বৈজ্ঞানিকের দপ্তর ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক- আল জাজারি অরূপ ব্যানার্জি শরৎ ২০১৯

ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-সব লেখা একত্রে 

অল জাজারি

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

একবিংশ শতাব্দীকে রোবটিক্সের শতাব্দী বললে বোধহয় ভুল হবে না। গত শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে কম্পিউটরের প্রবল উন্নতির কারণে, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি উন্নত দেশ একেবারে উঠে পড়ে লেগেছে যন্ত্র-মানব বানিয়ে ফেলার কাজে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, অদূর ভবিষ্যতে মানুষের চাইতে অনেক বেশি কর্মদক্ষ যন্ত্র-মানবের দেখা পাওয়া যাবে। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এমনই সম্ভাবনার কথা তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতায় উল্লেখ করতেন। তাঁর ধারণায়, ভবিষ্যতে যন্ত্র- মানব বা রোবটেরা, মানুষের চাইতে অনেক বেশি বুদ্ধিমান ও কর্মদক্ষ হয়ে প্রতিযোগিতায় মানুষকে পিছনে ফেলে দেবে এবং তারাই শাসন করবে পৃথিবী।
রোবটিক্স বিষয় হিসাবে খুব সম্প্রতি জনপ্রিয় হলেও এর মূল ধারণা প্রথম যার মাথায় এসেছিল, তিনি হলেন অল-জাজারি। পুরো নামটা বেশ খটোমটো – বড়ি অল-জামান আবু অল-ইজ ইসমাইল ইবন অল-রাজাজ অল- জাজারি। আমরা এঁকে সংক্ষেপে অল-জাজারি বলেই উল্লেখ করব। তাঁকে রোবটিক্সের জনক বলেও মনে করছেন প্রযুক্তিবিদেরা।
আজ থেকে প্রায় ৯০০ বছর আগে, তুর্কিস্তানের অন্তোলিয়ায় জন্ম হয় জাজারির। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মাঝামাঝি একটা জায়গা আছে, যার নাম হল, অল-জাজিরা। এই জায়গায় অল জাজারির জন্ম হয় বলেই তার নামের শেষে অল-জাজারি লেখা হয়। দ্বাবিংশ শতাব্দীকে বলা হয় মুসলিম স্বর্ণযুগ। অনেক আরব বিজ্ঞানী এই সময়ে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং স্থাপত্যশিল্পে মুল্যবান সব কাজ করে গেছেন। অল-জাজারির ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে মানুষটির সাধারণ জীবন। কিন্তু পাওয়া গেছে তাঁর আরবি ভাষায় লেখা একটা বই- “কিতাব জি মা রিফাত অল-হিয়াল আল হ্যান্ডাসিয়া” — বাংলা করলে দাঁড়ায় – প্রতিভাশালী যন্ত্রের জ্ঞানপুস্তক। ১৯৭৪ সালে বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ডোনাল্ড হিল। সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব জুড়ে অল-জাজারিকে নিয়ে আলোড়ন ওঠে।
একবিংশ ও দ্বাবিংশ শতাব্দীতে আনাতোলিয়ায় রাজত্ব করত তুর্কমান রাজবংশের আর্তুকিদ রাজারা। অল-জাজারির বাবা ছিলেন সেই রাজবংশের প্রধান প্রযুক্তিবিদ। তাঁর মৃত্যুর পর, অল-জাজারি রাজবংশের প্রধান প্রযুক্তিবিদ নিযুক্ত হন। সেই সময় আনাতোলিয়ার সুলতান ছিলেন নাসির মহম্মদ। তাঁরই অনুরোধে অল-জাজারি বইটি লিখে ফেলেন।
বিস্ময়কর ব্যাপার হল, পরবর্তীকালে ইউরোপে যে বিজ্ঞানের বিকাশ হয়, তার অনেক কিছুর প্রস্তাবনা পাওয়া যায় অল জাজারির লেখা বইটিতে। বিজ্ঞানের ইতিহাস লেখকেরা মনে করেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অনেক বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনার সূত্র জাজারির মস্তিস্ক-প্রসুত। তবে এই বিষয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত করা বোধহয় ঠিক নয়। কারণ, ইতিহাস বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একই সময়ে বা ভিন্ন সময়ে একই ধরনের বৈজ্ঞানিক চিন্তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। পণ্ডিতেরা বলছেন, অল-জাজারির কাজগুলো ছিল ‘হিট এন্ড ট্রায়াল’ পদ্ধতিতে করা। অর্থাৎ মাথায় চিন্তা এল, তিনি যন্ত্রের একটা খসড়া ড্রয়িং বানালেন, তারপর যন্ত্রটাকে বানিয়ে ফেললেন। এতেও যদি যন্ত্রের কাজকর্ম পরিকল্পিত যন্ত্রের সঙ্গে মিল না খায়, তবে আবার নতুন করে যন্ত্রের ত্রুটিবিচ্যূতির বিশ্লেষণ করা এবং সংশোধন করা। যন্ত্রের কাজ সাফল্য লাভ করলে ফাইনাল ড্রয়িং করে রাখা। এই পদ্ধতিতে কাজ করে ১৫০টিরও বেশি যন্ত্র বানিয়েছিলান অল-জাজারি।
অল-জাজারির লেখা “প্রতিভাশালী যন্ত্রের জ্ঞানপুস্তক”-এ বত্রিশটি বিভিন্ন যন্ত্রের বিশদ ড্রয়িং-এর দিশা দেখায়। এর মধ্যে প্রায় সব কটিই খুবই চাঞ্চল্যকর। সবচাইতে বিখ্যাত ড্রয়িং হল, হাতি-ঘড়ি। প্রতি আধ ঘণ্টা পরপর এই ঘড়ি সময় জানিয়ে দিত। অল জাজারি তাঁর বানানো যন্ত্রগুলিকে ছয়ভাগে ভাগ করেছেন — ১) ঘড়ি, ২) পানীয় জলের যন্ত্র, ৩) জল দিয়ে পরিষ্কার করবার যন্ত্র, ৪) ঝর্ণার পুকুর, ৫) জলাশয় থেকে জল তোলবার যন্ত্র, ৬) অন্যান্য যন্ত্র।
অল-জাজারি তাঁর যন্ত্রগুলিতে চেন-পুলি, ওজন, গিয়ার, লিভার ও ক্র্যাঙ্ক শাফট ইত্যাদি ব্যবহার করেছিলেন, যা হল যেকোনো ইঞ্জিনের আবশ্যিক অংশ। চেন-পুলি ব্যবস্থা কোনও ভারী জিনিসকে উপরে তুলতে বা নিচে নামাতে সাহায্য করে। মানুষ চেন-পুলির ব্যবহার কবে শুরু করেছিল, সেকথা বলা শক্ত। তবে অল-জাজারির জন্মের অনেক অনেক বছর আগে থেকেই চেন-পুলির আবিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। আধুনিক ক্রেনে চেন-পুলির ব্যবহার আমরা সবাই দেখে থাকি। ক্র্যাঙ্ক-শাফটের সর্বপ্রাচীন চিত্র অল-জাজারির বইটিতে পাওয়া গেলেও এর আবিষ্কর্তা অল-জাজারি কিনা, সে বিষয়ে প্রযুক্তিবিদেরা নিঃসন্দেহ নন। এবার দেখা যাক ক্র্যাঙ্ক-শাফট বলতে আমরা কী বুঝি।
ক্র্যাঙ্ক-শাফট হল যে কোনও ইঞ্জিনের একটি অংশ, যার কাজ হল পিস্টনকে উপরে বা নিচে ঘুরিয়ে কিছু নির্দিষ্ট কাজ করা। বাইরে থেকে শক্তির যোগান দিলে সেই শক্তি গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয় ক্র্যাঙ্ক-শাফটের সাহায্যে। এই লিঙ্কটা দেখে নিলে ক্র্যাঙ্ক-শাফটের ব্যবহার বোঝা যাবে – https://www.youtube.com/watch?v=XWJpvYtcIS8
সুলতান মহম্মদের জন্য প্রার্থনার আগে হাত মুখ ধোয়ার একটি যন্ত্র বানান অল-জাজারি, যাকে তুর্কি ভাষায় বলা হয় উদু।

