বৈজ্ঞানিকের দপ্তর মহাবিশ্বে মহাকাশে- কোয়াসার কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষা ২০১৭

মহাবিশ্বে মহাকাশে আগের পর্বগুলো

রহস্যময় জ্যোতিষ্ক – কোয়াসার  

সূর্য অস্ত গেলে নেমে আসে অন্ধকার। আর তখনই মহাকাশ ধীরে ধীরে ছেয়ে যায় আলোর মালায়। কোনোটি মিটমিট করে জ্বলছে, কোনোটির রঙ লাল, কোনোটি নীল, কোনোটি আবার ধবধবে সাদা। আদিমকাল থেকেই এই নক্ষত্রখচিত মাহাকাশ আমাদের কাছে বিস্ময়। আজও আমাদের এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। কত না রহস্য ছড়িয়ে আছে এই আদি-অন্তহীন মহাকাশের আনাচে কানাচে।

কোয়াসি-স্টেলার রেডিও সোর্স (Quasi-Stellar Radio Source), সংক্ষেপে কোয়াসার (Quasar) হল মহাকাশে এক রহস্যময় জ্যোতিষ্ক। এগুলি নক্ষত্র নয়, অথচ বিপুল আলো নিঃসরণ করে। এই নক্ষত্রসদৃশ্য উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কগুলি মহাকাশের অতি দূরতম অঞ্চলে অবস্থিত। এখনও পর্যন্ত এক হাজার কোটি আলোকবর্ষ দূরের ব্রহ্মাণ্ডগুলি (গ্যালাক্সি বা তারাজগত) দেখা সম্ভব হয়েছে। কোয়াসারগুলি আরও দূরের জ্যোতিষ্ক।  সাধারণ নক্ষত্রের সাথে এদের বড় পার্থক্য হচ্ছে এদের অকারের তুলনায় আলো নির্গমনের হার অত্যন্ত বেশি। অর্থাৎ আকারে অনেক ছোট হয়েও এরা অবিশ্বাস্য রকমের উজ্জ্বল।

মহাকাশে কোয়াসারের উপস্থিতি প্রথম জানা যায় ১৯৬০ সালে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেন যে মহাকাশের এমন জায়গা থেকে বেতার-তরঙ্গ নির্গত হচ্ছে যেখানে কোনো নক্ষত্রজাতীয় দৃশ্য আলোর উৎস নেই। এই বেতার-তরঙ্গের উৎস খুঁজতে গিয়েই তাঁরা সুদূর মহাকাশে কোয়াসার নামক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কর অস্তিত্ব টের পান। পরবর্তীকালে শক্তিশালী দূরবিনের সাহায্যে ওই অঞ্চলগুলিতে তাঁরা দৃশ্য আলোর উৎসের  সন্ধান পান। এত দূর থেকে এদের টিমটিমে তারার মত দেখতে লাগলেও প্রকৃতপক্ষে এদের ঔজ্জ্বল্য কোনো বড় তারাজগতের চেয়েও কয়েক শ’ গুণ বেশি হতে পারে।

প্রথম দিকে আবিষ্কৃত কোয়াসারগুলির মধ্যে বেতার তরঙ্গ নির্গমনের বিষয়টি প্রবলভাবে লক্ষ করা গেলেও পরবর্তীকালে এমন কিছু কোয়াসারের সন্ধান পাওয়া গেল যাদের বেতার তরঙ্গ সক্রিয় নয়। বেতার তরঙ্গহীন কোয়াসার আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা ‘কোয়াসি-স্টেলার রেডিও সোর্স’ নাম থেকে ‘রেডিও’ এবং ‘সোর্স’ শব্দ দুটি পাল্টে ‘অবজেক্ট’ (Objects) শব্দ ব্যবহার করে জ্যোতিষ্কগুলির নতুন নামকরণ করেন ‘কোয়াসি-স্টেলার অবজেক্ট’ (Quasi-steller Objects  সংক্ষেপে, QSO)।

কোনো কোনো কোয়াসারে বেতার তরঙ্গ সক্রিয় আবার কোনো কোনোটাতে তা অনুপস্থিত কেন? এর কারণ সঠিকভাবে এখনও জানা যায় নি। তবে দেখা গেছে যে কোয়াসারগুলি থেকে লেজের মতো অংশ বের হয় সেগুলির বেতার তরঙ্গ সক্রিয়।

কোয়াসার সম্পর্কে যে মতবাদগুলি প্রচলিত আছে তাদের মধ্যে কয়েকটি হল—

কোয়াসার হল এমন একটি নক্ষত্র যার ভর দশ লক্ষ সৌরভরের সমান। এর আলোর উৎস নক্ষত্রটির কেন্দ্রের কণা সমূহের মধ্যে সংঘটিত তাপ উৎপদ্যমান বিক্রিয়া ফিশন, ফিউশন, মহাকর্ষীয় ধ্বংস ইত্যাদি।

