বৈজ্ঞানিকের দপ্তর বাগ্মী হকিং-৩ অরূপ ব্যানার্জি শরৎ ২০১৯

বাগ্মী হকিং– পর্ব ১, পর্ব  ২

ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-সব লেখা একত্রে 

বাগ্মী হকিং

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

পর্ব ৩

১৯৯৬ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা দেন ডক্টর স্টিফেন হকিং, যার শিরোনাম ছিল—‘দ্য বিগিনিং অফ টাইম’, অর্থাৎ সময়ের সূত্রপাত। এই বক্তৃতায় তিনি সময়ের সূত্রপাত আদৌ ঘটেছিল কি না এবং হয়ে থাকলে কবেই বা সময় ফুরিয়ে যাবে সেই নিয়ে আলোচনা করেন। এখনও পর্যন্ত পাওয়া বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর মনে হয়েছিল, ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব একেবারেই চিরকালীন নয়। প্রায় ১৫০০ কোটি বছর আগে যে ব্রহ্মাণ্ড জন্ম নিয়েছিল বলে বৈজ্ঞানিকেরা দাবি করেন, সেই ধারণা যেমন মজবুত নাও হতে পারে, আবার সুনিশ্চিত করে বলাও যায় না ব্রহ্মাণ্ড কবে ধ্বংস হয়ে যাবে।

জাপানে একটি বক্তৃতা দিতে গিয়ে হকিংকে একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল – ‘ব্রহ্মাণ্ডের পুনঃপতন হতে আর কত বছর লাগতে পারে?’ অসামান্য রসিক হকিং-এর মনে হয়, ব্যাপারীদের হয়তো ধারণা হয়েছিল, এই প্রশ্নের উত্তরের উপর শেয়ার বাজারের ওঠানামা নির্ভরশীল। তাই তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “যারা শেয়ার বাজারে লগ্নিকৃত অর্থ নিয়ে চিন্তিত, তাদের এখুনি তড়িঘড়ি সব বিক্রিবাটা করবার দরকার নেই। যদি ব্রহ্মাণ্ডের শেষ অবস্থা বলে কিছু ঘটবার সম্ভাবনা থাকে, সেটি হতে অন্তত পক্ষে দু’হাজার কোটি বছর লেগে যাবে। ততদিনে মনে হয় গ্যাট ( GATT) চুক্তির সমাধানের রাস্তা বেরিয়ে যাবে।”

সন্দেহ নেই, তাঁর এই উত্তর প্রশ্নকর্তাকে বিব্রত করবার জন্য যথেষ্ট ছিল।

হকিং বলেন, “মানুষের জীবদ্দশার তুলনায় ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বের সময়কাল অনেক বেশি দীর্ঘ। সেই কারণেই কিছুদিন আগে পর্যন্ত মানুষ মনে করত ব্রহ্মাণ্ড স্থিতিশীল। অন্যদিকে বিগত কয়েক দশকে মানব সমাজে অত্যন্ত দ্রুত সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত বিবর্তন হয়েছে। এই উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে পৃথিবীর বুকে কয়েক হাজার বছর ধরে বর্তমান মানব-সমাজের অস্তিত্বের প্রমাণ হাতে আসছে। তাই ধরে নেয়া যায়, মানবজাতি ও ব্রহ্মাণ্ড এই দুইয়েরই অতীতে কোনও না কোনও সময়ে সূচনা হয়েছিল। কিন্তু কিছু মানুষ ধরে নেয়, ব্রহ্মাণ্ড ও মানবজাতি চিরকালীন। তারা মনে করে, বন্যা ও অন্যান্য সব প্রাকৃতিক দুর্ঘটনার কারণে মানবজাতি বারংবার ধ্বংস হয়েছে, আবার জন্ম নিয়েছে। তবে, যুক্তিসিদ্ধ ধারণায় ভিত্তি করলে মনে হয় মানবজাতির ইতিহাস খুব প্রাচীন নয়।”

