বৈজ্ঞানিকের দপ্তর ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-নোবেলে উপেক্ষিতা পদার্থবিদ লিস মেইটনার অরূপ ব্যানার্জি বসন্ত ২০১৯

ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-সব লেখা একত্রে 

নোবেলে উপেক্ষিতা পদার্থবিদ লিস মেইটনার

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মাদাম কুরী ছাড়া বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রতিভাবান মহিলা পদার্থবিদ হিসাবে যদি কারো নাম করতে হয়, তবে তিনি হলেন লিস মেইটনার। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে নোবেল প্রাইজ তার ঝুলিতে আসেনি। কিন্তু জার্মান রসায়নবিদ অটো হানের সাথে নিউক্লিয়ার ফিসন রিএকশন আবিষ্কার করার সমান কৃতিত্বের দাবীদার ছিলেন মেইটনার।

লিস মেইটনারের জন্ম হয় অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা শহরে, ১৮৭৮ সালে। মেইটনার পরিবার ছিলেন ইহুদি ধর্মাবলম্বী। সম্ভ্রান্ত, সংস্কৃতিবান এই পরিবারে অল্প বয়স থেকেই লিস মেইটনারের সঙ্গীত, গণিত ও পদার্থবিদ্যায় বিশেষ গুণ দেখা যায়। সেই সময়ে অস্ট্রিয়ান সমাজে মেয়েদের স্কুলের গণ্ডি পেরনো কষ্টসাধ্য ছিল। কিন্তু লিস স্থির করেন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনো করবেন। পরিবারের সবাই উচ্চতর পড়াশুনো এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য তাঁকে যথেষ্ট উৎসাহ দেন। স্কুলের পাঠ সাঙ্গ করে তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠিন প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেখানে ভর্তি হন। তখন ভিয়েনাতে তাত্বিক পদার্থবিদ্যার ক্লাস নিতেন বিখ্যাত পদার্থবিদ লুডউইক বোলজ্‌ম্যান। পদার্থবিদ্যার এই অধ্যাপকটি তার ক্লাসে একমাত্র ছাত্রীকে পেয়ে খুবই খুশি হন। বোলজ্‌ম্যান ছিলেন সেই সময়ে পদার্থবিদ্যার এক জনপ্রিয় অধ্যাপক। তিনি একদিকে যেমন তাঁর ছাত্রদের উৎসাহ দিতেন কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়ে, অন্যদিকে তাদের ভালবাসা উজাড় করে দিতেও কার্পণ্য করতেন না। বোলজ্‌ম্যানের তত্ত্বাবধানে লিস মেইটনারের পদার্থবিদ্যার তালিম একেবারে ভিত থেকে মজবুত হল। তাঁর পিএইচডির বিষয় ছিল জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণের পরীক্ষা। ১৯০৫ সালে তাঁকে পদার্থবিদ্যায় ডক্টরেট ডিগ্রি দেয় ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় মহিলা ডক্টরেট ছিলেন তিনি।

মানসিক অবসাদের কারণে হঠাৎ বোলজ্‌ম্যান আত্মহত্যা করেন। কিন্তু এই সংবাদে মেইটনার একটুও ভেঙে না পড়ে স্থির করেন বোলজ্‌ম্যান ইন্সটিটিউটেই কাজ করে যাবেন। এই ইন্সটিটিউটের নব নিযুক্ত পদার্থবিদ স্টিফেন মেয়ার লিস মেইটনারকে তেজষ্ক্রিয়  বিকিরণের উপর কাজ করবার জন্য অনুরোধ করলে মেইটনার আলফা ও বিটা রশ্মির প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করতে থাকেন। জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময়ে কাজ করছিলেন পদার্থবিদ ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। মেইটনার ইতিমধ্যেই প্ল্যাঙ্কের কাজের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলেন। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কও মেইটনারকে সহকারী হিসাবে পেয়ে বেজায় খুশি। মেইটনার প্ল্যাঙ্কের ক্লাসে ছাত্রী হতে চাইলে প্ল্যাঙ্ক বিস্মিত হয়ে বললেন, “তুমি নিজেই তো একজন ডক্টরেট। আমার ক্লাসে বসে কী করবে?” মেইটনার বলেন, তিনি প্ল্যাঙ্কের অসাধারণ ক্লাস থেকে পদার্থবিদ্যার নতুন জ্ঞান আহরণ করতে চান। প্ল্যাঙ্কের ক্লাসে ছাত্রী না হলে সেটা সম্ভব নয়।

