বৈজ্ঞানিকের দপ্তর পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক ঋজু গাঙ্গুলী শীত ২০১৭

  ঋজু গাঙ্গুলীর সমস্ত জয়ঢাকি লেখা একত্রে

অন্ধকার হল। সামনে পর্দা জুড়ে ধু-ধু বরফ। তার ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেছে উজ্জ্বল লাল জ্যাকেট পরা এক অভিযাত্রী। হঠাৎ সে একটা গর্জন শুনতে পেল।

পেছনে তাকিয়ে কিছু একটা দেখে নিঃসীম আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল সে। প্রাণভয়ে পিছিয়ে যেতে গিয়ে অসহায় ভাবে বরফের ওপর পড়ে গিয়ে সে অপেক্ষা করতে থাকল এক যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর জন্য।

কিন্তু কিচ্ছু হল না!

অভিযাত্রী চোখ মেলে, চারদিকে খুঁজেও কাউকে দেখতে পেল না।

আমরাও পেলাম না। শুধু তখন নয়, পরের সোয়া দু’ঘন্টা জুড়েই!

হল থেকে গম্ভীর মুখে বেরোবার সময়েই বুঝতে পেরেছিলাম, শনিচক্রের ‘ইয়েতি অভিযান’ সুখের হয়নি।

প্রিয়া সিনেমা হলের সামনে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ দিয়ে তখন উন্মত্ত জনস্রোত ধেয়ে চলেছে কালীঘাট মেট্রো থেকে গড়িয়াহাটের দিকে। দেশপ্রিয় পার্ক-এর চারপাশে পা রাখার জায়গা নেই।

কিন্তু তার মধ্যেই, হল থেকে বেরিয়ে অনেক কষ্টে পুলিশি ব্যারিকেড আর ভিড় সামলে বাড়ির দিকে যখন এগোচ্ছি, তখন জামার হাতায় টান পড়ল। বিরক্ত মুখে টানের উৎসের দিকে তাকিয়েই একটা ভীষণ সহজ, কিন্তু অত্যন্ত কঠিন প্রশ্নের সামনে পড়ে গেলাম।

“বাবা”, মেঘনা জিজ্ঞেস করল, “ইয়েতি কি সত্যিই আছে?”

রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘামতে-ঘামতে উত্তরটা দেওয়া সম্ভব ছিল না। প্রসেনজিৎ-আরিয়ান-যিশু-ফিরদৌস-বিদ্যা সমৃদ্ধ সিনেমাটা আমার সঙ্গে পা মেলানো মানুষদের অধিকাংশকেই বিরক্ত, ক্ষুব্ধ, এবং অনেকাংশে ক্রুদ্ধ করে তুলেছে, সেটা আশেপাশের সবার মুখেই স্পষ্ট ছিল। ইয়েতি আছে কি নেই, সেই প্রশ্নের উত্তরটাও যে অধিকাংশের কাছে অস্পষ্ট, সেটাও বুঝতে পারছিলাম।

ফ্ল্যাটে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে এসেই বুঝলাম, শুধু মেয়ে নয়, অনুমিতা, মধুরিমা, তোশালি, এমনকি বাড়ির প্রবল প্রতাপান্বিত অভিভাবক, সবার মনেই প্রশ্নটা জেগেছে। চটজলদি ডিনারের আশা ছেড়ে সোফায় বসেই অতঃপর ইয়েতির ইতিবৃত্ত শুরু করতে হল।

“বছরটা ১৯২১”, আমি শুরু করি, “ব্রিটিশ মাউন্ট এভারেস্ট রিকনেইস্যান্স এক্সপিডিশন-এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল চার্লস হাওয়ার্ড-বারি। সমুদ্রতল থেকে ২১,০০০ ফুট, মানে প্রায় ৬৪০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত লাখপা-লে এলাকা পার হওয়ার সময় বরফে কিছু পায়ের ছাপ দেখেন হাওয়ার্ড-বারি ও তাঁর সঙ্গীরা।

হাওয়ার্ড-বারি’র প্রাথমিকভাবে ধারণা হয়েছিল, হিমালয়ান গ্রে উলফ বা ওই জাতীয় কোনো প্রাণীর চলার ফলে ওই দাগগুলো তৈরি হয়েছে। কিন্তু জীবজগৎ সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা ছিল বলেই পায়ের ছাপগুলো দেখে পরে তিনি কোনো চতুষ্পদ প্রাণীর বদলে দ্বিপদের, বিশেষত খালি পায়ে চলা বড়োসড়ো মানুষের কথাই ভেবেছিলেন।

তাঁর সঙ্গে যে শেরপারা ছিল, তারা প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে বলে যে এই পায়ের ছাপ ‘ওয়াইল্ড ম্যান অফ দ্য স্নোজ’ বা মিতোহ-কাংমির। তিব্বতি ভাষায় মিতোহ মানে হল মানুষ-ভালুক, আর কাংমি মানে বরফের মানুষ। এই metoh-kangmi ১৯৩৮ সালে বিল টিলম্যান-এর লেখা ‘মাউন্ট এভারেস্ট’ নামক বইয়ে ভুলভাবে metch-kangmi হয়ে ছাপা হলে প্রচুর সংশয় তৈরি হয়।

কিন্তু ওই প্রাণীটির বদনামের জন্য দায়ী দ্য স্টেটসম্যান-এর সাংবাদিক হেনরি নিউম্যান। ‘এভারেস্ট রিকনেইস্যান্স এক্সপিডিশন’ সেরে দার্জিলিং-এ ফিরে আসা পোর্টারদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ‘কিম’ ছদ্মনামে সেটা প্রকাশ করার সময় তিনি ‘মিতোহ’ শব্দের মানে করেন ‘নোংরা’। এর ফলে প্রাণীটি শেষ অবধি জঘন্য তুষারমানব বা অ্যাবোমিনেবল স্নোম্যান নামেই পাশ্চাত্যের কাছে পৌঁছয়।

আর তার পরেই শুরু হয় ইয়েতির সন্ধান”।

“কিন্তু”, প্রশ্নটা করার জন্য তোশালি অনেকক্ষণ ধরে উশখুশ করছিল, “এর আগে কি ওই প্রাণীর ব্যাপারে কেউ কিছুই জানত না?”