যন্ত্রের মাথায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল একটি ময়ূর, যার মুখ থেকে জল বেরিয়ে সুলতানের হাত ধুইয়ে দিত। বাম দিকের দরজা খুলে এক পুতুল ভৃত্য বেরিয়ে আসত হাতে সাবানের ট্রে নিয়ে। জল দিয়ে হাত মুখ ধোয়া হয়ে গেলে ডান দিকের দরজা খুলে বেরিয়ে আসত আর একটি পুতুল ভৃত্য, তাঁর হাতে থাকত শুকনো তোয়ালে। সুলতান মহম্মদ এই যন্ত্রের কুশলতায় খুশি হয়ে অল-জাজারিকে বইটি লিখে ফেলতে উৎসাহ দেন।
অল-জাজারির সব চাইতে প্রসিদ্ধ কাজ হল হাতি ঘড়ি। এই ঘড়িতে বিশাল এক হাতির উপর দুটি মানুষ বসে থাকত। একজন হাতির পিঠে বসে একটা ঘুরন্ত টেবিলে হাতে নিয়ে বসে থাকত একটা পেন্সিল। প্রতি আধ ঘণ্টা পর পর হাতির হাওদার মাথায় বসে থাকা একটা ময়ূর ডেকে উঠত এবং সঙ্গে সঙ্গে মাহুত দু’হাতে ড্রাম বাজাত। আসলে হাতির পেটের ভিতর লুকানো ছিল জলের পাত্রের উপর ভাসমান এক ধাতব পাত্র। এই পাত্রের নিচে ছিল একটা ফুটো। ফুটোটা দিয়ে আধ ঘণ্টা ধরে একটু একটু করে জল ঢুকত। ঠিক আধ ঘণ্টা পর জল ভর্তি হয়ে পাত্র ডুবে যেত। পাত্র ডুবে যেতে তার সঙ্গে লাগানো একটা দড়ি টান দিতে গড়িয়ে যেত একটা বল। সেই বল যন্ত্রে হাঁ করে থাকা সাপের মুখে পড়তেই সাপটা যেত উল্টে। উল্টানো সাপের মুখ থেকে বল গড়িয়ে পড়তেই ক্র্যাঙ্ক-শাফটের সাহায্যে ঘুরে যেত যন্ত্রের মাথায় রাখা পাখি। উল্টানো সাপ সোজা হয়ে যেতেই আবার জলের পাত্র দড়ির টানে ভেসে উঠত। ইচ্ছা করলে একবার এই লিঙ্কে এই যন্ত্রের অপূর্ব এনিমেশন দেখে নেওয়া যেতে পারে।

