বৈজ্ঞানিকের দপ্তর ভারতের বৈজ্ঞানিক-বীরবল সাহনি-সংহিতা শরৎ ২০১৬

ভারতের বৈজ্ঞানিক-আগের পর্বগুলো

bigganbiggani58 (Medium)প্রত্নউদ্ভিদবিদ্যা ও ডঃ বীরবল সাহনী

সংহিতা

পৃথিবী বহু পরিবর্তনের পর আজকের অবস্থায় এসেছে। সেইসব পরিবর্তনের কথা জানা যায় পৃথিবীর মাটিতে আর তার নিচে থাকা পাথরগুলো থেকে। এই পাথরগুলোর মধ্যে যেগুলো পলি থেকে তৈরি, কিংবা যেগুলো আকরিক কয়লা, সেগুলোতে ছাপ রয়ে গেছে সুপ্রাচীন জীবজগতের। সেইসব ছাপ থেকে জানা যায় পৃথিবীর কোন ভূভাগ কোন ভূভাগের সাথে ছিল। পাথরে, বালিতে, পলিতে এবং জলে থাকা প্রাচীন জীবজগৎ নিয়ে পঠনপাঠনের বিষয়কে বলা হয় প্যালিঅনটোলজি (Paleontology) বা জীবাশ্মবিজ্ঞান। এই বিষয়ের যে শাখায় গাছ এবং গাছের নানান অঙ্গের এবং অংশের বিষয়ে পঠনপাঠন করা হয়, তাকে বলা হয় প্রত্নউদ্ভিদবিদ্যা বা প্যালিওবটানি (Paleobotany)।

ভারতবর্ষে প্রত্নউদ্ভিদবিদ্যা চর্চার পথিকৃত ছিলেন ডঃ বীরবল সাহনী। ডঃ সাহনী কিন্তু শুরুতে উদ্ভিদবিদ্যাই পড়েছিলেন। পরে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার সময়ে তিনি গন্ডোয়ানার উদ্ভিদ নিয়ে চর্চা শুরু করেন। গন্ডোয়ানা নামে পরিচিত ভূখন্ডটি পঞ্চান্ন কোটি থেকে পঞ্চাশ কোটি বছর আগে তৈরি হয়েছিল।  নানান ভঙ্গিল পর্বত তৈরি হওয়ার পদ্ধতিতে, নানান ভূভাগ জুড়ে আর তাদের মধ্যেকার জলভাগ সংক্ষিপ্তাকার ধারণ করে এক বিশাল মহাদেশ হয়ে জেগে উঠেছিল। আবার সাড়েও আঠার কোটি বছর  আগে থেকে প্রবল লাভা প্রবাহের মধ্যে দিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায় নানান খন্ডে। ভাঙন চলে প্রায় তের কোটি বছর আগে পর্যন্ত। তার মানে চারশো কুড়ি কোটি বছর ধরে সেই মহাদেশে নদী নালা বয়েছে, গাছপালা, পশু থেকেছে। সে সবের চিহ্ণ জমা হয়েছিল সে সময়ের তৈরি হওয়া পলিতে। যেগুলো কালক্রমে তৈরি হওয়া ভারতবর্ষের কয়লাখনিগুলোতে মাঝেমধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়। সেই সময়ের  যেসব গাছপালা ভারতে পাওয়া যায় তাদের নিয়েই চর্চা করেছিলেন ডঃ সাহনী।

ডঃ সাহনী জন্মেছিলেন ১৮৯১ সালের ১৪ই নভেম্বর, তখনকার পশ্চিম পাঞ্জাবের সালপুর জেলার ভীরা গ্রামে। মায়ের নাম ঈশ্বর দেবী, আর বাবার নাম লালা রুচি রাম সাহনী। তিনি ইস্কুলের পাঠ পেরিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন লাহোরের সরকারী কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে ১৯১১ সালে তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। যদিও তাঁর দাদামশায়ের প্রভাবে তিনি বিজ্ঞান পড়া শুরু করেন, তবে দাদামশায়ের চর্চার বিষয় রসায়নকে মুখ্য পাঠের বিষয় না করে, তিনি পড়েছিলেন উদ্ভিদবিদ্যা। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমানুয়েল কলেজ থেক তিনি স্নাতক হন ১৯১৪ সালে। অধ্যাপক এ সি সেওয়ার্ড-এর তত্ত্বাবধানে গবেষণা করে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি পান ১৯১৯ সালে, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এই গবেষণার সময়েই তিনি ১৯১৭ সালে ভারতের গন্ডোয়ানা যুগের গাছেদের বিষয়ে প্রথম আলোকপাত করেছিলেন।

ভারতে ফেরার পর তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। অধ্যাপণা করেছিলেন পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়েও। পরে তিনিই লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত হয়েছিলেন, ১৯২১ সালে। পরবর্তী বছরগুলিতে তিনি গন্ডোয়ানা যুগের নানান গাছের বিবরণ দেন। বহু প্রজাতিকে তিনি সংজ্ঞাত করেন। তার মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল উইলিয়ামসোনিয়া সেওয়ারদি (Williamsonia sewardi)। এই গবেষণার গুরুত্বের কারণে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট উপাধি দেয় ১৯২৯ সালে এবং ১৯৩২ সালে তাঁর লেখা বিবরণগুলি প্রকাশিত হয় প্যালিঅন্টোলজিকা ইন্ডিকা জার্নালে।

এরপরেও বহুকাল তিনি গন্ডোয়ানা যুগের উদ্ভিদদের বিষয়ে বিশদ অনুসন্ধান চালিয়ে যান। তাঁর পৌরহিত্যে লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রত্নউদ্ভিদবিদ্যা চর্চার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। তিনি ভারতের প্রথম প্যালিওবটানিক সোসাইটি স্থাপণ করেছিলেন যেটি পরে ১৯৪৬ সালে ইন্সটিটিউট অফ প্যালিওবটানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

গন্ডোয়ানা যুগের গাছেদের সম্পর্কে ডঃ সাহনীর গবেষণা এতো সুদূরপ্রসারী ছিল  যে তিনি দেশে বিদেশে বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এমনকি তিনি ফেলো অফ রয়্যাল সোসাইটি নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৩৬ সালে। তাঁর গবেষণার সুত্র আজও উল্লেখিত হয় গন্ডোয়ানা যুগের উদ্ভিদদের বিষয়ে গবেষণার সময়ে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s