বৈজ্ঞানিকের দপ্তর বাগ্মী হকিং-২ অরূপ ব্যানার্জি বর্ষা ২০১৯

বাগ্মী হকিং– পর্ব ১

ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-সব লেখা একত্রে 

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ব্রহ্মাণ্ডে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গিয়েছেন প্রফেসর স্টিফেন হকিং ১৯৯৬ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর এক বক্তৃতায়। এ প্রসঙ্গের উত্থাপন করে তিনি নিজেই দুটি প্রশ্ন করেন,

এক – ব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা কতটা?

দুই – ভবিষ্যতে জীবজগতের বিকাশ কীভাবে হতে পারে?

প্রশ্ন দুটির উত্তরও আমরা ডক্টর হকিং-এর মুখ থেকে জানতে পারি তার এই বক্তৃতায়। তিনি বলেন, “সাধারণ অভিজ্ঞতায় আমরা জানি, যেকোনো পরিস্থিতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি বিশৃঙ্খল হয়ে যায়, যাকে বলা হয় ডিসঅর্ডার। এই অবস্থাকে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সুত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এই সুত্র বলে, মোট বিশৃঙ্খলা বা এনট্রপি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েই চলে।

এবার আমরা এন্ট্রপির বিষয়টাকে একটু ভালো করে খুঁটিয়ে দেখি। আকাশে জেট প্লেন উড়ে যাওয়ার সময় সে তার পেছনে একটা সাদা রেখা ছেড়ে যায়। তার ইঞ্জিনের থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার বাষ্প ঊর্ধ্বাকাশের ঠাণ্ডায় জমে যাবার ফলেই এমনটা হয়ে থাকে। এইবার খানিক বাদে দাগটা কেমন খানিক এলোমেলো হতে থাকে। কেন? কারণ ওর মধ্যে যে বস্তুর কণাগুলো থাকে তারা তো এদিক ওদিক নড়াচড়া করছে। ফলে ক্রমশই ছড়িয়ে যাচ্ছে তারা। যত সময় যায় ততই এই প্রক্রিয়াটা চলতে থাকে। তারপর একসময় সেই ধোঁয়ার বস্তুকণাগুলো আর একেবারেই একসঙ্গে শৃঙ্খলা মেনে না থেকে, বিশৃঙ্খলভাবে অনেকটা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। আর আমরা দেখি ধোঁয়ার দাগটা এবড়োখেবড়ো হয়ে চওড়া আর হালকা হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল। গোটা বিশ্বব্রহ্মান্ডে যত বস্তু আর শক্তি আছে তারাও কিন্তু এই একই ধর্ম মেনে চলে। শক্তি ক্রমশ হালকা থেকে আরো হালকা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। (সূর্যের কাছাকাছি শক্তির ঘনত্ব বেশি তাই বেশি গরম, যত দূরে যাবে ততই ঘনত্ব কমে আর ফলে তাপ কম লাগে।) বস্তুও ক্রমশ ঘন আর দলাপাকানো অবস্থা থেকে ভেঙেচুরে গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। (নক্ষত্ররা মরে যায়, আর তারপর তাদের শরীরের একটা বড়ো অংশ বিস্তীর্ণ মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে মিশে যায়) অর্থাৎ  ব্রহ্মাণ্ডের বিশৃঙ্খলা বা এনট্রপি বাড়ে। 

তবে ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী এই এনট্রপি বেড়ে যেতে থাকলেও কোথাও কোথাও স্থানীয়ভাবে এর উলটোটাও ঘটে। যেমন নদীর স্রোত। সে ধেয়ে চলেছে একই দিকে। কিন্তু কোথাও একটা স্টিমার গেলে তার ধাক্কায় ছলাৎ ছলাৎ করে উলটোদিকে সামান্য একটু জল ছিটকে ওঠে মাঝে মাঝে। আসলে ওই স্টিমারের গতিটা স্থানীয়ভাবে তার কাছের জলের ভেতরে একটু শক্তি দিচ্ছে তাকে উলটো নিয়মে চলবার জন্য। তবে সেই উলটোপথে খানিক ছলাৎ করলেও আসলে তাকে ফিরে আসতে হয় মূল স্রোতের দিকেই।

মহাকাশেও তেমনি ছড়িয়ে থাকা অজস্র বস্তুকণা হঠাৎ হঠাৎ ঘুরতে ঘুরতে কাছাকাছি চলে এলে মাধ্যাকর্ষণের শক্তিতে ভর করে এনট্রপির বিরুদ্ধে একটা জোট বেঁধে ফেলে। সেই জোট বড়ো আর আরো ঘন হয়ে উঠে জন্ম দেয় নতুন নক্ষত্রের। এই ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে এনট্রপি উলটোপথে চলছে। (তবে সে আর কতক্ষণ! কয়েকশো কোটি বছর সেই উলটো পথে জ্বলে থেকে ফের তা মরে গিয়ে এনট্রপি বাড়বার মূল স্রোতে ফিরে আসে।

