বৈজ্ঞানিকের দপ্তর ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক- বিজ্ঞান দিশারী নিকোলা টেসলা অরূপ ব্যানার্জি বর্ষা ২০১৮

ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-সব লেখা একত্রে 

বিজ্ঞান দিশারী নিকোলা টেস্‌লা

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

১৮৬২ সাল। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির অধীনস্থ শহর গস্পিক শহরের রবিবারের এক মনোরম সকাল। এক যুবা ব্যবসায়ীর সেই শহরে আগুন নেভানোর এক সংস্থা ছিল। আগুন নেভানোর জন্য অত্যাধুনিক এক মেশিন কেনা হবে। মেশিন বিক্রি করবে যে কোম্পানি, তার লোকজন সকাল থেকে বেজায় শোরগোল ফেলে দিয়েছে নদীর পাড়ে। কীভাবে নতুন মেশিন কাজ করে, তা হাতেনাতে পরীক্ষা করে দেখাতে হবে। শহরের হোমরাচোমরাদের নেমন্তন্ন করা হয়েছে। তামাশা দেখবে বলে নদীর পারে দলে দলে সাধারণ মানুষ নতুন পোশাক পরে হাজির। নদী থেকে পাম্প করে জল তুলে দেখিয়ে দেবে কোম্পানির নতুন মেশিন। পেল্লায় সে মেশিন চালাতে আবার এক আধ জন নয়, মোট ষোল জন লোক লাগে।

মেশিন কোম্পানির এক কর্তা ব্যক্তি মেশিনের উপযোগিতা নিয়ে আবেগ মেশানো গলায় বক্তৃতা দিলেন। মেশিন চালু করবার হুকুম দেওয়া হল। সবাই উৎকণ্ঠিত। মেশিন চালু হল, কিন্তু একবিন্দু জলও তার মুখ দিয়ে বেরোল না। পাম্প বন্ধ করে আবার চালু করা হল। ফলাফলের হেরফের হল না। কোম্পানির কর্তাদের মাথায় হাত। উপস্থিত জনতা বিদ্রুপ করছে। কর্তাদের কপালে শীতের সকালেও ঘাম জমে উঠল। হোমরাচোমরা, গণ্যমান্যরা বিরক্ত। হাতির চাইতেো আকারে বড়, বাজে একটা মেশিন,‌ কোত্থেকে ধরে নিয়ে এসে তাদের ছুটির দিনের সকাল বরবাদ করার কোনও মানে হয়?

হঠাৎ দেখা গেল ছ-সাত বছরের একটা দামাল ছেলে কোথা থেকে ছুটে এসে নদীতে ঝাঁপ দিল। নদীর জলে ডুব দিয়ে ছেলেটি যেই না জল পাম্প করবার মেশিনের সাকশান পাইপ সোজা করে দিয়েছে, অমনি মেশিনের মুখ দিয়ে বেজায় তোড়ে জল বেরিয়ে এল। পাইপের মুখ দিয়ে তীব্র বেগে বেরিয়ে আসা জলে উপস্থিত ভদ্রজনদের পোশাক ভিজে যেতে তারা ভীষণ রেগে গেলো। সবাই হইহই করে উঠল। কম্পানির কর্তারা কিন্তু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

আসলে হাওয়ার চাপে সাকশান পাইপ চুপসে যাওয়ার ফলে পাইপে জল ঢোকার রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটি জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুব দিয়ে পাইপ সোজা করে দিতেই মেশিন চালু। কোনো বিজ্ঞান পাঠ না করে, শুধু উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করে এই সহজ হাওয়ার চাপের নীতি সেদিন যে বালকের মাথায় এসেছিল, তিনি আর কেউ নন, পরবর্তীকালের এসি মোটরের জনক, প্রকৌশলী-বিজ্ঞানী নিকোলা টেস্‌লা।

অতি অল্প বয়সেই টেস্‌লার ক্ষুরধার প্রতিভা ধরা পরে। স্কুলে অসম্ভব দ্রুততায় কষে ফেলতেন অঙ্ক। প্রকৃতি আর বিজ্ঞান নিয়ে অপার কৌতূহল জন্ম দেয় এমন এক বিজ্ঞানীর, যার অবদান সভ্য সমাজ চিরকাল মনে রাখবে।

