বৈজ্ঞানিকের দপ্তর বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক-টাইকো ব্রাহে অরূপ ব্যানার্জি শীত ২০১৭

ভারতের ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক সব পর্ব একত্রে

বিতর্কিত জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহে

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

জ্যোতির্বিদ গ্যালিলিও গ্যালিলি একটি বহুল চর্চিত নাম। পৃথিবী যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে, সে কথা প্রমাণ করার চেষ্টা তিনিই সর্ব প্রথম করেন। তখন মানুষ মনে করত পৃথিবী এক স্থানে স্থির আর মহা প্রতাপশালী সূর্য তার চারিদিকে পাক খাচ্ছে। চার্চও সে কথাই প্রচার করত।

পোপের বিরুদ্ধে মতামত দিয়ে গ্যালিলিওকে অপিরিসীম কষ্টও স্বীকার করতে হয়। এ সব কথাই আমাদের অল্পবিস্তর জানা আছে। কিন্তু গ্যালিলিওর পূর্বসূরি টাইকো ব্রাহে কোনও অংশে কম ছিলেন না।  জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহের জন্ম হয় ডেনমার্কে ১৫৪৬ খ্রিষ্টাব্দে। ডেনমার্কে সেই সময় দুই ধরনের মানুষ ছিল। এক শ্রেণী রাজার পৃষ্ঠ পোষক, কাজেই তারা ছিল ধনী, আর এক শ্রেণী ছিল অত্যন্ত গরীব। টাইকো ছিলেন প্রথম শ্রেণীর। টাইকো তার ধনী বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। তাঁর কাকা জোরগেন ব্রাহের কোনও সন্তান না হওয়ায় টাইকোকে তিনি দত্তক নিতে চান। টাইকোর বাবা-মা সে প্রস্তাবে সম্মতি দেননা। জোরগেন ছিলেন ডেনমার্কের রাজার সামরিক বাহিনীর এক প্রথম সারির সেনাপ্রধান। তিনি বেজায় চটে গিয়ে টাইকোকে অপহরণ করেন। টাইকোর একটি ভাই জন্মালে, ব্যাপারটা ধামাচাপা পড়ে যায়। টাইকো তাঁর কাকার কাছে মানুষ হতে থাকেন। একসময় কাকার বিপুল সম্পত্তির একমাত্র উত্তাধিকার হলেন টাইকো।

কাকা জোরগেনের ইচ্ছানুযায়ী টাইকোর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় আইন বিষয় নিয়ে। যদি তিনি আইনের পথে হাঁটতেন তাহলে এক অসামান্য জ্যোতির্বিদের বিচিত্র আবিষ্কার থেকে বিজ্ঞান বঞ্চিত হতো। কিন্তু সহসা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে গেলো। তার বয়স যখন চোদ্দ, তখন তিনি সূর্য গ্রহণ দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হন। স্থির করেন গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধি জানবার কাজেই আত্মনিয়োগ করবেন। আর যেমন ভাবা তেমনই কাজ। একটু বড় হয়ে আইন বিষয়ে পড়তে গেলেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাথায় ওদিকে ঘুরে চলেছে গ্রহ নক্ষত্রের বিচিত্র জগত নিয়ে বিস্ময়ের পোকা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর মুল্যবান সব বই কিনে ফেললেন। টলেমী আর কোপার্নিকাসের কাজ তন্ন তন্ন করে পড়ে ফেললেন। কিছু গ্রহ নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ যন্ত্রও কিনে ফেললেন। লেগে পড়লেন পুরনো মানযন্ত্রগুলো নিজের মতো করে গড়ে তোলার কাজে। সাথে চলল অঙ্ক কষে গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা। আইন আর কলা বিষয়ে পড়াশুনোও করতে হচ্ছে তখন। নিজের পরিবর্তিত মানযন্ত্র গুলো সবার চোখের আড়ালে রেখে দিয়ে রাত জেগে গ্রহ নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ হল তাঁর শখ।

