বৈজ্ঞানিকের দপ্তর মাথে মে ট্রিকস-আকাশের তারা গোনা কিংবা গাছের পাতা সূর্যনাথ ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৬

biggantricks (Medium)

আকাশের তারা গোনা কিংবা গাছের পাতা

সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

          যদি প্রশ্ন করা হয়, আকাশে ক’টা তারা আছে কিংবা বোটানিক্যাল গার্ডেনের বটগাছে ক’টা পাতা আছে, তার কি কোনও উত্তর হয়? উত্তর তো একটা নিশ্চই আছে কিন্তু চরম ধৈর্যবান মানুষের পক্ষেও সে উত্তর গুণে বার করা সম্ভব নয়।

আজকে দুটো এমন অঙ্ক আলোচনা করতে চাই, যেগুলো শুনলে এইরকমই মনে হবে, এ প্রশ্নের উত্তর কি বার করা সম্ভব? কিন্তু প্রশ্নগুলো যেহেতু অঙ্কের, তাই সরাসরি গণনা ছাড়াও অন্য বিশেষ পদ্ধতি আছে যার দ্বারা এই আপাত-অসম্ভব উত্তরও বার করা সম্ভব।

প্রথম প্রশ্নটি আমার এক বন্ধু পাঠিয়েছিলেন। অঙ্কের ভাষায় যাবো না, সরল কথায় প্রশ্নটা এইরকম—

একটা পঞ্চাশ অঙ্কের সংখ্যার বাঁদিক থেকে পঁচিশ নম্বর অঙ্কটি ছাড়া আর সবই ১।

অর্থাৎ সংখ্যাটি হল—

১১১১১১১১১১১১১১১১১১১১১১১১n১১১১১১১১১১১১১১১১১১১১১১১১১ !

এই পুরো সংখ্যাটি ১৩ দ্বারা বিভাজ্য হলে ঐ n অঙ্কটি কত?

শুনলে একটা অবিশ্বাস আসে— দূর, একি বলা সম্ভব নাকি? কিন্তু অসম্ভবই বা কেন, ঐ n-এর জায়গায় ১,২,৩,… ইত্যাদি অঙ্ক এক এক করে বসিয়ে কষে দেখলেই হয় সংখ্যাটা ১৩ দিয়ে বিভাজ্য কিনা!

এটা একটা পদ্ধতি বটে। এবং নির্ভুল পদ্ধতি, কোনও একটা অঙ্কে নিশ্চই ভাগ মিলে যাবে। সেটাই উত্তর। কিন্তু—

হ্যাঁ, একটা বিরাট ‘কিন্তু’। যতটা সহজে বলা গেল, প্রকৃত কাজটা করা কি ততই সহজ? কে করবে ঐ মেহনত? ধরা যাক, কম্পিউটারের সাহায্য পাওয়া যাবে না। তাহলে? মনে হয় কেউ নিশ্চই ও পথে পা বাড়াতে চাইবে না।

বাড়ানো উচিৎও নয়। তাহলে আর কোনও সহজ উপায় কি আছে নাকি? সৌভাগের কথা, আছে। সহজ যুক্তি দিয়ে এই ধাঁধার মত অঙ্কের উত্তর বার করা যায়।

প্রশ্নটা সংখ্যা-তত্ত্বের। কিন্তু জটিল সংখ্যা-তত্ত্বে যাবার দরকার নেই। যুক্তি দিয়েই ভেবে দেখা যেতে পারে। তা যুক্তিগুলো এইভাবে সাজালাম—

[১] সংখ্যাটাকে তিনটে সংখ্যার সমষ্টিতে ভেঙে নাও— (১) ২৪টা ১ এর পিঠে ২৬টা শূণ্য, (২) ঐ অজানা সংখ্যাটা, তারপর ১ ও তারপরে ২৪ টা শূণ্য এবং (৩) ২৪টা ১। সহজেই ধরা যাচ্ছে, এই তিনটে সংখ্যার সমষ্টি হল ঐ সংখ্যাটা।

[২] এখন এটা তো জানা, যে কোনও তিন অঙ্কের সংখ্যার পিঠে ঐ সংখ্যাটাই আবার লিখলে যে ছ’অঙ্কের সংখ্যাটা পাওয়া যায় তা ১৩ দিয়ে বিভাজ্য (খুব সহজ যুক্তি। যেহেতু ঐ ছ’অঙ্কের সংখ্যাটার একটা গুণনীয়ক ১০০১, যেটা কিনা ১৩ দিয়ে বিভাজ্য!)।