নিকোলা টেসলা ১৮৫৬ সালে অস্ট্রিয়া আর হাঙ্গেরির এক সীমান্ত এলাকায় অত্যন্ত গরিব পরিবারে জন্ম নেন। তার বাবা মিলুটিন টেসলা ছিলেন একজন খ্রিস্টান পাদ্রী। নিকোলার মায়ের স্কুল শিক্ষা না থাকলেও, তাঁর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার প্রতিফলন দুই ছেলে আর তিন মেয়ের মধ্যে অতি অল্প বয়স থেকেই দেখা যায়। মাত্র বারো বছর বয়সে টেস্‌লার ভাইয়ের মৃত্যু হলে সারা পরিবারের চাপ নিকোলার উপর বর্তায়। তিনি বুঝতে পারেন, ভবিষ্যতে অসচ্ছল পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিতে হবে।

খুব ছোট বয়সে একটি ঘটনা টেস্‌লার মন তোলপাড় করে দেয়। এক বর্ষণমুখর রাতে নিকোলার বাবা পাদ্রি মিলুটিনের ডাক আসে যজমানের ঘর থেকে। ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথে যখন মিলুটিন যজমানের বাড়ি যাচ্ছেন, তখন জঙ্গলে নেকড়ের পাল মিলুটিনের ঘোড়াকে আক্রমণ করে। ক্ষতবিক্ষত ঘোড়া মিলুটিনকে জঙ্গলে ফেলে রেখে বাড়ি ফিরে আসে।

পরিবারের মানুষ আহত ঘোড়ার পিঠে মিলুটিনকে দেখতে না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরিবারের শোক ঘোড়াটিকে এতটাই বিচলিত করে তুলেছিল যে, সে আবার উদ্যম জুটিয়ে দুর্ঘটনার জায়গায় ফিরে গিয়ে তার প্রভুকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। সে যাত্রায় বেঁচে যান পাদ্রী সাহেব।

এই ঘটনা নিজের লেখা বই, ‘মাই ইনভেনশনস’এ উল্লেখ করে নিকোলা মন্তব্য করেন, ঘোড়াটার কাছে তিনি শিখেছিলেন, একবার হেরে গিয়ে কোমর শক্ত করে আবার কীভাবে জিতে যেতে হয়। সারাজীবন সেই যোদ্ধা ঘোড়াটাই যেন বিজ্ঞানের দুস্তর ভূমিতে নিকোলাকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। তাই সারাজীবন ধরেই জ্ঞানপিপাসু এই মানুষটি নজির সৃষ্টিকারী কর্মদক্ষতা দেখিয়ে বিস্মিত করেছেন মানবসমাজকে।

তাঁর কর্মজীবনের কাহিনী, ‘মাই ইনভেনশনস’ পড়ে আরও জানা যায়, দিনের মধ্যে এক বা দু’ঘণ্টা ঘুম তাঁর বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট বলে তিনি মনে করতেন। বলতেন, আমার নতুন আবিষ্কারের ভাবনা আমাকে ঘুমাতে দেয় না। ঘুমালে কাজ কখন করব?

আবিষ্কার কি আর এক-আধটা? কর্মজীবনে পৃথিবীর প্রায় ছাব্বিশটা দেশে প্রায় তিনশো পেটেন্টের মালিকানা পান নিকোলা টেস্‌লা। তার বাবার ইচ্ছে ছিল, বড় হয়ে টেস্‌লাও তাঁর মতো একজন ধর্মযাজক হয়ে উঠুন। কিন্তু খুব অল্প বয়স থেকেই অঙ্কে ও বিজ্ঞানে বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করেন নিকোলা।

ছোটোবেলায় তিনি একবার খুব গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে বাবার কাছে আবদার করেন, আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে দাও, দেখবে আমি ঠিক ভালো হয়ে উঠব। প্রথম সন্তান হারানো পিতা তার দ্বিতীয় সন্তানের কথা ফেলে দিতে পারেননি। তিনি নিকোলার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাওয়ার পথে বাধা দেননি।

