বৈজ্ঞানিকের দপ্তর মহাবিশ্বে মহাকাশে-আকাশগঙ্গার ভবিষ্যৎ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎ ২০১৮

মহাবিশ্বে মহাকাশে সব পর্ব একত্রে

আকাশগঙ্গার ভবিষ্যৎ  

 কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

মহাবিশ্ব এক অনন্ত বিস্ময়। বিজ্ঞানীদের কাছে মহাবিশ্বের বহু রহস্য আজও অজানা, অব্যাখ্যাত। যেটুকু জানা গেছে তাতে বলা যায় মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে কোটি কোটি গ্যালাক্সি দিয়ে। আর প্রতিটি গ্যালাক্সিতে রয়েছে কোটি কোটি নক্ষত্র ও মহাজাগতিক ধূলিকণা।

সূর্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সৌরজগত। এই জগতেরই একটি গ্রহের নাম পৃথিবী। সৌরজগত যে গ্যালাক্সিতে অবস্থিত অর্থাৎ আমরা যে গ্যালাক্সির বাসিন্দা তার নাম মিল্কিওয়ে। একে আকাশগঙ্গা নামেও  অভিহিত করা হয়।

দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলে আসছিলেন যে প্রায় এক লক্ষ আলোকবর্ষ (আলোর গতিবেগ সেকেন্ডে  তিন লক্ষ কিলোমিটার। এক আলোকবর্ষ মানে এক বৎসরে আলো যতটা পথ অতিক্রম করে) দীর্ঘ এবং দশ হাজার আলোকবর্ষ প্রশস্ত এই সর্পিলাকার (spiral) গ্যালাক্সিতে মোটামুটি দশ হাজার কোটি নক্ষত্র আছে। তবে সাম্প্রতিক কিছু আবিষ্কার থেকে বিজ্ঞানীদের এই ধারণা পালটে গেছে। তাঁদের ধারণা আকাশগঙ্গার ভর, বিস্তৃতি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কীভাবে? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশগঙ্গার এক অদ্ভুত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা বলছেন। স্বজাতিভক্ষণ অর্থাৎ ছোট ছোট গ্যালাক্সিগুলিকে নিজের প্রকাণ্ড পরিসরে গ্রাস করে চলেছে।   

আশ্বিন-কার্তিক মাসে কৃষ্ণপক্ষে রাতের আকাশে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর বিস্তৃত যে আবছা আলোর সুবিশাল পথ দেখতে পাওয়া যায় তা আকাশগঙ্গার একটি অংশ মাত্র। আমাদের সৌরজগত এই আকাশগঙ্গার প্রান্তের দিকে অবস্থিত। অর্থাৎ, বলা যায় আমরা হলাম আকাশগঙ্গার এক শহরতলীর বাসিন্দা।

এই সুবিশাল আকাশগঙ্গাকে সম্পূর্ণভাবে দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এমন কোনো প্রযুক্তি আমরা এখনও তৈরি করতে পারিনি যার সাহায্যে পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ আকাশগঙ্গাকে দেখা যায়। বাড়ির ভিতর থেকে সম্পূর্ণ বাড়িটাকে যেমন দেখা যায় না, এটাও অনেকটা সেরকম। বাড়িটাকে দেখতে হলে বাড়ির বাইরে আসতে হবে। তেমনি গোটা আকাশগঙ্গাকে দেখতে হলে আমাদের আকাশগঙ্গার বাইরে যেতে হবে অথবা অন্য কোনো পড়শি গ্যালাক্সিতে যেতে হবে।

যেমন, আমাদের অন্যতম প্রতিবেশী গ্যালাক্সি  ‘অ্যান্‌ড্রোমিডা’-কে আমরা পৃথিবী থেকে অর্থাৎ আকাশগঙ্গার ভেতর থেকে সম্পূর্ণভাবে দেখতে পাই। আকাশের দিকে তাকালে খালি চোখে একে একটা আলোর পিণ্ডের মতো দেখতে লাগে। আকাশগঙ্গা থেকে এর দূরত্ব প্রায় কুড়ি লক্ষ আলোকবর্ষ।

এ-ছাড়াও আমাদের আরও দুটি প্রতিবেশী গ্যালাক্সি আছে। এরা হল ‘ম্যাগেলানিক’(বৃহৎ ও ক্ষুদ্র) মেঘপুঞ্জ (Magellanic clouds) দক্ষিণ গোলার্ধে সান্ধ্য আকাশে এদের দেখতে পাওয়া যায়। ছায়াপথ থেকে এদের দূরত্ব যথাক্রমে দু’লক্ষ ও এক লক্ষ সত্তর হাজার আলোকবর্ষের মতো। 