মহিলাদের প্রতি তদানীন্তন জার্মান পুরুষ শাসিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি খুব একটা উঁচুমানের ছিল না। উনবিংশ শতাব্দীর জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মহিলাদের রাখা হত সামান্য চাকুরে হিসাবে, তাদের উচ্চশিক্ষা লাভের কথা একেবারেই মেনে নেওয়া হত না। একরকম পরিস্থিতির চাপে পড়েই একদিন প্ল্যাঙ্ক মেইটনারকে কর্মক্ষেত্রে উপেক্ষা করা শুরু করলেন। যদিও তাঁর বাড়িতে লিসা মেইটনারের অবাধ যাতায়াত অব্যাহত ছিল। প্ল্যাঙ্ক খুব ভাল পিয়ানো বাজাতে পারতেন। তিনি মাঝেমধ্যেই নিজের বাড়িতে গান বাজনার অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। এমনকি আইনস্টাইনও তাঁর বেহালা নিয়ে হাজির হয়ে একবার প্ল্যাঙ্কের সাথে সঙ্গত করেছিলেন। লিস মেইটনার ছিলেন পদার্থবিদ্যার এই দুই প্রতিভাধর পুরুষের সঙ্গীতচর্চার সাক্ষী। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের দুই যমজ কন্যা ছিল লিসের বয়সী, আর তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ক্রমশ গাঢ় হয়ে ওঠেছিল।

প্ল্যাঙ্কের এই সঙ্গীত সন্ধ্যায় একদিন এলেন এক বুদ্ধিদীপ্ত কেতাদুরস্ত তরুণ বিজ্ঞানী, বয়সে প্রায় মেইটনারের সমান। তিনি আবার বড়ই সুকণ্ঠের অধিকারী। গান বাজনায় সেদিনের সন্ধ্যেয় প্ল্যাঙ্কের বসার ঘর মেতে উঠল বিজ্ঞানীদের সঙ্গীতের মূর্ছনায়। তরুণ বিজ্ঞানী অটো হানের সাথে আলাপ হতে সময় লাগল না তরুণী লিস মেইটনারের। হান তখন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তেজস্ক্রিয় রসায়নের উপর গবেষণা করছেন।

সাদামাটা সেদিনের সেই সন্ধ্যায় সূত্রপাত হল এক অত্যাশ্চর্য বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার। তেজষ্ক্রিয়তায় পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন শাস্ত্র প্রয়োগের এক নতুন দিক খুলে গেল। ১৯০৭ থেকে ১৯৩৮, দীর্ঘ তিন দশক ধরে এই দুই বিজ্ঞানী বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন রসায়ন প্রতিষ্ঠানে যৌথভাবে গবেষণা করেন।

বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন এমিল ফিসার। তিনি মহিলাদের গবেষক হিসাবে নিযুক্ত করার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। কাজেই অটো হান যখন লিস মেইটনারকে ফিসারের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন, এককথায় হানের প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেল। হানও ছেড়ে দেবার পাত্র ছিলেন না। নিমরাজি হয়ে ফিসার মেইটনারকে গবেষক হিসাবে তাঁর প্রতিষ্ঠানে নিতে রাজি হলেন এক শর্তে – লিস মেইটনারকে প্রতিষ্ঠানের বেসমেন্টের এক বদ্ধ ঘরে কাজ করতে হবে, প্রতিষ্ঠানের অন্য কোথাও তাঁকে দেখা গেলে চলবে না। এমনকি প্রতিষ্ঠানের শৌচাগার ব্যবহার করতে দেওয়া হল না লিসকে। প্রতিষ্ঠানের বাইরে এক রেস্তরাঁয় তাকে যেতে হত প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। শুধুমাত্র বিশুদ্ধ বিজ্ঞান সাধনার উদ্দেশ্যে মেইটনারের মতো এক সরল মিশুকে তরুণীকে বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তার জারি করা নির্দেশ পালন করতে হয়। অটো হান এই প্রতিষ্ঠানের একজন বেতনভোগী বিজ্ঞানী হলেও লিসকে কোনও বেতন দিতে অস্বীকার করা হয়। তিনি প্রথম কয়েক বছর এখানে কাজ করবার সময় নিজের বাবা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অর্থে নিজের খরচ চালাতেন।