হাই স্কুল জিমনাসিয়ামের চার বছরের কোর্সে ভর্তি হয়ে টেস্‌লা তিন বছরেই কোর্স শেষ করে ফেলেন। জানা যায়, তিনি শুধু মনে মনেই জটিল ক্যালকুলাসের অংকের সমাধান করে তার প্রফেসরদের তাক লাগিয়ে দিতেন।

জার্মানির প্রাগ শহরে চার্লস ফার্দিনান্দ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিকাল ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙে ডিপ্লোমা শেষ করার পর হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট শহরে প্রথম কাজে যোগ দেন এক টেলিগ্রাফিক কোম্পানিতে। এখানে কাজে যোগ দিয়েই জীবনে প্রথম যে যন্ত্র আবিষ্কার করেন, তাকে বলা হয় টেলিফোন রিপিটার।

রিপিটার একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র, যা ব্যবহার করা হয় টেলিসিগন্যাল গ্রহণ ও সঞ্চারণের জন্য। এই যন্ত্রটি সেই সময়ে টেলিগ্রাফ মেসেজ পাঠানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এর পেটেন্টের জন্য আবেদন করা হয়নি। সম্ভবত টেস্‌লা সেই সময়ে বয়সে অনেক ছোট হওয়ায় পেটেন্ট সম্পর্কে কোনও ধারনাই তাঁর ছিল না। টেস্‌লার অধ্যাবসায় ও মেধা দেখে তাঁর ঊর্ধ্বতন ইঞ্জিনিয়ার তাকে কন্টিনেন্টাল এডিসন কোম্পানিতে কাজে যোগ দিতে বলেন।

ইতিমধ্যে ইলেকট্রিক বাল্‌ব্‌ আবিষ্কার করে সেই কোম্পানির মালিক বৈজ্ঞানিক স্যার টমাস আলভা এডিসন সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছেন। দেশে দেশে উন্নত শহরগুলিতে ঘরে ঘরে বাল্‌ব্‌ লাগানোর কাজ শুরু হতেই প্রচুর কাজ কোম্পানির হাতে। নিকোলাকে প্যারিসের অফিসে যোগ দিতে বলা হল। বাল্‌বের উন্নতির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে সহজেই কর্তৃপক্ষের নজরে এসে যেতে বছর ঘুরতে না ঘুরতে টেস্‌লাকে আরও বড় দায়িত্ব দিয়ে বদলি করে দেওয়া হল আমেরিকায়।

এডিসনের কোম্পানি তখন ডিসি মোটর তৈরি করে। টেস্‌লা এখানে কাজ করতে করতে পলি-ফেজ অল্টারনেটিং কারেন্ট সিস্টেমের উপর কাজ করতে শুরু করেন। যুগান্তকারী আবিষ্কারের সুচনা হচ্ছিল টেস্‌লার কাজে।

টেসলা অল্টারনেটিং কারেন্ট সিস্টেমের উপর তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করলে এডিসন প্রমাদ গুণতে শুরু করলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ডাইরেক্ট কারেন্ট ইলেকট্রিকাল সিস্টেম চালু হলে এডিসনের কোম্পানি লাটে উঠবে। হলও তাই। এসি মোটর আবিষ্কার হয়ে গেল নিকোলার হাতে। এডিসন সরাসরি জনসমক্ষে টেস্‌লার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করতে লাগলেন, লোককে ভয় দেখাতে লাগলেন।

প্রায় রাতারাতি এডিসনের কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। এসি ইলেকট্রিকাল সিস্টেমে সুবিধা হল এই যে এতে বিদ্যুৎ তৈরির খরচ কম, বিদ্যুৎ এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় পাঠানো সহজ। এছাড়াও ডিসি সিস্টেম প্রাণঘাতী ছিল, যার সম্ভাবনা এসি সিস্টেমে অনেকাংশে কম। 

একরকম বাধ্য হয়েই এডিসন টেস্‌লার এসি সিস্টেম মেনে নিলেন তাঁর কোম্পানিকে ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচানোর তাগিদে। এডিসন বেশি মাইনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টেস্‌লাকে রাজি করালেন ডিসি মোটরের উন্নতির কাজ করতে। এক বছর পরিশ্রম করার পর টেস্‌লা নতুন পেটেন্ট আর নতুন মেশিন বানানোর প্রস্তাব দিয়ে কোম্পানির বেশি লাভের প্রস্তাব দিলেন এডিসনকে।

কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নাকচ হয়ে গেলো টেস্‌লার প্রস্তাব। প্রতিশ্রুত পারিশ্রমিকও তাঁকে দিলেন না এডিসন। বাধ্য হয়ে চাকরি ছাড়লেন টেস্‌লা। সেই সময়ে এমেরিকান শিল্পপতি ওয়েস্টিং হাউস ইলেকট্রিকাল আর্ক ল্যাম্প বানানোর জন্য টেস্‌লার নামে কোম্পানি খোলার প্রস্তাব করলে টেস্‌লা এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। কোম্পানির নাম হল, ‘টেস্‌লা ইলেকট্রিক লাইট এন্ড ম্যানুফ্যাকচারিং।’ তাও বেশিদিন স্থায়ী হল না। এডিসনের মতো ওয়েস্টিংহাউসও টেস্‌লাকে চাপ দিতে লাগলেন ডিসি মোটরের উন্নতি করার জন্য। টেস্‌লা জানতেন যে ডিসি মোটরের দুনিয়া শেষ। তাই তিনি বিদায় জানালেন নতুন তৈরি হওয়া নিজনামের কোম্পানিকে।

এর কিছুদিন পরেই অন্য এক শিল্পপতির আর্থিক সাহায্যে টেস্‌লা গড়ে তুললেন বিশ্বের সর্বপ্রথম এসি মোটর তৈরির ল্যাবরেটরি। ১৮৯৬ সালে নায়েগ্রা ফলসের কাছে স্থাপিত হল সেই এসি কারেন্ট জেনারেশন প্ল্যান্ট। ইতিমধ্যে এডিসনের কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেছে।

এরপর তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসাবে আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় টেস্‌লাকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করলে তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে যায়। ১৮৯৮ সালে আমেরিকার নৌবাহিনীর জাহাজে টেস্‌লা বেতার সঙ্কেত যন্ত্র বসিয়ে প্রচুর খ্যাতি ও অর্থ লাভ করেন।

টেস্‌লার তৈরি বিশ্বের প্রথম এসি মোটর

ওয়েস্টিংহাউসের কোম্পানিতে কাজ করতে করতে টেস্‌লা আবিষ্কার করেছিলেন এক হাই ফ্রিকোয়েন্সি অল্টারনেটিং কারেন্ট রেসোনেন্ট কয়েল, যা সারা পৃথিবীতে ‘টেস্‌লা কয়েল’ নামে খ্যাত। টেস্‌লা কয়েল দিয়ে হাই ভোল্টেজ স্পার্ক তৈরি করে যে-সব কাজ করা যেত, তাঁর মধ্যে অন্যতম, ইলেক্ট্রোথেরাপি করে বাতের ব্যথা কমানো ও ইলেকট্রিক কারেন্ট তারের সাহায্য ছাড়াই অনেক দূর পর্যন্ত পাঠানো।

তখনো পর্যন্ত কিন্তু মার্কনি সাহেব রেডিওর আবিষ্কর্তা হিসাবে আবির্ভূত হননি। আশ্চর্যের বিষয়, বেতার যোগাযোগ বা টেলিগ্রাফির কাজে টেস্‌লা কয়েল ব্যবহৃত হত মারকনির রেডিও আবিষ্কারের পরেও। এখন অবশ্য বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটায় টেস্‌লা কয়েল ব্যবহার করা হয় শুধু আকাশে রঙিন আলোর কারসাজি দেখাবার কাজেই। তদানিন্তন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে টেস্‌লা কয়েলের অবদান ছিল অসামান্য। মার্কনির অনেক আগে ১৮৯৬ সালে টেস্‌লা রেডিওর পেটেন্ট জমা করেন। দুর্ভাগ্যবশত আমেরিকান ফেডারেল কোর্টের আদেশে তাঁর সেই পেটেন্ট গৃহীত হয় তাঁর মৃত্যুর পর।

