বৈজ্ঞানিকের দপ্তর প্রতিবেশী গাছ-শোভাঞ্জনা বা সজিনা অপূর্ব চট্টোপাধ্যায় বর্ষা ২০১৮

প্রতিবেশী গাছ সব পর্ব একত্রে

শোভাঞ্জন বা সজিনা

সজিনা গাছের নাম যে শোভাঞ্জন তা আমার জানা ছিল না তাই শ্রদ্ধেয় শিবকালী ভট্টাচার্য মশায়ের “চিরঞ্জীব বনৌষধি” বইটির প্রথম খণ্ড হাতে নিয়ে গাছটি খুঁজতে একটু সময় লেগেছিল। শিবকালীবাবু এই গাছের ভেষজগুণ সম্বন্ধে যথেষ্ট বিশদ ভাবেই লিখেছেন। গবাদি পশুর ভেষজ চিকিৎসা বিষয়ে খোঁজ করতেই আমার এক সহপাঠী সজিনা গাছের অশেষ গুণ বিষয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। আমার বন্ধু, গবাদি পশুর চিকিৎসা করতেন গ্রামগঞ্জে। এখন অবসর নিয়েছেন। উনি সজিনা গাছ সম্বন্ধে আমাকে জানানোর পরই আমার মনে পড়ল প্রতি বছর কালীপূজা উপলক্ষে গ্রামের বাড়ি যাই। পূজার এক সপ্তাহ আগে গ্রামে যেতে হয় প্রস্তুতির জন্য। বাড়িতে পরিবারের কেউ থাকে না তাই সারা বছর বন্ধই থাকে বাড়ি।

বাগানে এবং বাড়ি সংলগ্ন পথের ধারে বেড়ে ওঠা সজিনা গাছের কাণ্ডে এই সময় শয়ে শয়ে শুঁয়ো পোকা বাসা বাঁধে। এই পোকাগুলির (শুককীট বা লার্ভা) গায়ে অজস্র শুঁয়ো (তীরের মত কাঁটা) থাকে যা মানুষের দেহে বিশেষ করে ছোট্ট ছেলেদের নরম পায়ের তলায় বিঁধে যায়। শুরু হয় জ্বলুনি। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে যায় শুঁয়ো হতে নির্গত রাসায়নিকের জন্য। এই শুঁয়োগুলি এক একটি সরু সূচ বা নলের মত। প্রতিটি শুঁয়োর গোঁড়ায় থাকে একটি থলি যার মধ্যে ক্ষারীয় বা অম্ল-রস থাকে। নল ভেঙ্গে গেলে এই রস দেহে প্রবেশ করে প্রচণ্ড জ্বালার সৃষ্টি করে। তাই সজিনা গাছ সম্বন্ধে আমার ভীতি রয়েই গেছে।

সামান্য কয়েক বছর আগেও সজিনা গাছ গ্রামাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে দেখা যেত। বর্তমানে তা অনেক কমেছে। যদিও এই গাছের মোটা ডাল মাটিতে পুঁতে দিলে গাছ হয়ে যায়। দুঃখের কথা এই গাছের পাতার অজস্র গুণের কথা আমরা মনে রাখি না। এদেশে শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে। সজিনা গাছের পাতা খাওয়ালে এই রোগ অনেকাংশে দূর হয়ে যায়। এর জন্য কোন খরচ হয় না। অথচ তা না করে দামী দামী ওষুধ খাওয়ানোর কথাই ভাবা হয়।

অশেষ গুন থাকা সত্ত্বেও এই গাছটি আমরা সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারি নাই। বলা বাহুল্য অতি অল্পই ব্যবহার করেছি আমরা বা অনেক ক্ষেত্রে অবজ্ঞা করেছি। নরম কাণ্ড যুক্ত এই গাছটি অতি দ্রুত বাড়ে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এই গাছটির আদি বাসস্থান ভারতবর্ষ। এই গাছের পাতায় হেন জিনিষ নেই যা নেই যেমন ট্যানিন, স্টেরল, টারপিনেড, ফ্লাভোনয়েড, স্যাপোনিন, এলকালয়েড, ক্যান্সার-রোধী পদার্থ (গ্লুকোসাইনোলেটস, আইসোথায়োসায়ানেটস), ইত্যাদি। প্রাচীন আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় এই গাছ ৩০০ ধরণের রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। ফিলিপাইন দ্বীপের অধিবাসীরা এই গাছকে ‘মায়ের শ্রেষ্ঠ বন্ধু’ বলেছে। পাতা রান্না করে শিশুদের খাওয়ানো হয়। এই গাছের বিজ্ঞান সম্মত নাম Moringa oleifera