অর্থাৎ বলা যায়, বিশ্বব্যাপি ক্রমবর্ধমান এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলার ভেতরে কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা বা সিস্টেমে শৃঙ্খলা বাড়তে পারে যদিও তার চারপাশের পরিবেশে ঘটে বিশৃঙ্খলা। আর, ঠিক এমনটাই ঘটে প্রাণিজগতের শরীর সৃষ্টির সময়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অণুপরমাণুদের একত্র করে একটা শরীর, অন্য একটা  শৃঙ্খলাবদ্ধ শরীর গড়ে তোলে খানিকটা সময়ের জন্য।

তাই জীবনকে বলা যেতে পারে একটা শৃঙ্খলিত ব্যবস্থা, যা নিজেকে গড়ে তোলার ক্ষমতা রাখে। অর্থাৎ সে নিজের মতো আর একটি শৃঙ্খলিত জীবদেহকে জন্ম দেওয়ার কাজে দক্ষ। আর, এই যে এনট্রপির উলটো পথে যাওয়া  এইটি করতে গেলে তাকে অন্য শক্তি থেকে খাবার বা তড়িৎশক্তি তৈরি করতে হবে, যার থেকে উৎপন্ন হবে তাপশক্তি। আর তাকেই কাজে লাগাবে সে প্রকৃতির নিয়মের উলটোপথে এই ক্ষণস্থায়ী যাত্রার জন্যে।

জীবনসৃষ্টির গোড়ায় ঠিক এই পদ্ধতিতেই কিছু অণু, বেড়ে চলা এনট্রপির উলটো পথে হেঁটে নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ফেলেছিল, হয়ত বিদ্যুৎচমক বা সেইরকম কোন উৎস থেকে শক্তি টেনে নিয়ে। তার পর থেকে তারা ক্রমাগত সেই কৌশলটা করে চলেছে। তাদের একদল এনট্রপির সাধারণ সূত্র মেনে ফের বিশৃঙ্খলায় ফিরে যাবার আগে নিজের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আরেকদল শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবদেহ সৃষ্টি করে রেখে যাচ্ছে। এই শক্তির উৎস হল বিপাক আর এই সৃষ্টির নাম প্রজনন। এই দুই ডানায় ভর করে এনট্রপির অমোঘ নীতির উলটো পথে হেঁটে বয়ে চলেছে জীবনের ধারা।

হকিং-এর মতে, এইভাবে প্রাণী নিজের ও তার প্রজন্মের শরীরে শৃঙ্খলা বাড়াতে গিয়ে পরিবেশে নিয়মভাঙা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে চলছে। জীবের শরীরে দুটি ব্যবস্থার কথা শোনালেন তিনি। এক, কতগুলি নির্দেশ — যা জীবজগতকে বেঁচে থাকতে এবং  প্রজনন করতে সাহায্য করে। দুই — যে ব্যবস্থা সেই নির্দেশাবলী পালন করবার সুযোগ করে দেয়। জীববিজ্ঞানে এই দুটি ব্যবস্থাকে নাম হল জিন ও বিপাক। কিন্তু তাঁর মতে, ব্যাপারটির মধ্যে একটুও জীববিজ্ঞান নেই। আবার অন্যদিকে কম্পিউটর ভাইরাস একটা প্রোগ্রাম, যার মধ্যে আছে নিজেকে নকল করে নেবার ক্ষমতা। আবার সেই ভাইরাস এক কম্পিউটর থেকে আর এক কম্পিউটরে ছড়িয়ে পড়তেও পারে। কিন্তু জ্যান্ত ভাইরাসের মতো এই কম্পিউটর-ভাইরাসের নিজস্ব বিপাক প্রক্রিয়া নেই। কাজেই তার জিন আছে, কিন্তু বিপাক নেই। বরং যে কম্পিউটরকে সে আক্রমণ করে, তার বিপাক প্রক্রিয়া একেবারে ওলট পালট করে দেওয়ার ক্ষমতা সে রাখে।  কিছু মানুষের মতে, জীবন্ত ভাইরাসকে প্রাণীজগতের মধ্যে ফেলা যায় না। যুক্তি দেওয়া হয় – ভাইরাসেরা আসলে পরজীবী, তারা স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। তাই হকিং-এর মতে — মানুষ সহ বেশির ভাগ প্রাণীই পরজীবী। কারণ বেঁচে থাকার জন্য তারাও অন্যের উপর নির্ভরশীল। কম্পিউটর-ভাইরাসকে জীব হিসাবে গ্রহণ করায় কোনও অসুবিধা নেই। এটিই তাঁর মতে – মানবসৃষ্ট একমাত্র বিধ্বংসীকর জীব।