জীবনের শেষ কর্মভাগে নিকোলা টেস্‌লা যুদ্ধের কাজে ব্যবহার হতে পারে এমন এক রশ্মি আবিষ্কারের পরিকল্পনা করেন, নাম দেন ‘ডেথ রে’। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ইলেকট্রিকাল চার্জ দিয়ে অনেকটা আজকের দিনের লেজার রশ্মির মতো সেই বিধ্বংসী রশ্মি শত্রু জাহাজকে মুহূর্তে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে বলে তিনি অনুমান করেন। কিন্তু তাঁর সেই আবিষ্কার অসম্পূর্ণ থেকে যায় তাঁর মৃত্যুতে।

এই অসামান্য প্রতিভাধর বিজ্ঞানী জীবনের শুরুতে এক্সরে ভ্যাকুয়াম টিউবের মধ্যে বিদ্যুৎ চালনা করে এক্সরে আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। কিন্তু আমরা জানি, রন্ট্‌জেনকেই সেই আবিষ্কারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। হাই ফ্রিকুয়েন্সি ইলেকট্রিকাল কারেন্ট পশুমাংসে উত্তাপের সৃষ্টি করে, এই কথা তিনি তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবনের গোড়াতেই অনুমান করে ফেলেছিলেন। মাইক্রোওয়েভ আবিষ্কারের সূত্রপাত তখনি। কিন্তু সে-কাজ বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি টেস্‌লা। মাইক্রোওয়েভ ওভেনের জন্ম এর অনেক অনেক পরে হয়। 

নিকোলা টেস্‌লা খুব ছোটবেলা থেকে এক অদ্ভুত অসুখে ভুগতেন। মনস্ত্বাত্বিকেরা এর নাম দিয়েছেন, অবসেসিসভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার বা সংক্ষেপে ওসিডি। বাংলায় বলা যেতে পারে অত্যাধিক অমোঘ ব্যাধি। ওসিডিতে আক্রান্ত হয় পৃথিবীর খুব কম সংখ্যক মানুষ। মনের এই জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি তাঁর চোখের সামনে অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পায় বারবার। আসলে এমন মানসিক অবস্থায় সেই ব্যক্তির ভ্রান্ত ধারণা হয়, যেন ঘটনাগুলো যেন তার চোখের সামনেই ঘটছে। এর ফলে তার আচার ব্যবহার সাধারণের চাইতে পৃথক হয়। আচরণগত বৈষম্যের জন্য মানুষ ওসিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পাগল বলে ধরে নেয়, যা সম্পূর্ণ ভুল। নিকোলা টেস্‌লা চোখের সামনে অদ্ভুত আলোর ছটা দেখতে পেতেন হঠাৎ হঠাৎ। সেই দৃশ্য তাকে এত বেশিমাত্রায় বিরক্ত করে তুলত, যে তিনি দুই হাত দিয়ে চোখের সামনে থেকে দৃশ্যগুলি সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। এই অদ্ভুত আচরণ ও ব্যবহারের জন্য ব্যক্তিগত জীবনে সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশা করতে তাঁর যথেষ্ট অসুবিধা হত।

টেস্‌লা তার আবিষ্কারের নিয়ে বিশদ আলোচনা করে গেছেন তাঁর লেখা বই ‘মাই ইনভেনশনস’ এ। এই বইটি পড়ে তাঁর মানসিক অবস্থান এবং প্রতিটি আবিষ্কারের পিছনে তার সুচিন্তিত পরিকল্পনার হদিশ পাওয়া যায়। জানা যায়, জটিল মেশিনগুলোর ড্রয়িং তিনি মনে মনেই এঁকে ফেলতে পারতেন, আর স্মৃতিতে ধরেও রেখে দিতেন। বিস্ময়কর ভাবে তার পরিকল্পিত কোনও মেশিন বাস্তবে বানাবার পর কখনো ব্যর্থ হয়নি। শুধু নতুন আবিষ্কারের পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে উন্নততর মস্তিষ্কের অধিকারী এই বিজ্ঞানী নিজের ভিতরে ডুব দিয়ে থাকতেন। বাইরের পৃথিবী তাঁর মনকে আলোড়িত করতে পারত না। আর হয়তো সেই কারণেই তিনি সারাজীবন থেকে গেছেন অবিবাহিত, নিঃসঙ্গ।