প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিজ্ঞানী সমাজে লিসের যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ছিল। এর একটি বড় কারণ ছিল লিসের আন্তরিকতাপূর্ণ মিষ্টি ব্যবহার আর ধারালো বুদ্ধি। এক্সরে ডিফ্র্যাকশন এর উপর বিশ্বখ্যাত কাজের জন্য প্রসিদ্ধ পদার্থবিদ ম্যাক্স ভন লাউ, নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত পারমাণবিক পদার্থবিদ জেমস ফ্র্যাঙ্ক ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম। বছর দুয়েক পর বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের উপর বিধিনিষেধ সামান্য শিথিল হয় এবং লিস বিজ্ঞানাগারের অন্যত্র বিচরণ করার স্বাধীনতাসহ সামান্য বেতনের মুখ দর্শন করেন। পারমাণবিক পদার্থবিদ্যায় ‘বিটা ডিকে’, বা বিটা কণার ক্ষয় তখন বিজ্ঞানীদের এক মাথাব্যাথার কারণ ছিল। হান ও মেইটনার এই বিষয়ে প্রভূত কাজ করেন এবং তাঁদের অনেকগুলি গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়। তাদের এইসময়ের সবচাইতে তাৎপর্যপূর্ণ গবেষণা ছিল তেজস্ক্রিয় বিকিরণে জন্মানো তীব্র গতিশীল পরমাণুদের অন্য একটি ধাতব পাত্রে একত্রিত করে সনাক্ত করা। কাজটা শুনতে বা পড়তে যত সহজ মনে হচ্ছে, বাস্তবে ঠিক ততটাই কঠিন। কারণ পরমাণুর থেকে নির্গত কণারা অতিশয় ক্ষুদ্র (১০-১৫ মিটার বা তার চাইতে ছোট)।

১৯১২ সালে বার্লিনের শহরতলী ডাহেমে ইন্সটিটিউট অফ কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ফিসিকাল কেমিস্ট্রি খোলা হয়। অটো হান সেখানে তেজস্ক্রিয় রসায়ন বিভাগে বৈজ্ঞানিকের পদে যোগ দেন। লিস মেইটনারকে কাজের সুযোগ দেওয়া হল অবৈতনিক বৈজ্ঞানিক হিসাবে। লিস কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে হাসিমুখে সদ্য প্রাপ্ত চাকরিতে যোগ দিলেন। ভাগ্যক্রমে ঠিক সেই সময়ে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক লিসকে নিজের সহকারী হিসাবে যোগদান করবার জন্য আহ্বান জানান এবং কিছু বেতনের ব্যবস্থাও করেন। এটিই ছিল লিসের জীবনে প্রথম বৈতনিক কর্মসংস্থান। আশ্চর্যের ব্যাপার, লিসের পুরনো মনিব এমিল ফিসার যখন জানতে পারলেন লিসকে প্ল্যাঙ্ক বৈজ্ঞানিকের পদে বহাল করেছেন, তিনি তাঁর প্রভাব খাটিয়ে এমন ব্যবস্থা নিলেন, যাতে লিসকে অটো হানের চাইতে কম বেতন দেওয়া হয়। ফিসারের নারী বিদ্বেষী এই মনোভাব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে পরবর্তীকালে লিস তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে চিঠিতে লেখেন, “কী আর করা যায়? আমি যে পদার্থবিদ্যার প্রেমে পড়েছি। ঠিক যেমন একজন মানুষ আর একজনকে ভালবাসে, যার কাছে সে অনেক দিক থেকে ঋণী!”