হকিং বললেন, “আমরা জীবন হিসাবে যা ভেবে থাকি আসলে তা হল কার্বন শৃঙ্খল – অন্য অণু যেমন নাইট্রোজেন বা ফসফরাসের সঙ্গে মিলেমিশে কার্বনের বিভিন্ন যৌগ তৈরি করে থাকে। কার্বন ছাড়াও অন্য কোনও অণু — যেমন সিলিকন, জীবন সৃষ্টি করতে পারত। কিন্তু পৃথিবীতে জীবন সৃষ্টির ক্ষেত্রে কার্বন হচ্ছে সব অণুর চাইতে বেশি গ্রহণযোগ্য। কার্বনকে তার সহজাত ধর্ম নিয়ে টিকে থাকতে গেলে প্রয়োজন হচ্ছে কিছু ভৌত ধর্মের সূক্ষ্ম হেরফের ঘটানো। এই ভৌত ধর্মের সামান্য অদল বদলের কারণে কার্বন পরমাণুর কেন্দ্র অস্থিতিশীল হতে পারে বা তার চারিদিকে ঘূর্ণনরত ইলেকট্রন ভেঙে পড়তে পারে তার কেন্দ্রে।”

হকিং বললেন, প্রাথমিক ভাবে আমাদের মনে হতে পারে, ব্রহ্মাণ্ড একেবারে নিখুঁত ভাবে কেউ যেন ছন্দোবদ্ধ করে রেখেছে। এটাও মনে হতে পারে যে, এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড বানানোই হয়েছিল মানুষ তৈরির উদ্দেশ্যে। কিন্তু এমন ভাববার সময় দু’বার ভেবে নেওয়া উচিত। তিনি এই আলোচনা করতে গিয়ে নৃবিজ্ঞান নীতির উপর জোর দিলেন। বললেন, “স্বপ্রমাণের উপর ভরসা করে বলা যায় — যদি এই ব্রহ্মাণ্ড জীবনধারণের জন্য বানানো না হয়ে থাকে, তবে ‘ব্রহ্মাণ্ড কেন এত নিখুঁত ছন্দবদ্ধ’ — এই প্রশ্ন আমাদের মনে উদয় হবার কোনও জায়গাই থাকে না।”

নৃবিজ্ঞান নীতির দুই ব্যবহারিক দিকের কথার ইঙ্গিত দিলেন স্টিফেন। একটি শক্তিশালী দিক, অপরটি দুর্বল। শক্তিশালী নৃবিজ্ঞান নীতি অনুযায়ী অনেকগুলি ব্রহ্মাণ্ড থাকতে পারে, যাদের পৃথক পৃথক ভৌত ধর্ম আছে। কিছু কিছু ব্রহ্মাণ্ডে সেই ভৌত ধর্মের ধ্রুবক জীবন তৈরির মশলা হিসাবে কার্বন অণুর অস্তিত্ব মেনে নিতেই পারে।  যেহেতু কোনও একটি ব্রহ্মাণ্ডে আমাদের বেঁচে থাকতেই হবে, তাই সেখানে ভৌত ধর্মের সামঞ্জস্য দেখতে পেলে বিস্ময়ের কিছুই থাকতে পারে না। সামঞ্জস্য না থাকলে, আমাদের টিকে থাকা দায় হয়ে উঠবে।

কিন্তু হকিং এর মতে, নৃবিজ্ঞান নীতির শক্তিশালী রূপ খুব একটা যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে না। কারণ এই নীতি মেনে নিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের চালিকা শক্তির কার্যকারণের বিশ্লেষণ দেওয়া অসম্ভব। আর যদি সেই সব ব্রহ্মাণ্ড আমাদের ব্রহ্মাণ্ড থেকে আলাদাই হবে, তবে আমাদের ব্রহ্মাণ্ডে যা ঘটে চলেছে, ওই সব পৃথক ব্রহ্মাণ্ড কী তার প্রভাব আমাদের ব্রহ্মাণ্ডে ফেলতে পারে? তাই হকিং নৃবিজ্ঞান নীতির দুর্বল রূপটিই মেনে নিলেন আর দিলেন সৃষ্টি রহস্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

১৫০০ কোটি বছর আগে হয়েছিল মহাবিস্ফোরণ, যাকে আমরা ‘বিগ ব্যাং’ নাম দিয়েছি। ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সেই আদি পর্বে কার্বন পরমাণুর সৃষ্টি হয়নি। তখন ব্রহ্মাণ্ড এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে থাকবার মধ্যে ছিল প্রোটন আরে নিউট্রন। প্রোটন আর নিউট্রন কনার সংখ্যা তখন ছিল সমান সমান। যত ব্রহ্মাণ্ড সম্প্রসারিত হল, ততই সে ঠাণ্ডা হতে থাকল। মহাবিস্ফোরণের এক মিনিট পর তাপমাত্রা হয়ত কমতে কমতে একশো কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে গিয়েছিল। এই তাপমাত্রায় নিউট্রন ভেঙে যেতে শুরু করল। হকিং যুক্তি দিলেন — এইটাই যদি ঘটে থাকে তাহলে ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত বস্তুর সাধারণতম পদার্থ হাইড্রোজেনে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার কথা। অবশ্য কিছু নিউট্রন প্রোটনের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে হিলিয়াম সৃষ্টি করেছিল, যার কেন্দ্রে আছে দুটি প্রোটন ও দুটি নিউট্রন। কিন্তু অক্সিজেন বা কার্বন তৈরি হওয়া তখনো শুরু হয়নি। শুধুমাত্র হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম থেকে জীবন তৈরির উপাদান সম্ভব ছিল না। প্রাচীন এই সময়কালে এত উত্তপ্ত পরিবেশে পরমাণু একত্রিত হয়ে অণুর সৃষ্টি করতে পারেনি।