“কেন জানবে না?”, আমি প্রতিবাদ জানাই, “এইচ. স্লিগার তাঁর ‘হিমালয়ান অ্যানথ্রোপলজি: দ্য ইন্দো-টিবেটান ইনটারফেস’ বইয়ে জানিয়েছেন যে লেপচা-সহ বহু হিমালয়বাসী উপজাতির প্রাক-বৌদ্ধ চিন্তাভাবনায় হিমবাহের বাসিন্দা এক প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যাকে শিকারের দেবতা বলে মনে করা হত।

১৮৩২ সালে জেমস প্রিন্সেপের সম্পাদনায় ‘জার্নাল অফ দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল’-এ বিখ্যাত ট্রেকার বি.এইচ. হডসনের উত্তর নেপাল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয়। হডসন লিখেছিলেন, তাঁর সঙ্গী গাইডদের সামনে পড়ে একটি লম্বা, দু’পেয়ে, লোমশ প্রাণী ভয়ে পালিয়ে গেছিল, যাকে দেখে তাঁর ওরাং-ওটাং বলে মনে হয়েছিল।

১৮৯৯ সালে লরেন্স অস্টিন ওয়াডেল-এর ‘অ্যামং দ্য হিমালয়াস’-এ প্রথমবার প্রাণীটির পায়ের ছাপের বিবরণ নথিভুক্ত হয়। ওয়াডেল-এর গাইডরা একে পাহাড়ের বাসিন্দা দু’পেয়ে বনমানুষের পায়ের ছাপ বলে দাবি করলেও সত্যিকারের একটিও প্রত্যক্ষদর্শী না পেয়ে ওয়াডেল সিদ্ধান্ত নেন যে এগুলো কোনো ভালুকের পায়ের ছাপ।

১৯২৫ সালে রয়েল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটি-র সদস্য ও ফোটোগ্রাফার এন.এ. টমবাজি উত্তর সিকিমের জেমু গ্লেসিয়ারের কাছে, প্রায় ১৫,০০০ ফুট বা ৪৬০০ মিটার উচ্চতায়, মোটামুটি আড়াইশো মিটার দূরত্ব থেকে, একটি বিশেষ প্রাণীকে দেখেন। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, প্রাণীটি ছিল বাহ্যিকভাবে মানুষের মতোই, তবে তার গায়ে কোনো পোশাক ছিল না, ছিল শুধু গাঢ় রঙের লোম। দু’পায়ে সোজা দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণীটি মাঝেমধ্যে নিচু হয়ে ছোটো গাছ-গাছড়া তুলে খাচ্ছিল। প্রাণীটি চলে যাওয়ার পর টমবাজি ও তাঁর গাইডরা জায়গাটায় গিয়ে তার পায়ের ছাপ দেখতে পান, যা ছিল মানুষের মতোই, শুধু ছ’-সাত ইঞ্চি লম্বা আর চার ইঞ্চি চওড়া!

১৯৪৮ সালে, ওই একই জায়গায়, রয়েল এয়ার ফোর্সের কাজ থেকে ছুটি নিয়ে পাহাড় চড়তে যাওয়া পিটার বিয়ার্ন পায়ের ছাপ দেখেন।

তবে আসল বিস্ফোরণটা হয় এরপর।”

“কী হয়েছিল?”, সমস্বরে প্রশ্নটা ভেসে আসায় আরো একবার সৃজিত অ্যান্ড কোং-এর সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করার কথাটা মনে হয় আমার। মাথা ঝাঁকিয়ে কথায় ফিরে আসি আমি।

“১৯৫১ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ পর্বতারোহী এরিক শিপটন মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান করেন। প্রায় ২০,০০০ ফুট বা ৬০০০ মিটার উচ্চতায় তিনি বরফের বুকে এক সারি স্পষ্ট পায়ের ছাপ দেখতে পান। তিনি সেগুলোর ফটো তোলেন, এবং লোকালয়ে ফিরে এসে সেগুলো লোকের কাছে পেশ করেন।

১৯৫৩ সালে স্যার এডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নোরগে যখন তাঁদের অভিযান চালান, তখন তাঁরাও এমন বেশ কিছু ছাপ দেখেছিলেন। হিলারি প্রথম থেকেই ইয়েতি-র অস্তিত্বে সন্দিহান ছিলেন। তেনজিং প্রথমে পায়ের ছাপগুলো ইয়েতির বলে মনে করলেও পরে মত বদলান।

কিন্তু এইসব দেখেশুনে বিদেশে ইয়েতির সুলুক-সন্ধান চেয়ে হাহাকার পড়ে যায়। ফলে মাঠে নামে ডেইলি মেল পত্রিকা। ১৯৫৪ সালে তারা ইয়েতির সন্ধানে এক বিশাল অভিযান চালায়।

এই অভিযানে পর্বতারোহীদের নেতা জন এঞ্জেলো জ্যাকসন এভারেস্ট থেকে কাঞ্চনজংঘা অবধি ট্রেক করার সময় তেংবোচে গুমফায় ইয়েতির বেশ কিছু আঁকা ছবি দেখতে পান। কৌতূহলী হয়ে তার আশেপাশে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে তিনি বরফে বেশ কিছু পায়ের ছাপ দেখতে পান, ও ফটো তুলে আনেন। পরে এই ফটোর মধ্যে অধিকাংশ পায়ের ছাপকেই কোনো-না-কোনো প্রাণীর বলে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেছে। কিন্তু কয়েকটা ছাপ চেনাজানা প্রাণীদের সঙ্গে মেলানো যায়নি।

এই অভিযান চালাতে গিয়ে পাংবোচে মনাস্ট্রি থেকে পাওয়া একটা জিনিসকে ইয়েতির চুল লেগে থাকা মাথার চামড়া, বা স্ক্যাল্প, বলে দাবি করে একটা লেখাও প্রকাশ করে ডেইলি মেল। তবে তুলনামূলক দেহতত্ত্বে বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ফ্রেডরিক উড জোনস সেটা খুঁটিয়ে দেখে স্পষ্টভাবেই বলেন যে মানুষের মতো কোনো প্রাণী বা অ্যানথ্রপয়েড এপ থেকে ওই চুল বা লোম ও চামড়া পাওয়া যায়নি।