টাইকোর কাকা, সেনাপ্রধান জোরগেন ব্রাহে, রাজা ফ্রেড্রিক-২ এর পরম বন্ধু ছিলেন। একবার জাহাজে রাজার সাথে ভ্রমণের সময় রাজাকে সমুদ্রে পড়ে যাবার থেকে বাঁচিয়ে দেন জোরগেন। কৃতজ্ঞতা হিসাবে জোরগেনকে আস্ত একটা দ্বীপই উপহার দিয়ে দেন রাজা।  সুইডেন আর ডেনমার্কের মাঝে অবস্থিত সেই দ্বীপের নাম ছিল হ্যাভেন। জোরগেন মারা যাবার পর টাইকো ব্রাহে হ্যাভেন দ্বীপে ইউনানিবর্গ প্রাসাদ গড়ে তোলেন।

বিবিধ মানযন্ত্র বানিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণে অত্মনিয়োগ করলেন সম্পূর্ণভাবে। এই সময় তার তৈরি উল্লেখযোগ্য তিনটি যন্ত্র হল- দ্বিগংশিক বলয় (Azimuthal Quadrant), ভূগোলক (Celestial Sphere)  এবং আরমিলারি গোলক (Armillary Sphere).  দ্বিগংশিক বলয় ব্যবহার করে ধূমকেতুর গতিপথ নির্ণয় করা হয়েছিল। ভূগোলক, মহাকাশে নক্ষত্র সমূহের আবস্থান চিহ্নিত করার জন্য নির্মাণ করা হয়। আরমিলারি গোলকের সাহায্যে গ্রহনক্ষত্রের অক্ষাংশ- দ্রাঘিমাংশ সুনিশ্চিত করা হয়েছিল। ডেনমার্কের রাজা ফ্রেড্রিক ২ ব্রাহের বৈজ্ঞানিক মেধা এবং কাজে খুশি হয়ে তার কাজের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেন।

একবার বেশ মজার এক কাণ্ড ঘটে। টাইকোর বয়স তখন বছর কুড়ি। অঙ্কের এক জটিল ফর্মুলা নিয়ে তার সাথে তর্ক বাধে আর এক জ্যোতির্বিদের। কেউ কারো চাইতে কম যায় না। তাই দুজনে ঠিক করেন ডুয়েল লড়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে। দেখাই যাক, কে ঠিক আর কেই বা বেঠিক। ডুয়েল লড়তে গিয়ে টাইকোর লম্বা নাক গেল উড়ে।  তারপর থেকে উনি তামা, সোনা আর রুপোর তৈরি তিনটি নাক তৈরি করেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই নাক পরে পার্টিতে জেতেন।

সাধে কি আর বলে, বিজ্ঞানীরা একটু ছিটিয়াল হয়! আবার ছিটিয়াল না হলে কে টাইকোর মতো প্রায় ১০০০ নক্ষত্রের এক মহামূল্যবান তথ্য ভাণ্ডার দিয়ে যেতে পারত মানব জাতির জন্য? টাইকো তার তথ্যাবলী আজীবন কাউকে হাত লাগাতে দেননি। কেবল মারা যাওয়ার মাত্র একবছর আগে জ্যোতির্বিদ জোহান্স কেপলারকে তার সহায়ক নিযুক্ত করেন। কেপলার তার মেধার মাধ্যমে টাইকোর মন জয় করে নিতে পেরেছিলেন। টাইকো মারা যাবার পর, টাইকোর সৃষ্ট পাণ্ডুলিপি কেপলারের হাতে আসে। আর তিনিও পরবর্তীকালে পৃথিবী বিখ্যাত হন।