হকিং বললেন — ব্রহ্মাণ্ড হয়তো আরও সম্প্রসারিত হয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যেতে পারত। কিন্তু কোনও কোনও জায়গায় পরিবেশের ঘনত্ব অন্য জায়গার তুলনায় বেশি ছিল। ফলে, অতিরিক্ত বস্তুর মাধ্যাকর্ষণের জন্য ব্রহ্মাণ্ডের সম্প্রসারণ সে জায়গাগুলিতে তুলনামূলক ভাবে কম হল। কোথাও কোথাও একেবারে থেমে গেল। মহাবিস্ফোরণের দুশো কোটি বছর পর এই সব জায়গায় বস্তু ভেঙে পড়ে সৃষ্টি হল নক্ষত্র। আদিম সেই তারাদের অনেকেই আকারে সূর্যের চাইতে অনেক অনেক গুন বড় ছিল। তারা সূর্যের চাইতে অনেক বেশি উত্তপ্তও ছিল। কাজেই হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম পুড়িয়ে কার্বন, অক্সিজেন এমনকি লোহারও সৃষ্টি হল। কয়েক হাজার লক্ষ বছর পর সেই সব নক্ষত্র সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ল। রেখে গেল পরবর্তী প্রজন্মের নক্ষত্রের জন্মের উপাদান।

সরাসরি দূরের তারাদের দেখবার কোনও উপায় নেই। কিন্তু কিছু তারা — যেমন পালসার, ক্রমাগত বেতার তরঙ্গ নিঃসরণ করে চলেছে। পালসার থেকে এই বেতার তরঙ্গ নিঃসরণের মাত্রা কমবেশি হওয়ার কারণে আমরা বুঝতে পারি, তার চারিদিকে পৃথিবীর মতো বড় বড় গ্রহ পাক খেয়ে চলেছে নিরন্তর। হকিং-এর মতে, পালসারের চারিদিকে ঘূর্ণায়মান গ্রহে প্রাণ থাকবার সম্ভাবনা নেই, কেননা তারার সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর সেই গ্রহগুলিতে কোনও প্রাণীর বেঁচে থাকা দায় হয়ে উঠত। কিন্তু পালসারের চারিদিকে ঘুরতে থাকা গ্রহ দেখে অনুমান করা যায়, আমাদের নক্ষত্রপুঞ্জের দশ হাজার কোটি নক্ষত্রের মধ্যে কিছু গ্রহে অবশ্যই জীবের অস্তিত্ব থাকতে পারে। 

কীভাবে সৃষ্টি হল আমাদের সৌরমণ্ডল? হকিং বললেন, “আজ থেকে চারশো পঞ্চাশ কোটি বছর আগে, অর্থাৎ মহাবিস্ফোরণের প্রায় এক হাজার কোটি বছর পর, পূর্ববর্তী ভাঙা তারাদের বস্তু দিয়ে সৃষ্টি হয় আমাদের সৌরমণ্ডল। পৃথিবী সৃষ্টি হয় অপেক্ষাকৃত ভারী পদার্থ কার্বন, অক্সিজেন ইত্যাদি দিয়ে। যে কোনও কারণে, এই সব পরমাণু থেকে তৈরি হয় ডি এন এ অনু। এতে দুটি  পেঁচানো শৃঙ্খল আছে, যা নিউক্লিক এসিড দিয়ে তৈরি। চার রকমের নিউক্লিক এসিড আছে, এডেনিন, সাইটসিন, গুয়ানিন আর থায়ামিন। একটি ডি এন এ শৃঙ্খলে নিউক্লিক এসিডের পর্যায়ক্রম অপরটিতে হুবহু এক। দুটি শৃঙ্খল আলাদা হয়ে গিয়ে আরও নতুন শৃঙ্খল বানিয়ে নিতে পারে। ডি এন এ অনু জিনগত সংবাদ নিজের ভিতরে কোডিং এর মাধ্যমে বহন করে।  ডি এন এর অংশবিশেষ প্রোটিন ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ তৈরি আর নিজের হুবহু প্রতিলিপি তৈরি করার ক্ষমতা সে রাখে।”

ডি এন এ অণু কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, কেউ সঠিক ভাবে জানে না। হকিং-এর মতে, এলোমেলো বিশৃঙ্খলা থেকে ডি এন এ অণু হঠাৎ তৈরি হয়ে গিয়েছিল – এমন কথা বলা যাবে না। বিজ্ঞানীরা কেউ কেউ বলেন, অন্য জগত থেকে জীবন এসেছিল। তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কোনও নক্ষত্রপুঞ্জে জীবনের অস্তিত্ব আছে, একথাও মেনে নিতে হবে। যদিও মহাকাশের বিভিন্ন রশ্মির বিকিরণের দাপটে ডি এন এ বেঁচে থাকার ব্যাপার প্রায় অসম্ভব। আর যদি তারা বেঁচে গিয়েও থাকে, জীবনের রহস্যের গল্প তারা শোনাতে পারবে না, কারণ কার্বন তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর যত বয়স, তার দ্বিগুন সময় আগে।