যথারীতি, এই রসকষহীন উত্তরটা অধিকাংশ মানুষের পছন্দ হয়নি। তার ওপর ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত বই ‘দ্য লং ওয়াক’-এ অভিযাত্রী স্লায়োওমির রাউইকজ দাবি করেন, ১৯৪০-এর শীতে হিমালয় পেরোবার সময় তিনি ও তাঁর সহযাত্রীরা প্রায় দু’ঘন্টা আটকে থাকেন, কারণ তাঁদের পথের ওপর দুটি লোমশ বিশালদেহী প্রাণী উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটাহাঁটি করছিল।

১৯৬০ সালে হিলারি ইয়েতির সন্ধানে একটি অভিযান চালান। খুমিয়াং মনাস্ট্রি থেকে আরেকটি কথিত ইয়েতির স্ক্যাল্প তিনি সংগ্রহ করেন, যা পরীক্ষা করে জানা যায় যে সেটি এক ধরনের হিমালয়ান অ্যান্টিলোপের চামড়া ও লোম দিয়ে বানানো।

তবে হ্যাঁ, ভুটানে ইয়েতি নিয়ে কিংবদন্তী এবং গল্প এতই জনপ্রিয় ছিল যে ১৯৬৬ সালে ‘ফোকটেলস অফ ভুটান’ সিরিজে ইয়েতি নিয়ে একটা ডাকটিকিট-ই বের করে ফেলে ভুটান পোস্ট!

১৯৭০ সালে ব্রিটিশ পর্বতারোহী ডন হুইল্যান্স অন্নপূর্ণা অভিযানের সময় কোনো প্রাণীর চিৎকার শুনতে পান, যেটা তাঁর সঙ্গী শেরপাদের মতে ছিল ইয়েতির ডাক। রাতে, তাঁদের ক্যাম্পের কাছে গাঢ় রঙের লোমে ঢাকা একটি দু’পেয়ে লম্বা প্রাণীকে দেখেন হুইল্যান্স নিজেই।

১৯৭২ সালে পৃথিবীর গভীরতম উপত্যকা, নেপালের বারুন ভ্যালিতে ক্রোনিন ও ম্যাকনিলি-র নেতৃত্বে অভিযান চালানো হলে সেখানে অজ্ঞাত কোনো দু’পেয়ে লম্বা প্রাণীর পায়ের ছাপ পাওয়া যায়। ওই উপত্যকায় ইয়েতির অস্তিত্ব আছে কি নেই, সেটা নিশ্চিতভাবে জানার জন্য হিমালয়ান কনসার্ভেশনিস্ট ড্যানিয়েল সি টেইলর, এবং ন্যাচারাল হিস্টোরিয়ান রবার্ট এল ফ্লেমিং জুনিয়র ১৯৮৩ সালে বারুন ভ্যালিতে খুব খুঁটিয়ে খোঁজাখুঁজি করেন।

এই অভিযানে এমন কিছু পায়ের ছাপ ওই উপত্যকায় পাওয়া যায়, যাতে হেলাক্স, অর্থাৎ পায়ের বুড়ো আঙুলের উপস্থিতি, এবং দু’পেয়ে চলন দেখে প্রায় নিশ্চিতভাবেই ওটা কোনো হোমিনয়েড-এর বলে মনে হয়”।

“হোমিনয়েড মানে কী?”, অনুমিতার প্রশ্নটা আমাকে থামিয়ে দিল। বাকিদের সপ্রশ্ন দৃষ্টি থেকে বুঝলাম, প্রশ্নটা সবার। অতঃপর আমাকে মেয়ের ড্রইং খাতার একটা পাতায় দাগ কেটে-কেটে ব্যাপারটা বোঝাতে হল।

“স্তন্যপায়ী প্রাণী, বা ম্যামেলস-এর মধ্যে একটা বিশেষ ধরনের প্রাণীদের বলা হয় প্রাইমেটস। এদের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা দিয়ে সহজেই এদের অন্য স্তন্যপায়ীদের থেকে আলাদা করা যায়, আর সেই বৈশিষ্ট্যগুলো হল:

  • কাঁধের জয়েন্ট বা সন্ধিস্থলটা নমনীয়,
  • আঙুলের ডগা শুধুই ধারালো নখ বা খুর ধরে রাখার জন্য নয়, বরং সেই জায়গাটা দিয়ে কিছু অনুভব করা যায়,
  • হাত শরীরের দুপাশে ঝোলাতে পারে, ও তাই দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করতে পারে, এবং
  • চোখজোড়া মাথার সামনের দিকে থাকায় বাইনোকিউলর ভিশন-এর সুবিধা পায়, যাতে ওভারল্যাপিং-এর মাধ্যমে দৃষ্ট বস্তু স্রেফ দ্বিমাত্রিক না থেকে তাতে গভীরতার অনুভূতিও আসে।

এই প্রাইমেটসদের দুটো ভাগে ভাগ করা যায়, (১) প্রোসিমিয়ানস, (২) অ্যানথ্রোপয়েডস।

প্রোসিমিয়ানস-দের মধ্যে আছে লেমুরিফর্মস, যাদের মধ্যে পড়ে যাবতীয় লেমুর ও লরিস জাতীয় বাঁদর, এবং টারসিফর্মস, যাদের মধ্যে এখন টিঁকে আছে শুধু ফিলিপিন্স দ্বীপপুঞ্জ ও তার কাছাকাছি দ্বীপে ত্থাকা টারসিয়ার নামের, বড়ো চোখের, একধরনের ছোটোখাটো প্রাণী। এদের ওয়েট-নোজড প্রাইমেটস-ও বলা হয়।

অ্যানথ্রোপয়েডস বর্গের প্রাণী, তথা ড্রাই-নোজড প্রাইমেটদের আবার দুটো ভাগে ভাগ করা যায়।

