বৈজ্ঞানিকের দপ্তর মাথা মে ট্রিক্‌স্-সময় ও দূরত্ব-সুর্যনাথ ভট্টাচার্য শীত ২০১৮

মাথে মে ট্রিকস সব পর্ব একত্রে

ছবিতে সময় ও দূরত্ব

সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

স্কুলে থাকতে ‘সময় ও দূরত্বে’র অঙ্কগুলো একদম ভালো লাগত না। বিভিন্ন গতিতে ভ্রাম্যমান গাড়িগুলোর কে আগে পৌঁছচ্ছে, কে কখন মিলিত হচ্ছে, কে কতো পথ অতিক্রম করছে, কে কাকে ওভারটেক করছে— এইসব কষতে কষতে মনে হত এসবের আমি কী জানি? কেউ মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে ঝিমোচ্ছে কিনা, কারোর পেট্রোল শেষ হয়ে গেল কিনা, কেউ অন্য রাস্তায় চলে গেল কিনা, কেউ ষাঁড়কে গুঁতো মারল কিনা— এরকম অনেক কিছুর ওপরেই তো তাদের গতি নির্ভরশীল। তাছাড়া এক স্পিডে কখনও গাড়ি চলে? পথে ভিড় আছে, জ্যাম আছে, হকার আছে, সিগনাল আছে। কতো কারণেই তো গাড়ির গতি কম-বেশি হতে পারে। তাহলে এক স্পিডে গাড়ি চলেছে ধরে নিয়ে এসব সময় কিংবা দূরত্ব কষে কী লাভ?

সমবেগের আদর্শ শর্তে সময়-দুরত্বের গণনার যে কী প্রয়োজনীয়তা সেটা তখন বোধগম্য হত না। মনে হত এ অনর্থক মেহনত। মূলত জটিল গুণ-ভাগ, নিরন্তর ঘন্টা-মিনিটের গণনা, একই দিক-বিপরীত দিকের বিভ্রান্তি এবং সবশেষে অনেক কসরত করার পরেও বিশ্রীরকম মিশ্র ভগ্নাংশের ‘সময়’ কিংবা ঋণাত্মক ‘দূরত্ব’-এ এসে ঠেকা— বারবার এইরকম সব দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে মন অপ্রসন্ন হত। আর অঙ্কবইগুলোও ছিল তেমনি। বিচিত্র উপায়ে একই রকম বিরক্তিকর সব সংখ্যার কারসাজি। নেহাত পরীক্ষায় একটা অঙ্ক থাকবেই, তাই বেজার হয়ে মাথার চুল টানা আর খাতায় কলম ঘষা চালাতে হত।

অনেক পরে দেখলাম, সময়-দূরত্বের অঙ্কেও কিন্তু মজা আছে। এই অঙ্ক মানেই শুধু গজ-ফুট-ইঞ্চি কিংবা ঘন্টা-মিনিটের ষড়যন্ত্র নয়। এই ধরণের অঙ্কের একটা বিশেষ প্যাটার্ন আছে। অ্যালজেব্রার সাহায্যে সেই ধরণটাকে আয়ত্ত করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। তাছাড়া আছে অনেক আকর্ষণীয় প্রশ্নও। সেগুলো আপাতদৃষ্টিতে জটিল মনে হলেও দেখা যায় কোনও বিশেষ কৌশলে— যাকে বলে ট্রিক— সমাধানের সহজ রাস্তা আছে। সবচেয়ে দরকার জটিল প্রশ্নের অন্তর্নিহিত সেই ট্রিকটা আবিষ্কার করে আক্রমনের অভিমুখটা ঠিক করে ফেলা। প্রশ্নের প্রতিপাদ্যটা ‘ভিসুয়ালাইজ’ করা গেলে সমস্যা আর সমস্যা থাকে না।