এই ব্রহ্মাণ্ডের অগণিত তারামণ্ডলে পৃথিবী ছাড়াও অন্য কোথাও নিশ্চয়ই প্রাণ সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সব তারামণ্ডল এত দূরে দূরে ছড়িয়ে, পৃথিবীতেই যে জীবনের সৃষ্টি হয়, একথা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই, এমন কথা বললেন হকিং। বললেন, “যদি কোনও গ্রহে প্রাণ সৃষ্টি এক রকম অসম্ভব হয়েই থাকে, তবে সেটি ঘটতে অনেক অনেক সময় লাগার কথা। আরও ভাল ভাবে বোঝাতে গেলে, সেই প্রাণ সৃষ্টি হয়েছিল বিবর্তনের হাত ধরে আমাদের মতো বুদ্ধিমান মানুষের জন্ম দেওয়ার জন্য, যার বেঁচে থাকার মেয়াদ ততক্ষণ, যতক্ষণ সূর্য বেঁচে থাকবে। এই সময় সীমা এক হাজার কোটি বছর, তারপর সূর্যটা বড় হতে হতে গোটা পৃথিবীটাই গিলে ফেলবে।”

খুঁজে পাওয়া ফসিল প্রমাণ করেছে প্রায় সাড়ে তিনশো কোটি বছর আগে পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি হয়। এটা ঘটেছিল খুব সম্ভব পৃথিবী ঠাণ্ডা ও শক্ত হয়ে যাওয়ার পঞ্চাশ কোটি বছর পর। পূর্ণরূপে জীবের সৃষ্টি হতে আরও সাতশো কোটি বছর লেগে থাকবে। হকিং প্রশ্ন তুললেন, যদি কোনও গ্রহে প্রাণের সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তাহলে প্রাপ্ত সময়ের মাত্র চোদ্দ ভাগের এক ভাগ সময়ে এটা হল কীভাবে? তিনি যুক্তি দিলেন, এত দ্রুত প্রাণের সৃষ্টির একটাই  কারণ – পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টি ও ধারণের উপযুক্ত মশলাপাতি সব মজুদ হয়ে গিয়েছিল। এমনও হতে পারে, পৃথিবীতে ডি এন এ তৈরির পিছনে অন্য কোনও সরল উপাদানের  হাত ছিল। কিন্তু যেই না ডি এন এ জন্মালো, সেই আগের বস্তুটি গেল হারিয়ে। হকিং-এর ধারনায় সেই সরল বস্তুটি হল আর এন এ। ছোট দৈর্ঘের আর এন এ নিজেদের প্রতিলিপি ঠিক ডি এন এর মতোই তৈরি করে ফেলতে পারে, তবে এর পেঁচালো দুটি শৃঙ্খল নেই। গবেষণাগারে অজৈব রাসায়নিক বস্তু থেকে নিউক্লিক এসিড তৈরি করা যায় না, আর এন এও নয়। তবে পঞ্চাশ কোটি বছর বেশির ভাগ জায়গা সমুদ্রের তলায় তলিয়ে থাকা পৃথিবীতে হয়তো আর এন এ তৈরি হয়ে থাকলেও থাকতে পারে। ডি এন এ যদিও নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে, কিছু অনিয়মিত ভুলের সম্ভাবনাও সেক্ষত্রে ছিল। কোনও কোনও ভুল হয়তো এমন মারাত্মক ছিল, যার ফলে ডি এন এ থেকে সৃষ্ট জীবের মৃত্যু হয়েছিল। কিছু ভুল ছিল নিরপেক্ষ – তারা জীনের স্বাভাবিক ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। কিছু ভুল প্রজাতিদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছিল। ডারউইন সাহেবের প্রাকৃতিক নির্বাচনে তারাই জয়ী হয়েছিল। 

এবার হকিং জীববিজ্ঞানের বিবর্তন প্রথমে ধীর গতিতে কেন হয়েছিল, সেই ঘটনার ব্যাখ্যা দিলেন। বললেন, “প্রাথমিক একক কোষ থেকে বহুকোষীয় প্রাণীর বিবর্তন হয় আড়াইশো কোটি বছরে, তারপর মাছ, অন্যান্য সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী জীবের উদ্ভব হতে আরও একশো কোটি বছর কেটে যায়। তারপর বিবর্তন দ্রুত হতে থাকে। পরবর্তী দশ কোটি বছর লাগে প্রাথমিক স্তন্যপায়ী জীব থেকে মানুষের উদ্ভবে। লেমুরের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে মানুষে বিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ছিল শুধু একটু ফাইন টিউনিং।”

