বৈজ্ঞানিকের দপ্তর মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় শীত ২০১৮

মহাবিশ্বে মহাকাশে সব পর্ব একত্রে

চান্দ্রপথ (অশ্বিনী থেকে রেবতী)-৪

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

 আর্দ্রাঃ

অনেকগুলি তারা নিয়ে গঠিত কালপুরুষ তারকামণ্ডল। এর সংস্কৃত নাম মৃগনক্ষত্র আর পাশ্চাত্য নাম ওরিয়ন (Orion)। এই তারকামণ্ডলের ১৩ টি তারা পৃথিবী থেকে খুব সহজে খালি চোখে দেখা যায়। তারাগুলি কাল্পনিক রেখা দিয়ে যুক্ত করলে কালপুরুষ মণ্ডলে একটি পুরুষের আকৃতি লক্ষ করা যায়। এর দক্ষিণ বাহুতে যে দুটি তারা আছে তার পূর্বেরটির নাম আর্দ্রা  (Betelgeuse)। অশ্বিনী থেকে শুরু করে এটি চান্দ্রতিথি সংক্রান্ত ষষ্ঠ নক্ষত্র। এটি মৃগশিরার পরবর্তী নক্ষত্র। আর্দ্রা নক্ষত্রের ঈষৎ উত্তর-পূর্বে মিথুন রাশির অবস্থান।

আর্দ্রা নক্ষত্রের অধিপতি রুদ্র। বেদে রুদ্রকে ঝড়-বৃষ্টির দেবতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর্দ্রার অর্থও জলসিক্ত। তাই আর্দ্রার সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হয়। প্রাচীনকালে কৃত্তিকা নক্ষত্রে যখন বাসন্ত বিষুবন হত তখন জ্যৈষ্ঠের  দ্বিতীয় সপ্তাহে সূর্য আর্দ্রা নক্ষত্রে প্রবেশ করত। সেই সময়ে ঝড়-বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। নতুন বৎসর শুরু হওয়ার পর ধরিত্রী তখনই প্রথম সিক্ত অর্থাৎ আর্দ্রীকৃত হত। নক্ষত্রটির আর্দ্রা নামকরণ সম্ভবত এই কারণেই। আরও একটি মত আছে। আর্দ্রা নক্ষত্র সুরগঙ্গার সন্নিকটে অবস্থিত। তাই নক্ষত্রটির সব সময় সিক্তভাব থাকা স্বাভাবিক। এই সিক্তভাব থেকেই নক্ষত্রের নামকরণ আর্দ্রা। গণক কালিদাসের মতে (ইনি কবি কালিদাস নন। এঁর আবির্ভাব সম্ভবত শকের দ্বাদশ শতাব্দীতে।) আর্দ্রা নক্ষত্রের সঙ্গে পদ্মের আকার ও বর্ণের উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য রয়েছে। 

আর্দ্রা নক্ষত্রের তারকা সংখ্যা এক। কালপুরুষের দক্ষিণ বাহুতে অবস্থিত পূর্ব দিকের এই তারাটি অতিশয় উজ্জ্বল ও তাম্রবর্ণের।  পৃথিবী থেক এর দূরত্ব প্রায় ৪২৭ ± ৯২ আলোকবর্ষ (১৩১ পারসেক)। এত দূরে থাকা সত্বেও তারাটিকে কালপুরুষ মণ্ডলের অন্যান্য তারার তুলনায় যথেষ্ট বড় ও উজ্জ্বল দেখায়। তারাটি কত বড় হতে পারে? উত্তর শুনলে অবাক হতে হয় বৈ কি। বৈজ্ঞানিকরা হিসেব করে দেখেছেন যে  ১৬ কোটি সূর্য এই তারার ভিতর অনায়াসে ঢুকে যাবে। আর যদি পৃথিবীকে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তাহলে প্রায় 20800000 কোটি পৃথিবী এর ভিতর এঁটে যাবে। এই হিসেব থেকেই বোঝা যায় তারাটি কত বড়। আমরা খালি চোখে আকাশে যত তারা দেখতে পাই তাদের মধ্যে আর্দ্রাই সবচেয়ে বড়।     

এত বড় তারা হয়েও আর্দ্রা সূর্যের চেয়ে ঠান্ডা। সূর্যের পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রা যেখানে ৫৮00 কেলভিন সেখানে আর্দ্রার  পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ৩১00 কেলভিনের কাছাকাছি। এমনটা হওয়ার কারণ কী? বৈজ্ঞানিকদের অনুমান আর্দ্রার হাইড্রোজেন জ্বালানী শেষ হয়ে গেছে, কেন্দ্রে এখন শুধু হিলিয়াম দহন চলছে। কম তাপমাত্রা আর বিশাল আকৃতির জন্য একে শীতল দানব তারা  (cool supergiant star) বলা হয়ে থাকে। এই ধরনের তারা মহাকাশে খুব কম দেখা যায়। বৃশ্চিক রাশিতে  (constellation scorpio) এই ধরনের আরেকটি লাল বর্ণের তারা আছে। তার নাম জ্যেষ্ঠা  (Antares)।