প্ল্যাঙ্কের সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও অটো হানের সাথে কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন লিস মেইটনার। তাঁরা খুঁজতে লাগলেন এক্টিনিয়ামের উত্তরসূরি মৌলটিকে। সেটা ছিল বড় কঠিন কাজ। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। হান চার বছরের জন্য যুদ্ধে গেলেন। কাজটা মেইটনারকে প্রায় একাই চালিয়ে যেতে হল। অবশেষে পাওয়া গেল সেই মৌল, যার নাম দেওয়া হল – প্রোট্যাক্টিনিয়াম। অটো হানের সাথে চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখে মেইটনার গবেষণা পত্র প্রকাশ করলেন। তাঁর কাজের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। প্রাগের এক সংস্থা তাঁকে অনেক বেশি বেতনে বৈজ্ঞানিক পদে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানলে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক সাহেব নড়েচড়ে বসলেন। এমিল ফিসারকে প্ল্যাঙ্ক মেইটনারের প্রসিদ্ধির কথা জানাতে, ফিসার তক্ষুনি তাঁর বেতন দ্বিগুন বাড়িয়ে দিলেন। মেইটনারের বার্লিন ছেড়ে যাওয়া আর হল না।

কয়েক বছর পর লিস মেইটনারকে অধ্যাপক পদে বহাল করা হল। তাঁর নিজস্ব গবেষণাগার হল। তিনি হলেন জার্মানির প্রথম মহিলা অধ্যাপক। যদিও গবেষণাগারে নারী বিদ্বেষে ভাঁটা পড়েনি একটুও। কিন্তু লিস তাঁর কাজ নিয়ে ডুবে গিয়ে তাঁর প্রতি বিজ্ঞান জগতের সমস্ত অবিচারকে সহজেই উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন।

১৯৩০ সালের জানুয়ারি মাসে এডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলার হলেন। তাঁর বিরুদ্ধ গড়ে ওঠা জনমতকে কড়া হাতে প্রতিহত করলেন হিটলার। দেশ জুড়ে ইহুদী নিধন শুরু হল। জার্মানির শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনামায় আলবার্ট আইনস্টাইন প্রুশিয়ান একাডেমী অফ সায়েন্স থেকে তাঁর চাকরি হারালেন। বিদেশ থেকে তিনি ঘোষণা করলেন, আর কোনোদিন জার্মানি ফিরে যাবেন না। সমস্ত দায়িত্বশীল পদ থেকে ইহুদিদের সরিয়ে দিতে লাগল হিটলারের নাৎসি সরকার। জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হলেন অসংখ্য স্বনামধন্য ইহুদি বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ। গটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্বিক পদার্থবিদ বিভাগের অধ্যক্ষ বিজ্ঞানী ম্যাক্স বর্ন ইহুদী হওয়ার কারণে তাঁর পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। তাঁর সাথে সাথে চলে গেলেন অনেক ইহুদী পদার্থবিদ ও গণিতজ্ঞ। হিটলারের সরকার বিবৃতি দিল – ‘এই সব ইহুদীরা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে গেলেও আমাদের দেশের কিছু আসে যায় না।’

স্বাভাবিকভাবেই এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে লিস মেইটনারের উপর চাপ আসতে থাকল। জার্মানির  রাজনৈতিক অস্থিরতা লিসকে যথেষ্ট চিন্তিত করে তুলল। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক তাঁকে বার্লিনেই থেকে যেতে পরামর্শ দিলেন। অটো হানও প্ল্যাঙ্ককে সমর্থন করলেন। নিজের জীবন সংশয় নিয়ে লিস ততখানি চিন্তিত ছিলেন না, যতটা ছিলেন সারাজীবনের কাজ ছেড়ে দিয়ে জার্মানি ত্যাগ করতে হবে – এই ভেবে। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় যখন দেখল লিস মেইটনার নিজে থেকে বার্লিন ছেড়ে যাচ্ছেন না, তখন তারা তাঁকে পদচ্যুত করল।

এতদিন প্ল্যাঙ্ক ও হান লিসকে নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, এবার নাৎসি সরকারের চাপে তাঁরা নতিস্বীকার করতে বাধ্য হলেন। হান ও প্ল্যাঙ্ক দুজনকেই ক্রমাগত চাপ দেওয়া হতে থাকলে তাঁরা ভয় পেলেন। অটো হান লিসকে তাঁর গবেষণাগারে আসতে নিষেধ করলেন। মেইটনার খুব কষ্ট পেলেন হানের এমন ব্যবহারে। ডায়েরিতে লিখলেন– ‘হান আমাকে তার সংস্থা থেকে প্রায় ধাক্কা মেরে বার করে দিয়েছিলেন। অবশ্য এর ক’দিন পর সে আমাকে খানিকটা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিল। তবে আমি তখন বুঝেছি, সেই আশ্বাসবাণীর উপর ভরসা করা যায় না।”