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ব্রহ্মাণ্ডের সূত্রপাত নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়, যার অধিকাংশই ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের উপর নির্ভরশীল ছিল। চাক্ষুষ প্রমাণ সেই যুক্তির মেরুদণ্ড হয়ে উঠতে পারেনি। হকিংয়ের মতে, এর জন্য দায়ী আমাদের মহাকাশের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য জ্ঞানের অভাব। তিনি বললেন, “একবার মহাকাশ বিজ্ঞানী স্যর আর্থার এডিংটন মন্তব্য করেছিলেন, ‘চিন্তা কোরো না, তোমার তত্ত্ব যদি পর্যবেক্ষণের সাথে না মেলে, তবে সেটা খুব সম্ভব তত্ত্বের ভুল।’ কিন্তু যদি সেই তত্ত্ব তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র লঙ্ঘন করে, তবে ঘোর বিপদ। সত্যি বলতে কী, ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব চিরকালীন, এমনটা মেনে নেওয়ার পিছনে যে যুক্তি আছে, তাও তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী একবারে ভুল। দ্বিতীয় সূত্র বলে, বিশৃঙ্খলা বাড়ে সময়ের সাথে সাথে। অথচ মানব-সভ্যতার ইতিহাস অন্য গল্প শোনায়। যদি ব্রহ্মাণ্ড চিরকাল ধরে থাকত, তাহলে এতদিনে সবকিছুই পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে গিয়ে সর্বত্র তাপমাত্রা সমান সমান হয়ে যেত। অসীম ও চিরকালীন ব্রহ্মাণ্ড হলে দিনে ও রাতে আকাশ সমানভাবে উজ্জ্বল হত। তাই নক্ষত্রেরা অতীতে অনেক কম উজ্জ্বল ছিল, এটি মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায়ই নেই।”

———————সম্পাদকীয় সংযোজনঃ বিশৃঙ্খলা বা chaos———————

ক্লাসে টিচার দেরি করলে কী হয়? মানে, যদি তোমাদের স্বাধীনভাবে যা খুশি করতে দেয়া হয় ক্লাসের ভেতর তাহলে কী ঘটবে? উত্তর হল কেওস বা বিশৃঙ্খলা। কেন? কারণ স্বাধীনতা দিলে কোনো দুটো লোক এক্কেবারে এক নিয়ম মেনে নড়াচড়া করে না। কেউ যায় জানালার ধারে মাঠের খেলা দেখতে, কেউ বা বোর্ডে টিচারের ক্যারিকেচার আঁকে আবার কেউ কেউ মহানন্দে মারপিট কিংবা কাগজের প্লেন বানিয়ে ওড়ায়।

আবার ধরো একটা আগুনের কুণ্ড থেকে ধোঁয়া উঠছে। তুমি তার ওপর একটা পাইপ রাখলে,পাইপের শাসনে পড়ে ধোঁয়া একটা স্তম্ভের মত বেশ লক্ষ্মী হয়ে ওপরের দিকে উঠল। তারপর? যেই না পাইপ শেষ হল ওমনি কী হয়? ধোঁয়া চারদিকে বিশৃঙ্খল ভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিশৃঙ্খলা বা কেওদসের জনম হয়।

আসলে তোমরা, ক্লাসের বন্ধুরা, টিচার যতই বলুক, স্পেশাল টাইপের দুষ্টু নও। কারণ, স্বাধীনতা দিলে প্রকৃতিতে সবকিছুই কিন্তু নিয়ম ভেঙে, নির্দিষ্ট আকার ভেঙেচূরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

তা ধরো ক্লাশে টিচার আসতে দশ মিনিট দেরি হল। তাহলে তোমাদের কেউ কেউ ততক্ষণে ঘরের বাইরেও ইতিউতি ছড়িয়ে পড়েছ। লুকোচুরি খেলা চলছে জোরদার। এবার ধরো টিচার আসতে দু ঘন্টা দেরি হচ্ছে। তখন দেখা যাবে ছেলেমেয়েরা গোটা স্কুলে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সারাদিন দেরি হলে? তারা এক্কেবারে ছড়িয়ে যার যার বাড়ি।

ধোঁয়াটার ক্ষেত্রেও তাই। যত সময় যাবে ততই তা এলোমেলো ছড়িয়ে যাবে। ফলে একক ক্ষেত্রফলের এলাকায় তার ঘনত্ব ক্রমেই কমবে। এবাররে ধরো টর্চের আলো। যত কাছে ফেলবে তত তীব্র ফোকাস। যত দূরে যাবে ততই বেশি এলাকা জুড়ে ছড়াবে আর ততই কমবে একক এলাকায় তার মোট পরিমাণ বা আলোর জোর।