এবার দেখা যাক টাইকোর বর্ণীত সৌরজগত কেমন ছিল। টাইকোর কাজ নিয়ে ভাবনা চিন্তা  করার আগে মাথায় রাখার দরকার যে সে সময়ে টেলিস্কোপ আবিষ্কার হয় নি। টেলিস্কোপ তৈরি করার কথা ভাবেন নি টাইকো। প্রথম টেলিস্কোপ তৈরি হয় গ্যালিলিওর হাতে, আরও কিছু বছর কেটে যাবার পর। টাইকোর প্রস্তাবিত সৌরজগতের কেন্দ্রে ছিল পৃথিবী। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে পাক খায় বৃত্তাকারে। গ্রহেরা সূর্যেকে প্রদক্ষিণ করে বৃত্তাকার পথেই। টাইকোর সৌরজগতের মডেলে একটাই ভুল ছিল। সেটা হচ্ছে পৃথিবীও যে অন্য একটি সৌরগ্রহ, তা অস্বীকার করা। হয়তো তৎকালীন প্রচলিত চার্চ স্বীকৃত ধারনার বিপক্ষে যাওয়া টাইকোর পক্ষেও সম্ভব হয় নি।  টাইকোর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে যে চাঁদ পৃথিবীকে চক্রাকারে পরিক্রমা করে চলেছে। কিন্তু চাঁদকেও একটি গ্রহ হিসাবে ধরা হয়। টাইকো ইউরেনাস, নেপচুন আর প্লুটোকে খুঁজে পান নি। তাই চাঁদ ও সূর্য সমেত মোট আটটি গ্রহকে স্বীকৃতি দেন। তিনি তার অক্লান্ত পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে মঙ্গল (Mars)  গ্রহের গতিপথের উপর এক সুবিশাল পরিসংখ্যান সংগ্রহ করেন। সেই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে পরবর্তীকালে কেপলার তার গ্রহের গতিপথের তিনটি বিখ্যাত সূত্র আবিষ্কার করেন। 

টাইকোর দ্বিতীয় প্রধান কাজ ধূমকেতু নিয়ে। এরিস্টটলের সময় থেকেই মনে করা হত ধূমকেতু পৃথিবী বা চাঁদ থেকে নির্গত কোনও গ্যাসের প্রভাব। প্রচুর পর্যবেক্ষণ করে, অঙ্ক কষে, টাইকো জানান, ধূমকেতু চাঁদের থেকে অনেক দূরে। আর এটা মোটেই পৃথিবী বা চাঁদের কোনও অংশ নয়। ধূমকেতু বস্তুত বরফ আর পাথরের জমাট মিশ্রণ। সূর্যের তাপে তা থেকে গ্যাসের উদ্ভব হয়ে থাকে।     

১৫৭২ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর খুব কাছে, এক আশ্চর্য আলোর ছটা সারা আকাশ জুড়ে দেখা যায় অনেকদিন যাবত। এই ঘটনার পিছনে দৈব শক্তির হাত আছে বলে ভাবা হয়। টাইকো তার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান আর যুক্তি দিয়ে প্রমান করেন যে আলোর ছটার পিছনে আছে পৃথিবীর খুব কাছাকাছি এসে পড়া একটি মৃত্যু পথযাত্রী নক্ষত্র। আধুনিক বিজ্ঞান এই ঘটনাকে সুপারনোভা বিস্ফোরণ বলে জানে।

টাইকো ব্রাহের আগে পর্যন্ত এরিস্টটলিয় ধারনা ছিল, স্বর্গ অর্থাৎ আকাশ, অপরিবর্তনীয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার অবদান প্রচলিত ধ্যান ধারনাকে আমূল বদলে দিতে শুরু করে, যার প্রভাব কেপলার বা তার উত্তরসূরিদের অগ্রসর হতে সাহায্য করে।

টাইকো ব্রাহের খ্যাপামি নিয়ে আনেক গল্প শোনা যায়। তার প্রাসাদে তিনি এক বেঁটে মানুষকে নিজের সহচর হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। এমন বিশ্বাস করতেন যে সে যাদুবিদ্যার অধিকারী। তার আর এক সহচর ছিল বাঁকানো শিং ওয়ালা এক জংলী হরিণ। ব্যস্ততার জন্য টাইকো একবার এক নেমন্তন্ন বাড়িতে যেতে না পারায়, সহচর হরিণটিকে নেমন্তন্ন রক্ষা করার জন্য পাঠিয়ে দেন। সেই নেমন্তন্ন বাড়ির ভোজের সাথে পানীয় কিছু বেশি পরিমানে খেয়ে ফেলে হরিণটি ঘটনাস্থলেই মারা যায়।