দুবাইতে ইবন বতুতা শপিং মলে গেলে এমনই এক হাতি ঘড়ির দেখা পাওয়া যায়।

আরও অনেক বিচিত্র জল ঘড়ির সন্ধান পাওয়া যায় অল-জাজারির বইটিতে। যেমন ধাতুর তৈরি কেল্লার ভিতরে রাখা জল ঘড়ি, প্রতি একঘণ্টায় যা সময় জানিয়ে দিত। আবার নৌকোর উপর রাখা জল ঘড়িও তৈরি করে তার বর্ণনা লিখে রেখে গেছেন অল- জাজারি।
সরোবর থেকে জল তোলার জন্য পাম্প তৈরি করেছিলেন অল-জাজারি। এই যন্ত্রে বিভিন্ন ধরণের গিয়ার ও শাফট ব্যবহার করা হয়। এই পাম্পে চারটি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়, তাই এই ব্যবস্থার সঙ্গে আজকের দিনের ফোর স্ট্রোক ইঞ্জিনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন, ক্র্যাঙ্ক-শাফট ও গিয়ার ব্যবহার করে কীভাবে জল তোলা যায়। পাঁচটি বিভিন্ন ধরণের পাম্পের হদিশ দিয়ে গেছেন অল-জাজারি, যার চালিকা শক্তি ছিল ওয়াটার হুইল, আজকের দিনে জল তোলবার পাম্প চালানোর জন্য যেমন বিদ্যুৎ-শক্তি বা ডিজেল ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
এছাড়াও অনেক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের উদ্ভাবক ছিলেন অল-জাজারি। এই কাজের দিশা দেখাবার জন্য অবশ্য তিনি গ্রীক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নিয়েছেন, যা তাঁর বিনয়ী চরিত্রের প্রকাশ বলে মনে করেন বিজ্ঞানের ইতিহাস লেখকেরা। অল-জাজারির আগেও মিশর ও বাগদাদের আরব প্রযুক্তিবিদেরা জল ঘড়ি তৈরি করায় পারদর্শী ছিলেন। অল-জাজারি তাঁদের কাজ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।
অল-জাজারির লেখা বইটির আর একটি বৈশিষ্ট্য হল রেখাচিত্র বোঝবার জন্য সাংকেতিক চিহ্নের ব্যবহার, পরবর্তীকালে ইলেকট্রনিক সার্কিটের রেখাচিত্রে যার অনেক চিহ্ন ইঞ্জিনিয়াররা ব্যবহার করেছেন।
অল-জাজারির বইটি আরব দেশের বিজ্ঞান ও ইউরোপীয় বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল। তাঁর বইটিতে শুধুমাত্র ব্যবহার উপযোগী যন্ত্রই নয়, বিনোদনের যন্ত্রও উল্লেখ করেছে। তিনি আবিষ্কারক ছিলেন না, ছিলেন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের একজন দক্ষ উদ্ভাবক। অল-জাজারির লেখা বইটিতে যন্ত্রাংশের গঠনের ও কার্যকারিতার বিশদ বিবরণ আজও আধুনিক যন্ত্রবিদদের বিস্মিত করে। দুর্ভাগ্যবশত, অন্যান্য বিজ্ঞানী ও আবিষ্কর্তাদের নিয়ে যতটা আলোচনা করা হয়, এই অসামান্য প্রতিভাবান যন্ত্রবিদ খুব কমই আলোচিত হয়েছেন।

তথ্য সূত্র –
1. The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices, Ismail al-Jazari, Translated by Donald R Hill, 1974
2. Ismail Al Jazari Machines and New Technologies, Abdullah Uzun*, Fahri Vatansever, acta mechanica et automatica, vol.2 no.3 (2008)

 জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

1 Response to বৈজ্ঞানিকের দপ্তর ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক- আল জাজারি অরূপ ব্যানার্জি শরৎ ২০১৯

  1. ARINDAM DEBNATH says:

    আধুনিক বিজ্ঞানের জনকদের প্রতি অসাধারণ শ্রদ্ধার্ঘ

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s