ডিএন এর বিকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল মানুষের বিবর্তন। প্রথমে হল তার কথ্য ভাষার বিকাশ, পরে লিখিত ভাষার বিকাশ। এইভাবে ডি এন এ ছাড়াও এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে তথ্য  হস্তান্তরিত হওয়া সম্ভবপর হল। গত দশ হাজার বছরে মানব ডি এন এ-তে কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন চোখে না পড়লেও, এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে জ্ঞান হস্তান্তরিত হয়েছে ঠিকই। হকিং মন্তব্য করলেন, “মানব শরীরের ডি এন এ-তে প্রায় তিনশো কোটি নিউক্লিক এসিড আছে, যার বেশির ভাগ ঘুমিয়ে আছে, কাজে আসেনা। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেহের দশ কোটি বিটস্‌-এর সমান তথ্য জমা হয়ে থাকে। উল্টো ভাবে ভাবতে গেলে, একটি ছোটখাট বইতে কুড়ি লক্ষের কাছাকাছি তথ্য থাকে। অর্থাৎ, আমাদের শরীরে মাত্র পঞ্চাশটা বইয়ের সমান তথ্য জমা হয়ে আছে। তাহলে দেখা গেল একটা বইতে ডি এন এর চাইতে এক লক্ষ গুণ বেশি তথ্য পাওয়া যায়।”

ডক্টর হকিং বললেন, মানবজাতি বিবর্তনের এক চমকপ্রদ বাঁকে দাঁড়িয়ে। প্রথমে সাধারণ নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে আমাদের বিবর্তন ঘটেছে, তারপর বিগত দশ হাজার বছরে আমাদের ডি এন এ-র উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না ঘটলেও বাইরে তথ্যের ভাণ্ডার ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়েছে। কারো কারো মতে বিবর্তন বলতে বোঝায় কেবলমাত্র  শরীরের ভিতরে ঘটে যাওয়া জিনগত বৈশিষ্টের পরিবর্তন, শরীরের বাইরের তথ্যের উপর বিবর্তনের প্রভাব হয় না। কিন্তু হকিং মনে করতেন, এমন ধারণা সঙ্কীর্ণ মনের পরিচয়। মানুষ তার জিনগত গুণ ছাড়িয়ে হয়তো জীনের থেকেও বড়। গুহাবাসী পূর্বপুরুষদের তুলনায় হয়তো আমরা কম শক্তিমান, কিন্তু তাদের চাইতে অনেক বেশি বুদ্ধিমান অবশ্যই। তবে তাদের সঙ্গে আমাদের এই পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে গত কয়েকশ হাজার বছর ধরে। তাই তাঁর মতে — মানবজাতির বিবর্তনের বিশ্লেষণ করতে হলে শরীরের অভ্যন্তরে ডি এন এ এবং বাইরের দুনিয়ার তথ্যের বিকাশ দুইই একত্র বিচার করা আবশ্যক।

বহির্দুনিয়ায় যে তথ্য সঞ্চারিত হয়েছে, সেই তথ্যের বিবর্তনের জন্য সময় লেগেছে হাজার হাজার বছর, আর এখন তা ছোট হতে হতে পঞ্চাশ বছর বা তার কম হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে মানুষের মস্তিষ্ক কিন্তু ডারউইনের প্রবর্তিত সময় সীমায় বিবর্তিত হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে। এটিই সমস্যার সূত্রপাত ঘটিয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে একটি মানুষ সবকটি লিখিত বই পড়ে ফেলতে পারত। এখন যদি কেউ দিনে একটা করেও বই পড়ে, তবে জাতীয় গ্রন্থাগারের সবকটি বই পড়ে ফেলতে তার পনের হাজার বছর লেগে যাবে। আবার ততদিনে আরও অনেক বই লেখা হয়ে যাবে।

এর অর্থ, একটি মানুষ কেবলমাত্র জ্ঞানের একটা ছোট্ট অংশের মালিক হতে পারে। হকিং উপায় বাতলে বললেন — “মানুষকে সঙ্কীর্ণ থেকে সংকীর্ণতর ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হতে হবে। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে এটিই হবে মানুষের সীমাবদ্ধতা। যেভাবে মানবসভ্যতায় বিগত তিনশো বছরে জ্ঞানের বিকাশ ঘটেছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খুব বেশিদিন চলা যাবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সবচাইতে বড় বিপদ – খাদ্য আর টিকে থাকার লড়াই। আসলে সেই গুহামানবদের স্বভাব আমাদের মধ্যে সহজাত। ডারউইনের পন্থায় বিবর্তন ঘটিয়ে আরও বুদ্ধিমান হয়ে ওঠার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। কিন্তু আমরা নতুন এক সময়কালে এসে দাঁড়িয়েছি, যখন আমাদের ডি এন এর নকশা আমরা নিজেরাই বদলে দেব। একটা নতুন প্রকল্পে মানব শরীরের ডি এন এর পুরো নকশাক্রম তৈরি করা হবে। এই প্রকল্পে ইতিমধ্যে কয়েকশো কোটি টাকা খরচ করা হলেও, সামান্যই কাজ এগিয়েছে। একবার যদি আমরা জীবনের বইটিকে পুরোটা পড়ে ফেলতে পারি, তাহলে তার ত্রুটি সংশোধন হতেও সময় লাগবে না। প্রথম প্রথম হয়তো ক্যান্সার বা মাস্কুলার ডিস্ট্রফির মতো রোগ সারাতে এটা কাজে লাগবে। এই রোগগুলো একটা একক জীনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাই ত্রুটি সংশোধন সহজ হবে। কিন্তু মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও অন্যান্য গুণ হয়তো একাধিক জীনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই তাদের খুঁজে বার করে নিয়ন্ত্রন করা একটু কঠিন হতে পারে। হয়তো আগামী শতাব্দীতে মানুষ তার বুদ্ধিবৃত্তি ও আক্রমণাত্মক ব্যাবহার নিয়ন্ত্রন করবার পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলবে।”