অতি বৃহৎ তারা হওয়া সত্বেও আর্দ্রার ভর তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সূর্যের ভরের ২0 গুণও নয়। এমনটা হওয়ার কারণ তারাটি প্রতি বছর  ২x১০২৪  কিলোগ্রাম ভর (0.00000১ সৌরভর পরিমাণ পদার্থ) বাইরে নিক্ষেপ করে চলেছে। এই হিসেব থেকে অনুমাণ করা যায় যে জীবনের মূল পর্যায়ে তারাটির বর্তমান ভরের দ্বিগুণ ভর ছিল। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, আর্দ্রার ব্যাস প্রায় ৬0%- এর মতো বাড়ে কমে। ফলে এর আকার-আয়তনেরও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে।  

আর্দ্রা একটি বিষমতারা (variable star)। এর দীপ্তি বাড়ে কমে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এর প্রভার মান  0.২ থেকে  ১.২ এর মধ্যে ওঠানামা করে। এর দুটি সঙ্গী তারা আছে। প্রথমটি ৫ A.U. দূর থেকে এবং দ্বিতীয়টি  ৪৫ A.U. দূর থেকে আর্দ্রার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে।

তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে আর্দ্রার একটি নাম বাহু। কালপুরুষের দুটি বাহুর মধ্যে দক্ষিণ বাহু নির্দেশক এই তারাটি বাম বাহু নির্দেশক তারাটির তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল। ফাল্গুন মাসে সন্ধ্যার অন্ধকারে আর্দ্রা নক্ষত্রকে সরাসরি মাথার উপরে দেখা যায়।  

পুনর্বসুঃ

অশ্বিনী থেকে শুরু করে চান্দ্রপথের সপ্তম নক্ষত্র পুনর্বসু আর্দ্রার পূর্বে অবস্থিত। এর পূর্ব দিকে ঈষৎ দক্ষিণে আছে পুষ্যা নক্ষত্র। এটি মিথুনরাশির নক্ষত্র। এর তিন-চতুর্থাংশ আছে মিথুন রাশিতে আর বাকি এক-চতুর্থাংশ আছে কর্কটরাশিতে। নক্ষত্রটির সৈদ্ধান্তিক নাম হল পুনর্বসু এবং ঋগ্বেদীয় নাম অদিতি। ফাল্গুন মাসের সন্ধ্যার আকাশে খালি চোখে নক্ষত্রটিকে খুব সহজেই দেখা যায়। আকাশের মাঝখানে সামান্য পূর্ব দিক চেপে এর অবস্থান। 

‘বসু’ শব্দের অর্থ দীপ্তি। পুনর্বসু হল দ্বিতীয়বার দীপ্তি বা জ্যোতি। দুটি দীপ্তির কারণ পুনর্বসু নক্ষত্র দুটি তারা সমন্বিত। তৈত্তরীয় সংহিতা, শাকল্য সংহিতা এবং খাদ্যখাদকেও বলা হয়েছে পুনর্বসু নক্ষত্র দুটি তারার সমাহার। দুটি তারাই বিশেষ উজ্জ্বল এবং সাদৃশ্যযুক্ত। তারা দুটির একটি ৪৫ আলোকবর্ষ এবং অপরটি ৩৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। পুনর্বসু নক্ষত্রের পশ্চিম প্রান্তের তারাটির নাম পোলাক্স (Pollux)। এটি একটি যুগ্ম তারা এবং এই নক্ষত্রের যোগতারাও। অপর তারাটির নাম ক্যাস্টোর (Castor)।

পুনর্বসুর দেবতা অদিতি। ঋগ্বেদে অদিতি সম্পর্কে যে বর্ণনা আছে তাতে বলা হয়েছে, অদিতি গুরুতারা এবং জ্যোতিষ্মতী। আদিত্য হল ঋতুপতি। আদিত্যের সঙ্গে অদিতির সম্পর্ক আছে। প্রায় আট হাজার বছর পূর্বে সায়ন বৎসর অর্থাৎ মহাবিষুব সংক্রান্তি বা বর্ষ শুরু হত পুনর্বসু নক্ষত্র থেকে।