ভাবছ শুধু আলো, ধোঁয়া এরাই দুষ্টু? তাহলে ধরো পাথর। কোটি কোটি বছর রেখে দাও, দেখবে একট পাহাড় কেমন ভেঙেচূরে ধুলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দুনিয়া জুড়ে—নদীর ধারা তাকে পলি বানিয়ে নিয়ে যায় দূরদুরান্তে, আলো, হাওয়া তাকে গুঁড়িয়ে ধুলো করে উড়িয়ে নিয়ে যায় কোথা থেকে কোথায় কে জানে।

এবারে আসা যাক একটা তারার কথায়। তার ভেতরে কী ঘটছে? সেখানে বস্তু শক্তি হয়ে যাচ্ছে থার্মোনিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায়। সেই শক্তি আলো আর তাপ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে হাজারো আলোকবর্ষ জুড়ে। কমছে তারার ভর। একটা জায়গায় সুন্দর একটা গোলকের মত চেহারা থেকে তার ভর এলোমেলো হয়ে বিরাট এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে গেল। নির্দিষ্ট আকার ভেঙে।

প্রকৃতির সবকিছুতেই এইরকম, যত সময় যায় ততই নির্দিষ্ট আকার ভেঙে বিশৃঙ্খল হয়ে বস্তু আর শক্তি ছড়িয়ে পড়তে থাকে দূরদুরান্তে।

এখন, গোটা ব্রহ্মাণ্ড জুড়েই তো এই প্রক্রিয়াটা চলছে, তাই না? ক্লাশের ছেলেরাই হোক আর আকাশের তারার শরীরের অণুপরমাণু, কেউ শৃঙ্খলা মেনে একত্র নির্দিষ্ট আকার নিয়ে থাকতে চায় না। তারা ক্রমাগত এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দূর থেকে আরো দূরে। তার মানে ব্রহ্মাণ্ডে ক্রমাগত বিশৃঙ্খলা বেড়েই চলে। এই যে প্রকৃতির বিশৃঙ্খলার প্রতি ঝোঁক, একে বলা হয় এনট্রপি। তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রটা খুব সরলভাবে একটা বেজায় দামী কথা বলেছে এই নিয়ে। সেটা হল, যত সময় যায় ততই ব্রহ্মাণ্ডের এনট্রপি বেড়ে চলে। তাহলে খুব লম্বা সময় গেলে কী হবে? সব গ্রহ, তারার শক্তি আর বস্তুরা ভেঙেচুড়ে ছড়িয়ে পড়বে তারপর সেই বস্তু আর শক্তির কণারা আরো ভাঙতে ভাঙতে… অবশেষে, শক্তির ক্ষুদ্রতম একক হয়ে তারা গোটা ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে একেবারে সমানভাবে ছড়িয়ে যাবে। তখন আর থাকবে না কোনো আলো, গ্রহ তারা… তাহলে বুঝতেই পারছ, ব্রহ্মান্ডের বয়েস অসীম হলে অ্যাদ্দিনে আর গ্রহতারা কিছু থাকত না। তাই হকিং-এর মত, ব্রহ্মাণ্ডের বয়েস মোটেই অসীম নয়, এবং তা মোটেই স্থিতিশীলও নয়। একটা নির্দিষ্ট সময়ে তার সৃষ্টি হয়েছে, আর তারপর থেকে ক্রমাগতই ভেঙেচূরে চলেছে সে, বেড়ে উঠছে কেওস। বাড়ছে এনট্রপি।

———————————সম্পাদকীয় সংযোজন সমাপ্ত——————————-

ডক্টর হকিংয়ের মতে, স্থিতিশীল ব্রহ্মাণ্ডে নক্ষত্রেরা কেন হঠাৎ জ্বলে ওঠে, কেনই বা তারা আবার নিভে যায়, এর কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। তেমনটা হলেও নক্ষত্রদের জ্বলে ওঠা ও নিভে যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে ব্রহ্মাণ্ডের বাইরে থেকে তার উপর কাউকে হস্তক্ষেপ করতে হত।

