বৈজ্ঞানিকের দপ্তর মহাবিশ্বে মহাকাশে কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎ ২০১৭

মহাবিশ্বে মহাকাশে আগের পর্বগুলো

সূর্য অস্ত গেলেই মহাকাশে দেখা যায় অজস্র আলোর বিন্দু। অত প্রাচীনকালের মানুষের কাছে তা ছিল এক বিস্ময়। সে সময় নক্ষত্র সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না। তাই তারা অবাক হয়ে ভাবত অন্ধকার নেমে এলেই মহাকাশে এরা কোথা থেকে আসে, আর দিনের বেলায় এরা কোথায় পালিয়ে যায়? এই রহস্যের উত্তর অবশ্য আজ আমাদের জানা। আমাদের এটাও জানা যে প্রতিটি নক্ষত্রই জন্ম-মৃত্যুর জীবনচক্রে বাঁধা। যদিও এদের জন্ম ও মৃত্যুর মাঝের সময়কাল এতটাই বড় যে আমাদের কারও জীবনে কোনো একটি নক্ষত্রের সম্পূর্ণ জীবনকাল দেখা সম্ভব নয়।

মহাকাশের মহাজাগতিক ধূলিকণা ও আন্তর্নাক্ষত্রিক গ্যাস থেকে নক্ষত্রদের জন্ম হয়। তারপর শুরু হয় তাদের বিবর্তন। বহুকাল নক্ষত্র হিসেবে থাকার পর তারা ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। মৃত্যুর পর তারা হয়ে যায় সুপার নোভা, সাদা বামন, নিউট্রন নক্ষত্র বা পালসার, কৃষ্ণগহ্বর, কীটগহ্বর, শ্বেতগহ্বর কিংবা কোয়াসার ইত্যাদি। চন্দ্রশেখরের নিয়ম অনুসারে বলে দেওয়া যায় নক্ষত্রটির শেষ দশা কেমন হবে। যে সব অপজাত নক্ষত্রের (Degenerate Star) ভর সূর্যের ভরের ১∙৪ গুণের কম তারা ‘সাদা বামন’ নক্ষত্রে পরিণত হবে। যাদের ভর ১∙৪ গুণের বেশি কিন্তু ৩ গুণের বেশি নয় তারা শেষ দশায় ‘নিউট্রন নক্ষত্র’ বা ‘পালসার’ হবে। আর যে সব অপজাত নক্ষত্রের ভর এর চেয়েও বেশি তারা বিস্ফোরিত হয়ে ‘সুপারনোভা’ হবে। এই ভর-সীমা (Mass-limit) জ্যোতির্বিজ্ঞানে “চন্দ্রশেখর সীমা” (Chandrasekhar Limit) নামে খ্যাত।

মহাকাশে বিশালায়তনের মহাজাগতিক গ্যাস ও ধূলিকণা এক জায়গায় জড়ো হয়ে অনুকূল অবস্থায় নিজের মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে সংকুচিত হতে থাকে। এই গ্যাসের মেঘে থাকে হাইড্রোজেন পরমাণু এবং যৎসামান্য অন্যান্য উপাদানের পরমাণু। এগুলি একত্রে আণবিক মেঘের (molecular clouds) চেহারা নিয়ে ছড়িয়ে থাকে প্রায় কয়েকশো আলোকবর্ষ। এই অবস্থায় এর অভ্যন্তরে শক্তি উৎপাদনের ব্যবস্থা ক্রিয়াশীল হয় না। বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের এই প্রারম্ভিক অবস্থার নাম দিয়েছেন আদি নক্ষত্র (Protostar)। সংকোচন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আদি নক্ষত্রের অভ্যন্তরে তাপ ও চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাপমাত্রা দশ লক্ষ ডিগ্রি কেলভিনে পৌঁছোলে এবং ঘনত্ব জলের ঘনত্বের প্রায় একশো গুণ হলে আদি নক্ষত্রের অভ্যন্তরে নিউক্লীয় বিক্রিয়া (Nuclear Reaction) শুরু হয়। এই সময় মহাকর্ষজনিত সংকোচন বন্ধ হয়ে যায়। এইভাবে একটা আদি নক্ষত্র একটা নক্ষত্রে পরিণত হয়। অত্যুচ্চ তাপমাত্রার কেন্দ্রকীয় সংযোজনে (nuclear fusion) নক্ষত্রটিতে সঞ্চিত হাইড্রোজেন পরমাণু হিলিয়াম পরমাণুতে রূপান্তরিত হতে থাকে। এরই সঙ্গে উৎসারিত হয় প্রভূত শক্তি ও বিকিরণ। নক্ষত্রটি উজ্জ্বল দেখায়।

এইভাবে কোটি কোটি বছর চলতে চলতে এক সময় নক্ষত্রটির কেন্দ্রাঞ্চলের সমস্ত হাইড্রোজেন পরমাণু হিলিয়াম পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। তখন কিছু সময়ের জন্য শক্তির উৎপাদন থেমে যায়। এই সময় নক্ষটির কেন্দ্রাঞ্চল সঙ্কুচিত হতে আরম্ভ করে।

