বৈজ্ঞানিকের দপ্তর বিজ্ঞানবিচিত্রা- পেনিসিলিন আবিষ্কার ও মাইক্রোবিয়ালআর্ট অপূর্বকুমার চটোপাধ্যায় বর্ষা ২০১৮

পেনিসিলিন আবিষ্কার ও মাইক্রোবিয়াল আর্ট

অপূর্বকুমার চট্টোপাধ্যায়

পেনিসিলিন আবিষ্কারের সঙ্গে বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং-এর নাম জড়িত হয়ে রয়েছে, এই তথ্য আমরা অনেকেই জানি। পেনিসিলিন আবিষ্কারের ফলে অন্তত দু কোটি মানুষ প্রাণ ফিরে পেয়েছেন বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। কি ভাবে পেনিসিলিন আবিষ্কার হল সেই ঘটনা সবার জানা নেই। তাই আজ সেই গল্পের মত কাহিনী লিখতে বসেছি। 

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং জন্ম গ্রহণ করেন ৬ আগস্ট ১৮৮১ সালে এক চাষী পরিবারে। পড়াশুনার জন্য তাঁকে লন্ডনে পাঠানো হয়। সেখানে তিন দাদা এবং এক দিদির সঙ্গে তিনি থাকতেন। রিজেন্ট স্ট্রীট পলিটেকনিক থেকে প্রাথমিক শিক্ষা নেবার পর তিনি চাকুরি নেন এক জাহাজ কোম্পানিতে। চার বছর পর তাঁর এক কাকার মৃত্যুর পর কিছু সম্পত্তি পেলে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট মেরি’স মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হতে সক্ষম হন। 

ডাক্তারি পাশ করবার পর স্যার এ রাইটের ল্যাবরেটরিতে যোগ দেন। ডাঃ ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কারের পূর্বেই ব্যাকটেরিয়া নাশক ‘লাইসোজাইম’ আবিষ্কার করেন।

এই শান্ত, মৃদুভাষী, লাজুক বিজ্ঞানী একবার কয়েকদিনের ছুটিতে বেড়াতে যান। ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯২৮ তারিখ সকালে কাজে যোগ দিয়ে ল্যাবরেটরিতে এসে কয়েকটি পেট্রি ডিসে স্টাফাইলোকক্কাস অরাস [Staphylococcus aureus] ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি পরীক্ষা করতে গিয়ে চমকে ওঠেন। তিনি দেখেন একটি প্লেটে পেনিসিলিয়াম জাতীয় ছত্রাক জন্মেছে। যে স্থানে ছত্রাকটি জন্মেছে সেই সব স্থানে কোন ব্যাকটেরিয়ার চিহ্ন নেই। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেই তিনি বুঝতে পারেন পেনিসিলিয়াম ছত্রাকে এমন কিছু রয়েছে যার সংস্পর্শে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারেনি। সেই শুভক্ষণেই আবিষ্কার হয় কোটি কোটি মানুষের প্রাণদায়ী প্রথম এন্টিবায়োটিক, যার নাম দেন পেনিসিলিন। 

এই অমায়িক বিজ্ঞানীই বলতে পারেন, “I did not invent penicillin. Nature did that. I only discover it by accident.”

পেনিসিলিন আবিষ্কার

স্যর আলেকজান্ডার ফ্লেমিং-এর পেনিসিলিয়ামের ব্যক্টেরিয়া নাশক গুণ আবিষ্কারের কাহিনী লিখেছি। এবার যদি প্রশ্ন করি ডাঃ ফ্লেমিং কি পেনিসিলিন তৈরি করতে পেরেছিলেন? যদি উত্তর হয় ‘না’, তাহলে কি বলা যাবে উনি পেনিসিলিন আবিষ্কার করেছিলেন। 

এক লহমায় বিষয়টি বড় জটিল হয়ে গেলো। এবার তাহলে দেখা যাক সত্যি কি ঘটেছিলো। ডাঃ ফ্লেমিং যেদিন পেনিসিলিয়ামের ব্যক্টেরিয়ারোধী গুণ দেখেছিলেন সেই সময় তাঁর অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি পেনিসিলিন তৈরি করতে পারেন নি কারণ তাঁর ল্যাবরেটরিতে সেই সুযোগ ছিল না। দশ বছর পর, ১৯৩৮ সালে ডাঃ হাওয়ার্ড ফ্লোরে [ডিরেক্টর, স্যর উইলিয়াম ডান স্কুল অফ প্যাথলজি, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়] এই বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে আরও দুজন বিজ্ঞানী ছিলেন – বায়োকেমিস্ট আর্নেস্ট চেন এবং নরম্যান হিটলে। তাঁরা এই কাজে সফল হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে টাকার অভাবের জন্য ফ্লোরে এবং হিটলে আমেরিকা চলে যান। সেখানে বছরখানেক ছিলেন। পরে ইংলন্ড ফিরে আসেন। একথা সকলেই জানেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আহত হাজার হাজার সৈনিককে পেনিসিলিন প্রয়োগ করে বাঁচানো হয়েছিল। এর কৃতিত্ব এই তিন বিজ্ঞানীর। তাই ১৯৪৫ সালে ফ্লেমিং-এর সঙ্গে ফ্লোরে এবং চেন’কে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু হিটলে সেদিন পুরস্কার পাননি। তার কারণ অজানা। 