দূরত্বের বিচারে এই দুটি গ্যালাক্সিকে আকাশগঙ্গার নিকটতম পড়শি বলা যেতে পারে। অন্তত ১৯৯৪ সালের আগে পর্যন্ত এমনই ধারণা ছিল। তিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এম আরউইন, জি গিলমোর এবং আর ইবাতা ওই বছরেই একটি নতুন ছোট গ্যালাক্সির খোঁজ পান। ‘স্যাগডেগ’ (Sag DEG) বা ‘ধনুরাশির উপবৃত্তীয় বামন গ্যালাক্সি’ (Sagittarius Dwarf Elliptical Galaxy) নামের এই ছোট্ট গ্যালাক্সিটি  মাত্র আশি হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই আবিষ্কারের ফলে ছায়াপথের নিকটতম প্রতিবেশীর আসনটি ম্যাগেলানিক মেঘপুঞ্জের কাছ থেকে সরে স্যাগডেগ-এর কাছে চলে এল।

এই ছোট্ট গ্যালাক্সিটি আবিষ্কারের সময় থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহলে একটা সন্দেহ দানা বেঁধেছিল। ম্যাসাচুসেটস এবং ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দেখালেন যে আকাশগঙ্গার আকর্ষণে স্যাগডেগ-এর শরীর অনেক আগেই ভেঙে গেছে। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ ধুলো-নক্ষত্র-গ্যাস গ্রাস করছে আমাদের গ্যালাক্সি ‘আকাশগঙ্গা’। ফলে স্যাগডেগ-এর চেহারাটাই বিকৃত হয়ে গেছে।   

     ধনুরাশির তারা এবং উজ্জ্বল আন্তর্নাক্ষত্রিক মেঘের আলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্যাগডেগ গ্যালাক্সিটির নিকটতম পড়শির তকমা বেশিদিন রইল না। একবিংশ শতাব্দীর গোড়াতেই স্যাগডেগ-এর আসন টলমল করে উঠল। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান সাইমন্স মিথুন রাশিতে খুঁজে পেলেন আরেকটি নতুন গ্যালাক্সি। ‘স্নিকার্স’ নামের এই গ্যালাক্সিটি আকাশগঙ্গা থেকে মাত্র পঞ্চান্ন হাজার আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে। তবে এটির কপালেও জূটল না নিকটতম পড়শির সম্মান। ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে বিয়াল্লিশ হাজার আলোকবর্ষ দূরে সন্ধান পাওয়া গেল আরও একটি গ্যালাক্সির। ২০০৩ সালের নভেম্বর মাসে এই নতুন পড়শির খোঁজ পাওয়া যায়। ইতালি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও বৃটেনের জ্যোতির্বিদদের একটি আন্তর্জাতিক দল এই বামন গ্যালাক্সিটির আবিষ্কারক। এই ছোট্ট গ্যালাক্সিটিরও স্যাগডেগ-এর মতো অবস্থা। এরও ধ্বংস প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই এর এক শতাংশ ভর আমাদের গ্যালাক্সি গ্রাস করে ফেলেছে। একটি ছোট্ট গ্যালাক্সিকে সম্পূর্ণ গ্রাস করতে আকাশগঙ্গার প্রায় একশ কোটি বছর সময় লেগে যায়।            

সম্প্রতি দুই জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্টিভ ফিলিপস এবং মাইকেল ড্রিঙ্কওয়াটার আরও নিকটবর্তী নতুন এক ধরনের গ্যালাক্সির উপস্থিতির সম্ভাবনার কথা শুনিয়েছেন। তাঁদের অনুমান এই ‘ইউ সি ডি’ বা ‘অতি ঘনসন্নিবিষ্ট বামন গ্যালাক্সি’ (Ultra Compact Dwarf Galaxy) গুলিতে  অবস্থিত কয়েকশো কোটি নক্ষত্র আকাশগঙ্গার মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে নিষ্পেষিত অবস্থায় রয়েছে।

ম্যাগেলানিক(বৃহৎ ও ক্ষুদ্র) মেঘপুঞ্জদ্বয়ও কিন্তু নিরাপদে নেই। আকাশগঙ্গা তাদেরও টেনে চলেছে। কয়েকশো কোটি বছর পর তাদেরও গ্রাস করে ফেলবে। মনে করা হচ্ছে ‘ম্যাগেলানিক স্ট্রিম’ নামক যে গ্যাসের পথ তাদের অধ্যে রয়েছে তা ভবিষ্যতে একে অপরের থেকে ছিন্ন হয়ে যাবে।

এখানেই কি শেষ হবে আকাশগঙ্গার গ্যালাক্সি ভক্ষণ? না, তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। ম্যাগেলানিক(বৃহৎ ও ক্ষুদ্র) মেঘপুঞ্জদ্বয়ের পর আমাদের গ্যালাক্সি ২০৫০০০ আলোকবর্ষ দূরে থাকা ‘লঘু সপ্তর্ষি বামন’কে (Ursa Minor Dwarf) নিজের পরিসরে টেনে নিতে শুরু করবে। তারপরে একে একে টেনে নেবে ২৪৮০০০ আলোকবর্ষ দূরের কালীয়মণ্ডলীয় বামন (Draco Dwarf), ২৫৪০০০ আলোকবর্ষ দূরের ভাস্করমণ্ডলীর বামন (Sculptor Dwarf), ২৫৭০০০ আলোকবর্ষ দূরে থাকা ষষ্ঠাংশমণ্ডলীয় বামন (Sextans Dwarf), ২৮৩০০০ আলোকবর্ষ দূরত্বের নৌতলমণ্ডলীয় বামন (Carina Dwarf), ৪২৭০০০ আলোকবর্ষ দূরের যজ্ঞকুণ্ডমণ্ডলীয় বামন (Fornax dwarf) ইত্যাদি।