(১) প্ল্যাটিরিনি, যাদের মধ্যে পড়ে মেক্সিকো, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বাসিন্দা যাবতীয় নিউ ওয়ার্ল্ড মাংকি, অর্থাৎ মার্মোসেট, স্কুইরেল মাংকি, হাউলার মাংকি, ইত্যাদি।

(২) ক্যাটারিনি, যাদের মধ্যেও দুটো বড়ো গ্রুপ পাওয়া যায়:

(ক) ওল্ড ওয়ার্ল্ড মাংকিজ, অর্থাৎ এশিয়া, আফ্রিকা সহ বাকি এলাকার বাসিন্দা যাবতীয় বাঁদর।

(খ) হোমিনয়েডস, মানে একটু আগে যার কথা বলা হল। মাংকিজ-দের থেকে এদের আলাদা করে দেয় বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য, যাদের মধ্যে আছে,

  • তুলনামূলকভাবে বড়ো চেহারা;
  • লেজের অনুপস্থিতি;
  • ট্রাংক, মানে মুখের সামনে উঁচু হয়ে থাকা অংশটা ছোটো হওয়া;
  • স্বভাবগত জটিলতা;
  • মস্তিষ্কের আকার ও জটিলতা দুই-ই বেশি হওয়া;
  • শৈশবের সময়কাল, এবং নির্ভরশীলতা, দুই-ই বেশি হওয়া।

এই হোমিনয়েডস-দের আবার তিনটে বড়ো শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:

১] হাইলোব্যাটিডস, বা লেসার এপস, যাদের মধ্যে আছে মূলত গিবন ও সিয়ামাং জাতীয় প্রাণী।

২] পংগিডস, বা গ্রেট এপস, যাদের মধ্যে আছে ওরাংওটাং, শিম্পাঞ্জি, আর গরিলা।

৩] হোমিনিডস, অর্থাৎ বিবর্তনের ধারায় মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছে বা থেকেছে যারা, সেইসব প্রাণী। এদের মধ্যে সবচেয়ে আগে আসে অস্ট্রালোপিথিচিনস, যারা আজ নিশ্চিহ্ন। তার পরে আসে ‘হোমো’ জেনাস-ভুক্ত বিভিন্ন প্রাণী, যাদের মধ্যে হোমো সেপিয়েন্স ছাড়া সবাই নিশ্চিহ্ন।

“মানে,” এতক্ষণে দম ফেলার সুযোগ পাই আমি, “বারুন ভ্যালিতে যাদের পায়ের ছাপ দেখা গেছিল, তাদের কোনো-না-কোনো এপ বা মানুষ হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়”।

“এরা সাইজে কতটা বড়ো হয়?”, জানতে চায় মধুরিমা।

উত্তর হিসেবে আমার হাতে আঁকা পচা ছবির বদলে এই স্কেচটা পেশ করছি।

“আচ্ছা বাবা”, এবার মেঘনা প্রশ্ন তোলে, “ম্যান আর মাংকিজ-রা কি একইসঙ্গে ইভলভ করেছে, না কি আলাদা-আলাদা সময়ে?”

“বিবর্তন বা ইভলিউশন একটা নদীর মতো,” আমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি, “যাতে এক-একটা সময়ে এক-একটা শাখা তৈরি হয়েছে।

ব্যাপারটা বোঝার জন্য আর দুটো ছবি তুলে ধরা যাক।

“কিন্তু,” বিবর্তন থেকে আমি আবার হিমালয়ে ফিরে আসতে সচেষ্ট হই, “বারুন ভ্যালিতে অভিযান চালাতে গিয়ে টেলর-ফ্লেমিং এক্সপিডিশন আরো কিছু জিনিস জানতে পারে। তারা গাছের মধ্যে কিছু ইন্টারেস্টিং বাসা বা নেস্ট পায়, এবং পায় একটু ছোটো আকারের ৭০ কিলো ওজনের ‘রুখ বালু’ বা ট্রি-বিয়ার ও বড়ো, হিংস্র, ১৮০ কিলো ওজনের ‘ভুই বালু’ বা গ্রাউন্ড-বিয়ার সম্বন্ধে প্রচুর রিপোর্ট। কয়েকটি খুলিও সংগৃহীত হয় ওই অভিযানে, যাদের সঙ্গে স্মিথসনিয়ান, অ্যামেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি, ও ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা নানা খুলির সঙ্গে তুলনা করে একটিই নতুন প্রজাতির ভালুকের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় ওই উপত্যকায়”।

“তার মানে”, কথাটা শ্রীমতী বললেও ঘরের সবার লম্বা মুখগুলো দেখে বুঝি যে অনুভূতিটা সবার, “ইয়েতি বলে কিছু নেই?”

“মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসটা ঠিক সরলরৈখিক নয়”, গম্ভীর হয়ে বলি আমি, “পাঠ্য বইয়ে যে ছবিটা থাকে, সেটা এরকম:

“কিন্তু হোমো ইরেক্টাস নামের মধ্যে গুঁজে দেওয়া হয়েছে আরো বেশ কিছু প্রজাতি, যাদের মধ্যে একটি হল হোমো হাইডেলবার্গেনসিস। আজ থেকে প্রায় আঠেরো থেকে ছয় লক্ষ বছর আগে এদের অস্তিত্বের যেসব চিহ্ন পাওয়া গেছে তা থেকে বোঝা যায় যে এরা ধারালো অস্ত্রের ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। হাড়, বিশেষত মাথার খুলির পর্যবেক্ষণ করে বোঝা গেছে যে আধুনিক হোমো সেপিয়েন্স-এর মস্তিষ্কের আয়তনের প্রায় ৯৩% ছিল এর মস্তিষ্কের আয়তন, যেখানে হোমো ইরেক্টাস-এর ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ৭৪%।

অনুমান করা হয় যে এই হোমো হাইডেলবার্গেনসিস থেকেই, আজ থেকে মোটামুটি পাঁচ লক্ষ বছর আগে, নিয়ানডারথাল এবং ডেনিসোভান প্রজাতি আলাদা হয়ে যায়।

