দিষ্ট হতে হতে বহু সভ্যতার উথ্থান পতন হয়ে গেছে। 

৫: হতেই পারত কোনো ‘আসুরিক’ বিজ্ঞান

অবশ্য আর একটা কথা না বললেই নয়। এমন কোনো কথা নেই যে বিজ্ঞান আবিষ্কারটা এসব ঝা, মিশ্র, উপাধ্যায়খচিত ব্রাহ্মণ্য পরিমন্ডলেই হবার ছিল। 

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম প্রযুক্তিবিদ্যা যদি বলে যদি কিছু হয় তো সে কৃতিত্ব খুব সম্ভবত ঝাড়খণ্ডের এক অধুনা প্রায়বিলুপ্ত অসুর ও আগারিয়া নামে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। 

কারণ খৃষ্টপূর্ব ১০০০এর আশপাশে উত্তর ও পূর্ব ভারতের তখনকার ভৌগোলিক চৌহদ্দির মধ্যে যেকটা জায়গায় লোহার আবিষ্কারের কথা শোনা যায়, তার মধ্যে ঝাড়খণ্ড অন্যতম। প্রায় তিন হাজার বছর আগের সে ভারতের যে ছিটেফোঁটা পাথূরে ও অন্যান্য প্রমাণ অবশিষ্ট, তার ভিত্তিতে বলা যায় যে, সে ভারত মূলত আদিবাসী ভারত। জার্মান প্রাচ্যবিদদের হাতে আর্য অনার্য তত্ত্ব তৈরীর তখনও ঢের দেরি। নীরঞ্জনা নদীতীরে উরুবেলা গ্রামের অশ্বথগাছতলায় সেই শাক্য রাজকুমারের বোধির আসন পাতারও তখন অনেক দেরি। সে সময়ের বিহার ছোটনাগপুরে নেই কোনো বৌদ্ধ বা জৈন, বা এমন কেউ যাদের আজ হিন্দু বলি। সে ভারতের উত্তর ও পূর্বের একটা বড় অংশ জুড়ে তখন চলছে tribal migration.. গন্ডক নদীর পূবে আজকের নেপাল সীমান্তের লাগোয়া জনক রাজার দরবারে তখন উত্তরের সরস্বতী নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে এসে পৌঁছচ্ছেন গোতম, যাজ্ঞবল্ক্যের মতো পরিব্রাজক ব্রহ্মবিদরা … ব্রহ্মকথার ধূম লেগেছে কোশী আর গন্ডক নদীর হিমকনকনে জলে ধোয়া বিস্তৃত অববাহিকার এখানে সেখানে। 

এই সময়টার আশপাশেই, পন্ডিতদের সাক্ষী মেনে বলা যায়, উত্তর পশ্চিমের কুরু পাঞ্চাল বা পশ্চিম সমুদ্রের পার থেকে বা, এমনকি আজকের ভারতের বাইরের আফগানিস্তান, বেলুচিস্তান থেকে সিন্ধুঘাটি হয়ে, নানা কারণে, পুবদেশে এসে পৌঁছচ্ছে এক বিরাট সংখ্যায় দ্রাবিড়িয় ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ – ওরাওঁ, অসুর, মুন্ডা, নাগ, হো…..

পূর্ণাঙ্গ চিত্রটা আজ জানা কার্যত অসম্ভব। কিন্তু সে-সময় এসব যাযাবর আদিবাসী গোষ্ঠীর একটা বড় অংশ আজকের বিহারের রোহতাসগড়, আজমগড় হয়ে নেমে আসছে আজকের ঝাড়খন্ডের ঘন জঙ্গলে ঢাকা রুক্ষ পাথুরে মাটির দেশে। অবিরাম চলেছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষি এই ভ্রাম্যমাণ মানুষগুলোর মধ্যে সঙ্ঘর্ষ ও আদানপ্রদান। 

পন্ডিতরা একমত নন, তবুও প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে খুব সম্ভবত এই ভ্রাম্যমাণ গোষ্ঠীর মানুষগুলোই ব্রাত্য বলে বর্ণিত। বেদে অবিশ্বাসী এই ভ্রাম্যমাণ মানুষগুলো যাগযজ্ঞ বা বৈদিক আচার অনুষ্ঠান বা দেবদেবীর একেবারেই ধার ধারত না। যদিও তান্ড্যব্রাহ্মণে এদের প্রাণভরে গালি দেওয়া হয়েছে, অথর্ব সংহিতার ব্রাত্যকান্ডে এদেরকে আবার পরমপুরুষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে! এরা নিশ্চিতভাবে কৃষিজীবী নন। সম্ভবত তারা পশুপালক এবং পশুপতি শিব তাদের উপাস্য। 