ব্রহ্মাণ্ড বিষয়ে মানব-সমাজের ধ্যানধারণার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেল যখন আমরা বুঝতে পারলাম ব্রহ্মাণ্ড স্থিতিশীল নয়, নক্ষত্রপুঞ্জ একে অপরের থেকে প্রচণ্ড বেগে দূরে সরে যাচ্ছে। বোঝা গেল অতীতে কোনও একসময়ে তারা কাছাকাছি ছিল। মহাবিস্ফোরণের সময় সব বস্তু একে অপরের ঘাড়ে চেপে ছিল। তখন একটি জায়গায় বস্তুর ঘনত্ব ছিল অসীম, যাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।

হকিং জানালেন, সিঙ্গুলারিটিতে পদার্থবিদ্যার সব নীতিই ব্যর্থ। অর্থাৎ, মহাবিস্ফোরণের পর ব্রহ্মাণ্ডের অবস্থা মহাবিস্ফোরণের আগের ঘটে যাওয়া ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত নয়, কারণ ব্রহ্মাণ্ড পরিচালনার পুরনো নীতি মহাবিস্ফোরণেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। মহাবিস্ফোরণের পর যে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হল, তার পূর্বাবস্থা থেকে সে সম্পূর্ণ আলাদা। যেহেতু বস্তু সংরক্ষণের নীতিও মহাবিস্ফোরণে বিনষ্ট হল, তাই বিস্ফোরণের আগে ও পরে বস্তুর মোট পরিমাণের তারতম্যও ঘটে থাকতে পারে।

যেহেতু মহাবিস্ফোরণ কেউ চাক্ষুষ করেনি, তাই এর পূর্ববর্তী পর্যায়কে একেবারে বাদ দিয়ে সময়ের সূত্রপাত মহাবিস্ফোরণের কাল থেকে ধরে নিতে বললেন হকিং। সময়ের সূত্রপাতের এই ধারণা একেবারে যুগান্তকারী হয়ে গেল। ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি নিয়ে নতুন ধারণা জন্ম নিল। তাঁর মতে, ব্রহ্মাণ্ড পরিচালনায় বর্তমানে যে সূত্রগুলি কার্যকর, তাদের সৃষ্টির জন্য মহাবিস্ফোরণের প্রয়োজন ছিল। তাই ব্রহ্মাণ্ডের আচরণ ছিল স্বকীয়, অর্থাৎ নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করে সে তার নিজের অস্তিত্বের জন্যে দরকারি নিয়মকানুনদের বানিয়ে নিয়েছে।  বাইরে থেকে তার সূত্রপাত কেউ ঘটিয়েছে, এমন ভাবার অবকাশ নেই।

যদিও বিজ্ঞানের সূত্রাবলী ব্রহ্মাণ্ডের সূত্রপাতের ইঙ্গিত দিয়ে থাকে, কিন্তু কীভাবে সেই সূত্রপাত ঘটেছিল, সে-বিষয়ে আলোকপাত করতে তারা অক্ষম। এটা অবশ্যই খুব দুর্ভাগ্যজনক। তাই কোনও একসময়ে যে সিঙ্গুলারিটি বা অসীম ঘনত্ব থেকে ব্রহ্মাণ্ডের আবির্ভাব হয়, সেই নিয়ে বারংবার বিজ্ঞানীরা চিন্তিত হয়েছেন। বিজ্ঞানীদের অনেকে বললেন, চলো, মাধ্যাকর্ষণের সূত্রকেই বদলে দেওয়া যাক, যাতে ব্রহ্মাণ্ডের প্রসারিত হওয়ার পক্ষে যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। বলা হল, দুটি নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্যে যেমন দূরত্ব বাড়ছে, তেমনি তাদের মধ্যের ফাঁকা জায়গায় নতুন পদার্থের জন্ম হওয়ায় নতুন নতুন নক্ষত্রের সৃষ্টি হচ্ছে। এটিকে বলা হয় ‘স্থিতাবস্থা তত্ত্ব’ (Steady State Theory)। এই তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন বিজ্ঞানী বন্ডি, গোল্ড ও হোয়েল। দুর্ভাগ্যক্রমে এই স্থিতাবস্থা তত্ত্বের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা গবেষণা এই তত্ত্বের প্রথম বিরোধ ঘোষণা করল। স্থিতাবস্থা তত্ত্বে সেই যে আন্তর্নক্ষত্র দূরত্ব বাড়লে সে শূন্যস্থান নতুন বস্তুর জন্ম হয়ে পূরণ হবার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, পরীক্ষালব্ধ ফল তার ঠিক উলটোটাই প্রমাণ করে দেখাল। আর এই তত্ত্বের কফিনে শেষ পেরেকটা গেঁথে গেল, যেদিন ১৯৬৫ সালে মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের আবিষ্কার হল। দেখা গেল, এই রেডিয়েশন বা বিকিরণ ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র সমানভাবে ছড়িয়ে আছে। এই বিকিরণের তাপমাত্রা চরম শূন্য তাপমাত্রার থেকে মাত্র ২.৭ ডিগ্রি উপরে। স্থিতাবস্থা তত্ত্ব দিয়ে এই বিকিরণ ব্যাখ্যা করা গেল না। কারণ সে তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিমুহূর্তে নতুন বস্তু সৃষ্টি হয়ে চললে এই বিকিরণ কখনওই এমন স্থির হয়ে থাকত না।