লিস বুঝতে পারছিলেন তার পক্ষে জার্মানিতে থাকা আর নিরাপদ হবে না। কিন্তু সেখান থেকে বেরনো ছিল ততটাই কঠিন। কারণ তাঁর কাছে কোনও পাসপোর্ট ছিল না। লিসের বিজ্ঞানী বন্ধুরা লিসকে বেহাল দেখে স্থির থাকতে পারলেন না। হল্যান্ডের দুই পদার্থবিদ ডির্ক কোস্টার আর এড্রিয়ান ফক্কার উঠে পড়ে লাগলেন হল্যান্ডে লিসের একবছরের ফেলোশিপ আর জার্মানি থেকে তাঁর বেরোনোর জন্য টাকা পয়সা জোগাড় করতে। বিজ্ঞানী নিলস বোর কোপেনহেগেনে লিসের চাকরির ব্যবস্থা করতে তৎপর হলেন। সুইডেনের বিজ্ঞানীরা তাঁকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সুইস সরকার পাসপোর্ট ছাড়া লিসকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকার করল। অবশেষে নিলস বোর স্টকহোম ইন্সটিটিউটে লিসের কাজ জোগাড় করে কোস্টারকে পাঠালেন জার্মানিতে, লিস মেইটনারকে সাথে করে নিয়ে আসবার জন্য। লিসের জার্মানি ছাড়ার ঘটনা কোনও অংশে হলিউডের সাসপেন্স ফিল্ম থেকে কম ছিল না। পরিকল্পনামতো বার্লিনের উইলহেম ইন্সটিটিউট অফ ফিজিকাল কেমিস্ট্রির অধিকর্তা পিটার ডিবাই কোস্টারকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে বার্লিন আসতে বললেন। ভাগ্যক্রমে নাৎসি সরকারের নজরে এল না জার্মানি থেকে লিসকে এভাবে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা। মাঝরাতে বার্লিন ছাড়লেন লিস, সাথে পদার্থবিদ কোস্টার। সীমান্তে প্রহরীকে ঘুষ খাইয়ে লিসকে জার্মানির সীমান্ত পার করালেন কোস্টার।

তারপর কয়েক মাস হল্যান্ডে কেটে গেলেও সেখানে থাকার পাকাপাকি ব্যবস্থা হল না লিস মেইটনারের। কিন্তু সুইডেনের স্টকহোমে লিসের চাকরি হয়ে গেল আর তিনি সাথে সাথে তাদের আমন্ত্রণ স্বীকার করে চিঠি দিলেন। ইতিমধ্যে জার্মানির নাৎসি সৈন্য হল্যান্ড আক্রমণ করল। লিস কাল বিলম্ব না করে সুইডেন পাড়ি দিলেন। জার্মানদের অত্যাচারের হাত থেকে বেঁচে গেলেন এক প্রতিভাশালী পদার্থবিদ।

দুর্ভাগ্যবশত লিসের জীবন সুখকর হল না। সুইডেনের যে চাকরি তিনি পেলেন, তাতে তাঁর বেতন একজন সামান্য পরীক্ষাগার সহায়কের সমান হল। অপরদিকে জার্মান সরকার বার্লিনে লিসের ব্যাংক একাউন্ট বাজেয়াপ্ত করায় তাঁর সারাজীবনের জমা পুঁজি ফেরত পাওয়া তো দূর, পেনশন পাওয়ার সম্ভাবনাও বিলীন হয়ে গেল। প্রবল অর্থকষ্টে পড়লেন লিস। একটা ছোট্ট হোটেলের বদ্ধ কামরায়, ধার দেনা করে, কোনোরকমে তাঁর দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত হতে থাকল।