যে সমস্ত নক্ষত্রের ভর সৌর ভরের ১∙৪ গুণ অপেক্ষা বেশি, তাদের ক্ষেত্রে সংকোচন-পর্বে ইলেকট্রন ও প্রোটন মিলিত হয়ে তৈরি হয় নিউট্রন নক্ষত্র। দেখা গেছে, সৌরভরের তিন গুণ পর্যন্ত ভর বিশিষ্ট নিউট্রন নক্ষত্র সাম্যাবস্থায় থাকতেপারে। এই সীমাকে বলা হয় ওপেনহাইমার ভলকফ লিমিট (Oppenheimer Volkoft Limit)। শুধুমাত্র নিউট্রন কণা দিয়ে তৈরি একটি নিউট্রন নক্ষত্রের ঘনত্ব এতটাই বেশি থাকে (প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে ১০৮ বা ১০ কোটি মেট্রিক টন) যে এক চামচ বস্তুপিণ্ডের ভর কয়েক কোটি টন হতে পারে। তুলনায় এদের ব্যাস হয় খুবই কম— মাত্র কয়েক কিলোমিটার। নক্ষত্রটিকে ঘিরে থাকে ইলেকট্রন-প্রোটন সম্বলিত আয়নিত গ্যাসীয় ঘূর্ণন। এই গ্যাস-প্লাজমার আচ্ছাদনে নিউট্রন নক্ষত্রটি প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকে। মহাসঙ্কোচনের দরুণ সৃষ্টি হয় এক অতি শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র যা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র। এই ঘূর্ণনের সঙ্গে তাল রেখে চৌম্বকীয় বলে গ্যাসীয় ধূম্রজালের আহিত কণাগুলিও ঘুরতে থাকে। এক্ষেত্রে ঘূর্ণায়মান নিউট্রন নক্ষত্রটি চুম্বকদণ্ডের মতো কাজ করে। অত্যুচ্চ ঘূর্ণন বেগের কারণে আহিত কণাসমূহ উত্তরোত্তর শক্তি অর্জন করতে থাকে। এর ফলে যে বিকিরণ বিচ্ছুরিত হয় তাকে বলে সিঙ্কেট্রন রেডিয়েশন (Synchertron Radiation)।

আহিত কণার গতিবেগ আলোর গতিবেগের কাছাকাছি এলে এরা চৌম্বকীয় অক্ষের কাছাকাছি চলে আসে। তখন চৌম্বকীয় মেরু থেকে সূক্ষ্ম বিকিরণ রশ্মি বা বেতার তরঙ্গ নির্গত হয়। এই বিকিরণ রশ্মির ত্বরিত দিক পরিবর্তনের কারণে নির্গত বেতার তরঙ্গ লাইটহাউসের আলোর মতো নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। বেতার-স্পন্দন গুচ্ছের এই উৎসকেই পালসার (Pulsar) বা বেতার স্পন্দক বলা হয়।

পালসার হল ঘূর্ণায়মান নিউট্রন নক্ষত্র। যদিও সব নিউট্রন নক্ষত্র পালসার নয়। যে সব নিউট্রন নক্ষত্রের ঘূর্ণনবেগ, উদ্ভূত চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের প্রাবাল্য, আয়নিত গ্যাস-প্লাজমা, পারিপার্শ্বিক তাপ-চাপ ইত্যাদির প্রত্যাশিত মাত্রার সমাবেশ ঘটে শুধু তারাই পালসার হয়। পালসারের চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী।  

তাহলে সহজ কথায় বলা যাতে পারে, পালসার হল অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং অত্যন্ত ঘন এমন এক গাগনিক বস্তু যা থেকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর হ্রস্ব বেতার তরঙ্গের ঝলক (Pulse) নিঃসৃত হয়। ইংরেজিতে এর পুরো নাম ‘পালসেটিং রেডিও স্টার’ (Pulsating Radio Star)। সংক্ষেপে আমরা ‘পালসার’ বলে থাকি। পালসার থেকে যেসব বেতার তরঙ্গ নিঃসৃত হয় তাদের কম্পাঙ্ক সাধারণত ত্রিশ মেগাহার্ৎজ [MHz] থেকে তিনশো মেগাহার্ৎজ[ MHz]-এর মধ্যে থাকে। তবে সব থেকে বেশি শক্তি নিঃসৃত একশো মেগাহার্ৎজ কম্পাঙ্কের বেতার তরঙ্গ থেকে। বেতার তরঙ্গ ছাড়াও পালসার থেকে গামা বা এক্সরশ্মি তরঙ্গও নিঃসৃত হয়। যে পালসার থেকে বেতার তরঙ্গরূপে বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় রশ্মি পৃথিবী অভিমুখে ছুটে আসে আমরা শুধু সেই পালসারটিকে শনাক্ত করতে পারি। পালসারগুলি থেকে যে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ঝলক নিঃসৃত হয় সেই কাল-পরিমাণ ০∙০০৩ সেকেন্ড থেকে ০∙১৬ সেকেন্ড। প্রত্যেকটি পালসারের ঝলকের সময়কাল এবং পরপর দুটি ঝলকের মধ্যবর্তী সময়ান্তরের মান বহু লক্ষ বছর ধরে এক থাকে।