টেস্‌লার দৈনন্দিন একটি অবশ্য কর্তব্যের মধ্যে ছিল পায়রাদের খাবার খাওয়ানো। শোনা যায় কাজে অত্যন্ত ব্যস্ততা থাকলেও তিনি পায়রাদের খাওয়ানোর কথা ভুলতেন না। নিজের খাওয়াদাওয়া নিয়ে যাঁর একটুও মাথাব্যথা ছিল না, শুধুমাত্র পায়রাদের প্রতি কেন তাঁর অতিরিক্ত ভালবাসা ছিল, এর সঠিক ব্যখ্যা দেওয়া কঠিন।

তাঁর আর একটি অভ্যাস মানুষকে বিব্রত করে তুলত। কারো সাথে হাত মেলাবার পর সাথে সাথে তিনি সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর এই অভ্যেস, সদ্য হাত মেলানো মানুষটিকে বেকায়দায় ফেলে দিত। টেস্‌লার খুব কাছের যে দু-একজন মানুষ ছিলেন, তাঁরা টেস্‌লার স্মৃতিচারণে বলে গেছেন, ছোটবেলা থেকে বারবার শরীরে রোগের সংক্রমণ হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই নিজেকে রোগমুক্ত রেখে নিরলস কাজ করে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একরকম বাধ্য হয়েই তিনি নাকি এই কাজ করতেন।

অবিবাহিত নিঃসঙ্গ জীবনে টেস্‌লা অন্য কাউকে তাঁর গবেষণার ওয়ারিশ করেও যাননি। রেডিও আবিষ্কারের সাতচল্লিশ বছর পর ১৯৪৩ সালে এক হোটেলের বদ্ধ ঘরে টেসলাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ৮৬ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর প্রিয় বিজ্ঞানের জগত ছেড়ে চলে যান অসামান্য প্রতভাধর বিজ্ঞানী নিকোলা টেস্‌লা।

অসাধারণ প্রতিভাধর বিজ্ঞানী তার জীবদ্দশায় অনেক সম্মান ও অর্থ লাভ করলেও, শেষ জীবনে অর্থকষ্টের শিকার হন। এত উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার করে গেলেও নোবেল প্রাইজের জন্য তাঁর নাম কখনো মনোনীত হয়নি।

টেস্‌লার মৃত্যুর খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই তাঁর সমস্ত গবেষণার দলিলের দখলদারি নিয়ে নেয়। “চরম গোপনীয়” তকমা লাগিয়ে, বিশ্বচক্ষুর আড়ালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর সমস্ত গবেষণার মূল্যবান কাগজপত্র। খুব সম্ভব সামরিক যন্ত্রপাতির উপর টেস্‌লার গবেষণা যাতে শত্রু দেশের হাতে যাতে চলে না যায়, সেই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, নিরলস কর্মী, আপাত দৃষ্টিতে বদমেজাজি মানুষটি কিন্তু অন্তরালে ছিলেন এক আদ্যন্ত দার্শনিক। এ-বিষয়ের সুলুক সন্ধান তাঁর নিজের বয়ানে লিখিত বই ছাড়াও তাঁর কিছু ঘনিষ্ঠের কাছ থেকে জানা যায়। খুব আল্প বয়স থেকেই পৃথিবীতে উপস্থিত শক্তি নিয়ে প্রচুর চিন্তাভাবনা করতেন তিনি। বলতেন, পৃথিবীর বিভিন্ন শক্তি, বিভিন্ন রূপে আছে। প্রয়োজন তাঁকে একীভূত করা। সেটা করতে পারলেই মনুষ্যজগতে শক্তি ও ক্ষমতার অভাব হবে না।

তাঁর দার্শনিক চিন্তা ভাবনার ফল স্বরূপ তিনি মহাজাগতিক রশ্মির উপর গুরুত্বপূর্ণ সব গবেষণা করে গেছেন। জীবনের শেষ ভাগে তিনি আধ্যাত্মিক দর্শন নিয়ে উৎসাহী হয়ে পড়েন। বিশ্ব ধর্মমহাসভায়, বিবেকানন্দের চিকাগো বক্তৃতার দিন, নিকোলা টেস্‌লা সভাগারে উপস্থিত ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে স্বামীজির বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হন। তাঁর মনে হয়, সৃষ্টির উৎস ও অন্ত নিয়ে নিজের মনে যে বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার উদয় হয়, আশ্চর্যরকম ভাবে হিন্দু বেদান্ত দর্শনে দেওয়া আছে তার ইঙ্গিত।