কথায় আছে বিপদ কখনো একা আসে না। লিসের ভাগ্যে তাই লেখা ছিল। স্টকহোম ইন্সটিটিউটে তাকে কাজ করতে হল তাঁর চাইতে আট বছরের ছোট, মানে সেইঘবানের অধস্তন কর্মচারী হিসাবে। সবে মাত্র সেইঘবান তখন এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপির উপর কাজ করে নোবেল পেয়েছেন। দেমাগে তাঁর মাটিতে পা পড়ে না। লিসকে তিনি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে লাগলেন, ‘ওল্ড ফ্যাশান্‌ড্‌ লেডি’ বলে। আবার অন্যদিকে লিসের কাঁধে ভর দিয়ে পারমানবিক পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করবেন বলে পেল্লায় এক সাইক্লোট্রন যন্ত্র কিনে আনলেন সেইঘবান তাঁর নোবেল পুরস্কারের প্রাপ্ত টাকায়। এদিকে লিস সারাজীবন পারমাণবিক পদার্থবিদ্যার উপর সাধারণ মাপের যন্ত্র ব্যবহার করে ব্যাবহারিক ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় প্রবল বুৎপত্তি অর্জন করেও নোবেল বিজয়ীর উপহাসের পাত্র হয়ে কাজ করে যেতে লাগলেন। লিসের পারমাণবিক পদার্থবিদ্যার গবেষণার অভিজ্ঞতা সেইঘবানের চাইতে অনেক বেশি ছিল। তাই তিনি অটো হানকে নিজের সুইডেন বাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলেন – ‘সেইঘবান ইন্সটিটিউট হল অচিন্তনীয় শূন্যস্থান। এখানে আছে পেল্লায় এক সাইক্লোট্রন আর আছে এক এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপ। যা নেই তা হল – পরীক্ষামূলক কাজের সঠিক চিন্তা ভাবনা। এখানে অতি মনোরম এক অট্টালিকা আছে, আছে কিছু অভিজ্ঞতাহীন অল্পবয়সী পদার্থবিদ, আর আছে এক ভয়ঙ্কর শ্রেণী বৈষম্য।’

বদ্ধ অস্বস্তিকর বিজ্ঞানাগারে মেইটনারের হাতে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল – নিউক্লিয়ার ফিসন রিঅ্যাকশন। এনরিকো ফের্মি দেখেছিলেন ইউরেনিয়াম পরমাণুকে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করলে ইউরেনিয়াম পরমাণু বিটা কণা নির্গমন করে নতুন কিছু পরমাণুর সৃষ্টি করছে। কিন্তু কী সেই নবসৃষ্ট পরমাণুর চরিত্র, তা তিনি বুঝে উঠতে পারছে না। আবার সেই নতুন মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা ইউরেনিয়ামের চাইতে বেশি। হান ও মেইটনার এই ইউরেনিয়াম অতিক্রান্ত মৌলের হদিশে নেমে পড়লেন।

হানের পরীক্ষায় দেখা গেল, ইউরেনিয়াম পরমাণু নিউট্রনের আঘাতে ভেঙে গিয়ে যে মৌল পাওয়া যাচ্ছে, বেরিয়ামের সাথে তার ধর্ম মিলে যাচ্ছে এবং তার পারমাণবিক ভর ইউরেনিয়ামের অর্ধেক। হান তার পরীক্ষার উপর গবেষণা পত্র প্রকাশ করলেন আর লিস মেইটনারকে চিঠি দিয়ে পদার্থবিদ্যার তাত্ত্বিক দিক দিয়ে এই পরীক্ষার ফলাফল ব্যাখ্যা করতে বললেন।

ঠিক এই সময়ে লিসের প্রিয় বোনপো অটো ফ্রিজ তার মাসির কাছে ছুটি কাটাতে এলে লিস ও ফ্রিজ দুজনে মিলে পারমাণবিক পরীক্ষার ব্যাখ্যা খুঁজতে লাগলেন। ফ্রিজ তখন নিলস বোরের তত্ত্বাবধানে কোপেনহেগেনে কাজ করছেন। তাদের গণনায় দেখা গেল ইউরেনিয়াম পরমাণুর উপর যে পরিমাণ তড়িৎ জমা হয়ে আছে, তা তাকে ভেঙে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। তারা আরও দেখলেন ভেঙে যাওয়ার পর যে টুকরোগুলো ছিটকে আসছে তাদের সম্মিলিত ভর ইউরেনিয়ামের ভরের চাইতে কম। কোথায় পালিয়ে গেল সেই ভর? আইনস্টাইনের বিখ্যাত ভর ও শক্তির সমীকরণ ব্যবহার করে তারা দেখলেন, ঠিক যতটা ভর লুপ্ত হয়ে গেছে, তার শক্তি ২০০ ইলেকট্রন ভোল্টের সমান। হানের পরীক্ষায় পাওয়া  গিয়েছিল ঠিক একই শক্তিতে ছিটকে যাওয়া নবজন্ম প্রাপ্ত পরমাণু। সেই পরমাণু দুটি হল – বেরিয়াম আর ক্রিপ্টন। ব্যস মিলে গেল হিসেব। পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের যুক্তি খুঁজে পেয়ে ফ্রিজ বোরের ইন্সটিটিউটে ফিরে গিয়ে তাকে সেই কথা জানাতে বোর পরামর্শ দিলেন – দেরি না করে ফ্রিজ আর লিস যেন গবেষণা পত্র প্রকাশ করে ফেলেন। লিস মেইটনার নব আবিষ্কৃত পারমাণবিক বিক্রিয়ার নাম দিলেন – নিউক্লিয়ার ফিশন।