সজিনা মাঝারি মাপের গাছ। এটি হিমালয়ের পাদদেশে জন্মে। বর্তমানে ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্র এই গাছ দেখতে পাওয়া যায়। ভারতবর্ষ ছাড়া পাকিস্থান, আফগানিস্থান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, দক্ষিণ পূর্ব এবং পশ্চিম এসিয় দেশ সমূহ, আরব, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফ্রিকার পশ্চিম দিকের দেশগুলি, উত্তর আমেরিকা, মেক্সিকো থেকে পেরু পর্যন্ত এবং দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল ও প্যারাগুয়েতে এই গাছ পাওয়া যায়।

সজিনা গাছ

  • কাণ্ড ও পাতা – সজিনা গাছের পাতা নরম। একটি পাতা কয়েকটি পত্রগুচ্ছের সমাহারে গঠিত। সরু গাছের ডাল সবুজ এবং নরম। ডাল বড় হলে শক্ত হয়ে যায়। গাছের কাণ্ড ছাই রঙের।
  • ফুল – ফুলের রং সাদা। গাছ লাগানোর আট দশ মাস পর থেকে ফুল ফুটতে শুরু করে। সারা বছরই গাছে ফুল ফোটে।
  • ফল – সজিনা গাছের ফলকে ডাঁটা বলে। এগুলি লম্বা, নলাকার। প্রথম অবস্থায় সরু, নরম এবং উজ্জ্বল সবুজ বর্ণের। ডাঁটার বৃদ্ধির সাথে সাথে মোটা, বড় এবং শক্ত হয়ে যায়। রং উজ্জ্বল সবুজ থেকে গাঢ় বা কালচে সবুজ বর্ণের হয়।
  • বীজ – ফলের মধ্যে বীজ থাকে। পাকা বীজের রং গাঢ় বাদামী। শক্ত। বীজের গায়ে পাতলা কাগজের ন্যায় ডানা থাকে যা বীজকে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে।

এই গাছের সকল অংশের ভেষজ বা অন্য গুণ রয়েছে যা বিভিন্ন ভাবে ব্যবহৃত হয়। এই সব ব্যবহারগুলির কয়েকটি সংক্ষেপে নীচে লিপিবদ্ধ করা হল।

  • পাতা – বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় পাতার ব্যবহার রয়েছে যেমন ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, ক্রিমি সংক্রমণ, ডায়াবেটিস, কাটা ছেঁড়া, ত্বকের রোগ, ইত্যাদি। রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ানোর জন্য পাতা খাওয়ানো হয়। তাছাড়া গ্রামাঞ্চলে গবাদি পশুর দুধ বৃদ্ধির জন্য খাবারের সঙ্গে সজিনা গাছের পাতা মিশিয়ে খাওয়ানো হয়।
  • বীজ – সজিনা ফলের বীজ স্বাস্থ্যবর্ধক। বীজ থেকে তেল উৎপাদন হয়। জলের বিশুদ্ধিকরণের জন্য বীজে ব্যবহার করা হয়। জলের নোংরা পদার্থ থিতিয়ে পড়াতে সাহায্য করে সজিনার বীজ।
  • বল্কল – সজিনা গাছের ছাল ছাড়িয়ে সেটি জলে সিদ্ধ বা অ্যালকোহলে ডুবিয়ে রেখে যে নির্যাস পাওয়া যায় সেটি পেটের ব্যাথা, আলসার, দৃষ্টিহীনতা, গাঁটের ব্যাথা, রক্তাল্পতা, দাঁতের ব্যাথা, এনিমিয়া, ডায়াবেটিস, ইত্যাদি রোগে প্রয়োগ করা হয়।
  • গাছের মূল – গাছের মূল জলে সিদ্ধ বা অ্যালকোহলে ডুবিয়ে রেখে প্রাপ্ত নির্যাস দাঁতের ব্যাথা, ক্রিমি সংক্রমণ এবং জ্বরের প্রতিষেধক রূপে ব্যবহার কর হয়।
  • সজিনা ফুল – সজিনা ফুল থেকে প্রাপ্ত রাসায়নিক পদার্থ পেশীর ব্যাথা, ফোলা, টিউমার, প্লীহা বৃদ্ধি প্রতিরোধে ব্যবহার হয়।
  • ফল – ফলগুলি স্বাস্থ্যবর্ধক। পাতা, ফল ও বীজ স্বাস্থ্যকর খাদ্যও বটে।
  • বায়ো-ফুয়েল – বিজ্ঞানীরা সজিনা ফলের বীজ থেকে বায়ো-ফুয়েল আহরণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
  • বায়ো-পেস্টিসাইড এবং ফাঞ্জিসাইড – পাতা এবং বীজের নির্যাস থেকে বিজ্ঞানীরা শস্যের ক্ষতিকারক পোকা ট্রাইকোডারমা গ্রানেরিয়ামের (Trichoderma granarium) শুককীট ও পূর্ণাঙ্গ দশার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে সুফল পেয়েছেন। তাছাড়া কাঠ বাদাম গাছের ছত্রাকের উপদ্রব কমাতে সক্ষম হয়েছেন।
  • গবাদি পশুর দুগ্ধ বৃদ্ধি – গবাদি পশুর খাবারের সাথে সজিনা গাছের পাতা খাওয়ানোর জন্য গবাদি পশুর দুধের পরিমাণ যথেষ্ট বৃদ্ধি ঘটে (৪৩ – ৬৫%) বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।
  • বেড়া দেওয়া – দক্ষিণ ভারত ও থাইল্যান্ডে বাগানের সীমানা বরাবর সজিনা ডাল পুঁতে বেড়া দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে।
  • হাইতি দ্বীপের অধিবাসীরা ঘনবদ্ধভাবে সজিনা গাছ পুঁতে ঝোড়ো হাওয়া আটকানোর চেষ্টা করে থাকেন।
  • সার হিসাবে ব্যবহার – সজিনা ফলের বীজ থেকে তেল নিষ্কাশনের পর বীজের ছিবড়া সার হিসাবে ব্যবহার করা হয়।
  • হ্যান্ড ওয়াস – সজিনা গাছের পাতার গুড়ো হাত ধোয়ার কাজে (হ্যান্ড ওয়াস) ব্যবহার কর হয়।