ইথিওপিয়ার ওমো নদীর ধারে পাওয়া ফসিল থেকে বোঝা যায় যে প্রায় দু’লক্ষ বছর আগে দেহতত্ত্বের দিক দিয়ে আধুনিক মানব বা হোমো সেপিয়েন্স আত্মপ্রকাশ করে।

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, এরপর হোমো সেপিয়েন্স নানা রূপান্তর ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাদের অন্য ভাই-বেরাদরদের চেয়ে এগিয়ে গেলেও, আজ থেকে প্রায় পঁচিশ হাজার বছর আগে অবধিও নিয়ানডারথালরা টিঁকে ছিল। কিন্তু তারপর, তীর-ধনুক-আগুন নিয়ে আক্রমণ চালানো মানুষদের সামনে তারা বিলুপ্ত হয়।

কিন্তু তার পরেও, দীর্ঘ দিন ধরে অজস্র উপকথায় তাদের অস্তিত্ব থেকে গেছে। আজও জঙ্গল বা গুহার বাসিন্দা আদিম মানব বা এপ-দের যেসব প্রবাদ ও কিংবদন্তী শোনা যায়, তাদের মধ্যে অনেকগুলোরই উৎস হল আমাদের সেই প্রাচীন আত্মীয়রা, অর্থাৎ নিয়ানডারথাল।

“২০০৩ সালে এশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় হোমো সেপিয়েন্স কীভাবে পৌঁছেছিল, সেই নিয়ে চাক্ষুষ প্রমাণ খুঁজে পাওয়ার আশায় একটা ইন্দোনেশীয়-অস্ট্রেলীয় টিম ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেন্স দ্বীপে অনুসন্ধান চালাচ্ছিল। সেখানকার লিয়াং বুয়া গুহায় তারা একটা প্রায় সম্পূর্ণ, এবং সাতটা আংশিক কঙ্কাল খুঁজে পায়। মোটামুটি ৯৫,০০০ থেকে ১৩,০০০ হাজার বছর পুরোনো এই কঙ্কালগুলো উচ্চতায় ছিল সাড়ে তিন ফুটের কাছাকাছি, আর ক্রেনিয়াল ক্যাপাসিটি, অর্থাৎ মগজের আয়তন ছিল হোমো সেপিয়েন্সের তুলনায় কম। এছাড়া হোমো ইরেক্টাস তো বটেই, এমনকি হোমো সেপিয়েন্সের সঙ্গে তাদের দারুণ সাদৃশ্য দেখে বিজ্ঞানীরা রীতিমতো দ্বিধায় পড়েন, যে এরা একটা নতুন প্রজাতি, নাকি হোমো সেপিয়েন্স-এরই একটা রোগগ্রস্ত বা প্যাথলজিক্যাল চেহারা।

অবশেষে, তিন ফুট উচ্চতার মানবের পক্ষেই মানানসই এমন বেশ কিছু পাথরের জিনিস পাওয়ার পর, এবং হোমো সেপিয়েন্সের ওই অঞ্চলে ৫০,০০০ বছর আগে পদার্পণের ব্যাপারে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়ার পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করেন যে এটি একটি আলাদা প্রজাতি। হোমো ইরেক্টাস এই অঞ্চলে এসে পৌঁছনোর পর সম্ভবত খাবারের অভাবেই তারা ‘ইনসুলার ডোয়ার্ফিজম’ নামক এক ধরনের বামনত্বের শিকার হয়। এতেই তাদের দৈর্ঘ্য, এবং মস্তিষ্কের আয়তন কমে যায়। এই প্রজাতিকে, আবিষ্কারের স্থানের ভিত্তিতে, হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস বলা হয়।

বিজ্ঞানীরা এই নতুন প্রজাতির আবিষ্কারে আরো বেশি করে উত্তেজিত হন, কারণ ইন্দোনেশিয়ার ওই অঞ্চলে ‘এবু গোগো’ নামে একধরনের ছোটো আকারের মানুষের প্রবাদ ও গল্প দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আছে। এই ছোটো মানুষেরা নাকি আগুনের ব্যবহার জানে না। তাই কাছাকাছি মানুষের সমাজ থেকে তারা ছোটো ছেলে-মেয়েদের চুরি করে নিয়ে যেত তাদের দিয়ে রান্না করাবে বলে। অবশ্য এই ছেলেমেয়েরা তাদের বোকা বানিয়ে পালিয়েও আসত।

এরা ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া-তে ‘ওরাং পেন্ডেক’ নামে এক ধরনের ছোটো চেহারার, মানে ৮০ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার উচ্চতার লোমশ দ্বিপদের অস্তিত্বের কথা চালু আছে সুমাত্রায়।

এইসব প্রবাদ, এবং হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস-এর মাত্র বারো-তেরো জাহার বছর আগে অবধিও আধুনিক মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানের নিশ্চিত প্রমাণ দেখে বিখ্যাত ‘নেচার’ পত্রিকার সম্পাদক হেনরি গি ২০০৪ সালে বলেন, ইয়েতির প্রবাদ ও কিংবদন্তীর পেছনেও এমন কোনো, এখনও খুঁজে না পাওয়া মানুষের জ্ঞাতি প্রজাতির অস্তিত্ব থাকতেই পারে”।

“তাহলে এর পরেও কি ইয়েতি নিয়ে খোঁজাখুঁজি হয়েছিল?”, জানতে চায় তোশালি।

“তোমরা কেউ জায়গান্টোপিথিকাস-এর নাম শুনেছ?”, আমি প্রতিপ্রশ্ন করি।

সবার মুন্ডুগুলো এত জোরে এদিক-ওদিক হতে লাগল, যে আমি ভয়ই পেয়ে গেলাম, পাছে সামনে বসা জনতা কবন্ধ হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি আবার কথা শুরু করলাম আমি।

“আজ থেকে প্রায় ন’লক্ষ বছর আগে থেকে শুরু করে লাখখানেক বছর আগে অবধিও ভারত, চিন, এবং ভিয়েতনামে অস্তিত্ব ছিল মানুষের এই জ্ঞাতি ভাইয়ের।