এই মতবাদ অনুসারে ক্ষুদ্র আয়তনের কোয়াসার থেকে বিপুল আলো নির্গমনের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেও অতি ভরের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। বিজ্ঞানীদের মতে ওরকম বিপুল ভরের কোনো নক্ষত্র যদি এতো আলো নিঃসরণ করতে থাকে তাহলে সেটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার কথা। এছাড়াও এ রকম বিপুল ভরের নক্ষত্রের নির্গত শক্তির ধরণ কোয়াসার থেকে নির্গত শক্তির ধরণ এক নয়। এই সব কারণে মতবাদটি সর্বজন গ্রাহ্য হল না।

মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা অদৃশ্য নক্ষত্রজগতের (গ্যালাক্সি) কোনো কোনোটার কেন্দ্রে রয়েছে অতিভারী কৃষ্ণবিবর। এরা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে ধূলি কণা ও গ্যাস গ্রাস করছে। কৃষ্ণবিবরে আগত বস্তুর ধ্বংসজনিত শক্তিই কোয়াসারের আলোর উৎস। কোনো নক্ষত্র যখন এই কৃষ্ণবিবরের পাশ দিয়ে যায় তখন তার নিকটপ্রান্তের উপর কৃষ্ণবিবরটির আকর্ষণ দূরপ্রান্তের তুলনায় বেশি থাকে। এই অসম আকর্ষণের ফলে নক্ষত্রটি ভেঙে চুড়ে ঘুর্ণায়মান ধূলি কণা ও গ্যাসীয় মেঘে পরিণত হয়ে কৃষ্ণবিবরের পৃষ্ঠে পতিত হয়। এই ধুলো ও গ্যাসীয় মেঘ যতক্ষণ ঘটনা দিগন্তের বাইরে থাকে ততক্ষণ এগুলি থেকে বিপুল আলো, বেতার তরঙ্গ ইত্যাদি নিঃসরণ হয়। ঘটনা দিগন্তে প্রবেশ করলে কৃষ্ণবিবরের প্রবল আকর্ষণে সেগুলি আর বেরিয়ে আসতে পারে না। এমন অবস্থায় কোয়াসারের কোনো বেতার তরঙ্গ সক্রিয়তা থাকে না। কোয়াসারে সঙ্গে কৃষ্ণবিবরের এই সংশ্লিষ্টতা থেকে কোয়াসারের ক্ষুদ্র আয়তন ও বিপুল আলো ও বেতার তরঙ্গ নিঃসরণের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ১৯৭৫ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিল এই মতবাদকে সমর্থন করে বলেন, কৃষ্ণবিবরটি প্রকৃতপক্ষে কয়েক কোটি সৌরভরের সমান ভর বিশিষ্ট কোনো নক্ষত্রের এক ঘন সন্নিবেশের কেন্দ্রে অবস্থিত।  

অনেকের মতে এই বিস্ময়কর জ্যোতিষ্কগুলির অফুরন্ত শক্তির উৎস হল অতি ভারী কৃষ্ণবস্তু (Dark Matter) যারা চারপাশের ধূলি কণা ও গ্যাস শোষণ করে নিজেরাই হয়ে ওঠে বিপুল শক্তির উৎস।

আরেকটি মত হল একটি কোয়াসারের জন্ম হয় দু’টি প্যাঁচানো তারাজগতের (গ্যালাক্সি) সংঘর্ষের ফলে। এই সংঘর্ষের সময় যে তারাজগতটির ভর বেশি থাকে তার কেন্দ্রস্থ অতিভারী কৃষ্ণবিবর শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং অপেক্ষাকৃত কম ভরের তারাজগতটির নক্ষত্রগুলি ও গ্যাসকে গ্রাস করতে থাকে। এই সময় প্রচণ্ড আলো নিঃসৃত হয়। চুপসে যাওয়া কম ভরের এই তারাজগতটিই হয়ে ওঠে একটি কোয়াসার। সম্প্রতি হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এরকমই একটি কোয়াসারের সন্ধান পেয়েছে। PG- 1012 + 008  নামের এই কোয়াসারটির পৃথিবী থেকে দূরত্ব ১·৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ।

কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে থাকা কোয়াসারগুলি খালি চোখে দেখতে পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। দেখার জন্য অতি শক্তিশালী বিশাল দূরবিনের সাহায্য নিতে হয়। এদের সম্পর্কে প্রচলিত কোনো মতবাদই এখনও সর্বজন গ্রাহ্য নয়। তবে এই জ্যোতিষ্কগুলি থেকে আগত আলোকরশ্মি, বেতারতরঙ্গ, এক্স-রে এবং অবলোহিত রশ্মি বিশ্লেষণ করে এখনও পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে তা হল এগুলি হল ধুলোর বলয়ে গঠিত দূরবর্তী কোনো তারাজগতের উজ্জ্বল সক্রিয় কেন্দ্রবিশিষ্ট বস্তু।