রজার পেনরোজ ও স্টিফেন হকিং প্রমাণ করেন, যদি কোনও একটি স্থানে একটি বিশেষ পরিমাণের বেশি ভর মজুত থাকে, তবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা সেখানে সিঙ্গুলারিটি সৃষ্টি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তাঁদের প্রথম প্রতিপাদ্য অনুযায়ী, ভেঙে পড়া নক্ষত্রের থেকে সৃষ্ট কৃষ্ণগহ্বরের ভেতর সময় অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। ব্রহ্মাণ্ডের প্রসারণকে তাঁরা দেখান সময়ের উলটো স্রোতে নক্ষত্রের ভেঙে পড়ার ঘটনা হিসাবে, মানে একটা গোটা ফিল্ম রোলকে উলটোদিকে ঘুরিয়ে দেখলে যেমন লাগে আরকি!

এইখানে একটা মজার জিনিস বলি। আমরা মহাকাশে দূরবীন-টুরবিন লাগিয়ে যে ব্রহ্মাণ্ড দেখতে পাই, সে কিন্তু তার অতীতের চেহারা। কারণ, নক্ষত্রদের থেকে আসা যে আলো এখন আমরা পৃথিবীর কাছাকাছি বা তার গায়ে এসে পড়তে দেখতে পাই, তারা অনেক আগেই রওনা দিয়েছে। তাহলে আমরা যে অতীতের আলোর শঙ্কু দেখছি, তার শীর্ষবিন্দুতে আছে বর্তমান সময়ের পৃথিবী। পিছনের দিকে চলে গেলে আলোর শঙ্কুর ক্ষেত্রফল বেড়ে যাবে। যদি এই শঙ্কুতে যথেষ্ট পরিমাণ পদার্থ থেকে থাকে, তবে সেই পদার্থ আলোর রশ্মিদের মাধ্যাকর্ষণ বলে বাঁকিয়ে দেবে। আলোর সেই বাঁকা পথ আবার শঙ্কুর ক্ষেত্রফল কমাতে কমাতে একটা বিন্দুতে গিয়ে মিলবে অতীতে। তাহলে দেখা গেল, সময়ের একটা সূত্রপাত হয়েছিল, কোথাও সে শুরু হয়েছিল একদা। শুরুর সেই বিন্দু হল সিঙ্গুলারিটি।

হকিং এবারে যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, ‘আমাদের অতীতের আলোর এই শঙ্কুতে যে যথেষ্ট পদার্থ মজুত ছিল, তা বুঝব কী করে?’ উত্তরে বললেন, “নক্ষত্রপুঞ্জে কতটা পদার্থ আছে তার পরিমাপ শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে করা সম্ভব নয়। তার হদিশ দেয় মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন। এই রেডিয়েশন বা বিকিরণ পদার্থের সাথে একই তাপমাত্রায় সুস্থিত থাকে। মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের বর্ণালী জানায়, জড় পদার্থ এই রেডিয়েশনকে একসময়ে বহুগুণ বিক্ষিপ্ত করেছে। তাই এই বিকিরণ ব্রহ্মাণ্ডের চতুর্দিকে সমানভাবে ছড়িয়ে আছে।”