চিনে নানা রকম পুরোনো হাড় বা ফসিল ‘ড্রাগন বোনস’ হিসেবে বিক্রি হয়। সেগুলো গুঁড়ো করে ওষুধ হিসেবে খাওয়ার জন্য, আর তাতে গরম শিক চেপে ধরলে যেসব ফাটল তৈরি হয় তার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ গণনার জন্য কাজে লাগে”।

সমস্বরে “ইয়াক!” ধ্বনি শুনে বুঝি, ব্যাপারগুলো আধুনিকাদের মোটেই পছন্দ হয়নি। আমি কথা চালিয়ে যাই।

“১৯৩৫ সালে অ্যানথ্রোপলজিস্ট র‍্যালফ ভন কোয়েনিগসওয়াল্ড চিনের এমনই এক ওষুধের দোকানে, এই প্রজাতির হাড় আবিষ্কার করেন। নিজের বন্ধু ও সহকর্মী ডেভিডসন ব্ল্যাকের সম্মানার্থে তিনি এই প্রজাতির নামকরণ করেন জায়গান্টোপিথিকাস ব্ল্যাকি।

ফসিল থেকে মনে হয় যে এই প্রজাতির প্রাণীরা লম্বায় প্রায় তিন মিটার বা ৯.৮ ফুট, এবং ওজনে ৫৪০ থেকে ৬০০ কিলো অবধি হত। তবে হ্যাঁ, বাস্তবে হয়তো এমন দৈর্ঘ্যর জায়গান্টোপিথিকাস কমই ছিল। মোটামুটি সাড়ে ছ’ফুট উচ্চতার, আর দু’শো কিলোর কাছাকাছি ওজনের হত এই প্রজাতির প্রাণীরা, এমনটাই এখন ভাবা হচ্ছে।

অস্ট্রালোপিথিকাস-এর বংশধর, এবং ওরাং-ওটাং-এর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এই প্রাণীরা এখনও হিমালয়ের বরফ আর দুর্গম অরণ্যে লুকিয়ে আছে, আর তাদের নিয়েই ইয়েতি-র প্রবাদ লোকমুখে ছড়িয়েছে, এমন দাবি কেউ-কেউ করেছেন ঠিকই।

কিন্তু…”

“কিন্তু?”, জানতে চাইল অনুমিতা।

“কিন্তু ওই বিশালকায় প্রাণীটির পক্ষে দু’পায়ে হাঁটা প্রায় অসম্ভব। তার বদলে গোরিলার মতো চার পায়ে হাঁটলেই তার পক্ষে স্বাভাবিক চলাফেরা করা সম্ভব। অথচ ইয়েতি সম্বন্ধে যা জানা গেছে তাতে এটা নিশ্চিত যে সে দু’পেয়ে।

তাছাড়া এই প্রাণীর ফসিল পাওয়া গেছে চিনের জায়েন্ট পান্ডাদের বিলুপ্ত পূর্বপুরুষদের জায়গাতেই, অর্থাৎ এরা মূলত বাঁশ, এবং বিভিন্ন ফল ও শক্ত ডাঁটা খেয়ে বাঁচত। হিমালয়ের ওই উচ্চতায় এদের খাবার আসবে কোত্থেকে? ইন ফ্যাক্ট, প্লিসটোসিন যুগে আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে এদের পরিবেশ ও আবহাওয়া বদলে যাওয়ার পর তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরেই তো এরা বিলুপ্ত হয়। তাই ইয়েতি আমাদের কোনো ভুলে-বিছড়ে আত্মীয়, এটা ঠিক মেনে নেওয়া যাচ্ছে না”।

ঘরে সবাই চুপ-চাপ হয়ে গেছে দেখে আমি আবার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

“ডিসেম্বর ২০০৭-এ অ্যামেরিকান টেলিভিশন প্রেজেন্টার জোশুয়া গেটস তাঁর ‘ডেস্টিনেশন ট্রুথ’ নামক টিমের সঙ্গে এভারেস্ট এলাকায় পৌঁছন। তিনি পরে দাবি করেন যে তাঁরা এমন বেশ কিছু পায়ের ছাপ দেখেছেন, যেগুলো লম্বায় ৩৩ সেন্টিমিটার বা ১৩ ইঞ্চি, আর পাঁচটা আঙুল নিয়ে চওড়ায় প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার বা ৯.৮ ইঞ্চি। সেই ছাপগুলোর কাস্ট পর্যবেক্ষণ করে ইডাহো স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যানথ্রোপলজিস্ট ও অ্যানাটমিস্ট ডক্টর জেফ্রি মেলড্রাম প্রথমে ছাপগুলোকে ‘আসল’ বললেও পরে মত বদলান। পরে গেটস ২০০৯-এ আবার এভারেস্ট অভিযানে গিয়ে কিছু লোম সংগ্রহ করেন, যেগুলোর জিনগত বিশ্লেষণ করে জানা যায় যে সেটা এখনও অজানা তথা ডেটাবেসে রেকর্ড নেই এমন কোনো প্রাণীর।

এরপর আরো বেশ কিছু এক্সপিডিশন হয়েছে নানা জায়গায়। কখনও ভুটানের পাহাড়ে, কখনও চিনের হুবেই প্রদেশের শেনংজিয়া জঙ্গলে, কখনও বা মেঘালয়ের গারো পাহাড়ে! কিন্তু ইয়েতির মুখোমুখি হওয়া শুধু রোমহর্ষক গল্প-উপন্যাসের বিষয় হয়েই রয়ে গেছে”।

একদম চুপচাপ হয়ে গেছিল ঘরটা। বাইরে কলকাতা ভিড়ে হয়রান। প্রিয়া থেকে অ্যাক্রোপলিস, সব হল থেকে তখন দর্শকেরা যাবতীয় লেনদেন ফুরোনোর পর আনন্দ বা হতাশা বুকে নিয়ে, বাড়ি বা নিকটতম পুজোপ্যান্ডেলের দিকে এগোচ্ছেন।

কিন্তু আমাদের ইয়েতি অভিযান তখনও “শেষ হয়ে হইল না শেষ” অবস্থায় রয়েছে, এটা আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম।

এবং ঠিক সেটাই হল। নীরবতা ভেঙে এবার তোশালি রীতিমতো প্রতিবাদ করল, “তাহলে তুমি সেদিন যে গল্পটার কথা বলছিলে, সেগুলো কি সব বানানো?”