[৩] এই যুক্তিতে (১) আর (৩) সংখ্যা দুটোই ১৩ দিয়ে বিভাজ্য। যেহেতু পুরো সংখ্যাটা ১৩ দিয়ে বিভাজ্য, অতএব সংখ্যা (২) টাও ১৩ দিয়ে বিভাজ্য হতে হবে।

[৪] (২)-র ডানদিকে যেহেতু যুগ্মসংখ্যক শূণ্য আছে, সুতরাং ঐ অজানা সংখ্যাটা ও তারপর ১ মিলে যে দু’অঙ্কের সংখ্যাটা সেটা ১৩ দিয়ে বিভাজ্য হওয়া ছাড়া গতি নেই।

[৫] তাই অজানা সংখ্যাটা ৯!

খুব ‘পেশাদার’ সমাধান বোধহয় হল না। কিন্তু উত্তরটা ঠিক। এবং যুক্তিগুলোও।

এই প্রশ্নের একটা ‘এক্সট্রা’ও আছে। ঐ আজানা সংখ্যাটা বাঁদিক থেকে না হয়ে যদি ডানদিক থেকে পঁচিশ নম্বর ঘরে হত, তাহলে?

এটা তোমরাই বার করতে পারবে, প্রায় একইভাবে।

নিশ্চই ভাবছ, যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ কষা হল না, ফর্মুলা ব্যবহার করা হল না, ইকুয়েশন-ডায়াগ্রাম এল না— এ কী রকম অঙ্ক?

হ্যাঁ, এও অঙ্ক। বস্তুত এইটাই অঙ্ক! ফর্মুলা আর ইকুয়েশন কিন্তু যুক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। শুধু একইরকম যুক্তি বারবার ব্যবহার করতে ঐগুলো প্রত্যেকবার আর আলাদা করে দেখানো হয় না।

এইরকম আর একটা অঙ্ক(!) যুক্তি দিয়ে সমাধান করা যাক। দ্বিতীয় প্রশ্নটা এই—

এক থেকে এক কোটি পর্যন্ত সংখ্যাগুলোর অঙ্কগুলোর সমষ্টি কত?

এখানে সংখ্যার অঙ্কের সমষ্টি বলতে সেই সংখ্যায় যে অঙ্কগুলো আছে তাদের সমষ্টি। যেমন, ৮৩৪৯২ এই সংখ্যাটির অঙ্কের সমষ্টি হল ৮+৩+৪+৯+২=২৬। এইরকম সব সংখ্যার জন্য। ওরেব্বাবা! এই ভাবে এক থেকে এক কোটি? সে কি সম্ভব নাকি?

সম্ভব। না, প্রথাগতভাবে কষে সম্ভব নয়। কিন্তু যুক্তির সাহায্যে— একটু চালাকি করে— দেখো না চেষ্টা করে।

ততক্ষণ আর একটা অঙ্কের ধাঁধা দেখে নেওয়া যাক না হয়। মনে কর, একটা ব্যাগে ৭৫টা সাদা বল আর ৮০টা কালো বল আছে। এ ছাড়া ঐ ব্যাগের বাইরে আমাদের কাছে আরও অনেক কালো বল আছে। ঐ ব্যাগ থেকে না দেখে দু’টো করে বল তোলা হবে এই পদ্ধতিতে—

(১) যদি দুটোই কালো বল ওঠে তাহলে একটা বাইরে ফেলে দেওয়া হবে আর একটা আবার ঐ ব্যাগে রেখে দেওয়া হবে।

(২) যদি একটা সাদা আর একটা কালো বল ওঠে তাহলে কালো বলটা বাইরে ফেলে দেওয়া হবে আর সাদা বলটা আবার ঐ ব্যাগে রেখে দেওয়া হবে।

(৩) যদি দুটোই সাদা বল ওঠে তাহলে দুটোই বাইরে ফেলে দেওয়া হবে আর বাইরে থেকে একটা কালো বলে ঐ ব্যাগে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে।

দেখা যাচ্ছে, এইভাবে প্রতি ক্ষেত্রেই দুটো করে বল বেরোচ্ছে আর একটা করে বল ভেতরে যাচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতিবার ব্যাগ থেকে একটা করে বল কম হয়ে যাচ্ছে। তার অর্থ, কম হতে হতে একসময়ে ব্যাগে একটামাত্র বল পড়ে থাকবে। প্রশ্ন হল, ঐ শেষ বলটার রং কি?