১৯৬০ সাল নাগাদ বেতার তরঙ্গ সক্রিয় জ্যোতিষ্কদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়। সেই তালিকায় 3C-273  নামের একটি জ্যোতিষ্ক ছিল। বেতার উৎসের এই জ্যোতিষ্কটি মাঝে মাঝেই চাঁদের আড়ালে চলে যায়। ১৯৬২ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের পার্কস রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান মানমন্দিরের বিজ্ঞানীরা এর অবস্থান নির্ণয় করতে সমর্থ হন। ১৯৬৩ সালে জ্যোতির্বিদ মার্টেন স্মিড এর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে হতবাক হয়ে যান। দেখা গেল 3C-273  কোনো নক্ষত্রই নয়। এক বিস্ময়কর জ্যোতিষ্ক। এর উজ্জ্বলতা একটা তারাজগতের মোট উজ্জ্বলতা থেকে অনেক গুণ বেশি।

কণা-ত্বরায়ক যন্ত্রে (Synchrotron) চুম্বকক্ষেত্রের ভিতর যখন শক্তিশালী ইলেকট্রন পাঠান হয় তখন এক ধরনের তরঙ্গ বিকিরণ পাওয়া যায়। একে বলা হয় সিঙ্কোট্রন রেডিয়েশন (Synchrotron Radiation)। কোয়াসারগুলি থেকে যে বিকিরণ বেরিয়ে আসে তা কৃত্রিম উপায়ে তৈরি এই তরঙ্গ বিকিরণের মতোই। যেহেতু কোয়াসারের শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রে ইলেকট্রনগুলি প্রচণ্ড গতিতে কুণ্ডলী আকারে চলে তাই অজস্র বেতার তরঙ্গ বেরিয়ে আসে।

রাশিয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইগর নোভিকভ এবং ইজরাইলের ইয়ুভ্যাল নীম্যান মনে করেন যে কোয়াসার হল আসলে শ্বেতবিবর বা শ্বেতগহ্বর (White Hole)। যদিও শ্বেতবিবরের অস্তিত্ব তত্ত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মহাকাশে এখনও আমরা এদের খুঁজে পাই নি। তবে কোয়াসারের অস্তিত্ব এবং ধর্ম সম্বন্ধে এখন আমাদের অনেকটাই জানা।

চল্লিশ কোটি আলোকবর্ষ দূরে আছে G2237 + 0305 গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রজগত। এর পিছনে আটশো কোটি আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে একটি কোয়াসার। এর আলো গ্যালাক্সিটির পাশ দিয়ে আসার সময় আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ অনুসারে বেঁকে যায়। ফলে ‘মহাকর্ষীয় লেন্সিং প্রভাব’-এর কারণে  কোয়াসারটির চারটে প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। একে ‘আইনস্টাইন ক্রস’ বলে। কোয়াসারের একট মাত্র প্রতিবিম্ব খুব কম দেখতে পাওয়া যায়।        

এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে কেউ অমর নয়। ‘জন্মিলে মরিতে হবে’ এই তত্ত্ব সকলের জন্যই প্রযোজ্য। পৃথিবীতে জীবজগতের যেমন জন্ম-মৃত্যু আছে তেমন মহাবিশ্বে গ্রহ-নক্ষত্রেরও জন্ম-মৃত্যু আছে। কোয়াসারের জীবনও অনন্ত নয়। এদের কাছাকাছি গ্যাসভাণ্ডার যখন নিঃশেষিত হয়ে যায়, তখন এদের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায় অর্থাৎ এদের মৃত্যু হয়। বিজ্ঞানীদের মতে কোনো কোয়াসারেই দু’শো কোটি বছরের বেশি টিকে থাকতে পারে না। বর্তমানে আমরা যে কোয়াসারগুলি দেখছি সেগুলি থেকে নির্গত  আলো মহাকাশের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বহু কোটি বছর পর আমাদের চোখে এসে পড়ছে। তাই বলা যেতে পারে দৃশ্যমান কোয়াসারগুলির অনেকেরই হয়তো এখন আর অস্তিত্ব নেই। যা দেখছি তা তাদের একেবারে শৈশবের চেহারা।

তথ্য সূত্রঃ

Space Encyclopedia – Heather Couper and Nigel Henbest; 1999 Dorling Kindersley.

The Universe – Iain Nicolson; 1996 Horus Editions.

The Rough Guide to the Universe – John Scalzi; 2003 Rough Guides Ltd.

মহাবিশ্বের বিস্ময় (প্রথম খণ্ড) – অরুণাভ চক্রবর্তী; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।

মহাবিশ্বে আমরা কি নিঃসঙ্গ – শঙ্কর চক্রবর্তী; বেস্ট বুক্‌স্‌, কলকাতা।  

মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় – প্রশান্ত প্রামাণিক; জ্ঞান বিচিত্রা, আগরতলা।

আকাশ ও পৃথিবী – মৃত্যুঞ্জয়প্রসাদ গুহ; চতুর্থ সংস্করণ ১৯৯৮, শৈব্যা প্রকাশন বিভাগ।

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s