বিপন্ন হয়ে শ্রীমতীর দিকে তাকালাম এই আশায়, যে ‘খাবারগুলো গরম করতে হবে’ বলে তাগাদা দিয়ে সে হয়তো আসরটা ভাঙতে সাহায্য করবে। কিন্তু দেখলাম সেই জ্যাগারিতে স্রেফ স্যান্ড হয়ে গেল, মানে তিনিও এবার গলায় বিদ্রোহ ফুটিয়ে বললেন, “তাহলে ছোটোবেলা থেকে পড়া ওই লেখাগুলো কী নিয়ে ছিল?”

আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর কাকাবাবু-সন্তু অ্যাডভেঞ্চার “পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক”, শেখর বসু-র রুদ্ধশ্বাস সাসপেন্সে ভরা “ইয়েতির মুখোমুখি”, এবং একেবারে সম্প্রতি হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত-র লেখা ক্রিপ্টোজুলজিস্ট জুটি হেরম্যান-সুদীপ্তর কাহিনি “বরফদেশের ছায়ামানুষ”, আনন্দমেলার পাতায় পড়া এই রোমাঞ্চকর উপন্যাসগুলো আমাদের নিয়ে গেছে কলকাতার এই ভ্যাপসা গরম থেকে অনেক দূরে, শীতল মৃত্যু আর অজানা বিপদে ভরা এক প্রান্তরে, বারবার। শুধু হাওয়ায় ভর দিয়ে লেখা হয়েছে এইসব কাহিনি, এটা মানা কি সহজ?

“ইয়েতি নিয়ে বিভিন্ন অভিযান চালানোর সময় থেকেই বারবার বলা হয়েছে”, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার কথা শুরু করি আমি, “যে, এই কিংবদন্তীগুলোর উৎস হল এই এলাকার কোনো-না-কোনো ভালুক, যাদের সম্বন্ধে বিস্তৃত রেকর্ড বিজ্ঞানী ও অভিযাত্রীদের কাছে নেই। কখনও ভাবা হয়েছে যে সে হল হিমালয়ান ব্রাউন বিয়ার (Ursus Arctos Isabellinus), কখনও বা তাকে গোলানো হয়েছে টিবেটান ব্লু বিয়ার (Ursus Arctos Pruinosus)-এর সঙ্গে।

ইয়েতির সন্ধানে ১৯৮৩ সালে বারুন ভ্যালিতে চালানো অভিযানের পর টেইলর, ফ্লেমিং, জন ক্রেইগহেড ও তীর্থ শ্রেষ্ঠ একটা থিওরি দেন। নেপালের মাকালু-বারুন ন্যাশনাল পার্ক এবং তিব্বতের চোমোলংমা ন্যাশনাল পার্ক এলাকায় গবেষণা চালিয়ে এশিয়াটিক ব্ল্যাক বিয়ার (Ursus Thibetanus), যার গায়ের লোমগুলো আসলে বাদামি, সম্বন্ধে প্রথমবার বিজ্ঞানীরা অনেক কিছু জানতে পারেন।

এই ভালুকেরা জন্মের পর থেকে প্রথম দু’বছর, মাটিতে হেঁটে বেড়ানো হিংস্র বিশালদেহী পূর্ণবয়স্ক তথা গ্রাউন্ড-বিয়ারদের হাত থেকে বাঁচার জন্য, গাছের ওপরে থাকে, তাই তাদের স্থানীয় অধিবাসীরা ট্রি-বিয়ার বলে। এই সময়ে তারা তাদের হাতের নখগুলো ভেতর দিকে বেঁকে আসার বদলে বাইরের দিকে নিয়ে আসতে শেখে, যাতে গাছে ঝোলার জন্য প্রয়োজনীয় অপোজিবল গ্রিপ তাদের আয়ত্ত হয়।

এরাই যখন বড়ো হয়ে মাটিতে, বা বরফে হাঁটে, তখন পেছনের পা বা থাবা ঠিক সামনের পা’র দাগের ওপরেই পড়ে। এর ফলে একে তো একটি চতুষ্পদের চলন দ্বিপদের মতো মনে হয়, তার ওপর বরফে পায়ের ছাপের আঙুলের জায়গাটা গভীর হয়ে বাইরের দিকে ছড়িয়ে যায়, বিশেষত ভালুকটি যদি তখন ওপর দিকে ওঠার অবস্থায় থাকে। ফলে আদতে খুব বেশি হলে ১৯০ সেন্টিমিটার উচ্চতার আর ১০০ সেন্টিমিটার কাঁধের একটা ভালুকের পায়ের ছাপ এমনভাবে বরফের বুকে তৈরি হয় যে প্রথম দর্শনে মনে হতে বাধ্য যে এটা কোনো, বুড়ো আঙুল বিশিষ্ট, হেলেদুলে দু’পায়ে হাঁটা হোমিনয়েডের পায়ের ছাপ!”

“তার মানে”, শুকনো গলায় বলল মধুরিমা, “আসলে ইয়েতি বলে কিছু নেই? সবটাই ভালুক-কে নিয়ে ভুলভাল ভাবনা?”