১৯৯০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় নরম্যান হিটলে’কে সান্মানিক ডক্টরেট অফ মেডিসিন ডিগ্রি প্রদান করেন।অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৯০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোন ব্যক্তিকে সান্মানিক ডক্টরেট অফ মেডিসিন ডিগ্রি প্রদান করা হল।

 স্যর আলেকজান্ডার ফ্লেমিংএর মাইক্রোবিয়াল আর্ট

স্যর আলেকজান্ডার ফ্লেমিং বিশ্বখ্যাত হয়েছেন প্রথম আন্টিবায়োটিক আবিষ্কার করার জন্য। কিন্তু তিনি যে একজন প্রতিভাধর শিল্পী ছিলেন তাঁর খবর আমরা কেউ রাখি না। পেনিসিলিন আবিষ্কারের আগে তিনি জলরঙের সাহায্যে ছবি আঁকতেন। সভ্য হয়েছিলেন চেলসি আর্টস ক্লাবের। তবে পেনিসিলিন আবিষ্কারের পর তাঁর ছবি আঁকার ধরণ পালটে ফেলেন। ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক নিয়ে গবেষণা করার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এক নতুন ধরণের শিল্প সৃষ্টি করতে শুরু করেন। এই শিল্পের নাম দেওয়া হয়েছে “মাইক্রোবিয়াল আর্ট”। তাঁর চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে ইদানীং অনেকে এই জাতীয় শিল্প সৃষ্টি করছেন। পরের কিস্তিতে সেই ধরণের দু একটি উদাহরণ দেবো। 

এবার বলি ডাঃ ফ্লেমিং কি অনন্যসাধারণ কাজ করেছিলেন। তিনি যে অজস্র ব্যাকটেরিয়া নিয়ে [এদের বেশির ভাগই রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া] গবেষণা করতেন তাদের মধ্যে কিছু ব্যাকটেরিয়া রঙিন পদার্থ (পিগমেন্ট) তৈরি করতে পারত। তিনি এই সব ব্যাকটেরিয়াগুলি সংগ্রহ করে রাখতেন। ছবি আঁকার জন্য [অবশ্যই পেট্রি ডিশে। কাগজের উপর নয়] এই রঙিন ব্যাকটেরিয়াগুলি ব্যবহার করতেন। আর তুলির বদলে তারের লুপের সাহায্যে পেট্রি ডিসে আঁকতেন। 

ব্যাকটেরিয়া সৃষ্ট রঙিন পদার্থ ব্যবহার করে নানা ধরণের ছবি উনি এঁকেছেন যেমন শিশুকে মা খাওয়াচ্ছেন, মানুষের মুখ কিম্বা দুটি ভাইরাস যেন রিঙের মধ্যে যুদ্ধ করছে!! এহেন অসাধারণ মানুষকে কুর্নিশ না করে পারা যায় না।

ওপরে ডাঃ আলেকজান্ডার ফ্লেমিং-এর মাইক্রোবিয়াল আর্ট বিষয়ে লিখেছি। তিনি প্রায় এক শতাব্দী আগে এটি শুরু করেছিলেন। আজ সারা বিশ্বে এই বিষয়টি ছড়িয়ে পড়েছে। সৃষ্টি হচ্ছে অসাধারণ সব শিল্প। তা দেখলে তাজ্জব হয়ে যেতে হয়। এতোই সুন্দর সেগুলি যা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম। লেখা হয়েছে প্রবন্ধ। তৈরী হয়েছে ইউটিউব ভিডিও। এমন কি প্রতিযোগিতা হচ্ছে। এই কিস্তিতে চারটি ছবি দিচ্ছি এই প্রতিযোগিতার। 


1) Dancing Microbes – by Ana Tsitsishvili, USA
2) Flowering Sunshine – by Manal Hamed of Qatar
3) Neurons [1st Prize] – by M. Berkmen & M. Penil, USA
4) Peoples Choice – by M. Berkmen & M. Penil, USA

American Society for Microbiology -এর সূত্রে ছবি গুলি পাওয়া গেছে।

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s