প্রফেসর হকিং-এর মতে, ভবিষ্যতে মানুষের উপর জিনগত প্রকৌশলের ব্যবহার নিয়ে হয়তো আইন বানানোর প্রয়োজন হবে। কিন্তু কিছু লোক স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর, রোগ উপশম ও দীর্ঘ জীবন লাভের প্রলোভন থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারবে না। যদি কোনও কারণ বশত এমন অতিমানব সৃষ্টি হয়, তবে রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দেবে, কারণ সাধারণ মানুষ অতিমানবদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় গো-হারা হেরে যাবে। তারা হয় মারা যাবে, না হয় একেবারেই গুরুত্ব হারাবে। সেক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তনশীল অতিমানবদের নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক জাতি জন্ম নেবে।

ডক্টর হকিং শোনালেন — “এই অতিমানবেরা যদি স্ব-বিদ্ধংসি না হয়ে ওঠে, তাহলে তারা অন্য গ্রহে উপনিবেশ গড়ে তুলতে পারবে। অবশ্য জৈব বস্তু দিয়ে তৈরি ডি এন এ সুদীর্ঘ মহাকাশ যাত্রার পক্ষে একেবারেই উপযুক্ত নয়। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী আলোর চাইতে দ্রুত বেগে চলা সম্ভব নয়। সবচাইতে কাছের নক্ষত্রে যাওয়া আসায় আট বছর কেটে যাবে। আর নক্ষত্রপুঞ্জের কেন্দ্রে যেতে লেগে যাবে এক লক্ষ বছর। কল্প বিজ্ঞানে এই সমস্যা মেটানো হয় স্থান কাল বাঁকিয়ে দিয়ে বা অতিরিক্ত মাত্রা ব্যবহার করে। মানুষ যতই বুদ্ধিদীপ্ত হোক, এমন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক ক্ষীণ। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলে, যদি আলোর চাইতে বেশি গতিতে চলা যায়, তবে অতীত ভ্রমন করা যাবে। সমস্যা যেটা হতে পারে, তা হল – অতীতে ফিরে গিয়ে সেই সব মানুষ অতীতটাকেই দেবে বদলে। আবার ভবিষ্যৎ পৃথিবী থেকে পর্যটকেরা দলে দলে ভিড় করে আমাদের মতো অনুন্নত মানুষদের জীবনযাপন দেখতে আসবে।”

জিনগত প্রকৌশলের প্রভাবে হয়তো ডি এন এ বদলে দিয়ে হাজার হাজার বছর বা অনির্দিষ্ট কালের জন্য বেঁচেও থাকবে মানুষ। অপেক্ষাকৃত সহজ কাজ হল, মহাকাশে যন্ত্র পাঠানো। কোনও তারামণ্ডলে ঢুকে পড়ে তারা নতুন নতুন পদার্থ আবিষ্কার করে আরও নতুন নতুন যন্ত্র আবিষ্কারের দিক খুলে দিতে পারে। এই ধরনের যন্ত্রগুলো মানুষের মতো কাজ করবে, তবে তাদের শরীরে জৈব কোষের বদলে থাকবে যান্ত্রিক ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রাংশ। যেমন ভাবে ডি এন এ আবির্ভূত হয়ে জীবনের          প্রাচীন একককে সরিয়ে দিয়েছিল, ঠিক একই ভাবে যন্ত্র ডি এন এর জায়গা কেড়ে নেবে।

যান্ত্রিক এই জীবন হয়ে উঠবে স্বনির্ভর। অর্থাৎ এই বহিরঙ্গের বিবর্তন হচ্ছে ক্ষণিকের জন্য – ডারউইনের বিবর্তন পদ্ধতি আর যান্ত্রিক বিবর্তন পদ্ধতির মধ্যবর্তী গর্ভাভিনয়। এমন স্বনির্মিত অবস্থান কতকাল চলতে পারবে, বলা কঠিন। যন্ত্র জীবন অস্থিতিশীলও হতে পারে, আবার সে নিজেকে হত্যাও করতে পারে। যদি তা চিরস্থায়ী হয়, সেক্ষেত্রে তার আয়ু সূর্যের মৃত্যু পর্যন্ত স্থায়ী হতে হবে, যাতে পাঁচশ কোটি বছর পর সে অন্য কোনও গ্রহে স্থান দখল করতে পারে। তাপগতি বিদ্যার দ্বিতীয় সুত্র অনুযায়ী, বেশির ভাগ নক্ষত্র আগামী দেড় হাজার কোটি বছর পর জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে গেলে ব্রহ্মাণ্ডে আসবে চরম বিশৃঙ্খলা।