ঋগ্বেদে তেত্রিশজন দেবতার উল্লেখ আছে। তার একজন হলেন অদিতি। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে আছে, এক সময়ে দেব-সকল থেকে যজ্ঞ সরে গিয়েছিলেন। যজ্ঞ শব্দের অর্থ সম্বৎসর। অর্থাৎ, যজ্ঞেই সম্বৎসরের শুরু ও শেষ। তাই যজুর্বেদে অদিতির দুটি মস্তকের উল্লেখ আছে। এই প্রসঙ্গে বাল গঙ্গাধর তিলক-এর ব্যাখ্যা হল, কোনো এক সময়ে পুনর্বসু নক্ষত্রে ক্রান্তিপাত হত। সেই বাসন্ত বিষুবদ্‌দিনেই একই সঙ্গে হত বর্ষশেষ এবং বর্ষারম্ভ। পুনর্বসু নক্ষত্রের তারা দুটি এই বর্ষশেষ ও বর্ষারম্ভেরই প্রতীক।

পুনর্বসু নক্ষত্রে কটি তারা তা নিয়ে প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ ছিল। লল্ল এবং শ্রীপতি-র মতে এই নক্ষত্র ৪টি তারায় গঠিত। কাল্পনিক রেখার দ্বারা এই চারটি তারাকে যুক্ত করলে একটি গৃহের আকার পাওয়া যায়। বরাহমিহিরের অভিমত ভিন্ন। তাঁর মতে পুনর্বসু নক্ষত্রে ৫টি তারা আছে।

পুষ্যাঃ

 পুনর্বসু নক্ষত্রবাস শেষ করে চন্দ্র প্রবেশ করে পুষ্যা নক্ষত্রে। তিনটি তারা নিয়ে গঠিত পুষ্যা নক্ষত্র অশ্বিনী থেকে শুরু করে অষ্টম নক্ষত্র। নক্ষত্রটির তিনটি তারাই তেমন উজ্জ্বল না হওয়া সত্বেও নির্মেঘ আকাশে পুনর্বসু নক্ষত্রের ঈষৎ দক্ষিণ-পুর্বে এবং অশ্লেষা নক্ষত্রের ঈষৎ উত্তর-পশ্চিমে একে খালি চোখে দেখা যায়। চৈত্র মাসের সন্ধ্যায় নক্ষত্রটি প্রায় মাথার উপর থাকে। পোষণার্থক পুষ্‌ ধাতু থেকে পুষ্যা শব্দের উৎপত্তি। এর আরেক নাম তিষ্য। তুষ্‌ ধাতু থেকে শব্দটি নিষ্পন্ন। এছাড়াও এর আরেকটি নাম ‘সিধ্য’। এই নামটি অমরকোষে পাওয়া যায়। ইংরেজীতে এর নাম ‘প্রিসেপ’ (Praesepe)। পুষ্যা নক্ষত্রে পুষ্পগুচ্ছের ন্যায় একটি তারকাপুঞ্জ আছে। অনেকের মতে সেই কারণেই এর নাম পুষ্যা। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে বৃহস্পতিকে পুষ্যার দেবতা বলে অভিহিত করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে সেখানে বলা হয়েছে, বৃহস্পতির প্রথম জন্ম তিষ্য নক্ষত্রে। অর্থাৎ পুষ্যা নক্ষত্রে বৃহস্পতি প্রথম আবিষ্কৃত হয়।

পুষ্যা নক্ষত্র তিনটি তারার সমন্বয়ে গঠিত— প্রাচীন ভারতের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও এ ব্যাপারে সহমত ছিলেন। এই প্রসঙ্গে বরাহমিহির, শ্রীপতি ও লল্ল-র মতামত উল্লেখ্য। পুষ্যা নক্ষত্রকে তিন তারা সমন্বিত শরাগ্র আকৃতির নক্ষত্র বলে কল্পনা করা হয়। সূর্যসিদ্ধান্ত মতে এই তিনটি তারকার মধ্যভাগের তারকাটি হল যোগতারা।

পুষ্যা নক্ষত্রের বিস্তার খ-গোলের ৯৩২০’ থেকে ১০৬৪০’ পর্যন্ত। এর পুরোটাই কর্কট (Cancer) রাশির অন্তর্ভুক্ত।

তথ্য সূত্রঃ

১) Hindu Astronomy, W. Brennand, London, 1896.

২) Popular Hindu Astronomy, K. Mukherjee, Jessore, 1902  

৩) প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান, অরূপরতন ভট্টাচার্য, কলকাতা, ২০০৬।

৪) রমেশচন্দ্র দত্ত— ঋগ্বেদ-সংহিতা, কলিকাতা, ১২৯২

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s