আকাশগঙ্গা থেকে পঞ্চাশ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরত্বের মধ্যে যে সব গ্যালাক্সি আছে সেগুলি হল আমাদের প্রতিবেশী গ্যালাক্সি। অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি রয়েছে কুড়ি লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। সেই  হিসেবে এই গ্যালাক্সিটি  শুধু আমাদের প্রতিবেশী গ্যালাক্সি নয়, কাছাকাছি প্রতিবেশীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গ্যালাক্সি। এর পরের স্থান হচ্ছে আকাশগঙ্গার অর্থাৎ আমাদের গ্যালাক্সির। তৃতীয় স্থানে আছে পিনহুইল গ্যালাক্সি। আকাশগঙ্গা যেভাবে একের পর এক ছোট ছোট গ্যালাক্সিগুলিকে গ্রাস করে নিজের কলেবর বৃদ্ধি করছে তাতে হয়তো সুদূর ভবিষ্যতে এক নম্বর জায়গাটা অ্যান্ড্রোমিডার থাকবে না, আকাশগঙ্গা দখল করে নেবে। আজকের ছোট ছোট গ্যালাক্সিগুলির মতো সেদিন হয়তো তারও বিপদ ঘনিয়ে আসবে?  তাই অ্যান্ড্রোমিডাও তার কলেবর বৃদ্ধির জন্য শুরু করে দিয়েছে তাকে ঘিরে থাকা ক্ষুদ্রাকার গ্যালাক্সি গিলতে। ইতিমধ্যে এই দৈত্যাকার গ্যালাক্সিটি একটি ছোট্ট গ্যালাক্সিকে পুরোপুরি গিলে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, অ্যান্ড্রোমিডা প্রতিদিন ১১০ লক্ষ কিলোমিটারেরও বেশি হারে বেড়ে চলেছে। এগিয়ে আসছে আমাদের গ্যালাক্সির দিকে। ইতিমধ্যেই এর আয়তন প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। হয়তো এমনও হতে পারে যে আকাশগঙ্গাও  অ্যান্ড্রোমিডার দিকে ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে?  যাই হোক, এইভাবে বাড়তে বাড়তে হয়তো এক সময় দুজনের মুখোমুখি দেখা হবে। শুধু দেখা হবে বললে ভুল হবে। দুই গ্যালাক্সির মধ্যে ঘটবে এক মহাসংঘর্ষ। চলতে থাকবে আন্তর্নাক্ষত্রিক ভাঙাগড়ার ঘটনা। এই মহাজাগতিক ভাঙনের ফলে ছিটকে বেরিয়ে আসতে থাকবে গ্যাস ও নক্ষত্ররাশি। ফলস্বরূপ, দুটি গ্যালাক্সিই তালগোল পাকিয়ে যাবে।  

     সংঘাত পর্যায় সমাপ্ত হলে আকাশগঙ্গার অপরূপ কুণ্ডলিত বাহুগুলি আর থাকবে না। সেগুলি বিনষ্ট হবে। পরিবর্তে সৃষ্টি হবে একটি নতুন, অপেক্ষাকৃত বৃহৎ উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি। বর্তমানে আকাশগঙ্গার যে আবছা, উজ্জ্বল বেষ্টনী আমরা মহাকাশে দেখতে পাই তা আর দেখা যাবে না। সারা আকাশ জুড়ে থাকবে বিস্তারপ্রাপ্ত ওই নতুন গ্যালাক্সির কেন্দ্র অঞ্চল। এটাই হবে আকাশগঙ্গার অর্থাৎ আমাদের গ্যালাক্সির ভবিষ্যত পরিণতি।

তথ্য সূত্রঃ

১) The Universe: Iain Nicolson: 1996 Horus Editions.
২) The Rough Guide to the Universe: John Scalzi: 2003 Rough Guides Ltd.
৩) আকাশ ও পৃথিবীঃ মৃত্যুঞ্জয়প্রসাদ গুহ, চতুর্থ সংস্করণ ১৯৯৮, শৈব্যা প্রকাশন বিভাগ।
৪) মহাবিশ্বের বিস্ময় (প্রথম খণ্ড); অরুণাভ চক্রবর্তী, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা প্রথম প্রকাশ ২০০৮। 
হেডপিসঃ আনুমানিক চার বিলিয়ন বছর বাদে আকাশগঙ্গা ও অ্যান্ড্রোমিডার সংঘর্ষ পৃথিবী থেকে যেমন দেখাবে। (উৎসঃ নাসা)

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s