বৈজ্ঞানিকের দপ্তর মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাকাশের ভূতুড়ে আলো কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় বসন্ত ২০১৭

মহাবিশ্বে মহাকাশে আগের পর্বগুলো

bigganmohabishwe6001-medium

    বিগব্যাং-এর পর তৈরি হল মহাবিশ্ব। মহাকাশে জন্ম হল অসংখ্য কোটি নক্ষত্রর। এরা নিজেদের মিধ্যে জোট বাঁধল। তৈরি হল ‘গ্যালাক্সি’ বা ‘তারাজগৎ’। মহাকাশে কতগুলি তারাজগৎ আছে? এর সঠিক উত্তর বিজ্ঞানীদেরও জানা নেই। কারণ মহাবিশ্ব বা মহাকাশের খুব সামান্য অংশই আমরা দেখতে পাই। বেশিরভাগটাই চোখের আড়ালে। তাই বলা যেতে পারে মহাকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য কোটি তারাজগৎ। 

     মহাবিশ্ব যেন এক সীমাহীন মহাসমুদ্র। সেখানে ভেসে বেড়ানো তারাজগৎগুলি একা একা থাকে না। থাকে দল বেঁধে। এরকম এক একটি দলকে বলা হয় এক একটি আঞ্চলিক গোষ্ঠী। এই আঞ্চলিক গোষ্ঠী আবার একটি সু-বৃহৎ তারাজগৎগুচ্ছের অংশ। ‘আবেলি 2744’ (Abeli 2744)  একটি সু-বিশাল তারাজগৎগুচ্ছ। চলতি কথায় একে বলা হয় ‘প্যান্ডোরাস তারাজগৎগুচ্ছ’ (Pandora’s Cluster)। এই তারাজগৎগুচ্ছ থেকে বেরিয়ে আসছে একধরনের ভৌতিক আলো। এই বিস্ময়কর ঘটনা কয়েক বছর আগে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের চোখে ধরা পড়েছে। কোথা থেকে আসছে এই হালকা নীল আলো? উৎসুক বিজ্ঞানীরা শুরু করে দেন খোঁজাখুঁজি।

     যখন তারাজগৎগুলি নিজেদের মধ্যে জোট বেঁধে আঞ্চলিক গোষ্ঠী বা তারাজগৎগুচ্ছ তৈরি করে তখন অনেক সময় দু’টি তারাজগতের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষরত দুটি তারাজগতের একটি সাধারণত উপবৃত্তাকার হয়ে থাকে। হাবল্‌ স্পেস টেলিস্কোপ এমনি এক সংঘর্ষরত তারাজগতের সন্ধান দিয়েছে অশ্লেষা নক্ষত্রমণ্ডলীতে। এখানে যে তারাজগৎ দুটির মধ্যে সংঘর্ষ চলছে তার একটি হল  ESO 510 এবং অপরটি হল  G 13। প্রায় এক কোটি আলোকবর্ষ দূরে আরও দুটি তারাজগৎকে সংঘর্ষরত অবস্থায় দেখা গেছে। এদের একটি দৈত্যাকার উপবৃত্তাকার তারাজগৎ এবং অপরটি তুলনায় অনেক ছোট একটি সর্পিল তারাজগৎ। ধনুরাশির মধ্য দিয়ে দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে এদের দেখা গেছে। এই বিধ্বংসী সংঘর্ষে  তারাজগৎ দুটির আকৃতি যেমন বদলে যায় তেমন বহু তারা নিজ নিজ তারাজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরা তখন সেই তারাজগৎগুচ্ছে ভবঘুরের মতো একা একা ঘুরে বেড়াতে থাকে। টফির দু’টি প্রান্ত ধরে টানলে যেমন মাঝখানটা সরু হতে হতে একসময় ছিঁড়ে যায় তেমন সংঘর্ষের ফলে ও মহাকর্ষ বলের টানে কখনও কখনও কোনো কোনো তারাজগতেরও তেমনি দশা হয়। ছিন্নভিন্ন হয়ে নিষ্প্রভ এই তারাজগৎগুলি তারাজগৎগুচ্ছের মধ্যে মৃতবৎ অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়। প্যান্ডোরাস তারাগুচ্ছের মধ্যে ছয় বিলিয়ন বছর ধরে ছিন্নভিন্ন হওয়া এরকম ছ’টি মৃতবৎ তারাজগৎ আছে। যেখানে যেখানে এই তারাজগৎগুলি আছে সেই অঞ্চলগুলি গাড় অন্ধকারে ডুবে আছে। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা গেছে যে ছিন্নভিন্ন তারাজগৎগুলির যে তারাগুলি ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে সেগুলি দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের তারা। এগুলির জ্বালানী শেষ হয়ে গেছে। কেন্দ্রে জমে আছে অক্সিজেন, কার্বন ও নাইট্রোজেন-এর মতো ভারী মৌলগুলি। পুরো তারাজগৎগুচ্ছটিতে এই ধরনের তারা আছে 200  বিলিয়নের মতো। এই তারাগুলি নিষ্প্রভ হলেও এগুলি থেকে এখনও এক ধরনের হাল্কা নীলাভ আলো বেরিয়ে আসছে। এই আলোর পরিমাণ সমগ্র তারাজগৎগুচ্ছ থেকে যে পরিমাণ আলোর বিকিরণ হচ্ছে তার প্রায় দশ শতাংশ।