অতীত আলোর শঙ্কু কেন্দ্রীভূত হওয়া আমাদের জানান দেয়, সময় একদা কোথাও নিশ্চয়ই শুরু হয়েছিল। প্রফেসর হকিং এই প্রসঙ্গে পরিহাস করে বললেন, “আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ভুলও তো হতে পারে! আমরা জানি, এই তত্ত্ব দূরবর্তী বস্তুর জন্য খাটে, খুব কম দূরত্বে টেকে না। কারণ, যখন ব্রহ্মাণ্ড খুব ছোটো একটা স্থানে অত্যন্ত ঘন অবস্থায় ছিল, তখন কম দূরত্বের জন্য সেখানে শুধু কোয়ান্টাম বলবিদ্যাই খাটবে, কারণ এই তত্ত্বই একমাত্র অনিশ্চয়তা তত্ত্বকে স্বীকৃতি দেয়।”

এই প্রসঙ্গে ঈশ্বর বিশ্বাসীদের ব্যঙ্গ করে হকিং বললেন, “অনেকেই মনে করে, ব্রহ্মাণ্ড যেমনভাবে সিঙ্গুলারিটি থেকে সৃষ্ট হয়ে প্রসারিত হয়েছিল, আবার সে সংকুচিত হয়ে অসীম ঘনত্বের সিঙ্গুলারিটি সৃষ্টি করবে। ক্লাসিকাল পদার্থবিদ্যা সিঙ্গুলারিটির ঘটনা পরম্পরা ব্যাখ্যা করতে পারে না, কারণ সেই অঙ্ক সিঙ্গুলারিটিতে আদৌ খাটে না। তাহলে তো বুঝতে হবে, ব্রহ্মাণ্ড কীভাবে শুরু হয়েছিল বিজ্ঞান তার হদিস দিতে অক্ষম! সেক্ষেত্রে বাইরের জগত থেকে কাউকে ডেকে আনতে হবে ব্রহ্মাণ্ড শুরু হওয়ার গল্প শোনাবার জন্য। বহু ধার্মিক নেতারা যে বিগ-ব্যাং ও সিঙ্গুলারিটি থিওরি মেনে নিয়েছেন, তাঁর একমাত্র কারণ ওই বাইরে থেকে দেবতার হাতে জগতের চাকাটা ঘুরিয়ে দেওয়া।”

ডক্টর হকিং এবার বুঝিয়ে দিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্ব কীভাবে ব্রহ্মাণ্ডের শুরুর গল্প শোনায়। তিনি বললেন, কোয়ান্টাম থিওরিতে আছে কাল্পনিক সময় রেখার ধারণা। সময়ের বয়ে চলাকে যদি একটা সরলরেখায় প্রকাশ করা যায়, তবে অতীতের সময়কে আমরা এই রেখাতেই পাব, তবে কাল্পনিক রূপে। এর অর্থ হল, পদার্থবিদ্যার সূত্র কাল্পনিক সময়রেখায় ব্রহ্মাণ্ডের অবস্থা বোঝাতে পারবে। বিগ ব্যাং সিঙ্গুলারিটির দেখা পাওয়া যাবে সময়রেখার উপরেই। তখন কিন্তু বাইরে থেকে কারও হস্তক্ষেপের কারণে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ধারণা যাবে মুছে।

একেই বলা হয় ‘নো বাউন্ডারি কন্ডিশন’। তবে এই তত্ত্ব কিন্তু পরীক্ষার করে প্রমাণ করতে হবে। যদি পরীক্ষার ফল তত্ত্বটিকে ভুল প্রমাণ করে, তাহলে আবার বাইরে থেকে ঈশ্বরকে ডেকে নিয়ে আসতে হবে জগতের চাকা ঘোরানোর জন্য। ‘নো বাউন্ডারি’ তত্ত্ব অনুযায়ী ব্রহ্মাণ্ড একটা বিন্দু থেকে মসৃণভাবে প্রসারিত হয়েছিল। প্রসারণের সময় পদার্থ তৈরি করার জন্যে সে শক্তি ধার করেছিল মাধ্যাকর্ষণ থেকে। ধার করা এই ঋণের বোঝা ক্রমশ বাড়তেই থাকে। ভাগ্যক্রমে এই ঋণ ব্রহ্মাণ্ডের শেষদিন পর্যন্ত শোধ করবার প্রয়োজন হবে না।