ইতিমধ্যে জার্মান সৈন্যবাহিনী পদার্থবিদ্যায় নব আবিষ্কারের মধ্যে পারমাণবিক বোমা বানাবার পরিকল্পনা খুঁজে ফেলল। ওয়ার্নার হাইসেনবারগ আর অটো হানের বোমা বানাবার দায়িত্ব পেলেন। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা বিফল হল। অন্যদিকে আমেরিকা দুটি পারমাণবিক বোমা বানিয়ে জাপানের দুই শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকি ধ্বংস করে দিল। মারা গেল হাজার হাজার মানুষ, বিকলাঙ্গ হল তার চাইতে অনেকগুণ বেশি। মানবজাতি দেখল পারমাণবিক বোমার বিধ্বংসী চেহারা। লিস একেবারে ভেঙে পড়লেন। সংবাদ মাধ্যম প্রচার করতে শুরু করল লিস মেইটনার জার্মানদের বোমা বানাবার ফর্মুলা ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিয়েছেন, আর আমেরিকা সেই ফর্মুলা কাজে লাগিয়ে কার্যসিদ্ধি করেছে।

১৯৪৪ সালে অটো হানকে নিউক্লিয়ার ফিশন রিঅ্যাকশন আবিষ্কার করবার জন্য রসায়নে নোবেল দেওয়া হল। লিস মেইটনার বঞ্চিত হলেন। অনেকে বলল, লিসের নোবেল পুরস্কার না পাওয়ার পিছনে হাত ছিল সুইডেনের নোবেল কমিটির প্রভাবশালী পদার্থবিদ, লিসের প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন বিজ্ঞানী মানে সেইঘবান।

সারা পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক মহল নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না। ব্রিটেনে তাকে বক্তৃতা করার জন্য ডাকা হলে, বিমানবন্দরেই সাংবাদিকরা তাকে ছেঁকে ধরলেন। লিস তখন নায়িকার পদে অভিষিক্তা। প্রচুর সম্মান ও পুরস্কার  দেওয়া হল লিস মেইটনারকে। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল। লিস অবসর নিলেন সেইঘবান ইন্সটিটিউট থেকে। সুইডেনের এটমিক এনার্জি কমিশন ততদিনে লিসের পদার্থবিদ্যায় গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপলব্ধি করে তার জন্য একটি নতুন পরীক্ষাশালা খুলে দিল। তিনি পারমাণবিক চুল্লি থেকে শক্তি আহরণ করার কাজে মন দিলেন।

১৯৬০ সালে কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে কেমব্রিজে অটো ফ্রিজের কাছে বাস করতে শুরু করেন লিস মেইটনার। প্রায় নব্বই বছর পৃথিবীতে কাটিয়ে, জীবনের শেষদিনগুলিতে বক্তৃতা, ভ্রমণ ও সঙ্গীতের আসরে নিজেকে ব্যস্ত রেখে মারা যান লিস মেইটনার। কেমব্রিজে তাঁর কবরে লেখা হয় – লিস মেইটনার, পদার্থবিদ, যিনি কোনোদিন মানবতা ভোলেননি।

  তথ্যসূত্র

  1. Lise Meitner and the discovery of nuclear fission, by Ruth Lewin Sime, Scientific American Inc. (1998)
  2. The Great Physicists, by William H. Cropper, Oxford Publication (2001), pp.330-343
  3. Freedom and constraint in the life of Lise Meitner, by Rachele Dominguez (2015)
  4. Lise Meitner: a life in physics, by Ruth Lewin Sime Berkeley : University of California Press (1996).

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s