     আবেলি 2744  তারাজগৎগুচ্ছে দৃশ্যমান যে তারাজগৎগুলি আছে তাদের প্রত্যেকটি দেখতে নীলাভ-সাদা। অথচ সম্পূর্ণ তারাজগৎগুচ্ছটি দেখতে নীলাভ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমনটা ঘটচ্ছে মৃত তারাজগৎগুলি থেকে বেরিয়ে আসা ওই  নীলাভ ভৌতিক আলোর প্রভাবে।

     এই প্রসঙ্গে বলি, আমরা যে তারাজগতের বাসিন্দা তার নাম ছায়াপথ বা মিল্কিওয়ে। কখনও কখনও একে আমরা আকাশগঙ্গাও বলে থাকি। আমাদের পড়শি তারাজগৎগুলির মধ্যে অন্যতম অ্যান্ড্রোমিডা। শরতকালে একে প্রায় সারা রাত ধরে দেখা যায়। ছায়াপথ থেকে এর দূরত্ব প্রায় কুড়ি লক্ষ আলোকবর্ষ (এক সেকেন্ডে আলো তিন লক্ষ কিলোমিটার পথ যায়। এই হিসেবে এক বছরে আলো যতটা পথ যায় তাকে বলে এক আলোকবর্ষ)। অ্যান্ড্রোমিডা এগিয়ে আসছে ছায়াপথের দিকে। বিজ্ঞানীরা হিসেব কষে দেখেছেন যে প্রায় ৩০০ কোটি বছর পরে অ্যান্ড্রোমিডা ও ছায়াপথ তারাজগৎ দু’টির মধ্যে এক বিশাল সংঘর্ষ ঘটবে। দুটি তারাজগৎই দৈত্যাকার। অকল্পনীয় সেই সংঘর্ষের পর দু’টি তারাজগৎই তালগোল পাকিয়ে যাবে। বদলে যাবে তাদের আকৃতি। তখন আমরা কেউই থাকব না। কারণ সৌরজগৎই থাকবে না। কে বলতে পারে সেই সময় অন্য কোনো গ্রহে বসবাসকারী কোনো উন্নত প্রাণী এই অঞ্চলে কোনো ভৌতিক আলো দেখবে না?

তথ্যসূত্রঃ

  1. The Universe – Iain Nicolson; 1996 Horus Editions.
  2. Philip’s Atlas of the Universe – Patrick Moore; 2001 Chancellor Press.
  3. Galaxies and the Universe – Allan Sandage, Mary Sandage and Jerome Kristian.
  4. Star Clusters – James E. Hesser.
  5. Wikipedia
  6. মহাবিশ্বের বিস্ময় (প্রথম খণ্ড) – অরুণাভ চক্রবর্তী; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
  7. মহাবিশ্বে আমরা কি নিঃসঙ্গ – শঙ্কর চক্রবর্তী; বেস্ট বুক্‌স্‌, কলকাতা।
  8. মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় – প্রশান্ত প্রামাণিক; জ্ঞান বিচিত্রা, আগরতলা।

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

 

          

               

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s