“হ্যাঁ”, একটু দুঃখিত গলাতেই বলতে বাধ্য হলাম আমি, “এই গবেষণা, এবং ইয়েতি নিয়ে প্রচলিত যাবতীয় কিংবদন্তী, মায় তার বিভিন্ন নামের ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে ড্যানিয়েল সি টেইলর ‘ইয়েতি: দ্য ইকোলজি অফ আ মিস্ট্রি’ বইয়ে সন্দেহাতীত ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ইয়েতি বলে আসলে কিচ্ছু নেই, সবটাই ওই ভালুকীয় ব্যাপার।

১৯৯২ সালে মালদ্বীপের ডাক বিভাগ ইয়েতি-কে মহাবিশ্বের রহস্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একটা ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিল।

কিন্তু মে ২০১৬-তে কিরঘিজ রিপাবলিকের পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রক একজোড়া স্ট্যাম্প প্রকাশ করে, যাদের দেখলেই বোঝা যায় যে ইয়েতি আজ প্রতিষ্ঠানের নজরে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।

“তার মানে এভারেস্ট নামক পাহাড় চূড়ায় আর আতঙ্কের কিছু নেই, তাই তো?”, সোফা ছেড়ে উঠে রান্নাঘর-মুখো হতে-হতে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেন শ্রীমতী।

“মোটেই নয়”, জোর গলায় বলে উঠি আমি।

বাকিরাও একটু থমকে যায়। গল্পের আশায় ক্লান্ত চোখগুলো আবার চকচকিয়ে ওঠে।

“১৯৫৩ সালে স্যার এডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নোরগে-র সেই ঐতিহাসিক শৃঙ্গবিজয়ের পর থেকে এখনও অবধি, শুধু সরকারি স্ট্যাটিস্টিকস অনুসারেই মাউন্ট এভারেস্টের মাথায় পা পড়েছে চার হাজারেরো বেশি অভিযাত্রীর। এখন, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, এবং উন্নততর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে প্রতি বছর দেড়শোর বেশি অভিযাত্রী এভারেস্ট উঠতে চেষ্টা করেন।

এর ফলে দুটো স্ট্যান্ডার্ড রুট, মানে তিব্বতের দিকে নর্থ-ইস্ট রিজ ও নেপালের দিকে সাউথ-ইস্ট রিজ, বিপজ্জনক রকম ভিড়ে প্রায় জ্যামজমাট হয়ে পড়েছে।

তবে তার থেকেও বড়ো কথা হল দূষণ।

যেহেতু এভারেস্টে চড়ার সময় একটা স্তরের পর নিতান্ত প্রয়োজনীয় ছাড়া কোনো জিনিস বহন করাই বিপজ্জনক ও ব্যয়সাপেক্ষ, তাই নিরুপায় হয়েই পর্বতারোহীরা ৮০০০ মিটার বা ২৬,০০০ ফুট উচ্চতার ‘এক্সট্রিম অল্টিট্যুড’ জোনে পৌঁছে অক্সিজেনের খালি সিলিন্ডার, খাবারের প্যাকেট, অকেজো জিনিসপত্র, এবং অন্য নানা জৈব ও অজৈব বর্জ্য ফেলে আসতে বাধ্য হন। এর ফলে পাহাড়ের পরিবেশ এতটাই বিঘ্নিত হতে থাকে যে নেপাল সরকার ২০১১ সালে শেরপাদের সংগঠন ‘এভারেস্ট সামিটিয়ার্স অরগানাইজেশন’-এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এভারেস্ট এলাকা থেকে প্রায় দেড় টন আবর্জনা সরিয়ে কাঠমান্ডুতে পাঠায় ট্রিটমেন্টের জন্য। পর্বতারোহীদের ওপর চার হাজার ডলার অবধি ফাইন-ও চাপানো হয়, যদি তারা নিজেদের বর্জ্য নিজেদের সঙ্গে ফিরিয়ে না আনে।

তিব্বতের দিকে রাস্তা কঠিন বলে পর্বতারোহীর সংখ্যা কম। সেই তুলনায় তিব্বতের এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে বিদেশি ট্যুরিস্টরা আসে গাড়িতে চেপে, এভারেস্টের দৃশ্য উপভোগ করতে। তাই সেই দিকে দূষণের চরিত্র একেবারে আলাদা। তাতেও চোমোলংমা ন্যাশনাল নেচার রিজার্ভ-এর কর্মীদের সম্প্রতি চারশো ব্যাগ আবর্জনা সরাতে হয়েছে ওদিক থেকে!

হ্যাঁ, একথা ঠিক যে এখন মানুষের সচেতনতাও বাড়ছে। ফলে অভিযাত্রীদের পথের গ্রামগুলোতেও এখন সৌরশক্তির ব্যবহার হচ্ছে, বিস্তীর্ণ এলাকায় প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়েছে।

কিন্তু বিপদ আছেই। তাছাড়া চিন সামরিক ও অর্থনৈতিক কারণে রেলপথ নিয়ে আসছে হিমালয়ের কাছে, আরো কাছে। তার দূষণ মাউন্ট এভারেস্টে পৌঁছনো ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ওটা ঠেকাতে না পারলে ওই এলাকার পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি ঠেকানো যাবে না”।

“তাই”, অবশেষে নিজের সিট ছেড়ে ডাইনিং টেবিল-মুখী হয়ে আমি বলি, “ইয়েতি হোক বা অন্য কোনো প্রাণী, যেই ওখানে থাকুক, তারা সবাই আপাতত মানুষের কীর্তির ঠেলাতেই সন্ত্রস্ত হয়ে আছে”।

“তাহলে মানুষই কি এখন পাহাড় চূড়ার আতঙ্ক?”, জানতে চায় মেঘনা।

বারান্দার বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে নজরটা পিছলে যায় আমার, আর চলে যায় দূরে, অনেক দূরে, ধূ-ধূ বরফের বুকে, যেখানে…

যেখানে একদল দুপেয়ে তার ঘরবাড়ি নোংরা করে চলেছে দেখে রেগে আগুন হয়ে উঠেছে ধূসর আর গাঢ় রঙের লোমে ঢাকা একটি লম্বা, বলশালী প্রাণী।

আর গর্জন তুলে ছুটে আসছে নিচে পিঁপড়ের মতো করে হেঁটে যাওয়া সার বাঁধা পর্বতারোহীদের দিকে।

তারপর…

“কী গো?”, বিরক্তি আর উদ্বেগ মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করেন শ্রীমতী, “খাবার ঠাণ্ডা হচ্ছে যে!”

চটকা ভাঙে আমার। কিন্তু কিছুতেই ভুলতে পারি না দৃশ্যটা।

আজও এই পৃথিবীর বুকে তো কত রহস্যই আছে। তেমনভাবেই যদি কেউ, বা কিছু থেকে যায় ওই পাথর, বরফ, আর আকাশের দেশে…

তাহলে ক্ষতি কী?

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s