সময়-দূরত্বের অনেক প্রশ্নে ‘গ্রাফ’ ব্যবহার করে ‘আক্ষরিক’ ভাবেই এই ভিসুয়ালাইজেশন সম্ভব। তারপর উত্তরও সহজেই বার করা যায়। ভ্রাম্যমাণ বস্তুগুলোকে বিন্দু ধরে একটা নির্দিষ্ট রেফারেন্স অক্ষের সাপেক্ষে তাদের গতিপথের চলরেখাগুলো— মানে ‘লোকাস’ আর কি— এঁকে ফেলতে পারলে অনেক সময়েই ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায়। সমগতির ক্ষেত্রে এই লোকাস এক নির্দিষ্ট নতি’র— অর্থাৎ ‘স্লোপ’— সরলরেখা হয়। সরলরেখার কাটাকুটি করার স্থানাঙ্কগুলো থেকেই প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসে।

উদাহরণস্বরূপ একটা প্রশ্ন এখানে দেখা যাক। এটা এক বিদেশী অলিম্পিয়াড স্তরের প্রশ্ন থেকে নেওয়া, চালু অঙ্কের বইতে হয়ত পাওয়া যাবে না—

প্রশ্নঃ রামবাবু অফিস ফেরত রোজ বিকেল পাঁচটায় ষ্টেশনে এসে নামেন। তাঁর ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে একই সময়ে ষ্টেশনে এসে পৌঁছয়। তারপর রামবাবুকে সঙ্গে নিয়ে ঠিক পাঁচটা কুড়িতে বাড়ি ফেরে।

একদিন রামবাবু পাঁচটার বদলে আগের একটা ট্রেনে চারটে দশে এসে নামলেন। স্বভাবতই তাঁর ড্রাইভার তখনও আসেনি। তাই তিনি হাঁটা লাগালেন। কিছুদূর পরেই রাস্তায় মোলাকাত হয়ে গেল ড্রাইভারের সঙ্গে। বাকি রাস্তাটুকু গাড়ি চড়ে তিনি বাড়ি পৌঁছলেন ঠিক পাঁচটায়

এরপর আরও একদিন রামবাবু ফিরলেন চারটে পঁয়ত্রিশে। সেদিনও তিনি গাড়ির অপেক্ষা না করে হাঁটা শুরু করে দিলেন এবং পথিমধ্যে গাড়ি ধরে বাড়ি এলেন। প্রশ্ন হল, সেদিন তিনি কখন বাড়ি পৌঁছলেন?

অবশ্যই ধরে নিতে হবে, রামবাবু ও গাড়ির নিজেদের গতিবেগ সর্বত্র সমান। এছাড়া পিক-আপ, গাড়ি ঘোরানো ইত্যাদিতে কোনও অতিরিক্ত সময় লাগছে না।

সমাধানঃ প্রথম দেখে অঙ্ক বেশ কঠিন মনে হয়। অ্যালজেব্রার সাহায্যে সমাধান করা হয়ত যাবে, কিন্তু বেশ কিছু সমীকরণ সল্ভ করতে হবে। কেননা, বাড়ি থেকে ষ্টেশনের দূরত্ব, রামবাবুর হাঁটার বেগ কিংবা গাড়ির বেগ— কিছুই দেওয়া নেই। বুঝে নিতে হবে, এগুলোর ওপর উত্তর নির্ভর করবে না। তবু অ্যালজেব্রা দিয়ে সমাধান চাইলে এই রাশিগুলোও বার করতে হবে।

এখন গ্রাফে’র সাহায্যে কীভাবে সমাধান সরল হয়ে যায় দেখা যাক। নীচের চিত্রে পুরো ব্যাপারটা দেখানো হল—

মোটা কালো দাগটা দিয়ে গাড়ির দৈনন্দিন গতিপথের গ্রাফ দেখানো হয়েছে। বাড়ির ‘ক’-বিন্দু থেকে শুরু করে ষ্টেশনের ‘খ’-বিন্দুতে ড্রাইভার রামবাবুকে পিক-আপ করে আবার ‘গ’-বিন্দুতে বাড়িতে ফিরে আসে। এখানে ‘ক-খ-গ’ পথটা কিন্তু গাড়ির ভৌগলিক পথ নয়, সময়-দূরত্বের পরিপ্রেক্ষিতে গাড়ির স্থানাঙ্কের লোকাস। অর্থাৎ, বিভিন্ন সময়ে গাড়িটি যে সব অবস্থানে থাকবে তার চলরেখা। ‘কখ’ রেখার নতি গাড়ির বেগ নির্দেশ করছে। বেগের পরিবর্তন নেই, তাই ‘কখ’ একটি সরলরেখা। একই ভাবে ‘খগ’ প্রত্যাবর্তনের পথে গাড়ির চলরেখা। ‘খগ’-র নতি ‘কখ’-এর সমান কিন্তু এই নতি নেগেটিভ, কেননা গাড়ির বেগ একই কিন্তু উল্টোদিকে।