যাহোক, এই শিবের উপাসক, পশুপালক যাযাবর গোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের আরও গভীরে আমাদের আপাতত যাবার দরকার নেই। কিন্তু এদের মধ্যে অসুর ও আগারিয়ারা সেই দূর অতীত থেকেই লোহা তৈরির প্রযুক্তি জানত। 

সেকালের মগধ থেকে সূদূর উজ্জয়িনী, অমরকণ্টক অবধি বাণিজ্যপথের অস্তিত্ব ছিল। 

আজও ঝাড়খন্ডে গুমলা, লোহারডাগা জেলায় অসুর জনজাতির বাস। আগারিয়াদের দেখা মিলবে হাজারিবাগ ন্যাশনাল পার্কের উল্টোদিকে যে রাস্তাটা হাল্কা হয়ে আসা জঙ্গলে নেমে হারিয়ে গেছে, সে পথ ধরে কিছুদূর হাঁটলেই। অবশ্য আজ আর স্বাধীন ভারতে জঙ্গলের অধিকার হারানো আদিবাসীদের কোনো গোষ্ঠীই সেভাবে তাদের শতাব্দীপ্রাচীন প্রযুক্তির অভ্যাসের সাথে জুড়ে নেই। দ্রুত বিশ্বায়ন ও দানবীয় বাজার অর্থনীতির সাথে তাল দেওয়া নতুন প্রযুক্তির সাথে লড়াইয়ে কবেই তারা হেরে বসে আছে।

কিন্তু  সত্যি  ইতিহাসে হেরে বসে থাকলেও আমরা যেহেতু counterfactual এর কথা বলছি, তাই ভাবতে বাধা নেই যে, যদি তাদের এই প্রযুক্তি শেষ অবধি কোনো না কোনো ভাবে বিজ্ঞানের আধুনিক দোরগোড়ায় গিয়ে ঠেকত, হয়ত তাহলে  সে বিজ্ঞানে  এই প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত  নানা ধরনের একক বা অন্যান্য নামে অসুর বা আগারিয়া  ছোঁয়া থাকতো। কিন্তু তার বদলে অসুর নামটা চিরকালই থেকে গেল মহিষাসুর ,গয়াসুর বা বড়জোর মহিষ( অসুর) মর্দিনী দুর্গার অনুসঙ্গ হয়ে। 

যাক সেসব! কী হলে কী হত এ-প্রশ্নকে এবার ছেড়ে আসি যা  কিছু  হয়েছে সেই প্রশ্নে!

৬: কথা ফুরিয়েও  না ফুরোনো  কথা

এসব  counterfactual  প্রসঙ্গের কথায় সম্ভবত এটা  বোঝা গেল  যে,  উনিশ শতকীয় উদ্যোগে শেষমেশ পরিভাষা তৈরি না হলেও বিজ্ঞানের দর্শনের খুব জরুরি কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছিল! 
নীডহ্যাম প্রশ্ন তুলেছিলেন যে বিজ্ঞান কেন আধুনিক যুগে এদেশে হল না?  প্রশ্নটাকে আর একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে আমরা রাখলাম এই বলে যে, যদি ‘সত্যিই’ হত, ব্রাহ্মণ্য বা অব্রাহ্মণ্য আম দরবারে, তবে সে বিজ্ঞান কেমন হত!
প্রশ্নটা বিজ্ঞানের দর্শনের সবচেয়ে ঝকঝকে প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটা, যার উত্তর আমরা কেউ জানি না। 
সোজা কথায়, সংক্ষিপ্তসার করলে দাঁড়ায় যে, একটা আগে থাকতেই মজুদ থাকা সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল ‘বিজ্ঞানের’ জায়মান পরিভাষাকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে? আর পারেই যদি তবে বিজ্ঞানে নৈর্ব্যক্তিকতা ব্যাপারটার আগাডগা মাথামুন্ডুর আদৌ কি কোনো একজাতীয় মানে দাঁড়ায়!

কিন্তু তার আরও বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। তাই আপাতত কথা ফুরোলেও counterfactual এর নটেগাছটা যেমন আছে তেমনই ছেড়ে যাওয়া যাক।

 জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s