১৯৬৭ সালে মহাশূন্যের বেতার তরঙ্গের উপর গবেষণাকারী জোসেলিন বেল এবং তাঁর গবেষণার উপদেষ্টা  টনি হেউইশ প্রথম পালসার আবিষ্কার করেন। সেই সময় কোনো বিজ্ঞানী পালসারের ধারণা মেনে নিতে পারেননি। বেতার তরঙ্গের এই স্পন্দন বা পালস এতটাই সুষম ও নিয়মিত ছিল যে তাঁরা তখন একে ভিনগ্রহের কোনো উন্নত সভ্যতা থেকে পাঠানো সংকেত বলে মনে করতেন। এরপর একে পর এক পালসার আবিষ্কৃত হতে থাকে। পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে মহাকাশে ১৫০ টির মতো পালসারের সন্ধান পাওয়া যায়। এখনও পর্যন্ত ১৮০০ পালসার আবিষ্কৃত হয়েছে। ১০৫৪ সালে মহাকাশে ঘটে যাওয়া এক সুপারনোভার অবশেষ থেকে সৃষ্টি হয়েছিল কর্কট নীহারিকা (Crab Nebula)।  সেখানে এই ধরনের স্পন্দন দেখতে পাওয়া যায়। এই পালসারের ঝলক প্রতি সেকেন্ডে ত্রিশ বারের মতো হতে দেখা যাচ্ছে।   

কয়েক বছর আগে ফার্মি গামা-রশ্মি স্পেস টেলিস্কোপ একটি নতুন ধরনের পালসার আবিষ্কার করেছে যেখান থেকে শুধুমাত্র গামা রশ্মির বিকিরণ হচ্ছে। প্রায় দশ হাজার বছরের পুরোনো এই মৃত নক্ষত্রের দেহাবশেষ থেকে প্রতি সেকেন্ডে তিনবার গামা রশ্মি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গবেষক পিটার মাইকেলসনের মতে সম্পূর্ণ নতুন জাতের এই পালসারের এটিই প্রথম নমুনা। প্রায় ৪৬০০ আলোকবর্ষ দূরে সিফিয়ুস নক্ষত্রপুঞ্জে রয়েছে সিটিএ-১ নামের সুপারনোভার অবশিষ্টাংশ। শুধু গামা-রশ্মি বিকিরণকারী এই নতুন পালসারটির অবস্থান সেখানেই এবং এর রশ্মি পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে প্রতি ৩১৬∙৮৬ মিলি সেকেন্ড পর পর। প্রায় দশ হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে সৃষ্ট এই পালসারটি আমাদের সূর্যের চেয়ে এক হাজার গুণ বেশি শক্তি নির্গমন করতে পারে। নতুন পালসারটি সুপারনোভা সিটিএ-১ এর প্রসারণশীল গ্যাসীয় খোলের ঠিক কেন্দ্রে নেই, একটু কিনারায় রয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এটা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। সুপারনোভা বিস্ফোরণ অপ্রতিসম হতে পারে। ফলে যে ধাক্কা বা শক তৈরি হয়, তা নিউট্রন নক্ষত্রকে মহাশূন্যের দিকে ছুড়ে দিতে পারে।

মহাকাশে রহস্যের শেষ নেই। যত দিন যাচ্ছে, নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে, ততই আমরা অবাক হচ্ছি। নতুন নতুন গ্রহ, নক্ষত্রের সঙ্গে মহাকাশে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে বিস্ময়কর নানা বিচিত্র মহাজাগতিক বস্তু। পালসার এমনই এক অত্যাশ্চর্য বস্তু।

তথ্য সূত্রঃ

  1. Space Encyclopedia – Heather Couper and Nigel Henbest; 1999 Dorling Kindersley.
  2. The Universe – Iain Nicolson; 1996 Horus Editions.
  3. The Rough Guide to the Universe – John Scalzi; 2003 Rough Guides Ltd.
  4. মহাবিশ্বের বিস্ময় (প্রথম খণ্ড) – অরুণাভ চক্রবর্তী; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
  5. মহাবিশ্বে আমরা কি নিঃসঙ্গ – শঙ্কর চক্রবর্তী; বেস্ট বুক্‌স্‌, কলকাতা।
  6. মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় – প্রশান্ত প্রামাণিক; জ্ঞান বিচিত্রা, আগরতলা।
  7. আকাশ ও পৃথিবী – মৃত্যুঞ্জয়প্রসাদ গুহ; চতুর্থ সংস্করণ ১৯৯৮, শৈব্যা প্রকাশন বিভাগ।
  8. পালসার – অনিশা দত্ত; শারদীয় জ্ঞান ও বিজ্ঞান, দশম-একাদশ সংখ্যা ২০১৬।
  9. নতুন ধরনের পালসার আবিষ্কৃত – সিফাত মাহমুদ; বিজ্ঞান সাময়িকী।

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s