এবার রামবাবুর হাঁটার চলরেখাগুলো দেখা যাক। এগুলো মোটা ধূসর রেখা দিয়ে দেখানো হয়েছে। এগুলোও সরলরেখা, কেননা রামবাবুর হাঁটার গতিও ধ্রুবক। আর যেহেতু এটাও ফেরার পথ তাই এই রেখাগুলোর নতিও নেগেটিভ। কিন্তু নতির মান অনেকটা কম। স্বাভাবিক, কারণ গাড়ির তুলনায় মানুষের হাঁটার গতি অনেক কম। অর্থাৎ সমান দূরত্ব যেতে রামবাবু গাড়ির চেয়ে অনেক বেশি সময় নিয়েছেন।

চারটে দশে রামবাবু ষ্টেশন থেকে হাঁটা শুরু করে ‘ঘ’-বিন্দুতে এসে গাড়ির সঙ্গে মিলিত হন ও বাকি রাস্তা গাড়ির বেগে অতিক্রম করে ঠিক পাঁচটায় বাড়ি আসেন। গাড়ি করে বাড়ি আসবার পথের চলরেখা ভাঙ্গা রেখা দিয়ে দেখানো হয়েছে। লক্ষ্য করার বিষয়, এই রেখার নতি ও অটুট কালো রেখার নতি সমান। কেননা দুটিই নির্দেশ করছে গাড়ির বেগ।

এতটা যদি পরিষ্কার বোঝা গেছে, তাহলে এই অঙ্কে আর কোনও সমস্যাই নেই। যেদিন রামবাবু চারটে পঁয়ত্রিশে ষ্টেশনে নেমেছেন সেদিনও তিনি সমান্তরাল ধূসর সরলরেখায় এসে ‘ঙ’-বিন্দুতে গাড়ি পেয়ে যাবেন। ফেরার রাস্তা দ্বিতীয় ভাঙ্গা কালো সরলরেখা, যা অটুট কালো রেখার সমান্তরাল।

তবে আর সমস্যা কী? খেয়াল কর, ৪-১০ ও ৫-০০টা’র ঠিক মাঝখানে আছে ৪-৩৫, দু’দিক থেকেই পঁচিশ মিনিটের ব্যবধানে। অতএব সদৃশকোণী ত্রিভুজের সূত্রানুসারে, ‘ঙ’-বিন্দুও থাকবে ‘খ’ ও ‘ঘ’-এর ঠিক মাঝখানে। একই কারণে শেষদিন রামবাবুর বাড়ি পৌঁছোবার সময় ৫-০০টা ও ৫-২০টা’র ঠিক মাঝখানে থাকবে। অর্থাৎ ঐদিন তিনি বাড়ি এসেছিলেন পাঁচটা দশে!

কোনও ক্যালকুলেশনই লাগল না, তাই না? যদি শেষদিনে ষ্টেশনে পৌঁছোবার সময়টা ঠিক মাঝখানে না হত, তাহলে একটু আনুপাতিক গণনা দরকার হত। কিন্তু আর কোনও অজ্ঞাত রাশি নির্ণয় করতে হবে না। চাইলে ‘ঘ’ ও ‘ঙ’-র স্থানাঙ্ক থেকে ঐ ঐ দিন রামবাবু কখন ও কোথায় গাড়ির সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন তাও বার করে ফেলা যায়।

এরকম আরও কিছু সময়-দূরত্বের প্রশ্ন আছে, গ্রাফ এঁকে যা খুব সহজে সমাধান করা যায়। পরবর্তী সংখ্যায় না হয় আর একটা এমন জটিল সমস্যার সরল সমাধান দেখানো যাবে।

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s