এবার স্টিফেন প্রশ্ন তুললেন, ভিনগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে আমাদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কতটা। যদি পৃথিবীতে জীবনের দেখা দেওয়ার সময় সীমা সঠিক ভাবে মাপা গিয়ে থাকে, তাহলে অন্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় থাকে না। কোনও কোনও নক্ষত্র মণ্ডল পৃথিবীর পাঁচশ কোটি বছর আগে জন্মেছে। তাহলে এতদিনে একটিও ভিনগ্রহের প্রাণী পৃথিবীতে দেখা গেল না কেন? তাঁর মতে না উড়ন চাক্তিতে চেপে এখনো কোনও প্রাণী অন্তত পৃথিবীতে পা রাখেনি আর যদি ভবিষ্যতে কোনোদিন রাখেও, তবে তাদের উপস্থিতি আদৌ সুখকর হবে না।

ভিনগ্রহের বাসিন্দারা যে পৃথিবীর মানুষের অতিথি হয়নি, তার একটা কারণ হকিং-এর মতে — “সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী কোনও গ্রহে প্রাণ সৃষ্টির সম্ভাবনা এতই কম, যে মনে হয় শুধুমাত্র পৃথিবীতেই প্রাণ সৃষ্টির সুযোগ ঘটেছিল। আমরা বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, বিবর্তনের অবশ্যম্ভাবী ফল হল বুদ্ধিমান জীবন লাভ। কিন্তু নৃতত্ত্ব নীতি আমাদের এমন ভাবতে বাধা দেয়। বিবর্তন বাস্তবিক পক্ষে বিক্ষিপ্ত একটি প্রক্রিয়া, বুদ্ধির বিকাশ যার একটি অন্যতম ফলাফল। বুদ্ধিবৃত্তির কোনও দীর্ঘস্থায়ী মূল্য আছে কিনা এটি এখনো খুব পরিষ্কার নয়।  আমাদের কুকর্মের জন্য যদি সমস্ত জীব ধ্বংস হয়েও যায়, ব্যাক্টিরিয়া ও অন্যান্য এক কোষীয় প্রাণীরা কিন্তু দিব্যি বেঁচে থাকবে। বিবর্তনের কালচক্রে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ, জীবনের ক্ষেত্রে একটি অবশ্যাম্ভাবি ফল নয়। একক কোষ থেকে বহুকোষীয় বুদ্ধিমান প্রাণী সৃষ্টি হতে সুদীর্ঘ আড়াইশো কোটি বছর কেটে গিয়েছিল। আর এক দিক থেকে দেখতে গেলে, কোনও ধূমকেতু বা উল্কার ধাক্কায় পৃথিবীতে বুদ্ধিমান প্রাণীরা বিনষ্ট হয়ে যেতেও পারত। আজ থেকে সাত কোটি বছর আগে নাকি এমনই এক মহাজাগতিক বস্তুর ধাক্কায় সব ডাইনোসরেরা  পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিছু ছোট স্তন্যপায়ী জীব সেই প্রলয় কাণ্ডে বেঁচে গিয়েছিল, মানুষের মতো বড়সড় প্রাণী সেই সময়ে থাকলে কিন্তু ধ্বংস হয়ে যেত। আনুমানিক দুই কোটি বছর পর পর পৃথিবীতে এমন বড় উল্কাপাতের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আছে। এই গণনা যদি নির্ভুল হয়, তবে বলা যেতে পারে, বিগত সাত কোটি বছরে এমন উল্কাপাতের ঘটনা না ঘটাতেই পৃথিবীতে বুদ্ধিমান জনজীবন বেঁচে থাকতে পেরেছে। নক্ষত্র পুঞ্জের অন্য যে সমস্ত গ্রহে প্রাণ ছিল, সেখানে হয়তো এত লম্বা ধাক্কামুক্ত দীর্ঘ সময়কাল ছিল না, যে কারণে সেখানে বুদ্ধিমান জীবের বিবর্তন ঘটতে পারেনি।

ডক্টর হকিং আর একটি সম্ভাবনার কথা শোনালেন, “ব্রহ্মাণ্ডে বুদ্ধিমান জীবনের অন্য রূপও আছে, যা আমাদের নজরে আসছে না। মহাকাশের বেতার তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে বহির্বিশ্বের সভ্যতার আবিষ্কারের অনেক প্রচেষ্টা হয়েছে, ফল লাভ কিছুই হয়নি। এই ব্যাপারে কিছু মন্তব্য করার আগে বরং সভ্যতার হাত ধরে আমাদের আর একটু বেশি হাঁটা উচিত।”

তথ্যসুত্র  

1. The Cambridge Lectures: Life Works, Dove Entertainment Inc., June 1996.

2. The Theory of Everything: The Origin and Fate of the Universe, Stefan Hawking, New Millennium Press, 2002.

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

1 Response to বৈজ্ঞানিকের দপ্তর বাগ্মী হকিং-২ অরূপ ব্যানার্জি বর্ষা ২০১৯

  1. Puspen Mondal says:

    খুব ভালো লাগল।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s