জীবনের শেষ পর্যায়ে টাইকো ব্রাহেকে ষড়যন্ত্রের স্বীকার হতে হয়। সাধাসিধা এক বিজ্ঞান সাধকের জীবনে নেমে আসে দুর্ভোগ। ব্রাহের অমানুষিক পরিশ্রমসাধ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের মুল্যবান তথ্য চুরি করে প্রাগে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাগে সেই সময় এ্যডলফ-২ রাজত্ব করতেন। তিনি প্রবল গুণ সম্পন্ন হলেও একটু খ্যাপাটে স্বভাবের ছিলেন। জ্যোতিষ বিদ্যা ও যাদুবিদ্যায় তার বিশেষ আগ্রহ থাকায় ব্রাহের উপর তার নজর পড়ে।

ব্রাহের মৃত্যুও কিছু কম চমকপ্রদ নয়! জানা যায় নেমন্তন্ন বাড়িতে বেশি পরিমাণ বিয়ার খেয়ে ফেলেন তিনি। কিন্তু কিডনির সমস্যার জন্য প্রস্রাব আটকে যাওয়ায় অসুস্থ হয়ে বিছানা নেন। এর কিছুদিন পর ১৬০১ সালে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেন যে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হন ও মার্কারি বিষ প্রয়োগে তাকে মেরে ফেলা হয়। সন্দেহের প্রথম তালিকায় ছিলেন তার প্রধান সহায়ক জোহান্স কেপলার। টাইকো ব্রাহে যাকে বিয়ে করেন, তিনি ছিলেন সাধারণ ঘরের। যেহেতু ব্রাহের জন্ম হয় অভিজাত পরিবারে,  ডেনমার্কের সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী ব্রাহের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ও সন্তানদের তার সম্পত্তিতে অধিকার ছিলনা। সেই সুযোগে কেপলার ব্রাহের সমস্ত সম্পত্তি এবং বৈজ্ঞানিক দলিলের মালিকানা পেয়ে যান। সে কথা কেপলার নিজে স্বীকারও করেন। কেপলারের প্রতি অভিযোগের আঙুল ওঠে। অন্য এক মতে তদানীন্তন ডেনমার্কের রাজা খ্রিস্টিয়ান-৪, ব্রাহের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে বিষ প্রয়োগে মেরে ফেলবার জন্য ব্রাহের দুঃসম্পর্কের এক ভাইকে নিযুক্ত করেন। কারো কারো মতে সেক্সপিয়ার তার হ্যামলেট নাটকের নাট্য উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন ব্রাহের মৃত্যু রহস্য ঘিরে।

ব্রাহের মৃত্যু রহস্য নিয়ে ডেনমার্ক তোলপাড় হলে ১৯০১ সালে কবর থেকে তার দেহ উদ্ধার করে সুইডেন এবং ডেনমার্কে ফরেনসিক পরীক্ষা করানো হয়। ব্রাহের গোঁফ ও চুল  পরীক্ষার ফলাফল বিষ প্রয়োগের অভিযোগ মিথ্যা প্রমানিত করে। ফরেনসিক পরীক্ষায় অনেকেই সন্তুষ্ট হননি। তাই ব্রাহের মৃত্যু এক বিরাট রহস্য হয়েই থেকে যায় জনসমাজে। ২০১০ সালে ডেনমার্কের  বিখ্যাত প্রত্নতাত্বিক প্রফেসর জেন্স ভেলেভ, চার্চ ও আদালতে দরখাস্তের মাধ্যমে, আবার ব্রাহের দেহাবশিষ্ট কবর থেকে উদ্ধার করার অনুমতি পান। কিন্তু ফলাফল সেই একই। বিষপ্রয়োগ মিথ্যে প্রমানিত হয়ে রহস্যের অন্ধকারে ডুবে রইল জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহের মৃত্যু।

তথ্যসূত্রঃ

1) Life and Times of Tycho Brahe by Niall Kilkenny.

2) A Chronicle of Mathematical People by A. Robert

3) The lord of Uraniborg: A Biography of Tycho Brahe by  Victor E. Thoren.

4) Tycho Brahe : A Picture of Scientific Life and Work in the Sixteenth Century by Dreyer, J. L. E.

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s