ব্রহ্মাণ্ডের সূচনার বিপুল, বিস্ফোরক প্রসারণের সময়কাল ছিল সীমিত। একসময়ে ধীরে ধীরে থিতু হয়ে আসে তার প্রসারণের হার। কিন্তু প্রকাণ্ড এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথাও হয়তো পাওয়া যেতে পারে তার সৃষ্টিকালের সময়ে অনিয়মিত প্রসারণ। ১৯৯২ সালে কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড এক্সপ্লোরার স্যাটেলাইট মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের মাঝে খুঁজে পেল এমনই অনিয়ম। মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের অস্থিরতা প্রমাণ করল ‘নো বাউন্ডারি’ তত্ত্বকে। কিছু জায়গায় পদার্থের প্রসারণ থেমে গেল এবং তারা ভেঙে পড়ে সৃষ্টি করল নক্ষত্র ও ছায়াপথ। আমাদের চারপাশে ব্রহ্মাণ্ডের যে বর্ণময় রূপ আমরা দেখতে পাই, তা সবই ‘নো বাউন্ডারি’ তত্ত্বকে প্রমাণ করে।

ব্রহ্মাণ্ডের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এই তত্ত্ব কোন পথ দেখায়? এই তত্ত্ব বলে, ব্রহ্মাণ্ড সংকুচিত হবে, তবে ১৫০০ কোটি বছর লেগে যাবে তেমনটি হতে। তাই ডক্টর হকিং তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “ব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হওয়ার অনেক দেরি, তাই কারও কিনে রাখা সরকারি বন্ডগুলো ভাঙিয়ে নিয়ে টাকা বাঁচানোর জন্য অনেক লম্বা সময় পাওয়া যাবে।”

আগে হকিং ভেবেছিলেন, ব্রহ্মাণ্ডের সংকোচন হবে প্রসারণের উলটো রাস্তায়, সময়ের উলটোদিকে। মানুষ তখন বুড়ো হওয়ার বদলে যুবা হতে হতে আবার মায়ের জঠরে ফিরে যাবে। কিন্তু অঙ্ক কষে তিনি দেখেন, এই সংকোচন প্রসারণের বিপরীত রাস্তায় হুবহু হবে না। ব্রহ্মাণ্ড একটা সম ঘনত্বের জড় পিণ্ডে পরিণত হতে পারে না। তখন ব্রহ্মাণ্ডের জড়বস্তুর পিণ্ডগুলোর ঘনত্ব আরও অনিয়মিত হবে।

হকিংয়ের এই অসামান্য বক্তৃতার সারমর্ম হল, ব্রহ্মাণ্ড চিরকালীন নয়। ১৫০০ কোটি বছর আগে ব্রহ্মাণ্ড ও সময়ের সূত্রপাত হয় মহাবিস্ফোরণ থেকে। সিঙ্গুলারিটি থেকে যে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্ট হয়েছিল, সেখানে পদার্থবিদ্যার সবগুলি সূত্রই ছিল অকার্যকর। কিন্তু যদি ‘নো বাউন্ডারি’ তত্ত্ব মেনে নেওয়া হয়, তবে ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম পরবর্তী দশা ও বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে প্রয়োজন সেইসব সূত্রগুলিই। কাল্পনিক সময়রেখায় স্থানকালের সীমা আছে, কিন্তু কোনও সীমারেখা বা বাউন্ডারি নেই। ‘নো বাউন্ডারি তত্ত্ব’ এক পরীক্ষিত সত্য। এই তত্ত্ব-মতে, প্রসারিত ব্রহ্মাণ্ড আবার সংকুচিত হতে থাকবে, কিন্তু এক পথে নয়। তাই বুড়োরা আবার যুবা হয়ে যাবে, এই ধারণার কোনও জায়গাই নেই।

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s