এতে টেসলার অনুসন্ধানী মন যেন নতুন দিশা পেয়ে গেল। তিন বছর স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকা বাস করেন। ১৮৯৫ সালে তিনি একটি ফ্রেঞ্চ নাটক দেখতে যান। সেই নাটকে একটি মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন প্রখ্যাত ফরাসি অভিনেত্রী সারা বার্নার্ড। প্রেক্ষাগৃহে সেদিন নিকোলা টেসলাও ছিলেন। সারা বার্নার্ড প্রেক্ষাগৃহে বিবেকানন্দকে দেখতে পান। নাটক শেষ হতেই দেখা করে স্বামীজিকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। টেস্‌লার সাথে সারা বার্নার্ডের বন্ধুত্ব ছিল। তাই টেসলাও সেই নৈশভোজে আমন্ত্রিত হন।

স্বামীজি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের বিষয়ে চিরকালই উৎসুক ছিলেন। নিকোলা টেসলার গবেষণা তাঁকে কৌতূহলী করে তোলে। দুই প্রবাদ পুরুষ বিজ্ঞান ও হিন্দু দর্শন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। আলোচনার মাধ্যমে বিবেকানন্দ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে জড় ও শক্তি, একে অন্যতে পরিবর্তিত হওয়া সম্ভব। টেস্‌লা সম্মতি জানান যে তিনি বল ও জড়পদার্থের সমন্বয়কে শক্তিতে পরিবর্তনের প্রমাণ দেবেন অঙ্ক কষে। টেস্‌লা সংস্কৃত পড়তে শিখেছিলেন কিনা সে বিষয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় না, তবে তার লেখায় দুটি সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার করে গেছেন, প্রাণ ও আকাশ। সংস্কৃত শব্দ ‘আকাশের’ সঠিক অর্থ টেস্‌লা তাঁর ক্ষুরধার মেধা দিয়ে বুঝেছিলেন। আকাশ, অর্থাৎ জড়। প্রচলিত ধারনা ছিল বেদান্তে ‘আকাশ’ শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে ইংরাজিতে ‘ইথার’ অর্থে। প্রাণকে তিনি আখ্যা দেন শক্তি হিসাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত টেস্‌লা ওই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে দেখাতে অসমর্থ হন।

বিজ্ঞানের দলিলে নিকোলা টেস্‌লার নাম শুধুমাত্র চুম্বক শক্তির একক হিসাবেই থেকে গেছে। ডাক্তারি পরামর্শে এম আর আই করাতে গিয়ে সাধারণ মানুষও পরীক্ষাগারের বিজ্ঞাপনে TESLA শব্দটি দেখতে পেয়ে একবার অন্তত এই মানুষটিকে স্মরণ করে। সৌভাগ্যক্রমে আবার বিশ্বজুড়ে নিকোলা টেস্‌লার মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। সম্প্রতি আমেরিকান মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA মহাকাশে একটি পরীক্ষা মূলক রোবট চালিত যান পাঠিয়েছে যার নাম রাখা হয়েছে ‘টেস্‌লা কার’। এখন প্রয়োজন শুধু তাঁকে স্মরণের মধ্যে দিয়ে আরও বিজ্ঞান চেতনার প্রসার। 

তথ্যসূত্রঃ

  1. The Life Times of NikolaTesla—Biography of a Genius, Marc J. Seifer. Birch Lane Press, Secaucus, N.J.,. 1996.
  2. Nikola Tesla, Life and Works, Istvan G. Kocsis, 2015
  3. My Inventions, Nikola Tesla, Electrical Experimenter magazine, 1919

ছবি সূত্রঃ The Life and. Times of NikolaTesla—Biography of a Genius, Marc J. Seifer, Birch Lane Press, Secaucus, N.J., 1996.

 

 জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s