প্রশ্নটা দেখলেই সেই অবিশ্বাসের অনুভূতি। এ কি বলা সম্ভব নাকি? কি ক্রমে কি রঙের বল উঠবে তার তো কোনও স্থিরতা নেই। তাহলে? নিশ্চই ভাবছ, কোনও ধাঁধার বইয়ে এই প্রশ্ন পেয়েছি। কিন্তু না, এ কোনও ধাঁধা নয়। অস্ট্রেলিয়ার গণিত অলিম্পিয়াডে ১৯৮৩ সালে এই প্রশ্ন করা হয়েছিল। মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবলেই দেখা যাবে এর একটা সুনির্দিষ্ট উত্তর আছে এবং তা পাওয়া যায় সহজ বোধগম্য কিছু যুক্তি বিচার করলেই! দেখাই যাক।

প্রথমেই দেখা যাচ্ছে, প্রতিবারেই কালো বলের সংখ্যা একটা করে বাড়ছে বা কমছে। (১) আর (২)-এ একটা করে কমছে, (৩)-এর ক্ষেত্রে একটা বাড়ছে। তাহলে কোনও না কোনও সময়ে সেটা ১-এ এসে পৌছতেই পারে। কিন্তু তা থেকে সেটাই যে শেষ বল, এটা বলা যাবে না। কেননা তখন সাদা বল অবশিষ্ট থাকতে পারে। অতএব এদিক দিয়ে সুবিধে হচ্ছে না। তাহলে সাদা বলের ক্ষেত্রে কি হচ্ছে দেখা যাক।

দেখা যাচ্ছে (১) ও (২)-এর জন্য সাদা বলের সংখ্যায় কোনও পরিবর্তন নেই। একমাত্র (৩)-এর ক্ষেত্রে দু’টি করে সাদা বল কম হয়ে যাচ্ছে। একটা ক্লু পাওয়া গেল মনে হচ্ছে। যে রঙেরই দুটি বল তোলা হোক না কেন, সাদা বলের সংখ্যায় হয় পরিবর্তন হবে না অথবা দুটি কমে যাবে। অর্থাৎ সাদা বলের সংখ্যা সর্বদাই জোড়সংখ্যায় কম হবে। যেহেতু বিজোড় সংখ্যক সাদা বল আছে (৭৫), তাই অন্তত একটা সাদা বল ব্যাগে থেকেই যাবে। অতএব অন্তিম বলটি সাদা হতেই হবে! কেননা, অন্তিম বলটি কালো হওয়ার অর্থ ৭৫টি সাদা বল বেরিয়ে গেছে, যা সম্ভব নয়।

খুব কঠিন যুক্তি নয় বোধহয়। এবং অবশ্যই চমকপ্রদ, তাই নয় কি? একই যুক্তির বিচারে বলতে পারো, বলের সংখ্যা উল্টো হলে (৭৫টি কালো আর ৮০টি সাদা) উত্তর কি হোতো?

দ্বিতীয় প্রশ্নের সমাধান। মনে করো সংখ্যাগুলো দুই স্তম্ভে নীচে দেখানো কায়দায় লেখা হল। দ্বিতীয় স্তম্ভে প্রথম স্তম্ভের বিপরীতক্রমে। লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, প্রতি সারির দুটি করে সংখ্যার অঙ্কগুলির যোগফল ৭টি করে ৯-এর সমষ্টি। অর্থাৎ—

১ থেকে ৯৯৯৯৯৯৯ সংখ্যাগুলি   সংখ্যা-জোড়ার অঙ্ক-সমষ্টি

০                 ৯৯৯৯৯৯৯       ৬৩

১                 ৯৯৯৯৯৯৮       ৬৩

২                 ৯৯৯৯৯৯৭        ৬৩

৩                 ৯৯৯৯৯৯৬       ৬৩

—————-

৪৯৯৯৯৯৭      ৫০০০০০২     ৬৩

৪৯৯৯৯৯৮     ৫০০০০০১      ৬৩

৪৯৯৯৯৯৯      ৫০০০০০০     ৬৩

যেহেতু ৫০০০০০০ সারি আছে, অতএব সবকটির অঙ্কসমষ্টি

= ৫০০০০০০ × ৬৩ = ৩১৫০০০০০০ ।

এক কোটি (১০০০০০০০) সংখ্যাটি এর মধ্যে ধরা হয়নি। কিন্তু তার অঙ্ক-সমষ্টি ১।

অতএব নির্ণেয় অঙ্কসমষ্টি = ৩১৫০০০০০১ ।

আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই মনে হয়। চালাকি, তাই না? হলই না হয়, যুক্তি তো আছে!

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s