এই গাছ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে মনে পড়লো এক দশক আগের একটি ঘটনা। পুরানো মন্দির দেখতে কাটোয়া মহকুমার একটি গ্রামে গেছিলাম। গ্রামের নাম শ্রীবাটি। শ্রীবাটির চন্দ্র পরিবারের পূর্ব পুরুষেরা মন্দিরগুলি তৈরি করেছিলেন। রয়েছে মন্দির সংলগ্ন বড় বড় বাড়ি। আজ সেই বাড়িগুলির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। এমন একটি বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েছিলাম। বড় বাড়িটির মাঝখানে প্রশস্ত উঠান। উঠানের চার দিকে ঘর। উঠানের এক দিক বরাবর রয়েছে কয়েকটা লম্বা সিঁড়ি। সিঁড়ি উঠে প্রশস্ত চত্বর। এই চত্বরের আচ্ছাদনকে ধরে রাখার জন্য রয়েছে বড় বড় থাম, উপরে ছিল কড়ি বরগা। ঠিক যেমনটি বইয়ের ছবিতে দেখি গ্রীক-রোমান সাম্রাজ্যের প্রাসাদের। তবে আজ আর তা নেই, অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছে কবে। বাড়ির দেওয়ালের পলস্তারা খসে পড়েছে অনেক কাল আগে। অনেক দরজা জানলার কবাট হয়েছে অদৃশ্য। বেশির ভাগ ঘর বন্ধ। কেউ বাস করেন বলে মনে হয় না। বোঝা যাচ্ছে বহু আগে এই পরিবারের মানুষেরা ধনী ছিলেন।

চোখে পড়লো এক জন মহিলা উঠানের ধারে সিঁড়িতে বসে শাক বাছছেন যেন। একটু দূর থেকে দেখে সেদিন বুঝতে পারি নি তিনি সঠিক কী করছেন। যে ফোটো সেদিন তুলেছিলাম বাড়ি ফিরে সেগুলি দেখে বুঝেছিলাম উনি সজিনা শাক (পাতা) বাছছিলেন। ছবি দেখে মনটা ভারাক্রান্ত হয়েছিল। বুঝলাম আজ অবস্থা পড়ে গেছে তাই আহার্য শুধু সজিনা শাক। আজ ভাবি, এই সব দুঃস্থ মানুষদের বাঁচিয়ে রেখেছে সজিনা পাতা। অথচ আমরা প্রাণদায়ী এই সজিনা গাছের প্রতি যথার্থ নজর দিই না।

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s